[‘ভগবানকে চেনা যায় কিভাবে’এই নিয়ে আলোচনা করছিলেন গুরু মহারাজ। আজ সেই আলোচনার শেষাংশ।] …….. এমনি বিশ্বাস ছিলো ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতয় পার্ষদ ভক্তভৈরব গিরিশচন্দ্রের ! প্রথমদিকে গিরিশ আলাদা করে সাধন-ভজন করতোই না ! ঠাকুরকে বলতো “তোমাকে পেয়েছি, আমার আবার সাধন ভজন কি ? যার জন্য সাধন-ভজন, সে তো আমার সামনেই বর্তমান ! করতে হয় তো ওসব তুমি করো ! আমি করতে পারবো না!” তারপর আরও বলতো “সাধন-ভজন করার উপদেশ, তুমি ওই কলকাতার বাবুদেরকে দাও যারা মুক্তি চায়-মোক্ষ চায়_ এসব ওদের জন্য ! আমি তোমাকে চেয়েছিলাম পেয়ে গেছি ! ব্যস্ _ আবার কি চাইবো?” দেখেছো_ কি জ্বলন্ত বিশ্বাস ! এক একদিন মদ খেয়ে মাতাল হয়ে গিরিশ ভাড়ার গাড়ি নিয়ে চলে আসতো দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুরের কাছে ! গাড়ি থেকে নেমেই চিৎকার চেঁচামেচি করতো, চুয়ারি করে ঠাকুরকে গালাগালি দিতো ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ঘর থেকে উঠে এসে তাকে চুপ করতে বললে, আরো জোরে জোরে চুয়ারি করে বলতো “তোমার কাছে সব ভদ্রলোকেরা আছে বলে চুপ করতে বলছো তো ওইসব ভদ্রলোকেদের তুমি জ্ঞান দাও, বেদ-বেদান্ত শোনাও ! আমি ওইসব চাইনা_ আমি জানি, আমার তুমি আছো ! আমার জীবনে তুমি থাকলেই হবে ! আমি মদ খাই, বেশ্যাবাড়ি যাই_ তার জন্য সবাই আমাকে ঘৃণা করে, শুধু তুমিই করো না ! তুমিই আমার ভগবান ! আমি জানি তুমি পূর্ণব্রহ্ম নারায়ন ! তাহলে, আমার আবার ভাবনা কি !” ঠাকুর বলতেন, “তুমি মদ খেয়ে এখানে আসোই বা কেন ?” গিরিশ বলতো “আমি স্ফুর্তি করার জন্য এক বোতল দু-বোতল মদ খেলাম কিন্তু তাতেও যখন স্ফুর্তি জমলো না, তখন ভাবলাম যাই, দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে একটু স্ফুর্তি করে আসি ! তাই চলে এলাম তোমার কাছে ! তোমাকে ভালবাসি_ তাই আসি ! তোমার কাছে এলে স্ফুর্তিটা একটু জমে !” তারপর মোদো-মাতাল গিরিশ, ঠাকুরের মুখের কাছে মুখ নিয়ে এসে অত্যন্ত বিনয়ের সুরে, কাতরস্বরে প্রেমিক পুরুষ যেমনভাবে তার প্রেমাস্পদকে প্রেম নিবেদন করে_ সেই ভঙ্গিমায় বলতো, “ঠাকুর ! তুমি আমাকে ভালোবাসো তো !” ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন,” তা ভালোবাসি বৈকি !” ঠাকুরের কথা শুনে গিরিশ কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে ঠাকুরের পা দুটো নিজের মাথায় চাপিয়ে নিতো ! তারপর বলতো“ব্যস্ ! আমার আর কিছুই চাই না, শুধু ওইটুকু যেন সারাজীবন বজায় থাকে!”– এই কথা বলতে বলতে, চোখ মুছতে মুছতে “জয় রামকৃষ্ণ”- “জয় রামকৃষ্ণ” ধ্বনিতে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির প্রাঙ্গন মুখরিত করে চলে যেত গিরিশ !
