সময়:– নভেম্বর,’88।
উপস্থিত ব্যক্তিগণ:–বিদ্যুৎ বড়ুয়া, জগাদা, সন্ধ্যা-মা ইত্যাদি রায়নার আরো কিছু ব্যক্তি।
জিজ্ঞাসু :–জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য কি?
গুরুজী:– জন্ম-মৃত্যুর কথা বলছো তো? এটা ঠিক জেগে থাকা এবং ঘুমন্ত অবস্থার মতো! জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তি! একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত একই চক্রে ঘুরতে থাকে মানুষ, আর সেটা হোল,জন্ম-জীবনকাল-মত্যু! যে কোন কার্যেরই ‘কারণ’ থাকে। আবার ‘কারণ’ সৃষ্টি হলেই ‘কার্য’- সম্পন্ন হয়! কিন্তু কার্য-সম্পাদনের নিমিত্ত প্রয়োজন হয় ‘আধার'(দেহ)-এর! তাই যখন তোমার জন্ম হচ্ছে অর্থাৎ পাঞ্চভৌতিক দেহধারণের প্রয়োজন হচ্ছে, তখন থেকেই স্থুল-দেহকে কেন্দ্র করে নানা রকম কার্য হয়ে চলেছে মৃত্যুকাল পর্যন্ত! মৃত্যুর পর সারা জীবনের কৃতকর্মের ফল ‘কারণে’ রূপ নিচ্ছে_ যা আবার পরবর্তী শরীর গ্রহণ অর্থাৎ পুনরায় জন্ম গ্রহণে বাধ্য করছে! এইভাবে _”পুনরপি জনমম্ পুনরপি মরণম্, পুনরপি জননী জঠরে শয়নম্”।
এইবার কথা হচ্ছে, সাধারণ মানুষ_ সারা জীবনে কি কর্ম করে? রিপুতাড়িত সাধারণ মানুষ, কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্যই তো সারা জীবন কর্ম করে চলেছে! এর বাইরে কতটুকু কর্ম হয়!!যদি হয়_তাহলে সেই কর্মগুলি অর্থাৎ সাধন-ভজন বা পরহিতায় যে কর্ম__ সেগুলি কর্মফল বা প্রারব্ধ কর্মকে ক্ষয় করে।
যাইহোক, তাহলে দেখা গেল_ তোমার জীবদ্দশাটাই জাগ্রতাবস্থা, মৃত্যুর পর কিছুকাল স্বপ্নাবস্থা, তারপর ঘন সুষুপ্তি অবস্থা! কিছুকাল ঐ অবস্থায় কাটানোর পর আবার কামনা-বাসনার টানে পর্যায়ক্রমে,সুষুপ্তি থেকে স্বপ্নাবস্থা এবং পরে জাগ্রতাবস্থা অর্থাৎ শরীর গ্রহণ ! এইভাবে সামগ্রিক বিচারে মানুষের দেহের মৃত্যু যেন একটা খোল বদলানোর মতো ব্যাপার! সুদীর্ঘ যাত্রাপথের একটু বিশ্রাম অথবা একটাই continuation-এর এক একটা ছেদ যেন “জীবন এবং মৃত্যু”!
“মানুষের জীবদ্দশায় ‘জীবন এবং মৃত্যু’-র মধ্যে কতটুকু ফারাক”__ হযরত মুহাম্মদ একবার তাঁর পার্ষদদেরকে একথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন । জন্ম এবং মৃত্যুর মধ্যে ফাঁক কতটা_ তার উত্তরে ওনার ভক্তদের কেউ বলেছিলেন 40 বছর, কেউ বলেছিলেন 60 বছর, কেউ 80 বছর_ কিন্তু এই উত্তরগুলি হযরতের মনঃপুত হল না! তখন উনি তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরি আবুবকর-কে উত্তর দিতে বললেন। আবুবকর উত্তর দিলেন,_ “হুজুর! আমার মনে হয় জীবন এবং মৃত্যুর মধ্যে ফারাক নামাজ পড়ার সময় একবার ঘাড় বাঁকাতে যতটুকু সময় লাগে_ ঠিক ততখানি!” হযরত এই উত্তর শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন!
