[‘ভগবানকে নরলীলায় চেনা যায় না’–এই নিয়ে গুরু মহারাজ আলোচনা করছিলেন। আগের দু’দিন ধরে এই আলোচনা হয়েছে,আজ পরবর্ত্তী অংশ]
… তাহলে বুঝতে পারলে তো, এই ঘটনাগুলি কেন উল্লেখ করলাম ? ‘ভগবানের লীলা’– বোঝার সাধ্য কজনের আছে ? তাঁর কোন্ আচরণে যে জীবের কি কি মঙ্গল নিহিত রয়েছে_ তা অজ্ঞান মানুষ কি করে বুঝবে ? তাছাড়া ভক্তের এবং ভগবানের মহিমা প্রকাশ করাটাও তো প্রয়োজন ! কারণ এই ঘটনাগুলিই পরবর্তীকালের ভক্তদেরকে ভগবানের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা-বিশ্বাস-ভালোবাসা আনতে সাহায্য করে থাকে ! তবে কাশীশ্বরের বাড়িতে সেদিন যে তথাকথিত ‘অলৌকিক’ কান্ডটি ঘটে গিয়েছিল, তার পিছনে একটা সূক্ষ্ম বিজ্ঞান রয়েছে সেটা বলছি শোনো ! ওই যে মেয়েটি মাধবী, সে ছোটবেলা থেকেই মহাপ্রভুকে দেখেছে, তার প্রতি 100 ভাগ ভক্তি-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা নিয়ে বড় হয়েছে ! ফলে তার সমগ্র মনটা জুড়ে শুধু “মহাপ্রভু”-ই ছিল ! তখনকার দিনের সামাজিক নিয়ম রক্ষা করতে গিয়ে তার ছোটো বয়সেই বিবাহ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার হৃদয়-মন থেকে মহাপ্রভু তো আর চলে যায়নি ! মেয়েটি 100 ভাগ বিশ্বাস করতো যে মহাপ্রভু স্বয়ং ভগবান এবং ভগবানই জন্ম-মৃত্যু সহ সবকিছুর নিয়ন্ত্রা ! ফলে ওই মেয়েটি পরিপূর্ণ অর্থাৎ ষোলোআনা বিশ্বাস নিয়েই ভগবান শ্রীচৈতন্যের কাছে তার স্বামীর প্রাণ ফেরানোর আবেদন নিয়ে গিয়েছিল ! তার মনে কোন সংশয়ই ছিল না যে, তার প্রার্থনা মঞ্জুর না হোতেও পারে ! ভক্তের এই যে 100 ভাগ বিশ্বাস, পরিপূর্ণ নির্ভরতাএইটা কার্যকরী হবেই ! এই ঘটনা যে শুধু 550 বছর পূর্বে একেবারের জন্য ঘটেছিল তা কিন্তু নয়, এই ঘটনা আজ‌ও ঘটতে পারে ! আজও পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে কোনো ভক্ত যদি 100 ভাগ ভক্তি-বিশ্বাস নিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে তাহলে তা মঞ্জুর হবেই হবে। আমার এই জীবনের ক্ষেত্রেই দ্যাখোনাআমার জীবনের কতগুলো বছর পথে-ঘাটে বনে জঙ্গলে পাহাড়ে পর্বতে একা একা ঘুরে ঘুরে কেটে গেছে । কতো প্রতিকূলতা, কতো বিপদ-আপদ, কতো অসুবিধা-বাধা ইত্যাদির মোকাবিলা নিজেকেই করতে হয়েছে। তখন কে আমার পাশে ছিল_ শুধু এক মা জগদম্বা ছাড়া ! তাহলে এখন এই বনগ্রাম আশ্রমে যখন থাকি, তখন কি আমি পারিনা দু বালতি জল টিউবওয়েল থেকে তুলে স্নান করতে, অথবা নিজের জামা কাপড়গুলোকে নিজেই কেচে নিতে ? বলো, পারি না কি? বাইরে ঘুরে বেড়ানোর সময় এখনও এই কাজগুলো তো আমাকেই করতে হয় ! তবুও যখন আশ্রমে থাকি, তখন এই কাজগুলো এখানকার দু-একজন(তখন তপি মা,স্বপন ব্রহ্মচারী,মুকুল ব্রহ্মচারী,জগুমাএরা ঐ কাজগুলি করতো।) করে দেয় । আমি allow করি বলেই_ ওরা এসব করার সুযোগ পায় ! কোনো রাজ্যের রাজামশাই কি পারেনা, তার জুতো দুটো নিজে নিজে পড়তে ! তবু দুজন লোক থাকে_ যারা এই কাজটা করে দেয় ! এটা যেন তাদের প্রতি একটা বিশেষ অনুকম্পা!
