স্থান:– বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন সময়:– 1989, উপস্থিত ব্যক্তিগণ:– গঙ্গা বাবু, আজিমগঞ্জের সেনগুপ্ত বাবু, মানিকব।রহ্ম প্রমুখ এবং অন্যান্য আরো ভক্তগণ । জিজ্ঞাসু:— আপনাকে একটা প্রশ্ন করছি, বিদ্যাসাগরের ভ্রান্তিবিলাস ব‌ই-টিতে(সিনেমাও হয়েছিল) যমজদের নিয়ে যে বিভ্রান্তি ঘটার কথা জানা যায়, বাস্তবেও কি এটা হতে পারে? গুরু মহারাজ:– তুমি যখন কোন বিষয় সম্বন্ধে জানতে চাইছো_ তখন “প্রশ্ন করছি” বলছ কেন? বলো_ “জিজ্ঞাসা করছি”! প্রশ্ন করেন গুরু,_ শিষ্য কে অথবা শিক্ষক,_ তার ছাত্রদেরকে অর্থাৎ যিনি জানেন তিনি “প্রশ্ন” করে জেনে নেন, শিষ্যের সেই সম্বন্ধে জ্ঞান আছে কি না!! কিন্তু যে ব্যক্তি কোন এক বা একাধিক বিষয় সম্পর্কে মোটেই জানেনা_ জানতে চাইছে সে করবে জিজ্ঞাসা বা পরিপ্রশ্ন_ প্রশ্ন নয়!! শ্রীমদ্ভগবতগীতায় রয়েছে_ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ‘শ্রদ্ধাপূর্ণ জিজ্ঞাসা’ বা ‘পরিপ্রশ্নে’-র দ্বারা জ্ঞানী-গুনী ব্যক্তির অথবা গুরুস্থানীয়দের সন্তুষ্টি বিধানের কথা বলেছেন_”প্রনিপাতেন,পরিপ্রশ্নেন_ সেবয়া”! যাইহোক, তোমার জিজ্ঞাসার উত্তরে বলি যে, এটা দেখা গেছে_ সব সময় পৃথিবীতে একই রকম দেখতে কমপক্ষে দুজন এবং অধিক পক্ষে সাতজন ব্যক্তি থাকতে পারে। স্থান কাল পাত্র ভেদে তাদের বয়সের, রঙের, উচ্চতার বা গুণের সামান্য হেরফের হতে পারে। এবার এই ধরনের দুজন ব্যক্তি যদি_ একই সময়ে একই স্থানে একই পিতা-মাতার দ্বারা জন্ম গ্রহণ করে তাহলে তারা দুই ভাই হিসাবে ভ্রান্তিবিলাস ঘটাতেই পারে! আবার দুই ভাই না হয়েও একই অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী দুজন ব্যক্তিও একইরকম দেখতে হতে পারে এবং বিভ্রান্তি ঘটনাতেও পারে।।এই দ্যাখো না_ আমার মত দেখতে এই মুহূর্তে পৃথিবীতে তিনজন ব্যক্তি আছে, তাদের নাম এবং বয়স ভিন্ন ভিন্ন_ কিন্তু একটা নির্দিষ্ট বয়সের নিরিখে_ এই তিনজনকে দে অনেকটা একই রকম লাগবে! এই দুজনের সঙ্গেই আমার দেখা হয়েছে_এদের মধ্যে একজন সন্ন্যাসী, অপরজন আবার সংসারী! তাহলে বুঝতে পারলে তো একই চেহারার দুজন বা একাধিক মানুষ পৃথিবীতে রয়েছে! তোমার চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্য যুক্ত ব্যক্তিও পৃথিবীতে এক বা একাধিক রয়েছে! জিজ্ঞাসু:– আচ্ছা স্বামীজি! পৃথিবীতে কোটি কোটি জীবের মধ্যে মাত্র কয়েকজন “ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা”_এটি জানতে পারে, আর বাকিরা তো শুধুই “জগৎ সত্য”- এই চেতনাতে ঘুরপাক খাচ্ছে! এর কারণ কি ? গুরু মহারাজ:– “ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা”_ এটা পূর্ণ জ্ঞানীর কথা! আচার্য শংকর একথা বলেছিলেন।