ব্যাপারটা বুঝতে পারলে_ তার মানে, উনি বোঝাতে চাইলেন জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে ফারাক বা ফাঁক অতি অল্প!বলা হয়_ “নিঃশ্বাসের কোন বিশ্বাস নাই !” প্রতিটি মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক কিছু ভাবছে, আশা করছে, সংকল্প করছে_ কিন্তু সে ভাবছে না যে, তার জীবন নশ্বর! পরমুহুর্তেই যে তার জীবন শেষ হয়ে যাবে না_ তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? কামনা এবং বাসনা চরিতার্থ করতে গিয়ে অজ্ঞানতাবশতঃ মানুষ অনিত্যকে ভালোবেসেছে, আর তা করতে গিয়ে_ নিজেই নিজেকে সহস্র বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলেছে! সেখান থেকে আর বেরোতে পারে না, অবশ্য বেশিরভাগই বেরোতে চায়ও না। এইভাবে মোহাচ্ছন্ন মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়!অন্যের মৃত্যু হতে দেখেও, প্রত্যেকেই ভাবে তার নিজের মৃত্যু হতে এখনো অনেক দেরি আছে! সে তার বর্তমান শরীরটাকেই ‘সবকিছু’_ মনে করে আঁকড়ে ধরতে চায় কিন্তু সে যে বহু শরীরের একটা continuation, এটা সে জানে না বা জানলেও বোধে আনতে পারে না! এই রহস্য একমাত্র জানেন জ্ঞানীরা, তাই তাঁরা দেহের মৃত্যুতে শোক করেন না বা বিচলিত হন না! তাঁরা জানেন যে দেহের মৃত্যু, দেরীতেই হোক বা এখনই হোক_ সেটা কোন সমাধান নয়! জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে বেরিয়ে আসাটাই প্রকৃত সমাধান! মরেই বা যাবে কোথায়_ আবার তো এখানেই ফিরে আসতে হবে! সাধারণ মানুষ এটা বোঝে না, ফাঁদে পড়া হনুর মতো হাত কামড়ায় আর ভাবে হাতটা তাকে ধরে রেখেছে! ব্যাপারটা বলি শোন__ হনুমানযারা ধরে(ব্যাধেরা) তারা বনে জঙ্গলে গিয়ে যেখানে অনেক হনুরা বাস করে, সেখানে গিয়ে মাটিতে গর্ত করে শক্ত কুঁজো এমনভাবে বসিয়ে রাখে _যাতে মুখটা শুধু খোলা থাকে। এইবার ব্যাধেরা কিছু ছোলা নিয়ে কুঁজোর ভেতরে রাখে এবং কিছু ছোলা বাইরেও ছড়িয়ে দেয়। এইভাবে অনেকগুলো কুঁজো মাটিতে ভালোভাবে আটকে দিয়ে তারা একটু