[পূর্ব প্রকাশিতের পর….]
পরমানন্দ, শ্যাম, শ্যামা -শিবে
ভেদ ভেবোনা আমার মন।
বহুতে এক দেখলে তবে ,
পাবি রে সেই মোক্ষ ধন।
পরম প্রেমময় গুরুজী, তাঁর কুটিরে দক্ষিণ দিকে বারান্দায় চেয়ারে বসলেন। গুরুজীকে দর্শন মাত্রই - আমাদের মধ্যে দিব্য আনন্দের ঢেউ বইতে লাগলো।
গুরুজী তাঁর ছোটবেলার হিমালয় ভ্রমণের কাহিনী বলছেন তা শুনে কখনো আমাদের মধ্যে শিহরণ জাগছিল, কখনো আবার কখনো আমাদের অন্তঃকরণে দিব্য আনন্দের স্রোত বইছিল ।
গুরুজী বলছিলেন– "জানিস , একদিন হিমালয়ের পাহাড়ি রাস্তায় সারাদিন হাঁটছি, হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা হয়ে এলো । তার উপর বৃষ্টি পড়তে লাগলো, ফলে ঘন অন্ধকার নেমে এলো ! ওখানে তখন প্রচন্ড শীত, এক্ষুনি আমার একটা আশ্রয়ের দরকার ! ঠিক তখনই দূরে একটি ক্ষীণ আলো দেখতে পেলাম ! নিশ্চিত আশ্রয় পাবার আশায় আলোটি অনুসরণ করে চলতে লাগলাম । হঠাৎ পায়ের তলার রাস্তা নরম লাগলো , কিছু পরেই আলোটি লক্ষ্য করে একটি সাধুর কুঠিয়ায় পৌছালাম। উনি আমার রাতে খাবার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করলেন । পরের দিন সকালে সাধুটির কাছে বিদায় নিয়ে যে পথে এসেছিলাম, সেই পথে কিছুদুর যাবার পর দেখি রাস্তাতেই বিশাল খাদ !
সাধুটির কাছে ফিরে গিয়ে সব বলতেই , উনি বললেন – "রাস্তা তো ১৫ -১৬ দিন আগে ধ্বসে নষ্ট হয়ে গেছে" । আমি বললাম_'কিন্তু কাল রাতে আমি তো এই রাস্তা দিয়েই এসেছি !' একথা শুনে সাধুটি হাসতে লাগলো, বলল _"আমিও তো কাল থেকে এটাই ভাবছি!" এরপর আমি ধ্যানে বসলাম। চেতনার গভীরে গিয়ে দেখলাম -- 'এক বিরাট পুরুষ খাদে দাঁড়িয়ে তার মস্ত হাতে আমাকে চাপিয়ে , আমায় এই বিরাট খাদ পাড় করে দিচ্ছে'।
তারপর ওই সাধুর কাছে বিদায় নিয়ে, তাঁর বলে দেওয়া পথ ধরে আবার পাহাড়ি রাস্তায় চলতে লাগলাম।
চলতে চলতে একটি জায়গায় শুনলাম , পাহাড়ের ওপরে একটি হ্রদ আছে, যেখানে রাত্রিতে দেবতারা স্নান করতে আসে। মনে মনে ঠিক করলাম, আমি দেবতাদের স্নান করা দেখতে যাব । কয়েকজন অবশ্য বারণ করল, বলল– "যারা ঐ স্নান করা দেখতে যায়, তারা আর ফেরে না" ।
আমি পাহাড়ের উপরে রাতের অন্ধকারে ওই হ্রদে গিয়ে পৌঁছালাম। অনেকক্ষণ বসে অপেক্ষা করছি, কিন্তু কোন দেবতাই তো আসছে না!