মানবজীবনে সম্পূর্ণতা না এলে এই কথার মর্ম উপলব্ধি হয় না! তুমি হয়তো ভাবছো, বেশিরভাগ মানুষের এই পূর্ণতা আসছে না কেন? এর কারণ পৃথিবী গ্রহটাইতো এখনো শৈশবাবস্থা রয়েছে! পৃথিবীর জীবজগতের চেতনা যেন ‘এক-দেড় বছরের শিশু যেন হামাগুড়ি থেকে সবে দাঁড়াতে শিখছে’_ এইরূপ অবস্থায় রয়েছে! সুতরাং তুমি কি করে আশা করো যে, তারা অর্থাৎ এই জগতের মানুষ জনেরা সকলে সম্পূর্ণতা লাভের জন্য সচেষ্ট হবে? ভগবান বুদ্ধ তো আজ থেকে 2500 বছর আগে সম্পূর্ণতা লাভ করলেন_ এই উদাহরণ দেখেও কি পৃথিবীর জনগণের বেশিরভাগ অংশ সচেষ্ট হয়েছেন হয়েছে? বিজ্ঞানীদের হিসেবে পৃথিবী গ্রহের বয়স 5000 কোটি বছর, জগত সৃষ্টি হয়েছে 500 কোটি বছর আগে, আর জীবনের উদ্ভব হয়েছে মাত্র 50 কোটি বছর আগে! আর হোমো ইরেকটাস অর্থাৎ খাড়া হয়ে দাঁড়ানো অবস্থার ‘মানুষ’ পৃথিবীতে এসেছে মাত্র কুড়ি লক্ষ বছর আগে! তাহলে বলো_ পৃথিবীর জন্ম-কালের বিচারে মানুষের শরীর-লাভ খুবই নবীন ! “মানুষ শরীর”_ জীবের শারীরিক বিবর্তনের শেষ ধাপ। এটা ঠিকই যে, মানব_ মন প্রধান, শরীর প্রধান নয়, তাই মানসিক বিবর্তন দিয়ে মানুষের উৎক্রমণ শুরু হয়। জন্ম-মৃত্যুর চক্রে বারবার যাতায়াত‌ই horizontal movement_এবং জন্ম-মৃত্যুর চক্র ছিন্ন করে বেরিয়ে যাবার প্রচেষ্টাই হোল Vertical Movement ! কিন্তু আমরা দেখছি যে, মানুষের এই বাঁচা-মরার চক্রে পড়ে থাকার ইচ্ছাই যেন বেশি! এইভাবে বাঁচার জন্য মানুষ, সমগ্র জীবজগতের সঙ্গে বা প্রকৃতির সঙ্গে যে লড়াই করছে_ তাকেই জীববিজ্ঞানীরা জীবনসংগ্রাম বলেছে__ কিন্তু এটাই কি প্রকৃত জীবন সংগ্রাম? না, তা নয়! জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে বাইরে যাবার জন্য যে সংগ্রাম তাই প্রকৃতপক্ষে “জীবন সংগ্রাম”! এবার বলোতো_ তোমাদের মধ্যে কয়জন সেই সংগ্রামে ব্রতী হয়েছো? হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন! এইরকম পরিসংখ্যানই সব জায়গাতে পাওয়া যায়_গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানোর লোক অধিক, কিন্তু “কাজের কাজ”-করার লোকের সংখ্যা সবসময় কম! তাই যে ব্যাপারে সাধারণ মানুষের নিজের ধারনাই তৈরি হয়নি অর্থাৎ মানবজীবনের চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছাবার_ কোন তাগিদই অনুভব হয়নি, সেখানে তুমি কি করে আশা করো যে, অনেক মানুষ “ব্রহ্ম সত্য_জগৎ মিথ্যা” এই সত্য উপলব্ধি করবে বা করতে সমর্থ হবে! মহামায়ার ইচ্ছায় এই জগত সংসারের লীলা চলছে, তিনি যেমন চালাচ্ছেন তেমনই চলছে_ এটাকেই “সত্য” বলে জেনো_ মায়ের ইচ্ছার বাইরে, অন্য রকম নিয়মে_ এই জগৎ চলবে কি করে! জিজ্ঞাসু:– সাধারণ মানুষ কি তাহলে কখনোই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে বেরোতে