জিজ্ঞাসু:— গুরুজী ! আপনি এতো কথা বলেন- সেগুলো যে আমি কম শুনি তা তো নয় কিন্তু সেইগুলো কাউকে বলার সময় দেখি– সব কথা মনে থাকে না, কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায় ! এমনটা কেন হয় গুরুজী?
গুরুমহারাজ:—- স্মৃতিশক্তি অটুট রাখার রহস্য হোলো_ ‘অস্খলিত ব্রহ্মচর্য’ ! যদি কারো অস্খলিত ব্রহ্মচর্য্য থাকে- তাহলে তার মেধা ভীষণ প্রখর হয়। ঐরকম মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি যদি কেউ থাকে, তাহলে দেখবি কয়েকবছর আগের ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা হয়তো সে তোকে বলছে, কিন্তু সে এমনভাবে বলবে যে মনে হবে যেন ঘটনাটা কালকে ঘটেছে ! দ্যাখো, যার জীবনে ব্রহ্মচর্য্য পালন ঠিক ঠিক হয়েছে, সে জীবনে কিছু একটা করবেই ! সে জগতে একটা দাগ রেখে যাবেই যাবে । তবে হ্যাঁ, সেটা ভালোর দিকেও হোতে পারে- আবার খারাপের দিকেও যেতে পারে ! জানিস_ আমার ক্ষেত্রে দেখেছি যাকে একবার দেখি, তাকে আর কখনো ভুলিনা। দেশী-বিদেশী ভক্ত মিলে কয়েক লক্ষ মানুষের (নারী-পুরুষ) নাম আমার মনে আছে, কারো সাথে দেখা হোলে_ তাকে তার নাম ধরেই সম্বোধন করি ! এছাড়া জন্ম-জন্মান্তরের অন্য অন্য জীবনের ঘটনার কথাও আমার স্মৃতিতে রয়েছে ! অটুট ব্রহ্মচর্য রক্ষাকারী যে কোনো সাধকের জীবনেই এইরকম ঘটনা ঘটতে পারে। স্মৃতিশক্তি জাগ্রত করার এটাই রহস্য ! তবে, সাধারণত আমি দেখি বেশিরভাগ মানুষই যেন আত্মবিস্মৃত ! এই যে ‘আত্মবিস্মৃতি’, শাস্ত্রে একেও একপ্রকারের ‘মৃত্যু’ হিসাবেই বর্ণনা করা হয়েছে ! একমাত্র “আত্মজ্ঞান”–লাভের পর_ এই আত্মবিস্মৃতি কাটে। আত্মজ্ঞান লাভ হোলে আর কোনোরকম স্মৃতিচারণাতেই কোনো অসুবিধা হয় না ! তখন সব জন্মের সমস্ত স্মৃতিই জাগ্রত হয়ে যায় ! আর এই অবস্থাতেই ঠিক ঠিক বোঝা যায় যে , জগতের সমস্ত অবস্থার সঙ্গেই আত্মার Relation রয়েছে ! দ্যাখ্- বিবর্তনের চক্রে পরে তোকে(যে কাউকে) তো পূর্বে পূর্বের বহু অবস্থাকেই অতিক্রম করে আসতে হয়েছে- ফলে সেইসব অভিজ্ঞতা তো তোর রয়েছেই_ শুধু আত্মবিস্মৃত হওয়ায় সেগুলি ঢাকা পড়ে রয়েছে। আত্মজ্ঞান লাভ হোলেই সেই সব স্মৃতি একেবারে জাগ্রত হয়ে যায় ! তখন জড়- চেতন- উদ্ভিদ সবার অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় এবং সবার সাথে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয় ! এমনকি এই সব কিছুর সাথে relation- ও তৈরি করা যায় ! দেখবি সাধারণত বেশিরভাগ মানুষ একা একা বেশিক্ষণ থাকলেই bore হয়ে যায় ! কোনো কিছুকে অবলম্বন করতে চায়, কারো সঙ্গ লাভ করতে চায়- বহুক্ষণ একাকী একেবারেই থাকতে চায় না ! অথচ আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয় অন্যরকম। আমি দেখেছি কি জানিস- আমি কোনো অবস্থাতেই কখনো bore হই না ! আমাকে যদি চার দেওয়াল বিশিষ্ট অন্ধকার কারাগারেও রেখে দেওয়া হয়, তাতেও আমি bore হবো না ! সেখানকার দেওয়ালগুলির সঙ্গেই আমার relation তৈরি হয়ে যাবে ! কোনো ব্যক্তির সাথে good relation তৈরির ব্যাপারটা হোলো—ঐ মানুষটির চেতনায়, তোর নিজের চেতনাকে নিয়ে যাওয়া ! এইটা করতে পারলেই যে কোনো ব্যক্তিকে তোর ‘আপনার’ মনে হয় অথবা সে ও তোকে ‘আপনজন’ ভাবে। এই ভাবে, শুধু মানুষই নয়, যে কোনো পশু-পাখির চেতনাতেও তোর চেতনার যোগাযোগ সম্পন্ন করা যেতে পারে, লতা-গুল্ম-উদ্ভিদের সাথেও relation তৈরি করা যেতে পারে এবং এমনটা করতে পারলে তাদের অনেক কথা জানা সম্ভব হয়, এমনকি তাদের ব্যথাও অনুভব করা যায়। আমাদের বনগ্রাম আশ্রমের গাছগুলোর সঙ্গে আমি প্রায়ই communicate করি ! ওই যে দেখছো আমার সামনে যে নারকেল গাছটি রয়েছে- দীর্ঘদিন ধরে এই গাছটিতে ফল ধরছিল না। একদিন রাত্রে এখানে পায়চারি করার সময় আমার মনোজগতে ঐ কথাটা strike করলো, ফলে আমি ঐ গাছটিকে স্পর্শ করে ওর চেতনায় পৌঁছে গিয়ে ওকে অনুরোধ করলাম, বললাম_ ” তুমি এবার অভিমান ত্যাগ করো এবং ফল দাও” ! এর কিছুদিন পরেই দেখলাম গাছটায় ‘মুচি’ ধরলো এবং গাছটি ফলও দিতে শুরু করলো। আর ওপাশে ঐ যে নারকেল গাছটা দেখছো, ওটাতেও দেখছি বেশ কয়েক বছর ফল আসছে না ! প্রথম প্রথম দু -এক বছর ফল হয়েছিল- তারপর থেকে আর হোচ্ছে না ! ওকে এখনো কোনো অনুরোধ করিনি- ওর উপর অন্যরকম একটা experiment চলছে- দেখা যাক কি হয় ! যাই হোক যা বলছিলাম এইভাবে জড়ের সাথেও communication করা যায়! কারণ জড়ের চেতনার অনুভূতি নাই, কিন্তু চৈতন্য রয়েছে (সাধারণভাবে আমরা যাকে ‘চেতনা’ বলি, তা পরিলক্ষিত হয় না কিন্তু চৈতন্যশক্তি সবের মধ্যেই রয়েছে)। জড়ের action-reaction রয়েছে কিন্তু reflection নাই ! অপরপক্ষে, জীবদেহে যেমন action-reaction-ও রয়েছে, তেমনি reflection-ও রয়েছে __এটাই জড়ের সঙ্গে জীবের মুখ্য পার্থক্য !