দূরে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। হনুমানেরা ছোলার লোভে গাছ থেকে নেমে আসে, বাইরের ছড়ানো ছোলাগুলি খাওয়া শেষ হয়ে গেলে, কুঁজোর মুখটা গর্ত মনে করে ভেতরে হাত ঢুকিয়ে ছোলা মুঠো করে ধরে _ তারপর যেই মুষ্ঠিবদ্ধ হাত বের করতে চায় অমনি তা যায় আটকে! যদি মুঠো ছেড়ে দেয় তো ‘সুরুৎ’- করে হাত বেরিয়ে আসবে কিন্তু হনু মুঠো ছাড়ে না,ফলে হাতও আর বেরোয় না! হনু ভাবে গর্ত তাকে আটকে_ধরে রেখেছে, ফলে টানাটানি করে, চিৎকার করে, শেষে হাতটাই কামড়ে ছিঁড়ে ফেলে _তবুও মুঠো ছাড়ে না! পরে যখন সে ক্লান্ত_অবসন্ন হয়ে পড়ে তখন শিকারিরা গিয়ে হনুটাকে বেঁধে ফেলে। তারপর যেই ওটার মাথায় “এক ডান্ডা”- মারে, সেই মুহুর্তেই হনুটি মুঠি ছেড়ে দেয় এবং অনায়াসে হাতটা বাইরে বেড়িয়ে আসে।
ঠিক সেইরকম মানুষ এই সংসাররূপ অরন্যে ‘ভোগবাসনা’-রূপ ছোলা-মুঠোকে ধরে ফেলেছে, এবার গেছে আটকে! তারপর নানা ক্লেশ পেতে থাকে, আর ভাবে সংসার তাকে আটকে রেখেছে! কিন্তু কেউ কাউকে আটকে রাখেনি, যেই মুহূর্তে সে বাসনা মুক্ত হবে_ সেই মুহূর্তেই সে নিজেও মুক্ত হবে। বাউল গানে আছে_ “ইঁদুর মারা কল রয়েছে জগৎ মাঝারে,
ও কলে কেউ কারে ফেলে না ধরে, দাদাগো_ আপন ইচ্ছায় সব পড়ে!
ইঁদুর মারা কল রয়েছে জগৎ মাঝারে!”
এটা মনে রেখো, ভোগবাসনা চরিতার্থ করার জন্য যে বেঁচে থাকা_ এটা মৃত্যুরই নামান্তর। স্বামী বিবেকানন্দ এই অবস্থাকেই বলেছিলেন_”চলমান মমি” বা “চলমান শ্মশান”! অপরপক্ষে,জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সাধনায় যে বেঁচে থাকা_ সেটাই “জীবন” বা “জীবিত মানুষ”-এর লক্ষণ। তাইতো আমি তোমাদের সবাইকে বলি_ জীবন্ত শবদেহ হয়ে বেঁচে থেকে লাভ কি? সিংহ গর্জন করো_ দেখবে, দুর্বল বাসনা সমূহ কোথায় পালিয়ে যাবে! ভুলেনা_ ত্যাগেই শান্তি, আর স্বরূপের বোধ করাই_ তোমার জীবনের উদ্দেশ্য! তাই তোমরা যে যখন থেকে এটা বুঝতে পারছো_ সে তখন থেকেই ‘লক্ষ্যে’ পৌঁছাবার চেষ্টায় ব্রতী হও, বৃথা কালক্ষয়ে লাভ কি!!
জিজ্ঞাসু:– “ত্যাগেই শান্তি”,তা বুঝবো কি করে?
গুরুজী:–স্থুলে তো বেশ বুঝতে পারিস! স্থুল দেহের ‘মল’ ত্যাগ হলে শরীরের শান্তি হয়। _হয় কিনা? ঠিক তেমনি, এই শরীরেই _ আরো দুটো শরীর রয়েছে _সুক্ষশরীর ও কারণ শরীর। এই শরীর দুটির ও ‘মল’ রয়েছে ! সুক্ষশরীরের ‘মল’ হচ্ছে _ চিত্তমল বা স্বার্থ, আর কারণ শরীরের ‘মল’ হচ্ছে _প্রানমল বা আবরণ অর্থাৎ অহংকার! স্বার্থত্যাগ হলেই চিত্তের শান্তি হয় আর আবরণ বা অহংকার ত্যাগ করতে পারলেই আত্ম-স্বরূপের সাক্ষাৎকার হয় ! এই অবস্থাতেই প্রকৃত শান্তিলাভ হয়,মা জীবের স্ব-ভাব অবস্থা। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ অবধূতের শিক্ষার গল্প বলতেন _ একদিন অবধূত দেখল একটা চিল এক খন্ড মাংস মুখে করে উড়ছে, আর এক পাল কাক “কা-কা” করতে করতে তার পিছন পিছন চলছে! কাকের দল চিলটাকে এমনভাবে বিরক্ত করছে যে, চিলটা কোথাও শান্তিতে বসতেও পারছে না _ আবার উড়েও শান্তি নাই! এইভাবে বেশ কিছুক্ষণ ওড়ার পর বিরক্ত হয়ে ঐ চিলটি মাংসখন্ড টা মুখ থেকে নিচে ফেলে দিল _ আর কাকের দল চিলকে ছেড়ে সেই মাংসখণ্ডের পিছনে ছুটল। তখন চিল নিশ্চিন্ত হয়ে একটা ডালে গিয়ে বসল _ এই ঘটনা দেখে অবধূত শিক্ষা নিলেন, _ ‘যে বস্তু বা যে বিষয় মানুষের অশান্তির কারণ, তা ত্যাগ করলেই অশান্তি দূর হয়।’ অর্থাৎ এক কথায় ‘স্বার্থ’–ত্যাগ করতে পারলে তবেই জীবনে শান্তি পাওয়া যায়! যে কোনো মহাজীবনের দিকেতাকিয়ে দ্যাখ্ না _ এই কথাগুলির সত্যতা বুঝতে পারবি ! একজন মহাপুরুষ যেন এক একটা ত্যাগের মূর্ত বিগ্রহ! তাই স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন “তোমাদের আদর্শ হোক সর্বত্যাগী শংকর!”
দ্যাখ্ বাবা, ‘শান্তি’- ‘শান্তি’ বলে চ্যাঁচালে কি শান্তি পাওয়া যায়? শান্তি বাজারে কিনতে পাওয়া গেলে না হয় 2/4- সের কেউ নিয়ে আসত! কিন্তু তা তো আর পাওয়া যায় না! সুতরাং প্রকৃত যদি কেউ শান্তি চায় তাহলে তাকে এই রহস্য বুঝতেই হবে! আর এই পদ্ধতির অনুশীলনে-ই তার জীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে!!
জিজ্ঞাসু:—আপনাকে আমরা এত ভালোবাসি, আর আপনি ছ মাস পরে হয়তো একবার আসেন! এটা কি ঠিক?
গুরুজী:– কোথায় তোরা আমাকে ভালোবাসিস! আর বাসলেও কতটুকু? মাঝে মাঝে,কোন সময় _ হয়তো তোদের, আমার কথা মনে পড়ে! সারাদিনের(২৪-ঘন্টা) সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে_ সেটা আর কতটুকু? আর তাও জানবি যে, সেটুকুও তোদের কৃতিত্ব নয়__ তোর অন্তরের অন্তর্যামী রূপে যিনি আছেন তিনিই_ আমার কথা তোদের মনে করান! ব্যাপারটা বুঝতে পারলি না? আচ্ছা বুঝিয়ে বলছি শোন,_ “আমি অমুক”_ এই যে ব্যক্তি-অহং, মানুষের মধ্যে সর্বদা স্থান অধিকার করে রেখেছে__ সেখানে আমার জায়গা কোথায়? তবে মেঘের আবরণে ঢাকা সূর্যও যেমন মাঝে মাঝে আলোর ঝিলিক মারে, ঠিক তেমনি তোদের অন্তর্জগতে ‘পরমচৈতন্য’ মাঝে মাঝে ঝিলিক দেয় অর্থাৎ সেই অন্তর্যামীই মাঝে মাঝে আমাকে মনে করায়! এটা কে কী ভালোবাসা বলবি? প্রকৃত ভালোবাসা হলে শয়নে, স্বপনে, নিদ্রায়, জাগরণে _সে শুধু আমার কথাই ভাববে! জাগতিক বিষয়সমূকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জ্ঞান করবে। আর তেমন কেউ যদি কোথাও থাকে, তো ধীরে ধীরে সে-ই “আমি” হয়ে যাবে! তখন তো আর “তুমি-আমি” থাকবে না _ তখন সবেতেই ‘আমি’-বোধ! তখন “আর আমি আসি না কেন” _ এরূপ জিজ্ঞাসাও থাকবে না,ফলে এই নিয়ে কোন আক্ষেপের প্রশ্ন সেখানে উঠবে না।
তাই বলছিলাম_ “আমাকে ভালোবাসিস” একথা বলিস না! আমাকে ভালোবাসার অনেক বিপদ আছে জানিস তো? সেসব সহ্য করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে! তাই যতক্ষণ তা না হচ্ছে ততক্ষণ এইরকমই চলুক _যেমনটা চলছে! মা জগদম্বার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক!!