ভগবানের নরলীলা ঠিক কেমন –তা একটা উদাহরণ দিয়ে বলছি শোনো ! সেটা ধরে নাও, দেশের প্রেসিডেন্টের কোনো একটা অখ্যাত গ্রামে visit করতে আসার মতো। এমনিতে গ্রামের কোনো সাধারন মানুষ যদি দেশের রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করতে চায়, তাহলে হয়তো অনেক চেষ্টায় তার বহু বছর সময় লেগে যাবে। আবার হয়তো অনেক চেষ্টা করেও এবং বহু সময় ব্যয় করেও–ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করতেই পারলো না ! কিন্তু প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপতি যদি নিজেই কোনোদিন ঐ ব্যক্তিটির গ্রামে visit করতে আসেন, তাহলে ঐ গ্রামের সমস্ত লোকেই তাঁকে দেখার অথবা তাঁকে স্পর্শ করার এবং তাঁর কাছে কিছু নিবেদন করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায় ! যদিও সেই সময় তার চারপাশে নানান প্রটোকল অফিসার, বডিগার্ডেরা থাকে। তাছাড়াও সেই জেলার ডিএম, পুলিশের বড় কর্তারা(ডিএসপি, এসপি ইত্যাদি) এবং আরো অনেকে থাকে ! তবুও সমস্ত গ্রামবাসীরাই প্রেসিডেন্টকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়ে যায়। এবার ওদের সকলের মধ্যে থেকে ঐ ব্যক্তিটি সুযোগ বুঝে যদি হঠাৎ করে প্রেসিডেন্টের পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, তাহলে তার মনোস্কামনাও পূর্ণ হয়ে যেতে পারে ! ঐ ব্যক্তি প্রেসিডেন্টের পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে , চারপাশের অফিসারেরা ওই লোকটির প্রতি বিরক্ত হয়ে_ তাকে তাড়াতাড়ি ওখান থেকে তুলে সরিয়ে দেবার চেষ্টাও করতে পারে ! তবে, সেই মুহূর্তে প্রেসিডেন্ট কিন্তু তাঁর প্রটোকল অফিসারদেরকেই ধমকে উঠবেন, বলবেন“থামো, থামো ! এতক্ষণ কোথায় ছিলে ? এখন ওকে ছাড়ো ! আমাকে শুনতে দাও, ও কি বলতে চাইছে !” ব্যক্তিটি গ্রামের সাধারণ মানুষ, সে আর কি বলবে ? হাতজোড় করে ছল ছল চোখে প্রেসিডেন্টের মুখের দিকে চেয়ে হয়তো বলবে “হুজুর ! আমি খুবই গরীব মানুষ, সংসার চালানোর মতো আমার তেমন কিছুই নাই ! আমার গোটা কয়েক ছাগল ছিল, সেগুলোও মারা গেছে ! আপনি যদি আমাকে দু’চারটে ছাগল কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেন_ তাহলে আমি সংসারটা ভাল করে চালাতে পারবো!” প্রেসিডেন্ট ঐ ব্যক্তির কথাগুলো মন দিয়ে শুনে সঙ্গে সঙ্গে ডিএমকে order দেবেন“আপনি ওর ব্যাপারটা একটু দেখবেন তো ! যেন ওই ব্যক্তিটির কোনো অসুবিধা না হয় !” ডিএম, সরাসরি দেশের রাষ্ট্রপতির আদেশ পেয়ে, অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে ওই ব্যক্তির যাতে একটা bank-loan-এর ব্যবস্থা হয় এবং যাতে সে কিছু , subsidy-ও পায়, নিশ্চয়ই তার ব্যবস্থা করে দেবেন ! তাছাড়াও হয়তো তিনি ওই ব্যক্তিকে আরো কিছু সরকারি সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেবার ব্যবস্থা করে দেবেন ! এতক্ষণ ধরে তোমাদেরকে কি বোঝালাম সেই ব্যাপারটা বুঝতে পারলে কি ? এতেও যদি বুঝতে না পারো, তাহলে বলতে হয় যে_ তোমাদের মাথায় ঝামা পোড়া আছে !! আর কতো clear করে বলবো বলো দেখি!! … (ক্রমশঃ)