পরম প্রেমময়, আনন্দময় গুরুজী তাঁর কুঠিয়ার দক্ষিণ দিকে ছোট্ট বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে তার
ছোটবেলার কাহিনী বলছিলেন– । আর আমরা উপস্থিত ৭/৮ জন ভক্তরা জবা গাছের তলায় বসে তাঁর অমৃত কথা শুনছিলাম। তাঁর কথায় আমরা কখনো খুবই আনন্দ উপভোগ করছিলাম, আবার কখনো খুবই কষ্টও পাচ্ছিলাম ।
গুরুজী বলছিলেন — “জানিস , ঘুরতে ঘুরতে হরিদ্বারে এলাম । জায়গাটা আমার খুবই ভালো লাগলো, অনেক সাধু এবং তীর্থযাত্রীরা এখানে এসে রয়েছে ! এখানকার প্রকৃতি খুবই সুন্দর ! মা গঙ্গার স্বচ্ছ জল তীব্র বেগে বয়ে যাচ্ছে । ঘুরে ঘুরে অনেক মন্দির দেখছি, কিন্তু দুদিন ধরে কোনো খাবর পাইনি, ফলে খুবই খিদে পেয়েছিল । খিদের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে, একটা ফলের দোকানের পাশে পড়ে থাকা কলার খোসাই গোটাকয়েক তুলে খেয়ে নিলাম। তোদের হয়তো বিশ্বাস হবেনা_ হয়তো ভাবছিস– ‘কলার খোসা খায় নাকি?’ কিন্তু খিদে মেটাতে মানুষকে অনেক কিছু করতে হয় বাবা ! যাই হোক, সেটাও খাচ্ছিলাম, এমন সময় একটা লোক গালাগালি দিতে দিতে সেখানে এলো, এসে সে বলল ‘কাজ করে খেতে পারো না !’ এটা শুনে আমি
ভাবলাম মা জগদম্বার যেটা ইচ্ছা ! ফলে আমি সেই স্থান ত্যাগ করে চলে গেলাম।
দ্যাখো, খিদের জ্বালা আমি নিজে অনেকবারই অনুভব করেছি কিন্তু তার ভয়ানক রূপ আমি একবার প্রত্যক্ষ করেছিলাম । সেই ঘটনাটা শোন--!
১৯৭৮ সালে খুবই বড় বন্যা হয়েছিল , অনেকেই হয়তো জানিস।
সেই সময় আমি দামোদরের ধারে চক্ষণযাদি গ্ৰামে টগরদের বাড়িতে ছিলাম। টগরদের বাড়ি বন্যায় প্রায় এক তলা ডুবে গেছিলো, তবে ওদের পাকা বাড়ি হওয়ায়, ওদের ছাদে গ্রামে অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। কারো কাছে কোনো খাবার ছিল না , দু’দিন ধরে সবার উপবাস । দুদিন পর কিছু রুটি যোগাড় হলো। আমি বললাম __’প্রথমে বাচ্চা ও বৃদ্ধদের দেওয়া হবে, তারপর মায়েদের দেওয়া হবে, তারপর পুরুষদের। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, বাচ্চাদের যেই রুটি দিলাম — অমনি মায়েরা বাচ্চাদের হাত থেকে ছোঁ মেরে রুটি কেড়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি কোনরকমে গিলে গিলে খেতে লাগলো !! সবাই বলে–‘ বাচ্চাকে দিয়ে-খাইয়ে মায়েরা খায়’ । খিদের জ্বালায় কোথায় গেল সেই সব কথা–! তাহলে
যাক সে কথা ! মা জগদম্বা কতক্ষণই বা আমার কষ্ট দেখতে পারেন, অবশেষে মা জগদম্বা -ই পেট ভরে খাবার খাইয়ে দিল । খেয়ে দেয়ে গায়ে একটু বল এলো, এরপর হরিদ্বারের মনসামাতা পাহাড়ে উঠে মাকে দর্শন করলাম । তারপর আদিগঙ্গার পূর্বপাড়ে চন্ডীমাতা পাহাড়ে গেলাম , ওখানে মা চন্ডীকে দর্শন করে এলাম ।”
গুরুজীর আলোচনার রেশ ধরে প্রসঙ্গক্রমে একটা কথা মনে পড়ে গেল। সেইটা বলে নিই—