জিজ্ঞাসু:– আমি শুনেছি আপনি দীর্ঘদিন ধরে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেরিয়েছেন। কোনদিন কি বাঘের সামনে পড়েননি?
গুরুজী:— বাঘের সামনে পড়লেই বা কি? কারো জীবন দেওয়া বা নেওয়া-টা কি কোন প্রাণীর হাতে, না মানুষের হাতে? জন্ম-মৃত্যু, ঈশ্বরের ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই যারা ঈশ্বরের জন্য সবকিছু ছেড়েছে বা ত্যাগ করেছে _ তাদেরকে প্রয়োজনে ঈশ্বরই রক্ষা করেন! তাছাড়া তুমি যদি কায়মনোবাক্যে অহিংসক হও _তাহলে সমস্ত হিংস্র পশুপাখি তোমার সামনে এসে হিংসা ভুলে যাবে। পূর্বে শোনা যেত ঋষিদের আশ্রমে _ সিংহ আর হরিণশিশু একসাথে বিচরণ করত, খেলা করতো! এরও কারণ ছিল ওই অহিংসা! তখনকার দিনে তপোবন গুলিতে সারাদিন শুধু সাধন-ভজন,বেদপাঠ,যজ্ঞ_ইত্যাদিই হোত।কোন আশ্রমিকের মনোজগতেই হিংসার কোন স্থান ছিল না_তাই এরূপ (সিংহ-হরিন একসাথে)ঘটনা ঘটা সম্ভব হোত।
স্বামী বিবেকানন্দ ভারত ভ্রমণের সময় একবার বাঘের মুখে পড়েছিলেন । স্বামীজী তখন খুব ক্লান্ত এবং ক্ষুধার্ত ছিলেন । এই অবস্থায় হঠাৎ সামনে বাঘ দেখে ও ঘাবড়ে গেলেন না_বরং বাঘকে উদ্দেশ্য করে বললেন,”হে বাঘ! তুমিও ক্ষুধার্ত _আমিও ক্ষুধার্ত! কিন্তু যেহেতু আমি তোমার ভক্ষ্য__ অতএব এসো, তুমি আমাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করো! এই বলে যেই তিনি বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছেন অমনি বাঘটি ভয় পেয়ে বা অন্যকিছু বুঝে_ সেই স্থান থেকে চলে গিয়েছিল। তাহলে কথাটা হচ্ছে তোমরা সচরাচর বাঘ দেখনা __তাই বাঘের ব্যাপারে তোমাদের একটা খুব ভয় কাজ করে ! কিন্তু যারা বনে জঙ্গলে বাস করে(বিশেষতঃ সুন্দরবন এলাকায়) _ তারা তো বলতে গেলে, বাঘের সঙ্গে ঘর করে! তাছাড়া বাঘ মারা বা বাঘ ধরাটা-ও তো একটা ভালো ব্যবসা! জ্যান্ত বাঘ অপেক্ষা মরা বাঘের কারবার-ই বেশি হয় ! কারণ বাঘের চামড়া, বাঘের জিভ _ খুব দামী, আর পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের আদিবাসীরা বাঘের মাংস খায়। একটা বাঘ মারা মানেই আদিবাসী গ্রামে একটা গণ-উৎসব শুরু হয়ে যায় বাঘের মাংস খাবার আনন্দে!
