শ্রী শ্রী গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ সম্বন্ধীয় বিভিন্ন আলোচনা এই “পুরোনো সেই বনগ্রামের কথা” পেজে করা হচ্ছিলো। আগের দিনের আলোচনায় ‘সাধারণ মানুষ, মহাপুরুষগণ এবং ভগবানের লীলাসাথী বা পার্ষদ’-দের উল্লেখ করে কিছু কথা বলে একটা গৌরচন্দ্রিকা করা হয়েছিল । এইটা কেন করা হয়েছিল তার মূল কারণটা এখন বলার চেষ্টা করছি ! দেখুন গুরু মহারাজ স্বামী পরমানন্দ স্থুল শরীর ছেড়েছেন ১৯৯৯ সালের ২৭ শে নভেম্বর। তার মানে হোচ্ছে প্রায় ২৫ বছর হয়েই গেল !! গুরুজীর স্থূলশরীর ছাড়ার পর গুরু মহারাজের প্রিয় সন্তান, সহযোগী পার্ষদদেরও অনেকেই শরীর ছেড়ে দিয়েছেন ! তবুও যাঁরা “পুরোনো বনগ্রাম আশ্রম”-এর সাধু, ব্রহ্মচারী, ভক্তবৃন্দ এখনো শরীরে রয়েছেন, আপনারা যারা পরমানন্দ অনুরাগী _সেটা হোতে পারে তাঁরা বনগ্রামে থাকেন বা বনগ্রামের বাইরে অন্য কোনো শাখা আশ্রমে থাকেন বা স্বগৃহে অথবা অন্য যে কোনো স্থানে বসবাস করেন _ তাঁরা একটুখানি হোলেও অনুভব করেন যে, ‘বৃহত্তর বা সার্বিক পরমানন্দ ভাবনা, পরমানন্দ মিশন ভাবনা’-র প্রেক্ষিতে কোথাও যেন একটু তালটা কাটা ! বৃহত্তর পরমানন্দ মিশনের ছন্দটা যেন একটু পতন হয়েছে বলে মনে হয়ে থাকে !পুরোনো বনগ্রামের গুরু মহারাজের সন্ন্যাসী, ব্রহ্মচারী, ভক্তবৃন্দের মধ্যে কোথাও যেন একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে, ব্যক্তি ভাবনায় যেন একটা চাপা ভাব, মহামিলনের ভাবনায় যেন একটুখানি অসোয়াস্তি !!
কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি ? এইটার সার্বিক ব্যাখ্যা করতে গেলে একটা বড় বই লিখেও হয়তো শেষ করা যাবে না। সুতরাং আমরা সেই সব ব্যাখ্যায় মোটেই যাবো না। আমরা শুধু সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করবো।
হে প্রিয় পাঠক বন্ধুগণ ! হে প্রিয় পরমানন্দ ভক্তগণ ! দেখুন— আমরা এইটুকু নিশ্চয়ই জানি যে, আমরা ভগবান বা ঈশ্বরের অবতার তো নয়ই অবতারের সাথী-পার্ষদ-সহচরও নই, আমরা নিতান্তই সাধারণ মানুষ ! সুতরাং আমরা যেন আমাদের level-টা বিস্মৃত না হই ! আমরা যেন ‘এই আশ্রমের ভক্ত ওই আশ্রমের ভক্ত’ এইরূপ কোনো দলাদলির মধ্যে নিজেকে জড়িয়ে না ফেলি !! জানেন _পুরোনো বনগ্রামের মহারাজেরা, পার্ষদেরা, সাথীরা, লীলা সহচরেরা শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতে উল্লেখিত সেই হোমাপাখির বাচ্চার মতো ! মনে হবে নিচের দিকে পড়তে পড়তে বোধয় মাটিতেই আছাড় খাবে –কিন্তু না !! পাখাদুটো খোলার ক্ষমতা অর্জন করলেই আবার উপরের দিকে চোঁ চোঁ দৌড় ! সোজা মায়ের কোলের কাছে নিরাপদ আশ্রয়ে !
