জিজ্ঞাসু:– আপনি একবার বলেছিলেনপূর্ণতালাভের জন্য মনুষ্যশরীরই সবচাইতে উপযুক্ত ! মনুষ্যেতর শরীরে তা সম্ভব নয় কেন ? গুরু মহারাজ:—- ঠিকই তো, পৃথিবী গ্রহে পূর্ণতা লাভের জন্য মনুষ্য শরীরই সবচাইতে উপযুক্ত ! এর কারণ এই গ্রহে জীবশরীরের বিবর্তনে সবচাইতে উন্নত শরীর হোলো মনুষ্যশরীর ! তবে অন্যান্য নক্ষত্রের গ্রহ মন্ডলীতে যেখানে যেখানে প্রাণ রয়েছে, সেখানে সেই গ্রহগুলির যেটি উন্নত শরীর সেই শরীরেও পূর্ণতা লাভ সম্ভব। দ্যাখো, ‘পূর্ণতা’ মানেই তো সবদিক থেকেই পূর্ণ ! ‘পূর্ণাবস্থা’ একবার প্রাপ্ত হোলে, আর অসুবিধা হয়না । তখন সেই ব্যক্তি যে কোনো গ্রহে, যেকোনো অবস্থাতেই শরীর ধারণ করুক না কেন_ অল্পদিনের মধ্যেই সেখানেও সে পূর্ণভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে_ ব্যাপারটা বুঝতে পারলে কি !
দ্যাখো, যে যেখানেই(যে কোনো নক্ষত্রমন্ডলীতে) শরীর ধারণ করুক না কেনপ্রত্যেকের পূর্ণতাই লক্ষ্য ! এখানে এই পৃথিবী গ্রহে পূর্ণতা লাভের জন্য মনুষ্য শরীরেরই প্রয়োজন ! তবে জানো, ‘পূর্ণতাপ্রাপ্তি’ , মানে কিন্তু সত্যি সত্যিই কোনো ‘প্রাপ্তি’ নয় ! বরং বলা যায়এটা অনেকটা যেন আবিষ্কার করার মতো ! তুমি তো স্বরূপতঃ পূর্ণই ! সুতরাং তোমার নতুন করে পাওয়ার আছেটাই বা কি ? মানব নিজের স্বরূপকে ভুলে_ সে যা নয়, নিজেকে সে তাই ভেবে বসে আছে ! ছাগলের পালে একটি সিংহশাবক বড় হওয়ার গল্প রয়েছে উপনিষদে ! সিংহশিশুটি বড় হবার পরেও ছাগলদের সাথেই ঘাসপাতা খেতো, ব্যা-ব্যা-করে ডাকতোএইভাবেই কেটে যাচ্ছিলো। কিন্তু একদিন ওই বনের পশুরাজ অর্থাৎ সবচাইতে বড় এবং শক্তিশালী সিংহটি, এই ব্যাপারটা দেখলো ! তারপর পশুরাজ ছাগলের দলটির কাছে গিয়ে ওই সিংহটিকে ঘাড়ে ধরে ঝর্নার ধারে নিয়ে গেল এবং স্বচ্ছ জলে তার চেহারা দেখালো ! পশুরাজ সিংহ একটা ভয়ঙ্কর গর্জন করে বললো_ “ভালো করে চেয়ে দ্যাখ্তুইও যা আমিও তা !” রূপকাকারে বর্ণিত উপনিষদের এই গল্পটির তাৎপর্য বোঝাতে, ঋষিরা এটাই বলতে চেয়েছেন যে, ‘সাধারণত মানুষ নিজেকে “অমুক-তমুক” ইত্যাদি বিভিন্ন নামে নিজেদের পরিচয় দেয় ! কিন্তু কারও জীবনে সদগুরু লাভ হোলে, গুরু তখন প্রকৃত সত্য তার কাছে উন্মোচিত করে দেন । তিনি বলেন“অহং ব্রহ্মাস্মি”, “তৎ-তমসি” ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণসহ প্রায় সকল অধ্যাত্ম-শিক্ষকেরাই, ‘জীবের স্বরূপ কি’- এই রহস্য বোঝাতে উপনিষদের এই গল্পটির উপস্থাপনা করে গেছেন । তবে একটা কথা মনে রাখবে, এই কথাগুলি প্রযোজ্য শুধুমাত্র ascending-দের ক্ষেত্রে ! অর্থাৎ বিভিন্ন