১৯৮৬ সালে হরিদ্বারে পূর্ণ কুম্ভের মেলা বসেছিল। পূর্ণ কুম্ভের মেলাতে গুরুজী গেছেন_ শুনলাম। শোনামাত্র আমারও খুব যাওয়ার ইচ্ছা হলো , ওখানে গিয়ে যদি গুরুজীর সাথে দেখা হয় – তাহলে খুব ভালো লাগবে ! এই কথাগুলি আমাদের গুরুভাই দিলীপ কুন্ডুকে বলতে ও রাজি হয়ে গেল । আমার এক বন্ধু শম্ভুনাথ লাহা আর্মিতে সার্ভিস করে, ওর পোস্টিং ছিল জম্মুতে । ও প্রায় দু মাস হল ছূটিতে এসেছে ।সব শুনে ও বলল -‘ ঠিক আছে, আমার ছুটি তো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে । আমার সাথে ফৌজি কামরাতে চলে যাবি ‘। ওর কথামতো জম্মু তাওয়াই এক্সপ্রেসে টিকিট কাটা হলো। নির্দিষ্ট দিনে ওই ট্রেনে চেপে পরের দিন রাত্রি দুটোর সময় লকসর্ স্টেশনে নামলাম । ওখান থেকে ভোর চারটের সময় হরিদ্বার যাওয়ার ট্রেনে চেপে সকাল ছটায় হরিদ্বারে নামলাম। কোথায় আশ্রয় পাবো জানিনা তাই টিকিটচেকারকেই বললাম’যদি কোথাও থাকার জায়গা না পাই, তাহলে রাত্রিতে স্টেশনে এসে যদি থাকি– কোনো কি অসুবিধা আছে ?’ টিকিটচেকার বললেন ‘রাতে এসে এখানে থাকতে পারেন’ ।
তখন হিন্দি একটু একটু বুঝি কিন্তু বলতে ভালো পারতাম না ।
কুম্ভ মেলার মধ্যে ঢুকলাম, যেদিকে তাকাচ্ছি খাঁকি পোশাকের পুলিশ , আর গেরুয়া পোশাকের সন্ন্যাসী । গঙ্গা নদীর বালুচরের উপর তাঁবু দিয়ে ঘেরা অনেক আশ্রম । "হর-কি-পৌড়ি" ঘাটে স্নান করে সারাদিন কুম্ভের মেলাতে ঘুরে দুপুরের পর পায়ে হেঁটে মনসামাতা পাহাড়ে উঠলাম । পাহাড় থেকে নেমে, এক পাউন্ড পাউরুটি আর রাবড়ি কিনে দুজনে খেলাম । ওতেই এমন পেট ভরে গেলো যে, শেষে আর খেতেই পারছিলাম না। রাতে থাকার জন্য কয়েকটি হোটেলে গেছিলাম কিন্তু সঙ্গে ফ্যামিলি নেই বলে, জায়গা হলো না । আরো একটু আগিয়ে গিয়ে রাস্তার একপাশে দেখি 'ভারত সেবাশ্রম সংঘে'র স্টলে খাবার বিলি হচ্ছে । যিনি বিলি করছিলেন তিনি একজন বাঙালি সন্ন্যাসী ! আমরাও বাঙালি জেনে, তিনি আমাদেরকে জোর করে লুচি তরকারি দিয়ে দিলেন। আমরা তো আর খেতে পারবো না__ তাই বাইরে এসে অন্যজনকে দিয়ে দিলাম । ভারত সেবাশ্রমে থাকার কথা বলতে, উনি বললেন__ 'একটু দূরে এগিয়ে যেতে হবে, ওখানে তাঁবুতে থাকতে পারেন!' । রাস্তাটি ক্রস করে ওপারে তাঁবু দিয়ে ঘেরা আশ্রম । একজন সন্ন্যাসী বসে প্রবচন করছিলেন । ভিতরে ত্রিপুরা সুন্দরীর মূর্তি । প্রবচন রত মহারাজকে দেখে ভালো
লাগলো , প্রণাম করলাম। বললেন_” কোথা থেকে আসছো?” আমরা বললাম “কোলকাতা থেকে”। উনি বললেন _ “ঠিক করে বলো (হিন্দিতে বলছেন)” । বললাম _ “কামারপুকুর থেকে!” এটা শুনেই উনি সামনে বসে থাকা ভক্তদের উদ্দেশ্যে বললেন _”ম্যাইনে দো বার উঁহা গিয়া থা , মেরা সমাধি হো গয়া “।
তারপর বললেন “কোথায় থাকবে ?” বললাম “কাঁধে কম্বল আছে, যখন ঘুম পাবেতখন মা গঙ্গারএই বালুচরের উপর শুয়ে পড়বো।” একথা শুনে উনি একটু অবাক হয়ে গেলেন, তারপর বললেন “এখানে তাঁবুতে থাকবে?” আমরা সম্মত হওয়ায় উনি একজন সাধুকে ডেকে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন।
বাংলার বাইরে এই প্রথম এলাম ।এরকম অচেনা অজানা জায়গায় এই বৃহৎ কুম্ভ মেলার মধ্যে এরকম সুব্যবস্থা হবে এটা স্বপ্নেও ভাবি নি ।
অন্তর্যামী প্রেমময় গুরুজীর ইচ্ছায় এবং করুণায় এটা সম্ভব হয়েছে ।
ক্রমশ