মহাভারতের কাহিনীতে আমরা পাই __কৌরব এবং পান্ডবদের মধ্যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কথা ! প্রথম থেকেই দুর্যোধন, পঞ্চপান্ডবদের প্রতি দ্বেষ-বিদ্বেষ-রেষারেষি-হিংসা ইত্যাদি করতো এবং পরবর্তীতে এরই ফলস্বরূপ হয়েছিল রক্তক্ষয়ী ঐ মারণ যুদ্ধ _ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ! একদলের(কৌরবদের) প্রায় সকলে যুদ্ধক্ষেত্রেই মারা গিয়েছিলেন, আর একদল(পান্ডবেরা) যুদ্ধ শেষে রাজসূয় যজ্ঞ (আত্মীয়-স্বজন-পরিজনদের হত্যার পাপস্খালনের নিমিত্তে) সম্পন্ন করার পর সন্তানদের হাতে রাজ্যপাট সঁপে দিয়ে মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করে একে একে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু এতো কষ্ট করে স্বর্গে পৌঁছানোর পর পান্ডবপক্ষের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা যুধিষ্ঠির দেখেছিলেন যে, সেখানে দেবরাজ ইন্দ্রের সাথে একাসনে বসে রয়েছেন দুর্যোধন এবং তাঁরা হাসিমুখে যুধিষ্ঠিরকে স্বর্গরাজ্যে আগমনের জন্য সম্ভাষণ জানাচ্ছেন!!
ব্যাপারটা কি বুঝলেন কিছু !!! কিরকম গোলমেলে ব্যাপার দেখেছেন!! আমরা কেউ যদি যুধিষ্ঠিরদের দলে, আবার কেউ দূর্যোধনের দলে নাম লেখাই–তাহলে আমরাও ঐরকমই মারামারি করে মরবো । কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের গতি কি হবে_ মহাভারতকার সেইটা বিশেষ করে কিছু লেখে নি। শুধু উল্লেখ রয়েছে যে, যেহেতু ‘ধর্ম ক্ষেত্রে(কুরুক্ষেত্র) মৃত্যু হয়েছে তাই সবারই সদগতি হবে।। কিন্তু আমরা তো কুরুক্ষেত্রের রনাঙ্গনে নাই তাই দলাদলির চাপে পড়ে মৃত্যু হোলে আমাদের কি গতি হবে ? আরে–গতি আবার হবে কি _আমাদের অনন্ত দুর্গতি হবে !! আমাদের ক্রিয়মান কর্মের বোঝা নিয়ে বারবার এই জন্ম মৃত্যুর চক্রে ফিরে আসতে হবে !! কিন্তু তেনারা(ভগবানের পার্ষদেরা) যেখানকার লোক সেখানে গিয়ে দিব্যি পরমানন্দে থেকে যাবেন !!
এজন্যই আমাদের শাশ্ত্রগ্রন্থে বলা রয়েছে_ “সাধু সাবধান!” এটা সাধারণ মানুষদের প্রতি মহাজনগণের একটা সাবধান বাণী ! এখানে “সাধু” বলতে শুধুমাত্র যে সন্ন্যাসীদেরকেই বলা হয়ছে এমনটা নয়! এই কথা সকল সৎ-বিবেকবান-সাধন ভজনকারী ব্যক্তিদেরকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে। গুরু মহারাজ বলেছিলেন “যে সাধে সেই সাধু;” এখানে ‘সাধে’ বলতে সাধন ভজন করাকে বোঝানো হয়েছে । ন’কাকা অর্থাৎ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীও আমাকে কথা প্রসঙ্গে প্রায়ই আশ্রমের বা বাইরের সাধুবিশেষতঃ খবরের কাগজে উল্লেখিত বিভিন্ন সাধু-সন্ন্যাসীদের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলতেন “আর বাবাওই গেরুয়া রঙের কাপড় পড়ে সাধু সাজাই হয়েছে ! প্রকৃত অর্থে ‘সাধু’ হওয়া আর হোলো কই বাবা !! জানে না তো সাজলেই ‘সাজা’ হবে! আর হোচ্ছেও তো–দেখছো না এরা সবাই নানান সমস্যার (শারীরিক–মানসিক, খবরের কাগজে উল্লেখিত সাধুরা তো রাজদন্ডও ভোগ করছে) মধ্যে রয়েছে !” তার পরেই বলতেন “মন না রাঙায়ে বসন রাঙালি _ কি ভুল করিলি যোগী।”
যাই হোক, আমাদের কথা তথাকথিত সাধুসন্তদেরকে নিয়ে নয় বা তাদের জীবনযাত্রাকে নিয়েও নয় ! এইটুকু আমরা অর্থাৎ পরমানন্দ ভক্তেরা জানি যে_ রাস্তা ঘাটে দেখতে পাওয়া ঝলমলে সাজ পোশাক পরা সাধু, নানান বেশধারী সাধু বা হয়তো কোনো বড় মঠ-মিশনের গেরুয়া পরা সাধু অথবা কোনো ফকিরবাবা -তান্ত্রিক- যোগী ইত্যাদি যাদেরকেই আমরা দেখতে পাই প্রথমেই আমরা(পরমানন্দ ভক্তেরা) তাঁদের কাউকেই বিরাট একটা কিছু বলে মনে করি না !! অবশ্যই তাঁদেরকে আমরা ভক্তি করি, শ্রদ্ধা করি_ তাঁর পোশাককে-তাঁর জীবনযাত্রাকে সম্মান করি । কিন্তু হৃদয়ের আসনে বসার জায়গা ততক্ষণ দিতে পারি না_ যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁর চালচলন, তাঁর আচার ব্যবহার, তাঁর ত্যাগ ও বৈরাগ্যপূর্ণ জীবন সম্বন্ধে সম্যক রূপে পরিচিত হই !
