জিজ্ঞাসু:—আচ্ছা গুরুমহারাজ ! পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি উর্দু?
গুরু মহারাজ:– হ্যাঁ, কিন্তু, হঠাৎ এই জিজ্ঞাসা কেন করছো?
তুমি কি বিষয়ে জানতে চাইছো সেটা বলো ,!
জিজ্ঞাসু:— না, পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলোয়াড়ের যখন টিভির সামনে কথা বলে অথবা ওদের কেউ যখন খেলার commentry করে, তখন দেখেছি ওরা বেশ ভালই হিন্দি বলতে পারে । কিন্তু হিন্দি তো ওখানকার ভাষা হোতে পারে না,__ তাই জিজ্ঞাসা করছিলাম ?
গুরু মহারাজ:—-ও__আচ্ছা ! হ্যাঁ, ওদের রাষ্ট্রভাষা উর্দূ । কিন্তু তা হোলেও, পাকিস্তানের বেশিরভাগ মানুষ অবশ্য পাঞ্জাবি অথবা সিন্ধ্রি ভাষাতেই কথা বলে ! যেহেতু পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট__মহম্মদ আলী জিন্নাহ্ এবং সেই সময়কার কর্মকর্তারা ছিল উর্দুভাষী, তাই জিন্নাহর সময়েই ঐ দেশটির রাষ্ট্রভাষা ‘উর্দু’–করা হয়েছিল ! তবে, ওই যে বললাম__ ওই দেশের অধিকাংশ জনগণ‌ই পাঞ্জাবি বা সিন্ধ্রি-ভাষী, তাই সঙ্গত কারণেই জিন্নাহর পর থেকে আর কোনো পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট উর্দুভাষী হয়নি, কিন্তু রাষ্ট্রভাষাটা উর্দু রয়েই গেছে !
পাকিস্তানে উর্দূভাষীদের কে ‘মুজাহিদ’ বলা হয় ! সেই অর্থে ওখানে মুজাহিদরা সংখ্যালঘু এবং তারা বারবার ওখানকার মানুষদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে আসছে । ওদের সাথে বাকি সম্প্রদায়ের মুসলমানদের দাঙ্গা প্রায়শ‌ই লেগে থাকে ! মহম্মদ ইকবাল(একজন কবি, যে “সারে জাঁহা সে আচ্ছা……” গানটি লিখেছিল) ভারত বিভাগের সময় সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল__কিন্তু পাকিস্তানের আভ্যন্তরীন এই রেষারেষির ব্যাপারটা বুঝতে পেরে, পরবর্তীতে “ভারত বিভাগ” নিয়ে খুবই আফসোস করেছিল।
দ্যাখো, এই জন্যই আমি তোমাদেরকে প্রায়ই বলি___”পৃথিবীতে এতো যে বিরোধ দেখা যায়, এই বিরোধ কিন্তু বাইরে কোথাও নাই ! বিরোধ রয়েছে মানুষের মনে ! মন ঠিক না হোলে পরিবার ভাগ, জাতি ভাগ, দেশ ভাগ ইত্যাদি ভাগ করেও অশান্তির হাত থেকে-বিরোধের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়না ! ঝগড়া-মারামারি-লড়াই-রক্তপাত ইত্যাদির হাত থেকেও মুক্তি পাওয়া যায় না ! মানুষ লড়তেই থাকে, লড়াইয়ের আর শেষ হয় না __”কুছ্ না কুছ্ বাহানা লেকে লড়েগা জরুর”!