জিজ্ঞাসু:– জ্যান্ত বাঘ কি করে ধরে? আর বাঘের জিভ-ই বা এত দামি কেন?
গুরুজী:– বাঘের জিভ কেন এত দামি_ সেটা ওই বিদ্যুৎ-ডাক্তার রয়েছে, ওরা ডাক্তারি পরিভাষায় কারনগুলো ভালো বলতে পারবে! আমি আর কি বলব _এসব কথা ওদের কাছেই শুনে নিও! তবে আদিবাসীদের জ্যান্ত বাঘ ধরার একেবারে সহজ একটা কায়দা বলছি শোনো _!
বনে বাঘের চলার একটা নির্দিষ্ট পথ থাকে, বাঘ-ধরা লোকেরা সেটা চেনে। বন-জঙ্গলের মধ্যে দুর্গম ঐ সরু পথের ঠিক যেখানটায় দুদিকে দুটো মোটা গাছ থাকে ওরা সেই জায়গাটাকে বাঘ ধরার জায়গা হিসেবে বেছে নেয়। এবার ঠিক বাঘ চলাচলের রাস্তায় শক্ত দু-কাছি দড়া বা শক্ত মোটা লতা __দু’দিকের গাছে বেঁধে দেওয়া হয়। দড়া দুটোর মাঝখানে (ঠিক রাস্তার মাঝে) একটা 3-4 ফুট শক্ত লাঠি খাড়া ভাবে আটকে দড়াগুলোয় পাক দেওয়া হয় _ এতে হয় কি,দড়াদুটো প্রচন্ড পাক খেলেও মাঝখানটায় একটা ফাঁক থেকেই যায়!দড়াগুলোয় এত বেশি পাক দিতে হয় যাতে দড়াটা একটু আলগা হলেই অন্তত এক মিনিটে 30-40 পাক উল্টো দিকে খুলে যায়!
মাঝখানটায় লাঠিটা খাড়াভাবে থাকার জন্য মাঝখানটা ফাঁক থাকে, আর সেইটাই হবে বাঘেদের যাবার পথ!এবার অন্য একটা লম্বা দড়ির সাহায্যে ওই খাড়া লাঠিটাকে এমনভাবে বেঁধে রাখতে হয় যাতে দড়িটা একটু টান দিলেই, লাঠিটা খুলে যায়! এইভাবে সব ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হোলে ঐ লোকগুলি লাঠির সাথে বাঁধা দড়িটা শক্ত হাতে টান করে ধরে, কাছাকাছি কোন গাছে উঠে চুপচাপ বসে বসে অপেক্ষা করে_কখন ঐ পথে বাঘ আসে!দড়িটা টান করে ধরে রাখায় দুটো কাজ হয়_মোটা দড়ার পাকও খুলে যায় না, আবার যদি বাঘ ওই পথে একবার আসে_ তাহলে বাঘ যেই দড়ার ফাঁকটা যেই পেরোতে যাবে, অমনি দড়ি ধরে হ্যাঁচকা টান মারলেই লাঠিটি খুলে যাবে। পাক দেওয়া দড়াদুটি মাটি থেকে প্রায় 3-4 ফুট উঁচুতে এমনভাবে আটকানো হয়ে থাকে, যাতে বাঘ ওই রাস্তা দিয়ে গেলে ওকে ঐ দড়ার ফাঁকের মধ্যে দিয়েই যেতে হয়!
