(পূর্বের প্রকাশিতের পর)
প্রেমময় আনন্দময় গুরুজী – হরিদ্বারের কুম্ভমেলায় রেলওয়ে কোয়াটারে ডাক্তারের বাড়িতে আগের দিন রাতে আমাদের বললেন– তোরা আদিগঙ্গার পূর্ব পাড় ধরে দক্ষিণ দিকে যাবি ওখানে দুইশ চল্লিশ বছর বয়সী “দেওরহা বাবা”-কে দর্শন করে আসবি !!
গুরুজীর কথামতো রাত্রিতে আশ্রমে ফিরে গিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম। সকালে উঠে আশ্রমের টিফিন খেয়ে আদিগঙ্গার পূর্ব পাড় বরাবর দক্ষিণ দিকে যেতে লাগলাম। কিছুদুর যাওয়ার পর দেখলাম হিমালয় পাহাড়ের পাঁচ-ছয়টি চূড়া! ওখানে পৌঁছাতেই একটা বেশ মজার ঘটনা ঘটে গেল !একটি ময়ূর যেই ডেকে উঠলো__অমনি ওই পাহাড় গুলিতে বারবার অনুরণন হতে লাগলো ! এইটা শুনে আমার মনে খুবই আনন্দ হতে লাগলো ! এইটা দেখে আমিও একবার "ওঁ" উচ্চারণ করাতে, সেটাও ঐ পাহাড়গুলোতে বারবার অনুরণন হতে লাগলো। আনন্দ পেয়ে আমি আরো কয়েকবার "ওঁ" উচ্চারণ করলাম। আর পাহাড়গুলিতে "ওঁ"-এর ঐরূপ বারবার অনুরণ হওয়ায় আমার খুব ই আনন্দ হচ্ছিল । মনে হচ্ছিল যেন অন্য জগতে প্রবেশ করেছি !
আরো কিছু দূর যাবার পর এক ঘন জঙ্গল পড়লো , ভেতর দিয়ে খুবই সরু পথ , একজন হাঁটা যাবে। জঙ্গলে প্রবেশের কিছু পরে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখলাম ! আমাদের বাড়িতে একটি ছবি ছিল__ 'ভগবান শ্রীচৈতন্য এবং নিতাই জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, আর ছবির নিচে অর্ধবৃত্তাকারে ময়ূরেরা বসে আছে!'--- ওখানেও এক জায়গায় ঠিক সেই রকমই ময়ূরগুলি বসে ছিল ! এছাড়াও জঙ্গলের সরু রাস্তার দু'পাশে রাস্তার দিকে মুখ করে অসংখ্য ময়ূর বসে ছিল। আমি সামনে হাঁটছিলাম আর আমার সাথী দিলীপ ছিল আমার পিছনে। রাস্তাটি অত্যন্ত সরু হওয়ায় ময়ূরগুলির ঠোঁট আমাদের হাঁটুর কাছে ঠেকছিলো। আমি দিলীপকে বললাম__" ময়ূরগুলির দিকে তাকাবি না ! কারণ গুরুজী বলেছেন ময়ূরের ঠোঁটে এতো জোর-- যে ঠুকরে রক্ত বার করে দিতে পারে!" ফলে আমাদের দেখেই হোক বা গুরুজীর কৃপায় ময়ূরেরা আমাদেরকে কিছু ক্ষতি করলো না !
জঙ্গলের পথ ধরে কিছুদুর যাওয়ার পর দেখলাম, জঙ্গল থেকে বের হবার কোনো রাস্তাই নেই ! চারিদিকে শুধু কুলগাছের বন ! মাটির নিচ থেকে উপর পর্যন্ত কেবল কুলগাছের ডাল। কোনো উপায় না দেখে শেষে মাটিতে শুয়ে শুয়ে বুকে হেঁটে কোনরকমে জঙ্গলের বাইরে আসতে পেরেছিলাম। কিন্তু এইটা করতে গিয়ে বেশকিছু কুলগাছের কাঁটা পিঠে লেগে রক্ত বেরিয়ে গিয়েছিল !
ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে গিয়েছিল, রোদের তীব্রতায় খুবই কষ্ট হচ্ছিল। আমাদের চলার পথের ডান পাশ দিয়ে গঙ্গা খুবই তীব্র গতিতে উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে বয়ে চলেছিল। তাই আমরা গরমের হাত থেকে বাঁচতে গঙ্গার জলে গিয়ে পা ডুবিয়ে কিছুক্ষণ বসলাম এবং গঙ্গার শীতল জল পান করলাম ! এতে আমাদের সমস্ত শরীর-মন শীতল হয়ে গেল ! মা গঙ্গার শীতল স্পর্শে আমাদের শরীরের সমস্ত কষ্ট মুহূর্তে কোথায় যেন চলে গেল! ঐসময় আমি দিলীপকে বললাম__ "এই সময় একটা কমলালেবু হলে ভালো হয় !" এই কথাটা বলা শেষ হয়েছে – তখন ই দেখি – গঙ্গার পশ্চিম পাড় থেকে পূর্ব পাড়ে আমাদের দিকে একটা বড় কমলালেবু তীব্র বেগে ভেসে আসছে ! সেটা দেখতে পেয়ে আমি দিলীপকে বললাম__" দেখ্-- লেবুটা কেমন আমাদের দিকেই আসছে !" কমলালেবুটা আমাদের হাতের কাছে এসে থেমে গেল। জল থেকে তুলে দুজনে লেবুটি খেলাম ! অপূর্ব তার স্বাদ ! এই গোটা ঘটনাটাই আমাদের কাছে অলৌকিক লাগছিল ! এটা কোনদিনও সম্ভব যে, পশ্চিম পাড় থেকে পূর্ব পাড়ে ওইভাবে লেবুটার ভেসে আসা !!
পরে আমার মনে হয়েছিল –গুরুজী শুধুমাত্র আমাদের কুম্ভমেলায় পাঠিয়েই থেমে থাকেননি, আমাদের সাথে সাথেই সূক্ষ্মভাবে ছিলেন ! তাই সন্তানের ইচ্ছা তিনি সাথে সাথে পূরণ করেছিলেন !
গঙ্গার পাড় ধরে আরো কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর দু-তলার সমান উঁচু বাঁশের একটি মাচা ছিল , মাথার ওপর একটি খড়ের ছোট্ট ছাউনি দেওয়া ঘর , ঘরের সামনে বারান্দা । মাচার সামনে বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের কাছে থেকে জানলাম - এখানে এই মাচার উপরে দুশো চল্লিশ বছর বছরের দ 'দেওরহা বাবা' আছেন। মনে স্বস্তি হলো গুরুজীর কথামতো ঠিক জায়গাতেই এসেছি। বেশ কিছুক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে থাকার পর অর্থাৎ আরো কিছু লোক জমা হওয়ার পর__ দেওরহা বাবা মাচার উপরকার খড়ের ঘর থেকে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন ! তারপর উনি উপস্থিত আমাদের সকলকে বললেন__ "আমি তিনবার 'সিয়ারাম' বলবো, তোমরাও তা আমার সাথে সাথে বলবে"। আমরা সকলে ওনার সাথে 'সিয়ারাম' বলার পর উনি দুই হাত তুলে সকলকেই আশীর্বাদ মুদ্রা দেখালেন । এরপর উনি ফের মাচার উপরের কুঠিয়ায় ঢুকে
গেলেন ।
দুপুর দুটো-আড়াইটার সময় আশ্রমে ফিরে খাওয়ার পর জানতে পারলাম, 'হর কি পৌড়ি'-- ঘাটের কাছে আমরা যে ব্রিজের থাম্বার কাছে বসে শাহীস্নান দেখব ভেবেছিলাম__ সেই ব্রিজটি এবং আরো তিনটে ব্রিজ লোকের চাপে ভেঙে গিয়ে কয়েক হাজার লোক মারা গিয়েছে !!
গুরুজী নিষেধ না করলে – ওখানে আমরাও থাকতাম এবং থাকলে আমাদের যে কি অবস্থা হতো__তা তো বুঝতেই পারছেন !!
সব শুনে ভাবলাম — করুণাময় ভগবান তাঁর ভক্তদের প্রতি পদে পদে কিভাবে রক্ষা করেন ! এটা আমরা প্রত্যক্ষ অনুভব করলাম! আমার এই কথাগুলো গুরুজীর সঙ্গে সংযুক্ত অনেক ভক্ত ই বাস্তবে নিশ্চয় অনুভব করেছেন — !!
এটা শাশ্বত সত্য যে, করুণাময় গুরুজী আমাদের সর্বদা এইভাবেই রক্ষা করে চলেছেন !!!!!
( ক্রমশঃ - - -)
শুভ বিজয়া তে গুরুজী কে শ্রদ্ধা,ভক্তি ও প্রণাম জানাই ❗
‼️🙏🌺🙏‼️
পাঠকদের – আমার যথা স্থানে শুভ বিজয়া তে
শ্রদ্ধা ভক্তি , প্রণাম – প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানালাম ❗
