(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
পরমপ্রেমময় পরমেশ্বর পরমানন্দ তাঁর কুঠিয়ার দক্ষিণ দিকে ইজি চেয়ারে বসে , তাঁর ঘটে যাওয়া– ছোটবেলার ঘটনা বলছিলেন আর দিব্য প্রেম বিলাচ্ছিলেন– । আর আমরা কয়েকজন ভাগ্যবান শ্রোতারা দিব্য প্রেমে বিভোর হয়ে সেই দিব্য আনন্দ উপভোগ করছিলাম।
গুরু মহারাজ বলে চলেছেন__"বয়স্ক সেই নাগা সন্ন্যাসী একজন মহাত্মা, ( উনার সাথে অল্প বয়স্ক একটি নাগা সন্ন্যাসী-শিষ্য ছিল ।) উনি আমায় বললেন, 'আমার এখানে আসা তোমার জন্য, ঈশ্বরের নির্দেশে তোমাকে আমি কৈলাস মানস সরোবর নিয়ে যাব। ওখান থেকে ফিরে আসার পর তোমাকে আরো অন্যান্য জায়গায় নিয়ে যাব ।
তবে এখন কৈলাস মানস সরোবর যাব।’
সাধুদের ঐ যাত্রাপথ খুবই কষ্টের । যাই হোক, আমাদের তিনজনের যাত্রা শুরু হলো । হিমালয়ের বহু পাহাড়চূড়ায় চড়াই-উতরাই ভেঙে ভেঙে আমরা এগিয়ে চলেছি, দিনের বেলা টানা চলা_ বিশ্রামের কোনো অবকাশ নেই। রাত্রিটা শুধু বিশ্রাম । চলার পথ জনমানব শূন্য , শেষে শুধু বরফের উপর দিয়ে চলা ! অবশেষে মহাত্মাজী একটা জায়গায় এসে বললেন আমরা এবার একটি গোপন সুরঙ্গ দিয়ে যাব , যা কেবল বিশেষ সাধু মহাত্মারাই জানে ।
অন্ধকার গুহা পথে তিন জনে চলেছি তো চলেছি ! চলতে চলতে গুহাপথের মধ্যে আরো একটি গুহার সামনে এসে ঐ মহাত্মাজী দাঁড়ালেন এবং সেই গুহার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেন । আমাদেরও গুহার মধ্যে ঢোকার জন্য বললেন । গুহায় ঢুকে দেখলাম মানুষের আকারে স্ফটিকের মত মূর্তি গুহার মধ্যে বসানো আছে ! মহাত্মাজী আমাকে বললেন “ইনি বাবাজী মহারাজ” । তারপর মহাত্মাজী স্ফটিকের মূর্তির কাছে গিয়ে “ওম নমঃ শিবায়” বললেন । তারপর স্ফটিকের মূর্তিটি ক্রমশ মানুষের রূপ নিল। তারপর আমায় দেখিয়ে বললেন_ “দেখুন কাকে নিয়ে এসেছি।” বাবাজি মহারাজ বললেন “ওর এখানে আসাটা মহামায়ার ইচ্ছাতে ই ছিল” ।
বাবাজি মহারাজকে যুবকের মতো দেখতে লাগলো কিন্তু ওনার দেহের বয়স প্রায় 2200 বছর শুনলাম ।
গোটা শরীর থেকে দিব্য জ্যোতি বেরোচ্ছে । আমি সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলাম । তারপর ওনার সাথে আমার বিশেষ কিছু কথাবার্তা হলো। পুনরায় প্রণাম জানিয়ে ওনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা পুনরায় অন্ধকার গুহা পথে চলতে থাকলাম ।
কিছুদূর চলার পর আবার অন্ধকার পথে আমরা আলো দেখতে পেলাম । তারপর মহাত্মাজী বললেন “গুহার পথ শেষ ,আমরা এবার শিব ভূমিতে প্রবেশ করব” । চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ_ খালি পায়ে বরফের উপর দিয়ে হাঁটছিলাম, আর কি ভীষণ ঠান্ডা যা শরীর সহ্য করতে পারছে না। বরফের ওপর হাঁটতে-হাঁটতে শরীর অবসন্ন হয়ে পড়লো , শেষে বরফের উপর পড়ে গেলাম।
সঙ্গে সঙ্গে মহাত্মাজী ঝোলা থেকে একটি শিকড় বের করে আমার জিভের তলায় দিয়ে দিল, কিছুক্ষণ পরে দেখি এই মাইনাস 30–মাইনাস 40 ডিগ্রি তাপমাত্রাতেও আমার শরীর দিয়ে ঘাম দিচ্ছে !! সাথে সাথে মহাত্মাজী আমায় বললেন "থুক
দে—” । আমি ঐ শিকড়টি মুখ থেকে ফেলে দিলাম এবং উঠে দাঁড়ালাম । আর কিছুক্ষণ ঐ শিকড়টি মুখে রাখলে হয়তো পাগল হয়ে যেতাম !
