স্থান ~ শিবপুর গঙ্গাবাবুর বাড়ী । সময় ~ ১৯৮৪ উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ গঙ্গাবাবু, রত্না, পূর্ণানন্দ মহারাজ, সব্যসাচী মান্না, চ্যাটার্জীবাবু, এনাঙ্কবাবু ইত্যাদি ৷
জিজ্ঞাসু :– এত নাম থাকতে আপনার নাম স্বামী পরমানন্দ কেন বাবা? আর আপনার মুখের ওই মধুর প্রশান্তিমাখা হাসিটি আপনি কোথা থেকে পেলেন?
গুরুমহারাজ > ‘স্বামী পরমানন্দ’ নামটি আমার গুরুদেব রামানন্দ অবধূতের দেওয়া। আমাকে যখন তিনি দীক্ষা দেন তখন তাঁর বয়স প্রায় ১৫৭/১৫৮। ঐ বয়সের মধ্যে তিনি সারাজীবনে আমাকেই মাত্র দীক্ষা দেন। যাহোক এসব কথা — হাসিটির একটি ইতিহাস আছে সেটাই বলছি শুনুন।
ছোটবেলায় একবার ঘুরতে ঘুরতে বৃন্দাবনে গিয়ে পৌঁছেছি। ওখানে বাঁকেবিহারীর মন্দিরে ঝুলন,রাস,জন্মাষ্টমী ইত্যাদি উপলক্ষে খুব ধুমধাম হয়। কোন অনুষ্ঠান ছাড়াও এমনিতেই ওখানে প্রতিদিন প্রচুর লোকের সমাগম হয়! ওখানকার একটা সিস্টেম রয়েছে_ মূলমন্দিরে বিগ্রহের সামনে বড় পর্দা টানা থাকে এবং বিশাল নাটমন্দিরে অনেক লোক জুটলে হটাৎ করে পর্দা সরিয়ে বিগ্রহের "ঝলক দর্শন" বা "ঝাঁকি দর্শন করানো হয়। তাছাড়া দেখেছিলাম_ভক্তরা প্রায় সকলেই মাথায় ছোট ছোট ঝাঁঝুরির মতো 'ঝাঁকা'য় করে পূজার সামগ্রী (ফুল,ফল এবং অন্য উপাচার) নিয়ে যায়, এ থেকেও "ঝাঁকি" নামটা এসে থাকতে পারে। আবার ভিতরে যে রাধাকৃষ্ণের মূর্তি আছে তা যেহেতু উপস্থিত ভক্তদেরকে "এক ঝলক"-ই মাত্র দর্শন করানো হয় এবং পরক্ষনেই পর্দা আবার টেনে দেওয়া হয় বলেই নামকরণের এরূপ কারণ হতে পারে । যাইহোক, নাট মন্দিরের ভিতরটা ঘেরা আর প্রচণ্ড ভিড়, আমার তখন ছোট বয়স _ফলে ভিড়ের চাপে পিষ্ট হওয়ার ভয়ে আমি পাশে-পাশেই ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ হুড়মুড় করে একটা বিশাল চেহারার লোক আমার উপরে এসে পড়ল। আমি পড়ে গেলাম তার ধাক্কায় _ব্যাথাও লাগল খুব! ব্যথার চোটে আমি বললাম “অন্ধ্যা হ্যায় কিয়া, দেখ্ নেহি সাক্তা?” সে বলল ‘হ্যাঁ, ম্যায় অন্ধ্যা হুঁ’। আমি ঝেড়ে-ঝুড়ে উঠে দেখি সত্যিই সেই লোকটি অন্ধ — একটু লজ্জিত হলাম। কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, "আপ্ অন্ধা হ্যায় তো ইঁহা কিঁউ আয়া? ইঁহা তো লোগ্ দেখনেকে লিয়ে আয়া হ্যায়, আপতো কুছ দেখ নেহি পাওগে"। সে উত্তর দিল "হ্যম্ দেখনেকে লিয়ে নেহি, দিখানেকে লিয়ে আয়া হ্যায়"!
