জিজ্ঞাসু:–ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে যে সমস্ত বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়, সেগুলির বয়স বিচার করেএটা বোঝা যায় যে, এদেশের কোনো হিন্দু মন্দিরই অতোটা প্রাচীন নয় ! এমনটা হওয়ার কারণ কি_ গুরুজী ? [এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন গুরু মহারাজ। আজ ঐ আলোচনার শেষাংশ] ………… এইভাবে, বুদ্ধের সময় থেকেই তাঁর শিক্ষায়_ তাঁর আদর্শে আকৃষ্ট হয়ে বা অনুপ্রাণিত হয়ে দলে দলে তরুণ-যুবকরা বুদ্ধের চরণে শরণ নিয়ে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেছিল ! এই সমস্ত সন্ন্যাসীদের জন্য বুদ্ধের নিয়ম ছিল খুবই কঠোর ! যেমন— খুব ভোরে ওঠা, প্রাতঃকৃত্য সেরে এবং স্নান করে ধ্যান-জপ করা, সারা দিনে মাত্র একবার আহার্য গ্রহণ(তাও আবার ভিক্ষান্ন!)–ইত্যাদি বিধান ছিল ! ভগবান বুদ্ধ নিজেও ভিক্ষান্ন গ্রহণ করতেন । সেইজন্যই আজও বৌদ্ধ-সন্ন্যাসীদের মধ্যে একটি নিয়ম চালু রয়েছে (যেহেতু এখন আর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ভিক্ষা করার প্রয়োজন হয় না) যে, তাঁরা যখন কোথাও অন্নগ্রহণ করেন, তখন একটা থালায় সমস্ত আহার্য সাজিয়ে তাঁকে হাতে তুলে দিতে হয় এবং এটাকেই বৌদ্ধ-সন্ন্যাসীরা ভিক্ষান্ন হিসাবে গ্রহণ করেন ও সেই খাদ্যটিই সারাদিনের খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে থাকেন ! আজও তাঁরা সারাদিনে একবারই খান, তার বেশি নয়।
সন্ন্যাসীদের জন্য ভগবান বুদ্ধের এই কঠোর নিয়মটাইএকসময় একটা বিরাট সমস্যা সৃষ্টি করেছিল ! তখন এক একটা সংঘারামকে কেন্দ্র করে কতশত যুবক সন্ন্যাসীরা যে থাকতো তার ইয়ত্তা নাই ! ওই যুবক সন্ন্যাসীদের সারাদিনে একবার মাত্র খাওয়া, তাও আবার ভিক্ষান্ন ভোজন ! একটা নির্দিষ্ট স্থানে অতোগুলো সন্ন্যাসীদের পেটভরা ভিক্ষান্ন প্রতিদিন পাওয়াও দূরূহ হোতো ! তাই যে মুহূর্তে ভিক্ষায় বেড়োবার জন্য নির্দিষ্ট ঘন্টাটি বাজতোঅমনি সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুধার্ত সন্ন্যাসী ভিক্ষুর দল সংঘারাম থেকে বের হয়ে দ্রুতবেগে চারিদিকে দুরে-দুরান্তরে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা কোরতো । ছড়িয়ে যাবার কারণ ছিল এই যে, দূরবর্তী স্থানে অর্থাৎ কোনো নতুন জায়গায় ভিক্ষা করতে যেতে পারলে বেশি খাদ্য পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি ! একই স্থানে প্রতিদিন যদি এতগুলি মানুষ ভিক্ষা করে, তাহলে সবার পেট ভরা খাবার সেখানে পাওয়া যেত না ! এদিকে ফিরে আসারও একটা তাড়া ছিলকারণ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই সকলকে ফিরে আসতে হোতোতা না পারলে রাত্রে সংঘারামের বাইরেই রাত্রি কাটাতে হোতো ! এইসব বিভিন্ন কারণের জন্য, সন্ন্যাসীরা ভিক্ষা-গ্রহণের ঘণ্টা বাজলেই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চারদিকে ছুটে বেরিয়ে পরতো।
কিন্তু এক একটা সংঘারাম থেকে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক সন্ন্যাসীরা যখন ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে যেতো, তখন এই সন্ন্যাসীদের পায়ের চাপে চাষীদের লাগানো মাঠের ফসল একেবারে বিনষ্ট হয়ে যেতো ! চাষিরা তাদের এই সমস্যার কথা জানিয়ে নিজের নিজের রাজ্যের রাজার কাছে নালিশ জানাতে লাগলো ! এসব ঘটনা ভগবান বুদ্ধের মহাপ্রয়াণের অনেক পরের কথা ! যাই হোক, সংঘারামের বৌদ্ধাচার্যদের কাছে গিয়ে চাষীদের দুরবস্থার কথা রাজন্যবর্গেরা জানাতে থাকলো ! এরপরেই সকলে মিলে বসে সন্ন্যাসীদের স্থায়ীভাবে একস্থানে থাকার এবং তাদের সেখানেই ভোজনের ব্যবস্থা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ! তাছাড়া বুদ্ধের শিক্ষাকে মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেবার জন্য এবং হাতে-কলমে ছাত্রদেরকে বুদ্ধের আদর্শ শিক্ষাদানের জন্য শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলারও প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল । এই সব কথা চিন্তা করেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে একে একে বৌদ্ধবিহার, বৌদ্ধ সংঘারাম, বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে উঠতে লাগলো ।
এইভাবেই নালন্দা, বিক্রমশিলা, তক্ষশীলা, ওদন্তপুরী ইত্যাদি বৌদ্ধবিহারগুলী রাজা, জমিদার, শ্রেষ্ঠী ইত্যাদিদের অর্থানুকূল্যে গড়ে উঠেছিল ! এইসব স্থানে শতশত সন্নাসীদের স্থায়ীভাবে থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থাও হয়েছিল । বিনিময়ে এঁরা ছাত্রদের পাঠদান করাতেন এবং সাধারণ মানুষকেও বুদ্ধের শিক্ষা বিতরণ করতেন ! ওই সব ‘বিহারে’ প্রচুর আবাসিক ছাত্র থাকতো, যারা সবাই যে এইদেশের ছাত্র ছিল তাই নয়, অন্যান্য প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ছাত্ররাও আসতো ! আর সন্ন্যাসীরা তাদেরকে শুধু পাঠদানই করাতেন_তা নয়, পাঠদানের সাথে সাথে ছাত্রদেরকে নৈতিক শিক্ষা, যোগাভ্যাস ইত্যাদি নানারকম শিক্ষাও দিতেন ! এই ভাবেই বৌদ্ধ বিহারগুলো ভগবান বুদ্ধের আদর্শ ও শিক্ষাকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার জন্য কাজ করছিল ।
তখনকার দিনে এইধরনের বিহারগুলোই ছিল গোটা পৃথিবীর মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের ইউনিভার্সিটি ! কারণ তৎকালীন অখন্ড ভারত অর্থাৎ বর্তমানের বাংলাদেশ-পাকিস্তান-আফগানিস্তান-মায়ানমার-বালি,বোর্ণিয় ইত্যাদি দ্বীপ রাষ্ট্রগুলি ছাড়াও চীন-জাপান-সিংহল ইত্যাদি এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন দেশ থেকেও ছাত্ররা ওইসব ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসতো ।৷