কোন বাঘ ওখানে এসে পৌঁছে,যেই সামনের দুটো পা ও মাথা টা ভরে সামনে আগাতে যায়_ঠিক সেই সময়েই গাছে বসে থাকা লোকগুলো_ লাঠির সাথে বাঁধা দড়িটাকে হ্যাঁচকা টান মেরে খুলে দেয়! আর বাঘটা আটকে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে দড়ার পাক প্রচন্ড বেগে বাঘ-সমেত সাঁই সাঁই করে ঘুরতে থাকে! কয়েক মিনিটের মধ্যে অত বেগে 30-40 পাক খেয়ে বাঘটার এমন করুন অবস্থা হয় যে,ঘোরা একটু বন্ধ হলে_ বেচারা বাঘটা ভয়ে আর নড়তে-চড়তে বা শব্দ করতেও চায় না! কোনরকম ভাবেই পিছন পায়ে একটু জোর দিতেও চায়না! কেননা একটু জোর দিলেই আবার 2/4 পাক খেয়ে যায়! বাঘটা একেবারে নেতিয়ে পড়েছে দেখে, বাঘ-ধরা লোকগুলো গাছ থেকে নেমে আস্তে আস্তে বাঘটাকে বাঁধে। কেউ কেউ বাঘের গায়ে মাথায়হাতও বোলায়! ওরা জানে সেই মুহুর্তে ঐ বাঘটির কাছে থেকে ওরা খুবই নিরাপদ, কেননা 30-40 পাক খেয়ে বাঘটার এমন ঘোর লেগে যায় যে, সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই থাকে, কোনো reaction করে না_বা করতে পারেই না।।
জিজ্ঞাসু:– মানুষ এতসব জানে, এত কিছু করে_তবু মানুষের দুঃখ তো আর ঘুচছে না?
গুরুজী:– দুঃখ ঘুচবে কি করে?অজ্ঞানতা যে কাটছে না! জ্ঞানীরা তো কখনো দুঃখ করেন না, বরং তাঁরা সবার দুঃখমোচন করার চেষ্টা করেন। ভগবান বুদ্ধদেব বলেছিলেন চারটি আর্য সত্যের কথা__ দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখ মুক্তির উপায় আছে এবং দুঃখ মুক্তির উপায় _’নির্বাণ’! বুদ্ধ নিজেকে দেখিয়ে বললেন _”আমি নির্বাণ লাভ করেছি, ফলে আমার দুঃখ নিবৃত্তি ঘটেছে, সুতরাং দুঃখমুক্তি ঘটাতে চাইলে _ তোমরাও বুদ্ধ হও!” এই প্রসঙ্গে যে ঘটনাটা ঘটেছিল সেটা বলছি!
একবার ‘পূর্ণ'(ভগবান বুদ্ধের এক প্রিয় শিষ্য) বুদ্ধকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,_ “দুঃখের কারণ কি”? উত্তরে বুদ্ধ পূর্ণ-কেই বলেছিলেন, এর কারণ অনুসন্ধান করতে!পূর্ণ নগরে গিয়ে দুঃখের কারণ খুঁজে লাগলো। এক জায়গায় সে দেখল যে, একজন ভিখারি একটা গাছতলায় বসে বসে খুব দুঃখ প্রকাশ করছে, বলছে_ “হে ভগবান! সব লোকের থাকার জন্য কত বাড়িঘর আছে, আমার একটা মাথা গোঁজার মতো ভাঙা কুটিরও জোটে না! সামনেই বর্ষাকাল আসছে_ কিভাবে যে গাছতলায় রাত্রি কাটাবো_তাই ভেবে পাচ্ছি না!” ভিখারিটির হা-হুতাশ শুনে পূর্ণ বুঝল, ‘আশ্রয়হীনতাই দুঃখের কারণ’! দুঃখের কারণ খুঁজে পেয়েছে এই আনন্দে পূর্ণ ভগবানের কাছে ফিরে যাচ্ছিল_ হঠাৎ একটা প্রাসাদোপম বাড়ি সংলগ্ন বাগান থেকে একজন বৃদ্ধের বিলাপ শুনে সে থমকে দাঁড়ালো। সেখানে গিয়ে ঐ ব্যক্তির