[জিজ্ঞাসু:— পুরাণাদি শাস্ত্র পড়ে দেখেছি সেখানে শুধু বিভিন্ন গল্প-কাহিনী রয়েছে । আপনি যেমন সুন্দর করে আমাদেরকে শাস্ত্র-ব্যাখ্যা গুলি বোঝান, ওখানে সেইরকম তো কিছু পাওয়া যায় না?গুরু মহারাজ এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন। উনি একটি উপনিষদের গল্পের অবতারণা করেছিলেন, যেখানে পরমাশক্তি হৈমবতী দেবতাদের অহংকার নাশের জন্য প্রকট হয়েছিলেন। আজ তার পরবর্ত্তী অংশ] …. এরপর দেবরাজ ইন্দ্র একে একে বরুন, চন্দ্র-আদি অন্যান্য দেবতাদেরকেও সেই অত্যূজ্বল জ্যোতির পরিচয় জানার জন্য পাঠালেন ! কিন্তু তারা সকলেই বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে এলো, কারো সাধ্য হোলোনা একখণ্ড তৃণখন্ডের এতোটুকু পরিবর্তন করার ! তখন দেবরাজ ইন্দ্র বুঝতে পারলেন যে, নিশ্চয়ই এখানে কোনো রহস্য লুকিয়ে রয়েছে ! তাই এবার তিনি নিজেই সেখানে গেলেন । সেই অদ্ভুত জ্যোতির সামনে দাঁড়িয়ে দেবরাজ ইন্দ্র কিন্তু কোনোরকম অহংকার প্রকাশ না করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ‘সেই জ্যোতির পরিচয় কি’ তা জানানোর জন্য অনুরোধ করলেন !
দেবরাজের একান্ত অনুরোধ শুনে সেই জ্যোতিঃপুঞ্জ ধীরে ধীরে অন্তর্হিত হোতে থাকলো এবং সেখান থেকেই হৈমবতী প্রকট হোলেন। তাঁর সামনে সমস্ত দেবতারা তাদের ভূল বুঝতে পেরে লজ্জায় অধোবদন হয়ে থাকলো ! হৈমবতীর দেওয়া শিক্ষা সকলেই বুঝতে পারলো যে, তাদের অতিরিক্ত অহংকার প্রর্দশনের ফলেই তারা সাময়িকভাবে শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল ! দেবতারা বিবেকবান, আর বিবেকবান ব্যক্তিদের জীবনে কোনো কোনো সময় কিছু ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকলেও, তাদেরকে ভুলটা ধরিয়ে দিতে পারলে_
তারা তা দ্রুত সংশোধন করে নিতে পারে ! কিন্তু অহংকারে উন্মত্ত, অবিবেকী অসুর-দৈত্য-দানব বা রাক্ষসেরা নিজেদের ভুলটা বুঝতে পারে না বা বুঝতে চায় না ! তাই তাদের সংশোধন ঘটানোও খুব মুশকিল হয়ে পড়ে। অবিবেকীদের সাথে বিবেকীদের এটাই প্রধান পার্থক্য !
যাই হোক যা বলা হচ্ছিলো_ মানুষের মধ্যেই দেবতা, মানুষের মধ্যেই অসুর-দানব-দৈত্য-রাক্ষস ইত্যাদি রয়েছে । এইটা বিচার করা হয় গুনভেদে ! গুনভেদে, কর্মের‌ও ভেদ হয়ে যায় ! তবুও কখনো কখনো ভালো মানুষেরাও হয়তো কিছু মন্দ কাজ করে ফেলে, কিন্তু মানুষের গুণ বিচার না করে_ শুধু কর্মের বিচারে সবার জন্য একই শাস্তিবিধান বা একই বিচার হোতে পারে না ! সমাজে কিন্তু এইভাবেই বিচারব্যবস্থা চলে আসছে যে, সকলপ্রকার মানুষের‌ই এক কাঠগড়ায়, একই বিচারকের দ্বারা, এক‌ই সংবিধান অনুযায়ী বিচার হয় ! কিন্তু এটা ভুল প্রয়োগ ! “সাম-দান-দন্ড-ভেদ”_ বৈদিক যুগ থেকে ভারতবর্ষে, শাস্তিবিধানের যে চতুর্বিধ প্রয়োগের কথা বলা হয়েছিল এটাই ছিল সঠিক পদ্ধতি।
যাই হোক, উপনিষদের যে গল্পটা তোমাদের বলছিলাম, সেটা থেকে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা হোলো_ অহংকার-ই মানুষকে শক্তিহীন করে তোলে। এটি মানুষের শক্তিকে বিপথগামী করে, তার বিনাশ ঘটায় ! দেবতারা সত্ত্বপ্রধান, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের মধ্যেও অহংকারের প্রাধান্য কোনো না কোনো সময় আসতে পারে ! কিন্তু এমনটা হোলেই হয় অনর্থ ! এই নিয়ম যেমন কোনো individual বা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি তা বৃহৎ অর্থে সমাজ বা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য ! তবে এটা নিশ্চিত যে, ‘অহং’-নাশ হোলেই হৈমবতীর দর্শন পাওয়া যায় অর্থাৎ সাধকের ‘ব্রহ্মবিদ্যা’ অধিগত হয় !
পুরাণে আরেকটি গল্পের উল্লেখ রয়েছে_ যেখানে দেখা যায়, প্রিয়তম প্রিয়তমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং প্রিয়তমা তার প্রিয়তমকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কিন্তু তাদের মিলন আর হোচ্ছেনা ! একজন যখন একটা নির্দিষ্ট স্থানে আসছে, ঠিক তার পূর্বমুহূর্তে অন্যজন সেই স্থান ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে ! এর ফলে তাদের মধ্যে রয়েছে চরম অতৃপ্তি বা দুঃখ ! এই ঘটনাটি রুপকাকারে দেহতত্ত্বের একটি ঘটনাকে বোঝানো হয়েছে ! দেহের প্রাণবায়ু এবং অপানবায়ু শরীরে এমনভাবে অবস্থান করে_ যাতে এরা কখনোই দুজনে একত্রিত হয় না ! প্রাণবায়ু যখন একটি নির্দিষ্ট point-এ এসে পৌঁছায়, ঠিক তখনই অপানবায়ু সেই স্থান ত্যাগ করে ! আবার অপরপক্ষে, অপানবায়ু যখন সেই স্থানে এসে পৌঁছায়_ তখন প্রাণবায়ু সেই স্থান ত্যাগ করে। …. (ক্রমশঃ)