এর কারণ _ আমরা যে স্বামী পরমানন্দের সন্তান ! আমরা যে গেরুয়া বসন পরা সন্ন্যাসীর বেশে থাকা স্বয়ং ভগবান স্বামী পরমানন্দকে দেখেছি !! আমরা এইটা অন্তরের গভীর থেকে জানি যে, অমনটা তো আর এই পৃথিবী গ্রহে সমকালীন সময়ে আর কেউ হোতে পারে না ! আবার যদি কখনো ঈশ্বরের অবতরণ হয় এবং তিনি যদি সন্ন্যাসীরই বেশ ধারণ করে লীলাখেলা করেন(যদিও এমনটাও আর হওয়া সম্ভব নয় কারণ ভগবানের একই লীলা দুইবার হয়না অর্থাৎ লীলার repeataion হয় না), তখন সমকালীন মানুষেরা জানতে পারবে প্রকৃতঅর্থে “সাধু” বলতে ঠিক কি বোঝায় ! হয়তো স্বামী বিবেকানন্দের সময়কালীন মানুষেরা, যারা তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছিল, তারা কিছুটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিল ।
সুতরাং পরমানন্দ ভক্তদের আর বর্তমানের অন্য কোনো নামকরা সাধু-সন্ত, মহাত্মা, যোগী, সিদ্ধ ইত্যাদি নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা থাকার কথা নয় ! তবে তাঁদের সকলের প্রতি আমাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা-কর্তব্যবোধ ইত্যাদিরও খামতি নেই ! আবার অযথা আদিখ্যেতাও নাই !
তবে এইসব কথা এখন থাক্ ! আমরা ছিলাম ভগবানের পার্ষদদের কথায়-- যাঁরা হয়তো সাধু সন্ন্যাসীর বেশে, ব্রহ্মচারীর বেশে বা সাধারণ মানুষের বেশে রয়েছেন। হয়তো তাঁদের চলার পথে নানা অসঙ্গতি আপনার আমার চোখে পড়ছে ! তবু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের তাদের দোষ না ধরা, তাঁদের সমালোচনা না করাই একান্ত ভাবে কর্তব্য ! এইসব করলে তাঁদের কোনো অনিষ্ট হবে না, তাঁরা যে স্থিতির লোক _সেই স্থিতিতেই থেকে যাবেন, আরব্ধ কাজের শেষে তাঁরা একই জায়গায় (পরমানন্দলোকে) ফিরে যাবেন ! কিন্তু আমরা দোষদৃষ্টির দোষে দুষ্ট হয়ে সাজা পাবো_আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে পড়ে বারবার যাতায়াত করতে থাকবো !!
তাই আসুন –আমরা বিভিন্ন আশ্রমের সাধু-সন্তদের প্রতি দোষদৃষ্টি পরিহার করি ! আমরা শুধুমাত্র পরমানন্দমুখী হয়ে চলি এবং আমাদের জীবনকে মহাজীবনে রূপান্তরিত করার কাজে ব্রতী হই।। আসুন _আমরা পরমানন্দমুখী হয়ে জীবনের বাকি কটা দিন আনন্দে-পরমানন্দে কাটিয়ে দিই ! যদি আমাদের খন্ড ভাবনা–সম্প্রদায় ভাবনা থাকেও– তাহলেও যেন আমরা নিজের মনে দৃঢ়সংকল্প করে, কঠিন প্রতিজ্ঞা করে অর্থাৎ যে কোনো উপায়ে নেগেটিভ ভাবনা থেকে সরে আসি !
আমাদের জীবনের সাধন-ভজন-সেবাকর্ম ইত্যাদির একটাই উদ্দেশ্য হোক--'দোষদৃষ্টি পরিহারপূর্বক যো সো করে শ্রীগুরু পরমানন্দের প্রসন্নতা অর্জন করা, তাঁর কৃপা লাভ করা!!' মহাজনগণ এইজন্যই আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন যে, সর্বদা আমরা যেন এই প্রার্থনা করে চলি __ওঁ গুরু কৃপাহি কেবলম্ ! গুরু কৃপাহি কেবলম্। গুরু কৃপাহি কেবলম্!!