পারবে না? গুরু মহারাজ:– এই চক্র থেকে মানুষ বেরোতে পারবে না, তা নয়_মানুষ এখান থেকে বেরোতে চাইছে না! মহাপুরুষগণের হৃদয় তো এই জন্যই কাঁদে! জীব জগতের প্রতি এই স্নেহ বা করুণাই তো অবতরণের অন্যতম কারণ! এইজন্যেই তো ঈশ্বরের অবতারগণ বারবার দেহ ধারণ করেন, আর আজীবন চেষ্টা চালিয়ে যান যাতে মানুষের অজ্ঞানতা কাটে, যাতে মানুষ অন্তর্মুখী হয়, যাতে মানুষ অপূর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ণ হয়! বুঝলে গঙ্গাবাবু _ জীবজগতের দুঃখ, ছোট থেকেই আমাকে স্পর্শ কোরতো_সবসময় পীড়া দিতো! সেই সময় আমি একদিন পৃথিবীর কুলকুণ্ডলিনী খুঁজে পেলাম ,তখন ভাবলাম__ “দিই নাড়া”! তাহলে সমগ্র জীবজগতের জন্ম-মৃত্যুর cycle আগামী 100 বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণ হয়ে যেতো! জীবজগতের দুঃখে কাতর হয়ে স্বামী বিবেকানন্দ‌ও কয়েকবার এই চেষ্টা করেছিলেন _ কিন্তু মা জগদম্বা তাঁকে নিরস্ত করেছিলেন! আসল ব্যাপারটা কি জানো_ এই জগৎ সংসারে যা কিছু দেখছ,যা কিছু ঘটে চলেছে_ তা সবকিছুই ৺রী-মায়ের ইচ্ছাতেই হচ্!ছে জীবজগতের সমস্ত লীলা-খেলা তিনিই চালাচ্ছেন এবং সেখান থেকে তিনি-ই রস আস্বাদন করছেন! জীবজগতের খেলা বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর আস্বাদনে বন্ধ হয়ে যাবে যে! তাই তাঁর ইচ্ছাতেই চলছে__ একদিকে জন্ম_ অপর দিকে মৃত্যু, আর মধ্যেখানে একটুখানি জীবনকাল! তাই নিয়েই মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসা-কাঁদা ! জীব জগতের এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র ততদিন চলবে_ যতদিন না ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছায় খেলা বন্ধ হয়! তবে, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যেমনটা বলতেন, “খই ভাজার সময় দু-একটা খ‌ই খোলায়(কড়াই-এ) দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টপটপ্ করে ফুটে খোলার বাইরে চলে যায়”। ঠিক তেমনি এই জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকেও দু-একজন‌ই মাত্র বাইরে আসতে পারে_ উত্তপ্ত খোলার জ্বলন(সংসারের ত্রিতাপ জ্বালা) বেশিক্ষণ তাদের সইতে হয় না! বাকিরা অসহায় ভাবে তপ্ত খোলায় পড়ে থাকে _ যতক্ষণ না ‘ভাজুনী’ নেড়ে নেড়ে ফুটিয়ে-ফাটিয়ে ছেঁকে তাদেরকে বাইরে ফেলে, ততক্ষণ তারা উত্তপ্ত খোলার ভোগ জ্বলন ভোগ করতে বাধ্য হয়! সুতরাং দেখা যাচ্ছে, হয় বাহাদুর হতে হবে অন্যথায় মহাপুরুষের আগমন প্রতীক্ষায় ত্রিতাপ জ্বালা সহ্য করে বসে থাকতে হবে_ কবে তিনি কৃপা করে ওই উত্তপ্ত খোলার বাইরে এনে ফেলবেন।। জিজ্ঞাসু:–মহাপুরুষের সংস্পর্শ ছাড়া_ তাঁদের শিক্ষা বা মতবাদ দিয়েও তো জগৎ-কল্যাণ হয়, মানুষের আধ্যাত্মিক