জিজ্ঞাসু:–আচ্ছা গুরু মহারাজ! যে কোনো পরম্পরায় বর্তমান গুরু যদি বোধি ব্যক্তি নাও হ’ন, তাহলেও কি তাঁর শিষ্যদের মধ্যে কারো পূর্ণত্ব লাভ সম্ভব হয় ?
গুরু মহারাজ:—হ্যাঁ তা হোতে পারে বৈকি ! ভারতবর্ষের অনেক প্রাচীন পরম্পরায় এমন রেকর্ড‌ রয়েছে ! উদাহরণ হিসাবে বলা যায়_ শিবযোগী গোরক্ষনাথের গুরু মৎসেন্দ্রনাথের আত্মদর্শন হয়নি, কিন্তু ওনার শিষ্য গোরক্ষনাথের হয়েছিল(পরে গুরু মৎসেন্দ্রনাথ আবার পুনরায় শিষ্য গোরক্ষনাথের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন এবং পরে তাঁরও আত্মদর্শন হয়েছিল)। দ্যাখো, কোনো শক্তিশালী পরম্পরার কোনো গুরু যদি তেমন শক্তিশালী নাও হ’ন, তাহলেও সেই পরম্পরার মধ্যেই আধ্যাত্মিক শক্তি এমনি এমনিই বাহিত হয় । ফলে, ওই পরম্পরায় পরবর্তীতে যদি কখনো কোনো শক্তিশালী আধার(আধ্যাত্মিক ব্যক্তি) এসে যায়, তাহলে পরম্পরায় বাহিত আধ্যাত্মিক শক্তি ওই আধারে ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে এবং ঐ আধ্যাত্মিক ব্যক্তিটি আত্মজ্ঞান লাভ করে পূর্ণতা প্রাপ্ত হোতে পারে !
তবে এখানে কিন্তু একটা শর্ত রয়েছে, শর্তটি হোলো_ ওই আধারের(আধ্যাত্মিক ব্যক্তিটির) যেন তাঁর পরম্পরার প্রতি বা তাঁর নিজ-গুরুর প্রতি একান্ত বিশ্বাস এবং নির্ভরতা থাকে ! ব্যস্, তাহলেই হবে । নিষ্ঠাভরে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সাধন করতে করতে তার সিদ্ধিলাভ হবেই ! আর প্রকৃত আধ্যাত্মিক পথে সাধনে সিদ্ধ হোতে পারলে ঐ সাধকের সামনে দিগন্ত খুলে যায় ! তিনি এরপর লোক কল্যানের নিমিত্তে ঈশ্বরের ইচ্ছায় অন্যান্য আরো অনেক কিছুই করায়ত্ত করতে পারেন।
এই প্রসঙ্গে আমার একটা গল্পের কথা মনে পড়ছে, সেইটা বলছি শোনো ! এক রাজার রাজমহলে একটি দাসী বা ঝি ছিল, যে রাজার অন্দরমহলের ঘরগুলি ধোয়া-মোছার কাজ করতো । সেই দাসীর একটা ছোটো ছেলে ছিল, মাঝেমধ্যে সেই বাচ্চাটিও মায়ের সাথে রাজবাড়ীতে যেতো । রাজামশাই যতক্ষণ অন্দরমহলের ঘরে থাকতেন, ততক্ষণ রাজার ঘরে অন্য কারো যাওয়া নিষেধ ছিল ! ফলে দাসীটিও সেইসময়টা বাইরের বারান্দা বা অন্যান্য ঘরগুলি ধোয়া-মোছার কাজ করতো । আর ঐ মহিলা যতক্ষণ কাজ করতো, তার শিশুপুত্রটি রাজবাড়ীর বিরাট বারান্দায় ছুটোছুটি করে খেলা করে বেড়াতো।
একদিন হয়েছে কি_ রাজা তখনও তাঁর ঘরে রয়েছেন, এমন সময় দাসীর ছেলেটি ছুটে ছুটে রাজার বারান্দায় খেলা করতে করতে হঠাৎ করে কখন যে সে রাজার ঘরে ঢুকে পড়েছিল সেটা তার মা খেয়াল করেনি ! ছেলেটি রাজার ঘরে ঢুকে পড়তেই, রাজার বডিগার্ডরা দৌড়ে এসে শিশুটিকে ধমক-ধামক দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে চাইছিল ! কিন্তু ছেলেটি একটুও ভয় না পেয়ে, চোখ পাকিয়ে রক্ষীদের উদ্দেশ্যে বললো_ “আমাকে ছেড়ে দাও, নাহলে আমি আমার মা-কে বলে দেবো!” রক্ষীরা মজা করে বললো_ “তোর মা আমাদের কি করবে?” শিশুটি দৃঢ়কণ্ঠে বললো_ “আমার মা, তোমাদেরকে বকবে,মারবে !” এদিকে হয়েছে কি_ ওদের এইসব কথাবার্তা রাজামশাই-এর কানেও যাচ্ছিলো । তিনি বাইরে এসে জানতে চাইলেন ‘এই ছেলেটি কে’ ? রক্ষীরা ছেলেটির পরিচয় দিলে রাজামশাই জিজ্ঞাসা করলেন_ ‘ছেলেটি তাঁর ঘরে ঢুকলো কি করে’ ? রক্ষীরা বললো_ “মহারাজ_ ওর মা আপনার ঘর পরিষ্কার করে! এই ছেলেটি মায়ের সাথে মাঝে মাঝে এখানে আসে ! আজ খেলা করতে করতে আপনার ঘরে হটাৎ করে ঢুকে পড়েছে ! তাই আমরা ওকে বের করে দিচ্ছি!”
এই ফাঁকে ছেলেটি করেছে কি_ এক ছুটে রাজার কাছে গিয়ে রক্ষীদের বিরুদ্ধে নালিশ করতে শুরু করে দিলো এবং ঐ একই কথাই বললো_”ওদের বলে দাও তো, এরপর যদি ওরা আমাকে বিরক্ত করে– তাহলে আমি মা-কে বলে দেবো এবং ওদের খুব শাস্তি দেবো !” রাজামশাই শিশুর এই সারল্যে খুবই খুশি হোলেন এবং ছেলেটিকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন যে, এরপর থেকে শিশুটিকে যেন আর আটকানো না হয়, তার যখন খুশি, সে ঘরে ঢুকতে পারে_ তাকে যেন কেউ বাধা না দেয় ! … (এই আলোচনাটি চলবে…)