জিজ্ঞাসু:—আমরা অনেক সময় শুনতে পাই যে, সমাজে এমন অনেক সাধু-সন্ন্যাসী রয়েছে_ যাদের মধ্যে অনেকেরই নানারকম সিদ্ধাই রয়েছে ! তারা বিশেষ ক্ষমতাবান সাধু ! কিছু কিছু সাধু-সন্তের এরকম ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা রহস্যটা কি ?
গুরু মহারাজ:—–‘সিদ্ধাই লাভ’ ব্যাপারটা আলাদা, আর ‘সিদ্ধ হওয়া’_ ব্যাপারটা আলাদা ! ‘সিদ্ধাই-লাভ’– করাটা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়, কিছুদিন নিষ্ঠাসহকারে practice করলে অথবা সাধন-ভজন করলে অনেকরকম সিদ্ধাই অর্জন করা যেতে পারে ! ‘সিদ্ধাই’ এক ধরনের ‘বিদ্যা’ ! তন্ত্রের অভিচার ক্রিয়ায় প্রাপ্ত ‘সিদ্ধাই’ এক ধরনের ‘মায়াবিদ্যা’ ! এটা প্রদর্শন করে কিছুদিন অনেক মানুষকে বোকা বানিয়ে স্ববশে হয়তো আনা যায় কিন্তু তা বেশিদিন টেকে না ! ফলে সিদ্ধাই-প্রাপ্ত সাধকটির শেষজীবন(সিদ্ধাই নষ্ট হয়ে যাবার পর) খুবই দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় কাটে। জগতে সিদ্ধাই-প্রাপ্তরা সংখ্যায় অনেকে থাকলেও, ঠিকঠিক ‘সিদ্ধ ব্যক্তি’ পাওয়া খুবই মুশকিল ! শাস্ত্রে রয়েছে চৌষট্টি কলার কথা ! এর মধ্যে এক একজন সাধক, সাধনার দ্বারা এক একটা ‘কলা’-য় সিদ্ধ হোতেই পারে, যেমন কেউ হয়তো সংগীতে সিদ্ধ, কেউ চারুকলায় সিদ্ধ, কেউ নৃত্যে সিদ্ধ_ কিন্তু ‘নিত্য সিদ্ধ’ কজনকে পাবে ? সে ওই দু-একজন ! ‘সিদ্ধাই’– ব্যাপারটা কেমন জানো তো নরেশ বাবু(ঐদিন সিটিং -এ উপস্থিত হাওড়ার রমেশ দত্তের দাদা, নরেশ দত্ত।)_ যেমন ধরো, তোমার 10 লক্ষ টাকা রয়েছে_ যেটা তুমি হয়তো বহু বছরের পরিশ্রমে রোজগার করেছিলে । এবার তুমি যদি সেই টাকা আর না বাড়াবার চেষ্টা করে(ব্যবসা-বানিজ্যে না খাটিয়ে), শুধু খরচা করতে থাকো_ তাহলে কি হবে বলোতো ! একদিন দ্যাখা যাবে, তোমার ওই টাকার ভান্ডার ফুরিয়ে যাবে এবং তুমি আবার কপর্দকশূন্য হয়ে যাবে তাই নয় কি?
দ্যাখো, যে কোনো আধ্যাত্মিক ব্যক্তি তো ‘নিত্য’-এর খোঁজে পথে নেমেছে তাহলে সে সিদ্ধাইকে নিয়ে অর্থাৎ ‘অনিত্য’-কে নিয়ে মাথা ঘামাতে যাবে কেন ? তার কাছে কোনো অনিত্য বস্তু লোষ্ট্রবৎ পরিত্যজ্য অর্থাৎ রাস্তায় পড়ে থাকা ইঁটের টুকরোর মতো পরিত্যজ্য ! উপনিষদে বলা হয়েছে “যেনাহং নামৃতাস্যাম্ কিমাহং তেন কুর্যাম্”! অর্থাৎ যে বিদ্যা আমাকে অমৃত-তত্ব দিতে পারেনা, সে বিদ্যা নিয়ে অধ্যাত্ম পথের সাধকের কি লাভ হবে ? কিন্তু সাধারণ মানুষ এক্ষুনি কিছু দেখতে চায়, সুলভে কিছু পেতে চায় ! আর তারাই এই ধরনের সিদ্ধাই-প্রাপ্ত ব্যক্তিদের পাল্লায় পড়ে ! কিছুদিন তারা ওইসব ব্যক্তিদেরকে নিয়ে খুব হইচই করে, তাকে মহাত্মা-মহাপুরুষ-মহাযোগী, এমনকি ছোটোখাটো ‘ভগবান’-ও বানিয়ে বসে ! কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ভাবনার বেলুন চুপসে যায় এবং লোকজনের মোহভঙ্গ ঘটে। সিদ্ধাই-লাভের জন্য নানারকম বিদ্যা রয়েছেডাকিনীবিদ্যা, পিশাচ সিদ্ধি, ভুডুতাছাড়া তন্ত্রে বর্ণিত রয়েছে বেশকিছু অভিচার সিদ্ধির কথা, যেমন উচাটন, বশীকরণ, সম্মোহন ইত্যাদি ! কিছুদিন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অভ্যাস করলেই ঐ বিদ্যাগুলি আয়ত্ত করা যায় । জার্মানির দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসকঅ্যাডলফ্ হিটলার‌ও এইরকম একটা দলের সদস্য ছিলেন । ওরা ভারতীয় তন্ত্র ও যোগ এবং আফ্রিকান ভুডু (এটাও একপ্রকারের ডাকিনীবিদ্যা)-র সংমিশ্রণে একটা অদ্ভুত ‘অভিচার প্রণালী’ চালু করেছিল ! জানো, এটা পরম্পরাক্রমে এখনো জার্মানিতে রয়ে গেছে !
আমি যখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়েছিলাম, তখন জার্মানিতে “মহাকারি সোসাইটি”- নামে একটি সংস্থায় গিয়ে ওদের কার্যকলাপ দেখেছিলাম ! ওদের ক্রিয়াচারগুলি, প্রচলিত যে সমস্ত আচার বা ক্রিয়া রয়েছে_ তার ঠিক উল্টো অর্থাৎ সবকিছুই যেন negative ! যেমন ধরো, ওরা যদি ক্রস গলায় পড়ে, তাহলে সেটা পড়বে উল্টো করে ! ভারতীয় স্বস্তিকা চিহ্ন যদি ব্যবহার করে_তাও উল্টো করে পড়বে ! ওদের মধ্যে দু-একজনকে উল্টোনো ওঙ্কার চিহ্ন পড়তে বা হাতে উল্কি হিসেবে এঁকে রাখতেও দেখেছিলাম ! এরা কোনোরকম দেব-দেবী বা যীশুর মুর্তি রাখেনা, তার বদলে ওরা বিভৎস-দর্শন শয়তানের মূর্তি পূজা করে ! ছাগল বা যে কোনো পশু কেটে রক্ত দিয়ে ওই মতের লোকেরা শয়তানের পূজা সম্পন্ন করে । ইউরোপের সাধারণ মানুষ এই জন্যই এই সব দলের লোকেদের saturn-worshiper_ বলে সম্বোধন করে থাকে। … (ক্রমশঃ)