জাগরণ_এগুলি হয়? গুরু মহারাজ:– জগৎ-কল্যাণ বলতে তোমার ধারণটা কি_ কোন সেবামূলক কাজ বা ওই ধরনের কোনকাজকে বোঝ তো? এই ধরনের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ তো বর্তমানে, সমাজে বহু organisation করে চলেছে! কিন্তু এর দ্বারা মানবের প্রকৃত কল্যাণ হয় কি? হয় না! মানবের চেতনার উত্তরণ এবং বিবেকের জাগরণ কিসে হয় সেটা আগে জানতে হবে_যা মানুষকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে! পূর্ণতা লাভ-ই মানবজীবনের উদ্দেশ্য, সুতরাং তোমার জীবনে পূর্ণতালাভের জন্য যিনি তোমাকে সাহায্য করছেন_ তিনিই তোমার যথার্থ কল্যাণকামী! এখানে মনে রাখতে হবে, প্রথাগত কোন শিক্ষা বা আদর্শ দিয়ে কিন্তু কোন মানুষের পূর্ণতা আসেনা! একমাত্র জীবনে জীবন যোগ করেই তা সম্ভব হয়! একটি জ্বলন্ত প্রদীপ-ই পারে আরেকটি প্রদীপকে জ্বালাতে! কিন্তু যদি দুটি প্রদীপের মধ্যে সংস্পর্শ না ঘটে_ তাহলে তেল-সলতে থাকা সত্ত্বেও নেভা প্রদীপ জ্বলবে কি? জ্বলবে না!তাই জানবে, করুনাময়ের করুণায়, সাধারণ নগণ্য জীবেরও দ্রুত উত্তরণ ঘটে_ মহাপুরুষের সংস্পর্শে এলে! জীব স্বরূপতঃ ব্রহ্ম_ ফলে প্রদীপ তো সে বটেই(অর্থাৎ পূর্ণতা লাভের সমস্ত সম্ভাবনা তার মধ্যে বিদ্যমান) কিন্তু অজ্ঞান-অন্ধকারের আবরণ তাকে ঢেকে রেখেছে, তাই ব্রহ্মবিদের সংস্পর্শ ছাড়া এইজন্যেই ওই অবস্থা থেকে স্বরূপের প্রকাশ ঘটে না, অর্থাৎ ওই ব্যক্তির অজ্ঞান-অন্ধকার কাটে না! এবার কথা হচ্ছে তাদের ঐ মহাপুরুষের সাথে সরাসরি সংস্পর্শ হোল না_তাহলে তাদের কি উত্তরণ ঘটবে না?_ নিশ্চয়ই ঘটবে! মহাপুরুষের লোকান্তরিত হবার পর তাঁর মতবাদ থেকে যায়, তাঁর শিক্ষা থেকে যায়, তাঁর উত্তরসূরিরা থেকে যায়_ সেই সবের মাধ্যমে_ পরবর্তী কালের মানুষেরা প্রেরণা লাভ কোরে চেতনার উত্তরণ ঘটাতে পারে! এইভাবে আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করা কোন ব্যক্তির যখন সংসার আলুনি বোধ হতে থাকে_ তখনই মা জগদম্বার ইচ্ছায় ওই ব্যক্তি কোন সদ্গুরুর সন্ধান পেয়ে যায়! এই ভাবেই তাদের জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি ঘটে! সুতরাং দেখা যাচ্ছে_মানবজীবনে সৎসঙ্গ, সদগ্রন্থ বা মহামানবদের জীবনী পাঠ_ ইত্যাদির ভূমিকা অপরিসীম,যা মানুষকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে অনেকটাই এগিয়ে দেয়, কিন্তু কোন না কোন মহাপুরুষের সংস্পর্শ ছাড়া প্রকৃত “মুক্তি” ঘটে না! আরেকটা কথা হচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে একজন মানুষ_ এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় কতটুকু? বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্তর্গত কত সৌরমন্ডল, কত নক্ষত্র_ তার মধ্যে পৃথিবী গ্রহ যেন একটি অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু! সেই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দু-পৃথিবীর অন্তর্গত আবার মহাদেশ, দেশ, প্রদেশ ! একটা প্রদেশের আবার কত বিভাগ_ সেইসব ভাগ করতে করতে একটা অঞ্চল, একটা গ্রাম_ সেই গ্রামের মধ্যে কত বাড়ি, কত ঘর, কত পরিবার! ঐরকম একটি পরিবারের একজন সদস্য হচ্ছে_ একজন ব্যক্তি! তাহলে বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে তুলনামূলক বিচারে_ একটা মানুষ কত -কত বেশি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র! তাহলে এরূপ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানুষ কখনো কি এমন কোনো মতবাদকে গ্রহণ করতে পারে_ যা দ্বারা এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চরাচরকে এবং তার প্রকাশক-কে জানা যায়? এইজন্যেই অর্থাৎ তার মন এবং বুদ্ধির সীমাবদ্ধতার জন্য‌ই_ সাধারণত মানুষ ক্ষুদ্র সংকীর্ণ চিন্তা-সম্বলিত মতবাদ বা আংশিক মতবাদ অর্থাৎ বিভিন্ন দার্শনিক বা সামাজিক মতবাদগুলি গ্রহণ করে থাকে। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বা সমাজে এই ভাবেই বিভিন্ন মতবাদ স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জানবে, সেগুলি যেন সমুদ্রের বুকে ওঠা ছোট ছোট তরঙ্গ বিশেষ! যেগুলি উঠে কিছুদূর গিয়েই আবার সমুদ্রে মিশে যায়! উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সত্তর আশি বছর ধরে মার্কস-দর্শন রাশিয়া সহ আরো অনেক দেশে খুব চলল! কিন্তু গ্লাসনস্তের সূচনাতেই(গুরু মহারাজ যে সময় কথাগুলি বলছিলেন,ঠিক সেই সময়েই সোভিয়েত রাশিয়ায় গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রৈকা লাগু হয়েছিল) দ্যাখো_ সোভিয়েতের বেশ কয়েকটা প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হতে চাইছে, বিভিন্ন বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার জন্য দাবিও জানাচ্ছে অর্থাৎ রাশিয়ায় আর এই মত গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না ! তাহলে দেখা যাচ্ছে না কি যে,_ কোন মতবাদ বা “বাদ” কখনই স্থায়ী নয়_ এগুলি পরিবর্তনশীল! কোন সমাজ হয়তো কোন ‘বাদ’_কে গ্রহণ করে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে_কিছুদিনের মধ্যেই দেখা যাবে_ তার চাইতে ‌ও উন্নত কোন ‘বাদ’ এসে আগেরটাকে বাদ দিয়ে নিজেই শিকড় গেড়ে বসে পরে। কিছুকাল পরেসেটা‌ও আবার পুরোনো হয়ে যায়!