ঠাকুর বলতেন_ ‘ভক্ত ভৈরব গিরিশ !’ গিরিশচন্দ্রের বিশ্বাসের কাছে পর্বতসদৃশ স্বামী বিবেকানন্দ‌ও মাঝেমধ্যে নত হোতেন !
ঠাকুরের অন্তর্ধানের পরের একটা ঘটনা বলছি শোনো ! একদিন স্বামীজি তাঁর শিষ্যদের বা অন্যান্য গুরুভ্রাতাদের সামনে বেদান্ত আলোচনা করছিলেন । এমন সময় গিরিশচন্দ্র সেখানে এসে হাজির ! স্বামীজী ওনাকে দেখেই একটু রহস্য করে বলেছিলেন, “জি.সি( গিরিশচন্দ্রকে স্বামীজি সংক্ষেপে জি.সি বলে ডাকতেন)
সারাজীবন তো একই ভাবে কাটিয়ে দিলে, এবার একটু বেদান্ত চর্চা করো !” এই কথা শুনে গিরিশ বলেছিল, “নরেন ভাই_ বেদ-বেদান্ত আমার মাথায় থাক্, ও সবে আমার কোনো কাজ নাই ! সাক্ষাৎ বেদ-বেদান্তরূপী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে আমার নমস্কার!”_ এই বলে গিরিশ হাতদুটো জোর করে মাথায় ঠেকিয়ে চোখ বুঝে বারবার ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করতে লাগলো ! গিরিশের মুখে এই কথা শুনে এবং গিরিশের ঠাকুরের প্রতি এইরূপ নিবেদিত-ভাব দেখে স্বামীজীর মত মানুষও কেঁদে ফেললেন ! গিরিশ এটা দেখে স্বামীজী তাঁর শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বললেন_ “ওই দ্যাখ্_ তোদের গুরু এক্ষুনি জগতের সব কিছুকেই “মায়া” বলে উড়িয়ে দিচ্ছিলো(যেহেতু স্বামীজী বেদান্ত আলোচনা করছিলেন), এখন আবার কেমন বাচ্চাদের মতো কাঁদছে দ্যাখ্ !”
এই ঘটনার কথা স্বামীজীর শিষ্যরা পরবর্তীকালে স্বামীজীর কাছে উল্লেখ করলে_ স্বামীজী উত্তরে বলেছিলেন, “সেদিন আমি বুঝেছিলাম বেদ-বেদান্ত পড়ে যে বোধের অবস্থা হয়, জি.সি-র অবস্থা তারও ঊর্দ্ধে ! দেখলাম ওর নির্বেদ অবস্থা !”
তাই বলছিলাম বাবা_ ভগবান করুণাময় কিন্তু তার করুণার বোধ করাটাই বড় কথা ! ভগবান যেন বর্ষার বৃষ্টিধারা ! কাউকেই তিনি কম বা বেশি কৃপা করেন না ! ওই যে বললাম ভগবান বৃষ্টিধারার মতো ! বৃষ্টি যেমন উঁচু-নিচু, ডাঙ্গা-খাল সব জায়গাতেই সমান ভাবে পড়ে, কিন্তু জমির অবস্থান অনুযায়ী সেই বৃষ্টির জল কোথাও জমে, আবার কোথাও মোটেই জমে না ! ঈশ্বরের কৃপালাভের পরবর্তী অবস্থাটাও বোঝা যায় পাত্রের আধার অনুযায়ী, তার হৃদয়ে ভক্তি-ভালোবাসা-ব্যাকুলতা অনুযায়ী ! দ্যাখো, ব্যাকুলতাই আসল ! ভক্তের হৃদয়ে ঠিক ঠিক ব্যাকুলতা থাকলে কৃপা অনুভূত হবেই হবে ! এ ব্যাপারে তোমরা নিঃসংশয় হোতে পারো !