যাইহোক যা বলছিলাম__ মহম্মদ আলী জিন্নাহ্ প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরেই__ ও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে দিলো, অন্য সব ভাষাগুলির চাইতে উর্দুকেই অধিক প্রাধান্য দিয়ে দিল ! তখন সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ পাকিস্তান, আর স্বাধীনতার আনন্দে মেতে থাকা দেশের জনগণ ! প্রেসিডেন্ট যেটা করেছে সেটাকেই মেনে নিয়েছিল ! কিন্তু মুশকিল হোলো পূর্ব পাকিস্তান বা বর্তমান বাংলাদেশকে নিয়ে ! তখন বর্তমান বাংলাদেশের নাম ছিল পূর্ব-পাকিস্তান ! ভারতবর্ষের পশ্চিম অংশের নাম ছিল পশ্চিম-পাকিস্তান এবং পূর্ব অংশের নাম পূর্ব পাকিস্তান ! ফলে ওখানেও হুকুম জারি হয়ে গেল যে পূর্ব পাকিস্তানের‌ও রাষ্ট্রভাষা করতে হবে উর্দু ! কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণ সম্পূর্ণরূপে(শতকরা একশ ভাগ) বাংলাভাষী ! তারা এই হুকুম মানবে কেন ? তাই শুরু হয়ে গেল ঝগড়া-গন্ডগোল ! আর এইসব চলতে চলতেই তো এইটাকে নিয়ে বেধে গেলো ভয়ঙ্কর যুদ্ধ ! “ভাষা” নিয়ে যুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম ! ধর্ম নিয়ে, জাতি নিয়ে__ পৃথিবীতে যুদ্ধ অনেক হয়েছে, কিন্তু ভাষা নিয়ে যুদ্ধ আগে কখনো হয়নি ! সেই সময় প্রেসিডেন্ট জিন্না ঢাকা এসেছিল এবং উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার স্বপক্ষে বক্তৃতাও দিয়েছিল।
কিন্তু এখানকার বাংলাভাষী জনগণ এই ব্যাপারটা একদমই মেনে নেয়নি ! ভাষা আন্দোলন যখন ব্যাপকতা লাভ করতে শুরু করেছিলো, মুজিবর রহমান তখন ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট । ওখানকার স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছাত্ররা ভাষা আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলো ! বিভিন্ন অন্যান্য ছাত্র সংগঠন‌ও তাদেরকে support করলো ! এইভাবে ছাত্র আন্দোলন‌ই ধীরে ধীরে সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিলো ! তার উপর পাকিস্তান সরকার মুজিবর এবং আরও অনেক নেতাকর্মীদেরকে গ্রেপ্তার করে বসলো, __ভাবলো মুজিবুরের মতো দু-চারজন উঠতি নেতাদেরকে গ্রেফতার করলে হয়তো ঐ আন্দোলন থেমে যাবে ! কিন্তু ওদের এই ধারণা ভুল ছিল !
এই ঘটনার পরে আন্দোলন তো থামলোই না, বরং দিনকে দিন তা বেড়েই চললো । পাক সরকার জনগণের আন্দোলনের চাপে মুজিবকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হোলো, আর ছাড়া পেয়েই মুজিবর রহমান নতুন উদ্যমে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
এর পরের ইতিহাস তো তোমাদের সবার জানা __ভারতবর্ষ এবং আরো কয়েকটি দেশের সহায়তায় এই যুদ্ধে মুজিবর জয়ী হোলো ! দেশটি এরপরেই স্বাধীনতা পেল। বাংলাদেশ সৃষ্টি হবার পরেই পূর্ব-পাকিস্থানের নতুন নাম হোলো “বাংলাদেশ” !
ভাষা নিয়ে এই ধরণের বড় একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছিল পৃথিবীতে ! দ্যাখো, সেই অর্থে বাংলা ভাষা কিন্তু সেই সময় বাংলাদেশের বাঙ্গালীদের কাছে ছিল প্রাণস্বরূপ ! তাই তারা এতো বড় লড়াইটা চালিয়ে যেতে পেরেছিল এবং অবশেষে বিজয় লাভ করেছিল !
অপরদিকে, পশ্চিমবাংলার বাঙালিদের মুখেই শুধু বড় বড় কথা, কাজের কাজ তো কিছু দেখি না ! তাছাড়াও বাংলাদেশ আর একটা বড় কাজ করেছে__ “বাংলা ভাষা”-কে বিশ্বের দরবারে একটা মর্যাদার আসনে বসিয়ে দিয়েছে ! এখন যেহেতু বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং সেই দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, তাই রাষ্ট্রসঙ্ঘে যখন ওই দেশ থেকে কোনো প্রতিনিধি যায় __তখন তারা বাংলা ভাষাতেই ওদের বক্তব্য রাখে !
বাংলাদেশে একজন প্রেসিডেন্ট ছিল এরশাদ, যার পূর্ব পুরুষেরা ছিল আমাদের এখানকার মুর্শিদাবাদের লোক । এরশাদ ইংরেজি ভাষাটা একদমই জানতো না, ফলে ও যেকোনো বিদেশ সফরে গেলে বাংলাতেই কথাবার্তা বলতো ! দোভাষীরা ওখানে উপস্থিত থাকতো এবং ওর সাথে কেউ ইংরেজিতে কথা বললে, তারা তাদেরকে সব বুঝিয়ে দিতো !
বাংলাদেশের কিছু মানুষ গোঁড়াপন্থী হোলেও, অন্যান্য মুসলিম দেশের মুসলমানদের অপেক্ষা এই দেশটির মুসলমানেদের একটা বড় অংশ চেতনায় অনেকটাই উন্নত ! আমি এটা বলছি, হয়তো তোমাদের কাছে আমার কথা অতোটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হোচ্ছে না, কিন্তু এটা সত্য জানবে ! বাংলাদেশে অনেক উদার মানসিকতার মানুষ আছে, যারা ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে নিজেদেরকে এখনও মুক্ত রাখতে পেরেছে এবং সত্যিই তারা মুক্ত চিন্তার অধিকারী ! পরবর্তীকালে এদের দ্বারা সমাজের অনেক মঙ্গল সাধন হবে।৷