এই ভাবেই সমাজজীবন ধীরগতিতে এগিয়ে চলছে! ‘বাদ’_ দিয়েই যদি সমাজের প্রকৃত কল্যানের কাজটি সম্পন্ন হতো_ তাহলে মহাপুরুষগণের বারবার আসার প্রয়োজনটাই বা কি ছিল? তাই যে কথাগুলি বলছি, মন দিয়ে শোন এবং বোঝার চেষ্টা করো_ কোনরকম-ism বা ‘বাদ’ দিয়ে কখনোই জীবনে পূর্ণতা লাভ হয় না! পূর্ণতা লাভের জন্য চাই ব্রহ্মজ্ঞানী মহাপুরুষের সংসর্গ ! তবে এটাও মনে রাখবে যে, বিভিন্ন সামাজিক দর্শন বা দার্শনিক মতবাদ গুলিও সেই একই তত্ত্ব থেকেই উৎসারিত কিন্তু আংশিক! মহাসাগরের বুকে এগুলি যেন এক একটা ছোট ঢেউ, সেখানে মহাপুরুষগণের প্রবর্তিত মতবাদ গুলি যেন এক একটা বিশাল তরঙ্গ! বর্তমানে দেখা যাচ্ছে_ পৃথিবীতে এরূপ তিনটি সব চাইতে বড় আধ্যাত্মিক তরঙ্গ ক্রিয়াশীল, যাদের কেন্দ্রে রয়েছেন ভগবান বুদ্ধ, যীশু ও স্বামী বিবেকানন্দ! জিজ্ঞাসু:—আগের দিন আপনি self-hypnosis নিয়ে আলোচনা করছিলেন! আমি একজন সন্ন্যাসীকে জানি_ যিনি হিমালয়ের বিভিন্ন মঠ-মিশন ঘুরেও কোন প্রকৃত সাধু দেখতে পাননি! তাই এখন তিনি ওই rationalist-দের সঙ্গে একমত যে,_ ভূত_ভগবান এসব কিছুই নাই? গুরু মহারাজ:–তাই নাকি? তবে জানবি_ তিনি যদি প্রকৃতই সন্ন্যাসী হন, তাহলে আবার তিনি মূল স্রোতে ফিরে আসবেন। কারণ rationalist-দের চিন্তাধারা একজন ঈশ্বরপরায়ণ মানুষের মনকে_ সাতদিন থেকে এক বছর পর্যন্ত নাড়া দিতে পারে_ তারপর কোন আধ্যাত্মিক মানুষের মনে ঐসব দূর্বল যুক্তি আর টেকে না! হিমালয়ের মঠ-মিশনে ঘুরেও উন্নত মহাপুরুষের দেখা পায়নি বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন উনি_ মহাপুরুষরা কি সেখানে নিজেদেরকে “দ্যাখো_ দ্যাখো” করছে নাকি যে, যে-কেউ গেলেই তাঁদেরকে দেখতে পাবে ? অতটা সহজ নয়! চোখের সামনে দিয়ে “ভগবান” নেচে-গেয়ে চলে গেলেও মানুষ দেখতে পাবে না_ যদি দেখার চোখ না থাকে, চিনতে পারবে না_ যদি চেনার ক্ষমতা না থাকে! আর এই দেখা বা চেনার ক্ষমতা লাভ হয়_ ঈশ্বরের‌ই কৃপায়! সুতরাং তোমার ঐ সন্ন্যাসীটি কি ঈশ্বরের কৃপালাভের জন্য যথেষ্ট সচেষ্ট ?_ সেইটা দেখতে হবে! তিনি যা চেয়েছেন তাই পেয়েছেন_ “যাদৃশী যস্য ভাবনা সিদ্ধির্ভবতি তাদৃশী”! যাইহোক, ছাড় ওসব কথা! self-hypnosis_ ব্যাপারটা কি জানিস, মনের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ‌ই হোল self-hypnosis! যেমন ধর্_ তুই মনে মনে যেটা ভাবছিস _ সেটাই বর্তমানে একদম three dimension-এ প্রকট হয়ে যাচ্ছে! আমি নিজে এসব পরীক্ষা করে দেখেছি_ ক্যাম্পে থাকার সময়(গুরু মহারাজের চাকুরী করাকালীন সময়ে,অর্থাৎ 1976/77সাল) আমার সাথে যারা থাকতো তারাও অনেকে দেখেছে বিভিন্ন মূর্তি three dimension-এ প্রকট হয়ে যেত! কালী, কৃষ্ণ,শিব সব-ই! এরকম করতে করতে একদিন আমার গুরুদেব রামানন্দ অবধূতজী প্রকট হোলেন।