নক্ষত্রমন্ডলের যে সমস্ত গ্রহে জীবসকল রয়েছে_ তাদের জৈবিক-উদবর্তনের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য ! একবার পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটে গেলে আর জীবের নিজস্ব identity থাকেনা, তখন তিনি “তাঁর” হয়ে যান ! তবে অনেক সময় এইরূপ দিব্যপুরুষ যেখানে থাকেনসেই স্থানের জীবসকলের কল্যাণের জন্য তিনি একটা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম identity ইচ্ছা করেই রেখে দেন । যাতে ঐ শরীর দিয়ে জীবকল্যানের জন্য নির্দিষ্ট কাজটি তিনি সম্পন্ন করতে পারেন ! এমন অনেক উচ্চকোটির সাধক রয়েছেন, যাঁরা শুধুমাত্র জীবকল্যানের আকাঙ্খাটুকু বজায় রেখে_ বহুকাল ধরে ঐরূপ identity রেখে দিয়েছেন, entity-র সাথে একাত্ম হোতে চান না ! বৌদ্ধ ধর্মমত অনুযায়ী এই অবস্থাকে ‘অবলোকহিতেশ্বর বুদ্ধ’ অবস্থা হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণও নরেন্দ্রনাথের descending বোঝাতে এই ধরণের অবস্থা বর্ণনা করেছিলেন ! তিনি যা বলেছিলেন, তা হোলো_ ‘চেতনার ঊর্ধ্বলোকে অবস্থিত এক জ্যোতিঃর্লোক রয়েছে, যেখানে জ্যোতিঃপুঞ্জের ন্যায় প্রভা বিশিষ্ট সাতজন ঋষি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ছিলেন’ ! লোক কল্যাণের জন্য বা জীব কল্যাণের জন্য ঠাকুরের আহ্বানে, তাঁদের একজন এই পৃথিবী গ্রহে নেমে এসেছিলেন ! এই ব্যাপারটাই বলা হচ্ছিলো বুঝতে পারছো ? চিন্ময়লোক থেকে ঈশ্বরের অবতরণের সাথে সাথে, তাঁর পার্ষদদেরও এই ভাবেই কোনো না কোনো “লোক” থেকে অবতরণ হয়ে থাকে (আমরা শুনেছিলাম গুরু মহারাজের সাথে এবার অষ্টবসুদের মধ্য থেকে, দ্বাদশ আদিত্যদের মধ্য থেকে, এইরূপে মোট দু’শোর বেশি পার্ষদ_ সমাজের বিভিন্ন স্তরে শরীর গ্রহণ করেছেন ! এঁদের অনেকের সাথে হয়তো গুরু মহারাজের physically দেখা-সাক্ষাৎই হয়নি কিন্তু তাঁরা সকলেই গুরুমহারাজের আরদ্ধ কাজে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন ! এঁদের মধ্যে অনেকেই ধর্মজগতে যেমন রয়েছেন, তেমনি অনেকেই রয়েছেন সংগীতজগতে, সাহিত্যজগতে, রাজনীতিতে, প্রশাসনে ইত্যাদি সমাজের সর্বক্ষেত্রে ! এঁদের অনেকেই ভারতবর্ষের বাইরেও রয়েছেন ! )। এই ধরনের অবলোক-হিতেশ্বর বুদ্ধরা পূর্ণ-ই কিন্তু সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কিছু একটা আকাঙ্ক্ষার আবরণ রেখে দেন। কিন্তু ঐ টুকুই, এর বেশি কিছু নয়। তাইতো তাঁরা অক্লেশে এবং অনায়াসে বলে দিতে পারেন _“ভারতবর্ষের একটা কুকুরও যতদিন অভুক্ত থাকবে, ততদিন আমি বার বার শরীর নেবো।”