অবশেষে গভীররাতে দেখলাম দূর থেকে আলোর অনেকগুলি বিন্দু এই হ্রদের দিকে আসছে, ভাবলাম__ ‘বোধয় দেবতারা আসছে।’ হ্রদের কাছাকাছি আসতেই দেখলাম কয়েকটি বাঘ । বন্য পশুদের চোখ রাত্রিতে জ্বলে । প্রাণ বাঁচাতে ঠান্ডায় বরফগলা হ্রদের এক গলা জলে নেমে পড়লাম। বাঘগুলি সারারাত ঐ হ্রদের পাড়ে বসে রইল । সকাল হতেই বাঘ গুলি চলে গেল। ওরা চলে যাবার পর – পুকুর থেকে উঠে এলাম । এরপর পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে এসে আবার পাহাড়ি রাস্তায় চলতে লাগলাম ।
জানিস —হিমালয়ে ঘোরার সময় নেপালের ধবলগিরি যাবার রাস্তায় চলতে চলতে একবার পথ হারিয়ে ফেললাম। একই জায়গায় ঘুরছি_ এমন সময় একজন আমায় বলতে লাগলো – "সামনে এদিকে এসো" ! এগিয়ে যেতে আবার বলল_ "বাঁ দিকে এসো"! আবার কিছুদুর যাবার পর বলল_" ডানদিকে এসো"! এইভাবে দু তিন কিলোমিটার সেই নির্দেশ মেনে যেতে হলো । পাহাড়ি রাস্তায় চড়াই-উৎরাই পথে যত যাচ্ছি_ ঐ ব্যক্তির গলার জোর যেন আরও বাড়ছিল । যাই হোক, তাঁর নির্দেশমতো যেতে যেতে এক জায়গায় আসতেই নির্দেশ এলো_ "এবার দাঁড়াও! সামনের মাটি সরালেই একটি পাথরের চাঁই দেখা যাবে। ওটা সরাও!" পাথরের চাঁইটা সরাতেই দেখলাম একটি গুহার মুখ । গুহার মধ্যে প্রবেশ করে দেখি অতিবৃদ্ধ কঙ্কালসার একজন যোগী পুরুষ বসে আছেন । গোটা শরীরে চামড়া ঝুলে রয়েছে । চোখ দুটিও ঝোলা চামড়ায় ঢাকা।
এই যোগি পুরুষের গুরু , ওনার উপর সন্তুষ্ট হয়ে নির্বাণ স্থিতি (বোধে বোধ /ব্রক্ষ্ম জ্ঞান) দান করতে চেয়েছিলেন কিন্তু ঐ যোগীর – ভগবান বুদ্ধের দর্শনের ইচ্ছা ছিল। এই ইচ্ছা জানাতেই , গুরুদেব তাকে বলেছিলেন – তোমার এই ইচ্ছা পূরণের জন্য, তোমাকে বহুকাল অপেক্ষা করতে হবে ! তার চেয়ে তুমি এখনি নির্বাণ প্রাপ্ত হও"। কিন্তু সেই সাধক ভগবান বুদ্ধের দর্শনলাভের ইচ্ছাই জানালেন । তখন গুরুদেব বললেন –"যখন লোহার পাখি আকাশে উড়বে , লোহার হাঁস জলে ভাসবে , জলে আগুন হবে ,তখন তাঁর দর্শন পাবে।" গুরুর এই কথা মতো তাঁর শিষ্য প্রায় দুই হাজার বছর , এই গুহার মধ্যে সাধনার গভীরে ভুবে ছিলেন।
তারপর উনি হাত দিয়ে চোখের ওপর ঝোলা চামড়া তুলে ধরতেই দেখলাম চোখের মনিগুলি তীব্র আলোর মতো যেন জ্বলছে । তারপর আমায় জিজ্ঞাসা করলেন "লোহার পাখি কি আকাশে উড়ছে ? লোহার হাঁস কি জলে চলছে ? জলে আগুন হয়" ? আমি 'হ্যাঁ'– বলাতে, উনি বললেন–"এতোদিনে আমার আন্তরিক ইচ্ছা পূর্ণ হলো"।
তারপর বললেন “বহুদিনের সাধনায় আমি জগত জ্ঞান এবং চৌষট্টি সিদ্ধি লাভ করেছি, সেই জ্ঞান আমি তোমাকে দিতে চাই ।” আমি সম্মতি জানাতে, উনি আমার মধ্যে সেই জ্ঞান সঞ্চার করলেন ।
আমি তাঁকে একটু সেবা করার কথা বলতে, উনি বললেন– "না" । তারপর আমার কাছে শরীর ছাড়ার অনুমতি চেয়ে , শরীর ছেড়ে দিলেন । আমি ওনার সৎকার করে আবার পাহাড়ি রাস্তায় চলতে শুরু
করলাম।।
ক্রমশ - - -