উনি আমাকে এই বিজ্ঞানটা বোঝালেন_ তারপর থেকে আমারওই সব পরীক্ষা করা বন্ধ হয়ে গেলো! মনের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ‌ই হোল self-hypnosis! স্বামী তুরীয়ানন্দ ছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের একজন সন্ন্যাসী শিষ্য! একবার তুরীয়ানন্দের পিঠে কার্বাংকল ফোঁড়া হয়েছিল, ডাক্তার এসে ফোঁড়াটাকে কেটে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিল কিন্তু সেদিন তুরীয়ানন্দ ডাক্তারের কাছে কোন ব্যথার অনুভূতি প্রকাশ করেননি । পরে একদিন ঐ ডাক্তার আচমকা যেই ফোঁড়ার ব্যান্ডেজ খোলার জন্য হাত দিয়েছে, অমনি তুরীয়ানন্দ_”উঃ-উঃ” বলে যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে উঠলেন! এই কান্ড দেখে ডাক্তার তো অবাক! সে জিজ্ঞাসা করল,” মহারাজ! সেদিন কত কাটাকুটি করলাম তাতে আপনি যন্ত্রণা পাননি, আর আজ শুধু হাত দিয়েছি_ তাতেই এত যন্ত্রণা পেলেন?” স্বামী তুরীয়ানন্দ বললেন, “সেদিন আমি তোমার হাতে ছুড়ি-কাঁচি দেখেই শরীর থেকে মনটা তুলে নিয়েছিলাম, তাই যন্ত্রণার বোধ ছিল না! কিন্তু আজ আমি প্রস্তুত ছিলাম না বলেই যন্ত্রনা-বোধ হোল। যাক্ এখন আমি মন তুলে নিচ্ছি_এবার তুমি যা ইচ্ছে তাই করো!” এইসব ঘটনা একেবারে সত্য ঘটনা_ঘটনার রেকর্ড রয়েছে , যেহেতু বহু লোকের সামনে ঘটেছিল! কিন্তু যে সমস্ত মানুষের মধ্যে এখনো সত্যের ধারণা হয়নি_ তারা এই ধরনের ঘটনাগুলির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্টোপাল্টা করে বসে। এই প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ে গেল, সেটা বলছি শোনো_ এক গরীব বিধবার ছেলে রোজ খুদ(কম দামের ভাঙা চাল)ঘাঁটা খেয়ে বড় হয়েছিল! গোবর কুড়িয়ে ঘুঁটে বিক্রি করে_ অন্নের জোগাড় করতে গিয়ে ঐ মা-টি তার ছেলেকে এর চেয়ে বেশি ভালো খাদ্য জোগাড় করে দিতে পারে নি! ছেলেটি বড় হয়ে খুব রূপবান এবং শিক্ষিত হয়েছিল। তারপর কপালগুণে কোন ধনীলোকের ঘরে একটি মেয়ের সাথে তার বিয়ে হয়ে গেল! বিয়ের পর প্রথমদিন জামাই শ্বশুর বাড়ি গেছে, রাত্রে শাশুড়ি-মা নানারকম রান্না করে জামাইকে খেতেও দিয়েছে! ঘুঁটে-কুড়োনীর ছেলে_ কখনও তো এতসব খায়নি, ফলে সমস্ত রান্নাই সে খুব পরিতৃপ্তি সহকারে খাচ্ছিল।তার খাওয়া প্রায় শেষের দিকে_ এমন সময় শাশুড়ি-মা তাকে পরমান্ন পরিবেশনের জন্য এলো! সাদা রঙের পরমান্ন দেখে জামাই ভাবল ওটা বোধহয় খুদঘাঁটা_ তাই সে বলে উঠল,_ “না- না- না ওটা দেবেন না! ও আমার মা রোজ রাঁধে!” শাশুড়ি মাতা একথা শুনে ভাবল _ ‘জামাই বুঝি রোজ পরমান্ন খায়! তাহলে জামাই গরীব হলেও বড় ঘরের ছেলে!’ এদিকে কান্ড ঘটল কি__ শাশুড়ি-মা, পরমান্নের হাঁড়ি থেকে এক হাতা পরমান্ন তুলে ছেলেটির পাতের কাছে নিয়ে চলে গিয়েছিল! কিন্তু নতুন জামাই _” না-না-না”করে ওঠায়, তাড়াতাড়িতে হাতা সরিয়ে নেওয়ার সময় দু’চার ফোঁটা পরমান্ন পড়ে গিয়েছিল জামাইয়ের পাতে! জামাই সেটি মুখে দিয়ে দেখল _ আরে! এত খুদঘাঁটা নয়, দারুন খেতে! যেমন স্বাদ_তেমনি সুগন্ধ !