দুঃখের কারণ কি জিজ্ঞাসা করায়_ বাড়ির মালিক তাকে বলল যে, এত বড় প্রাসাদের মতো বাড়িই তার দুঃখের কারণ! সে সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে ওই বড় বাড়িটা তৈরি করেছিল, কিন্তু তার ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে,কর্মসূত্রে অন্যত্র থাকে। এদিকে স্ত্রী-ও তাকে ছেড়ে পরলোকগমন করেছে। ছেলেমেয়েরা তাকে তাদের সঙ্গে থাকার জন্য বলে_ কিন্তু নিজের হাতে তৈরি এই বাড়ির মায়া ত্যাগ করে সে কোথাও যেতে পারে না! আবার অন্য কারও হাতে এই বাড়ি ছেড়ে দিতেও পারে না! ফলে বৃদ্ধ বয়সে একা একা নির্বাসন-যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে তাকে ।
এটা শুনে হতাশ হয়ে পূর্ণ আবার ফিরে চলল নগরে! যাবার সময় হঠাৎ সে দেখল পথের পাশে দেবালয়ে, এক দম্পতি ঠাকুরের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে কাতরকন্ঠে প্রার্থনা করছে! পূর্ণ ছুটে গিয়ে তাদের দুঃখের কারণ জিজ্ঞাসা করল_ তারা উত্তর দিল যে তাদের টাকাপয়সা-ঘরবাড়ি সবই আছে, কিন্তু তারা সন্তানহীন_এটাই তাদের জীবনের সবচাইতে দুঃখ! পূর্ণ তখন ভাবল_ এবার সে দুঃখের কারণ পেয়েছে, ‘সন্তানহীনতাই দুঃখের কারণ’! আবার সে ফিরে চলল প্রভুর কাছে! চলতে চলতে নগর পেরিয়ে একটা ঝোপের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে সে শুনতে পেলো একটি লোকের বিলাপ! পূর্ণ তাকে জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছে _আপনার দুঃখের কারণ কি?” লোকটি বলল, _ “মহাত্মন্! একপাল সন্তানই আমার দুঃখের কারণ! সারাদিন খেটে খুটে ঘরে এসে সবেমাত্র খেতে বসেছি _এমনসময় শুয়োরের পালের মতো, আমার ছেলেমেয়ের দল ছুটে এসে ভাগ বসাতে শুরু করল, কেউ বিরক্ত করছে _ কেউ কোলে বসছে,কেউ কাঁধে চড়ছে! আমার মনে হচ্ছে কি জানেন _ সন্তান না থাকাই সুখের! আহা, সন্তানহীনরা কি সুখী! তারা অন্তত সুখে-শান্তিতে একটু খেতে পায় বা ঘুমোতে পায়, আমি তাও পাই না!” এইভাবে পূর্ণ দেখল ধন থাকাও দুঃখের কারণ_ধন না থাকাও, সন্তান থাকাও দুঃখের কারণ _ সন্তান না থাকাও, বাসস্থান থাকাও দুঃখের কারণ _ বাসস্থান না থাকাও, বিভ্রান্ত হয়ে পূর্ণ ফিরে গেল ভগবান বুদ্ধের কাছে! করজোড়ে, নতমস্তকে দাঁড়ালো তার সামনে! তখন বুদ্ধ উপস্থিত সকলকে উদ্দেশ্য করে এই আর্য সত্য গুলি বললেন _ “দুঃখ আছে, দুঃখের কারণ আছে, দুঃখ নিবৃত্তি উপায় আছে এবং ‘পরিনির্বাণ’-ই _ সেই উপায়! ভগবান আরও বললেন _ “সকল দুঃখের মূল হলো তৃষ্ণা বা বাসনা!একমাত্র নির্বানলাভ হলেই সকল তৃষ্ণার অবসান হয় এবং তখনই দুঃখের পরিসমাপ্তি ঘটে।।
