জিজ্ঞাসু:—ছোটবেলায় আপনি যে প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষ এবং ভারতবর্ষের বাইরের কিছু দেশে ঘুরে ছিলেন__ তার সবটাই কি পায়ে হেঁটে?___এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন গুরু মহারাজ। আজ সেই আলোচনার শেষাংশ।]

….. ভিতরে গিয়ে দেখি_ ঘরে একজন বৃদ্ধ বৈষ্ণব সাধুবাবা রয়েছেন এবং ওই ঘরে যে সমস্ত ছোটো ছোটো গোপাল, রাধারানী এবং আরও বিগ্রহ মূর্তি রয়েছে__উনি তাদের সাথেই নিবিষ্ট হয়ে এতক্ষণ কথা বলছিলেন । তিনি এতোটাই নিবিষ্ট হয়ে কথা বলছিলেন যে, মনে হচ্ছিলো যেন ওইসব মূর্তিগুলি সবাই জীবন্ত এবং তারা নড়াচড়া করছে, সারা ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে__আর উনি বকাবকি করে ওদেরকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন ! আমি প্রথমটা একটু অবাক হয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু পরে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ওনার এই ক্রিয়াকর্ম আর একটু বেশিক্ষণ দেখতে চাইছিলাম ! কিছুক্ষণ দেখার পর বুঝলাম_ উনি একজন প্রেমিক সাধু ! ওনার নাম ছিল “যাদবানন্দ” ! উনি সেদিন আমাকে খুবই যত্ন করে ঠাকুরের প্রসাদ খাওয়ালেন এবং আমার ছোটো বয়স দেখে আমাকে রাত্রে থাকার জন্য অনুরোধ করলেন ।
আমি শুধু সেই রাত্রিতেই নয়, বেশ কয়েকদিন ঐ সাধুটির প্রেমে আটকে পরে ওখানে থেকে গিয়েছিলাম । আমি যখন ওনার কাছে গেছিলাম__ তখন ওনার অনেকটাই বয়স হয়েছে, উনি বেশ বৃদ্ধ হয়েছেন বলা যায় ! কিন্তু কি জানো_ দারুণ মজাদার মানুষ ! যেন সদানন্দে রয়েছেন ! সেই রাত্রে নানারকম কথা হোলো_ দেখলাম যে উনি বালগোপালকে সাক্ষাৎ স্থুল ‘বালগোপাল’ হিসাবেই সেবা করেন ! সেইজন্যই উনি মূর্তিগুলির সাথে কথা বলেন, তাদেরকে বকাবকি করে খাওয়ান, স্নান করান ! সেই রাতে উনি তাদেরকে বিশ্রামে রেখে দিয়ে, তারপর শুয়ে শুয়ে আমার সাথে কথা বলছিলেন । আমি সুযোগ বুঝে উঠে বসে ওই বৃদ্ধের পা-দুটো কোলে নিয়ে একটু হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম, পা দুটো টিপে দিয়ে সেবা করছিলাম ! তখন দেখলাম উনি ব্যাপারটা বেশ enjoy করছেন, উনি আমাকে মোটেই নিষেধ করলেন না ! কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখি হটাৎ করে সটান উঠে পড়ে আমার পা-দুটি ওনার কোলের উপরে তুলে নিয়ে টিপতে শুরু করলেন ! আমি প্রবল বাধা দিয়ে বললাম __”আপনি এটা কি করছেন ! ছাড়ুন–ছাড়ুন ! এমনটা করবেন না !” উনি হেসে বললেন__ “চুপ করে বসে থাকো ! আমি আমার ইষ্টের সেবা করছি, তোমার নয় !”
এই কথার পরে আমি চুপ করে গেলাম ! তখন উনি কথা বলতে শুরু করলেন, নানা রকম কথা ! মহাপ্রভুর সাথে রায় রামানন্দ যে প্রেমপূর্ণ আলাপন হয়েছিল__ সেই সব কথা ! প্রেমের অত্যন্ত উর্দ্ধ অবস্থায় ছিলেন যাদবানন্দ ! পাঁচ-সাত দিন আমি ওনার ওখানে ছিলাম, কিন্তু যেদিন আমি চলে যেতে চাইলাম__ দেখলাম ওনার চোখে জল ! আমাকে প্রেমের সাথে বললেন__ “থেকেই যাওনা, বাকি কটা দিন ! আমার পর আমার গোপাল, রাধারানী এদের সেবা করার ঠিকমতো লোক_ এখনো পর্যন্ত পাইনি ! এই সবে তোমাকে পেলাম, তাও চলে যাবে !” আমি বললাম_ “তোমার তো একটা গোপাল, আমার যে অনেক গোপাল !” তখন উনি বললেন _”ঠিক আছে, তাহলে যাও ! কিন্তু যখন ইচ্ছা হবে, তখন চলে এসো”!
এইভাবে, আমার ভ্রমণকালীন সময়ে__ কতো মানুষের কাছে যেমন অবজ্ঞা-অবহেলা ইত্যাদি পেয়েছি, তেমনি পেয়েছি বহু মানুষের স্নেহ-প্রেম-ভালোবাসা ! অনাহারে-অনিদ্রায় দিনের পর দিন, রাতের পর রাত কাটাতে হয়েছে। আর জামালপুর স্টেশনের ঘটনা তো তোমরা জানোই! যেখানে সাহায্য-সহানুভূতির আশা করেছি, সেখানে হয়তো পেয়েছি বঞ্চনা-লাঞ্ছনা ! আবার চলার পথে অনেকেই স্বেচ্ছায় সাহায্যের বা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে__ আমাকে অনুরোধও করতে হয়নি ! এই ভাবেই মা জগদম্বার ইচ্ছায় আমার ভ্রমণকালীন সময় __নানান বৈচিত্র্যপূর্ণ ঘটনার মধ্যে দিয়ে কেটে গেছে।৷