এই জিনিস ফেরত দিয়ে তো খুব ভুল হয়েছে! যাইহোক _ রাত্রে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে তখন রান্নাঘরে ঢুকে লুকিয়ে লুকিয়ে খাওয়া যাবে’ _ এই ভেবে সে খাওয়া সাঙ্গ করে উঠে পরলো! গভীর রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়লো _ জামাই তখন আস্তে আস্তে উঠে রান্নাঘর খুলে অন্ধকারে _পরমান্ন খাবার জন্য এ-পাত্র ও-পাত্র হাতড়ে বেড়াতে লাগল। এই কম্মো করতে গিয়ে তার হাতে, মুখে, জামাকাপড়ে কালি লেগে সে তো একেবারে ভূত সেজে গেছে _ কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই,সে শূধুই পরমান্ন খুঁজে চলেছে! হঠাৎ তার হাতে লেগে “ঢং” করে একটা হাঁড়ি গড়িয়ে পড়ে যেতেই বাড়ির কর্তার ঘুম হয়ে গেল! সে বেরিয়ে এসে দেখে রান্নাঘর খোলা _ তাহলে নিশ্চয়ই চোর ঢুকেছে! অমনি কর্তামশাই “চোর”- “চোর” বলে চেঁচাতে শুরু করে দিল। বাড়ির অন্য পুরুষেরা, চাকর-বাকর সবাই বেরিয়ে এসে, কালিঝুলি মাখা চোর কে বেদম প্রহার দিতে থাকল! চেঁচামেচি শুনে ঘুম নব-বিবাহিত বধূটির ঘুম ভেঙে গেল, সে দেখল তার পাশে স্বামী নেই! তাই সে দৌড়ে গিয়ে স্বামী খুঁজতে গিয়ে দেখে _ অন্ধকারে চিনতে না পেরে সবাই নতুন জামাইকে চোর সন্দেহে মারছে! বউটি অতি কষ্টে সবাইকে বুঝিয়ে আলোয় নিয়ে গিয়ে _ তবে তার স্বামীকে উদ্ধার করে নিজের ঘরে নিয়ে এলো! জামাই উদ্ধার হোল ঠিকই_ কিন্তু সবার মনে তখন একটাই জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খাচ্ছিল_ ‘জামাই রান্নাঘরে কালি ঝুলি মেখে করছিল টা কি’? ব‌উ-এর কাছে গিয়ে জামাই স্বীকার করতে বাধ্য হলো যে, সে চুরি করে রান্নাঘরে ঢুকে ছিল পরমান্নের স্বাদ পাওয়ার জন্য! তাই বাবা! বিধবার ছেলের খুদঘাঁটা খাওয়ার মত মেকিজ্ঞান আর পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে পরমান্ন অর্থাৎ পরাবিদ্যার স্বাদ কি কখনো পাওয়া যায়? কখনোই পাওয়া যাবে না! তাই তোমরা _ এখনও যারা পরমান্নকে অর্থাৎ পরমতত্ত্বকে “খুদঘাঁটা” ভাবছো_ যখন তার আসল taste পাবে, তখন তোমরাই ঐ ঘুঁটেকুড়ানির ছেলের মতো লজ্জা-মান ত্যাগ করেও তার taste পেতে চাইবে! মানুষ আত্ম-সমালোচনা না করে অকারণে মহাপুরুষদের সমালোচনা করতে যায়,নিজে না শিখে-না বুঝে অপরকে শেখাতে বা বোঝাতে চায়_আর এইসব কিছু করতে গিয়ে তার সবটাই ফাঁকি হয়ে যায়! তাই আমি তোমাদেরকে বলছি_যদি কিছু জানতে বা শিখতে হয়_তাহলে তাঁর কাছেই শেখো _যাঁর ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়েছে,_যাঁর পূর্ণত্বের বোধ হয়েছে! এই পূর্ণজ্ঞানী মানবেরা নিজের জীবনে আচরণ করে যা দেখিয়ে যান, সেই শিক্ষাই হোল যথার্থ শিক্ষা।।