স্থান:–বনগ্রাম মুখার্জি বাড়ি। সময় _ ৩১-শে ডিসেম্বর,১৯৯১।
উপস্থিত ব্যক্তিগণ:–জয়দীপ, লেখক (কোলকাতার) দেববাবু, ন”কাকা, মেজো কাকা (রমাপ্রসাদ বাবু), তপি মা, রেবা মা, রীতা দি(সিঙ্গুর) প্রমুখেরা।
জিজ্ঞাসু(গুরু মহারাজের পিছনে বসে থাকা মেয়েদের মধ্যে থেকে একজন):—আগামীকাল পয়লা জানুয়ারি ! এই দিনে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ কল্পতরু হয়েছিলেন কাশীপুর উদ্যানবাটীতে ! আমরাও তাই আগামীকালের প্রতীক্ষায় রয়েছি, কি ঘটে তা দেখার জন্য ?
গুরু মহারাজ:—দ্যাখ্_ প্রকৃতপক্ষে ঈশ্বর নিত্য-কল্পতরু ! হিন্দিতে একটা কথা রয়েছে”যো মতি সো গতি” ! মনুষ্যসমাজের কোটি কোটি মানুষের মধ্যে, যে _ যে চেতনায় থাকে, ঈশ্বর তার সেইরূপ গতি প্রাপ্ত করান ! এই কথার কোনো সংশয় করিস না ! ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ, তাঁর নর-লীলার শেষদিকে কোনো এক পয়লা জানুয়ারি কাশীপুর উদ্যানবাটীতে কিছু লোককে বিশেষ কৃপা করেছিলেন এবং বলা হয় সেটা ছিল অহৈতুকী কৃপা ! ওইদিনের সেই ঘটনাকে স্মরণ করেআজও রামকৃষ্ণ মিশনের ভক্তরা বিভিন্ন মঠ-মিশন সহ নানাস্থানে ‘কল্পতরু উৎসব’ পালন করে থাকে ! কিন্তু এটা জেনে রাখা ভালো যে, নরলীলায় ঈশ্বর স্থুলশরীর ধরে ভগবান-রূপে অবতীর্ণ হ’ন ! ফলে তিনি তখন কত কি-ই না করতে পারেন ! তিনি ইচ্ছা করলে কোনো কারণ ছাড়াইযে কোনো কার্য ঘটাতে পারেন ! তাঁরই তো জগৎ তাই তিনি যা কিছু তাই করতে পারেন বই কি ! তাঁর কাজে কে বাধা দেবে ? মহামায়া, যোগমায়া তো তাঁতেই মুগ্ধ !!
যাই হোক, সেদিন কাশীপুর উদ্যানবাটীর ঘটনায় ফিরে যাই ! ধরে নেওয়া যাক্ সেদিন_ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ না হয় ‘কল্পতরু’-ই হয়েছিলেন ! কিন্তু ওখানে উপস্থিত যে কজন ভক্ত ছিল_ তারা চাইলো টা কি ? কিছুই না ! আর মানুষ কি-ই বা চাইতে পারে ? কিছু স্থুল-অনিত্য বস্তুর চাওয়া তো ? সেই অর্থে, বলতে গেলে বলতে হয় সাধারন মানুষ তো ঠিকমতো চাইতেও জানে না ! স্বয়ং ভগবান দিতে চাইছেন, তবু কেন মানুষ নিত্যবস্তু চাইতে পারে না বলো তো ?_ কারণ সে ‘হারানো’-র ভয় করে ! মানুষ যে_ যে অবস্থায় আছে, সে সেই অবস্থাতেই থাকতে চায় ! সেই অবস্থাটাকে সে হারাতে চায় না ! আর সে চায় না, কারণ সে যে_ স্ত্রী-পুত্র-জমিজমা-ব্যবসা-বাণিজ্য-চাকুরী ইত্যাদি নানাকিছু নিয়ে দুনিয়াদারির শিকার হয়েছে ! এই মহামায়ার মায়ায় আবদ্ধ অবস্থাটা সে হারাতে চায় না ! সেইটাকেই আঁকড়ে ধরে সে বেঁচে থাকতে চায়তাতে সে যতোই ত্রিতাপ জ্বালায় জ্বলে মরুক না কেন ? কিন্তু মানুষ যদি ঈশ্বরের কাছে ঠিকমতো (নিত্যবস্তু) চাইতে পারে, তাহলে সে পাবে না কেন নিশ্চয়ই পাবে ! ঈশ্বর করুণাময়তিনি তো সকলকে দেবার জন্যই বসে আছেন ! শুধু নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারলেই হোলো ! মানুষ ঈশ্বরের দিকে এক পা এগিয়ে গেলে, ঈশ্বর মানুষের দিকে একশো পা এগিয়ে আসেন ! তবুও মানুষ এক পা আগাতে পারে না ! কজন মানুষ যোগমার্গ অবলম্বন করে বা অন্য কোনো পথ (জ্ঞানের পথ, প্রেমের পর,করলাম বা সেবার পথ ইত্যাদি) অবলম্বন করে ত্যাগব্রতী হয়ে “নির্বিকল্প সমাধি” চায় বলো ? মানবজীবনের উদ্দেশ্যই হোলো নির্বিকল্প সমাধিলাভ বা আত্ম-সাক্ষাৎকার ! কিন্তু সাধারণ মানুষ কখনোই সেই অবস্থা লাভ করতে চায় না শুধুমাত্র যৌবন-অর্থ-যশ-ভোগের সামগ্রী ইত্যাদি হারানোর ভয়ে ! ঐ যে বলা হোলো_ সে তার নিজের অবস্থানটা (চেতনার যে লেভেলে সে রয়েছে)-কেই আরও জোর লাগিয়ে ধরে থাকতে চায় এবং এটাকে ধরেই জীবনের বাকি দিনগুলো বাঁচতে চায় ! এটাই হোলো মানুষের পিছিয়ে পড়ার রহস্য ! শাস্ত্রে এটাকেই বলা হয়েছে বন্ধন, মা মহামায়ার বন্ধন ! স্ত্রী-পুত্র-পরিজন-বিষয়-আশয় ইত্যাদির প্রতি মায়াবশতঃই এই বন্ধন-দশা প্রাপ্ত হয় মানুষ !
মানুষের জীবনে প্রেম প্রকটিত হয় না বলেই মানুষ মোহগ্রস্থ (বিকার) হয় ! অপরপক্ষে, মানবজীবনে যদি প্রেমের উদয় হয়, তাহলেই মানুষ মুক্ত হোতে পারে ! প্রেমের স্বভাবই হোলো_ ছেড়ে দেওয়া, কাউকে আটকে রাখা নয় ! তবে জানিস তো’ প্রকৃত প্রেম কখনোই কোনো নিয়ম ভাঙে না, ‘প্রেম’ সমস্ত নিয়ম অতিক্রম করে চলে যায় ! আপাতদৃষ্টিতে প্রেমের কার্যকলাপ দেখে মানুষ ভাবে প্রেম বোধহয় সমস্ত নিয়মের বেনিয়ম ঘটায় ! কিন্তু তা নয় ! এটি হোলো নিয়মকে অতিক্রম করে যাওয়া_ তাই প্রকৃত প্রেম কখনো প্রেমাস্পদকে আঘাত দেয় না, তাকে বাঁধতে চায় না _সবসময় তাকে মুক্ত করে দিতে চায়। ….. (ক্রমশঃ)