এইভাবে কয়েকদিন চলার পর আমরা মানসসরোবরে এলাম । মানস সরোবরে এসে আমরা মহা আনন্দে স্নান করলাম। এরপর কৈলাস পর্বতের দিকে যাত্রা শুরু করলাম কৈলাস পর্বতের পাদদেশে ‘ডারচেনে’ পৌছালাম। ডারচেন থেকে কৈলাস পরিক্রমা শুরু করলাম, সারাদিন হাঁটছি সন্ধ্যার দিকে ডিরিফুক গুম্ফার অধ্যক্ষ মহাত্মাজীকে সাদরে আহ্বান করলেন । আমরা তিন জন ওই গুম্ফায় প্রবেশ করলাম । রাত্রির খাবার হিসাবে লামারা আমাদের ছাবাক অর্থাৎ কাঠের পাত্রে তে কালো ডাল আর ইয়র্কের মাংস দিল । মাংস প্রচণ্ড দুর্গন্ধ হওয়াই মহাত্মাজী খেতে রাজি হলেন না । অবশেষে মঠাধ্যক্ষ এসে ভুট্টার ছাতু , মাখন আর কাল ডাল দিল। রাতে খাওয়ার কিছু পরে একে একে লামারা এবং মঠাধ্যক্ষ এলেন , তারপর ভগবান শিব এবং গুঢ় আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে আলোচনায় সকাল হয়ে গেলো ।
ডিরিফুক গুম্ফার মঠাধ্যক্ষ এবং লামাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পুনরায় আমরা কৈলাস পরিক্রমা শুরু করলাম।
যতই এগিয়ে যাচ্ছি, পাহাড়ের উচ্চতা ততই বাড়তে শুরু করলো । কৈলাস পর্বতের বরফ গলা জল থেকে কয়েকটি খরস্রোতা নদী সৃষ্টি হয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে । হাঁটতে হাঁটতে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় আমরা সেদিন জুনথুল গুম্ফায় রাত্রি বাস করলাম । সকাল হতেই পুনরায় কৈলাস পরিক্রমার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম ।
হাঁটতে হাঁটতে মহাত্মাজী এবং উনার সাথে ল্যাংটা সাধুটি_আমাকে একটি গুপ্ত গুহাতে নিয়ে গেলেন । সেই গুহার মধ্যে শিব স্থিতির মানুষেরাই প্রবেশ করতে পারে । ওনারা আমাকেও গুহার মধ্যে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। ভগবান শিব একবার তিব্বতি শরীর নিয়ে জন্ম নিয়েছিলেন এবং কৈলাসেতে যত দিন থাকতেন , এই গুহাতে বসবাস করতেন।।
এই গুহার মধ্যে ভগবান শিবের ব্যবহৃত বাঘছাল, ডমরু, ত্রিশূল আরো অনেক কিছু আছে। গুহার মধ্যে যাঁরা বসবাস করছেন_ ওনারাও শিব-স্থিতিতে আছেন । গুহার মধ্যে যতক্ষণ ছিলাম খুবই আনন্দ অনুভব করছিলাম । ওনাদের সাথেও গূঢ় আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
তারপর গুহা থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় কৈলাস পরিক্রমায় বেরোনো হলো। পরিক্রমা করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সেই দিন আমরা ‘সেলুন’ গুম্ফায় রাত্রি বাস করেছিলাম ।
ক্রমশ - - -