কথাটা এমনভাবে সে বলল, আমার মর্মস্থল স্পর্শ করল সেই কথা! আমার অন্তর্জগতে বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো — “দেখনে কে লিয়ে নেহি, দিখানেকে লিয়ে আয়া হুঁ”! তারপর এমন হোল যে, সেই ভিড় হট্টগোল কিছুই আর শুনতে পাচ্ছিলাম না, শুধু ওই একটা কথাই আমার কানে বাজছিল। কোনক্রমে ভিড় কাটিয়ে বাইরে এলাম কিন্তু ওই কথা-কয়টির হাত থেকে রেহাই পাচ্ছিলাম না। এদিকে দেখি শরীরেও প্রচন্ড উত্তাপ আর জ্বালা শুরু হয়ে গেছে অথচ ভিতর থেকে শুধু ওই কথাটাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে বারবার” দেখনে কে লিয়ে নেহি, দিখানেকে লিয়ে আয়া হুঁ”! ছুটে গিয়ে যমুনার জলে ঝাঁপ দিলাম। শরীর শীতল হল বটে কিন্তু ভিতরের আনচানানি আর কাটেনা। জল থেকে উঠলেই শুরু হচ্ছিল শরীরের জ্বালা! কিন্তু জলেই বা কতক্ষণ থাকা যায় — পাড়ে উঠে ভিজে বালি গায়ে চাপিয়ে চাপিয়ে সময় কাটাতে লাগলাম। কিন্তু গায়ে এত উত্তাপ যে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিজে বালি শুকিয়ে যাচ্ছিল। বহু মানুষ আমাকে ওই অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে সহানুভূতি প্রদর্শন করতে আসছিল। কিন্তু নিজের অসহনীয় কষ্টে তাদের সহানুভূতিও বিরক্তিকর লাগছিল। আমি তাদের দিকে এমন বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিলাম যে,_ কেউই বেশিক্ষণ আমার কাছে দাঁড়াচ্ছিল না।
সেই সময় আমার দিন-রাত্রির হিসাব ছিল না, কিন্তু পরে বুঝেছিলাম প্রায় তিনদিন তিনরাত্রি আমার ওই অবস্থা চলেছিল। তারপর তৃতীয় রাত্রির ভোরে যখন যমুনার তীরে ভিজে বালি গায়ে চাপিয়ে অসহ্য জ্বালা ভোগ করছি, তখন এক অপূর্ব মূর্তি আমার সামনে প্রকট হল ! আর তার মুখে ছিল অপার্থিব মধুর হাসি। আমার দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে সে হাসতেই লাগলো বহুক্ষণ ধরে! এমন অপূর্ব মূর্তি কোন নারীর না কোন পুরুষের তা বুঝতে পারছিলাম না, কারণ কোন নারীও অত সুন্দর হয় না — কোন পুরুষ-ও নয়! কিন্তুসে যে-ই হোক_ তার হাসি আমার শরীরের জ্বালা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। আমি বিরক্ত সহকারেই তাকে বললাম "অত হাসছো কেন, অত হাসি তুমি পাও কোথা থেকে"? সে আমার কথার কোন উত্তর দিল না শুধু হাসতেই থাকলো! আমার রাগ হচ্ছিল,বিরক্ত লাগছিল_ আমি ভাবছিলাম ওর দিকে তাকাবো না _কিন্তু নিজের অজান্তেই সেই সুন্দর মূর্তির সুন্দর হাসির আকর্ষণ বোধ করতে লাগলাম! এই ভাবে তার দিকে তাকাতে তাকাতে আমি বুঝতে পারলাম আমার শরীরের জ্বালা কমতে শুরু করেছে, তারপর কমতে কমতে আমার শরীরের সমস্ত উত্তাপ শীতল হোল, শরীরের সমস্ত জ্বালাও শান্ত হোল _আর হাস্যময়(-ময়ী) সেই মূর্তিটি ধীরে ধীরে আমার শরীরে মিশে যেতে লাগল। তারপর থেকেই দেখলাম_আমার মধ্যে তার হাসিটি এসে গেল! এই যে হাসছি — সেই হাসিই এই হাসি!
বি: দ্র: [ন’ কাকার কাছে শোনা গেল — উনি যখন গুরুমহারাজের সাথে উত্তরকাশীতে গিয়েছিলেন তখন রামানন্দ অবধূতজীকে উনি জিজ্ঞাসা করেন গুরুজীর ‘পরমানন্দ’ নামকরণের কারণ সম্পর্কে। উত্তরে রামানন্দজী বলেছিলেন — যুবক রবীন কে দেখেই তাঁর পরম-প্রীতি লাভ হয়েছিল__ তাই “পরমানন্দ” নাম! ওর নাম শ্রবণে, মননে বা উচ্চারণে মানুষের পরম প্রীতিলাভ হয়, তাই ওই নাম দেওয়া হয়েছে— ‘স্বামী পরমানন্দ’।
জিজ্ঞাসু:– আপনি নিজেকে কোন সম্প্রদায়ভুক্ত বলে মনে করেন?
গুরুমহারাজ :– আমি কোন সম্প্রদায়ভুক্ত নই। আমি কোন সম্প্রদায়ের গোলামীও করতে চাইনা। — কোন নতুন সম্প্রদায় সৃষ্টিও করতে চাইনা। আমাকে আপনি Mystic বলতে পারেন। দেখুন পৃথিবীতে কত সম্প্রদায় আর এক এক সম্প্রদায়ের এক এক রকম দর্শন—এক এক রকম আচার-অনুষ্ঠান! এক সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায় থেকে নিজেকে কতখানি পৃথক রাখবে, যেন তারই প্রতিযোগিতা চলছে। এইভাবে মানবগোষ্ঠী জাতিগত, বর্ণগত, ধর্মগতভাবে নানান সম্প্রদায়েই বিভক্ত হয়ে চলেছে। বর্তমানে আবার অর্থগত, স্ট্যাটাসগত ভাবেও বিভাগ হয়েছে। এরকম চলতে থাকলে তো মানুষের সমাজজীবনের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। একই ছাদের তলায় বাস করে অথচ পরস্পর পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ — একি সভ্যতা! একি সমাজ! সহযোগিতা, সহমর্মিতা না গড়ে তুলতে পারলে এই সমাজব্যবস্থা তো অতি সত্বর ভেঙ্গে পড়বে! আজকে একটাও যৌথ পরিবার_ টিকে থাকছে না, যারা টেকাতে চাইছে পারিপার্শ্বিকতার চাপে তারাও টিকতে পারছেনা। — ভাবুন তো এর পরিণাম কি? ছোট ছোট স্বার্থকেন্দ্রিক পরিবারের শিশুরাও স্বার্থপর হয়ে উঠছে, তাদের সুকুমার শিশুমনে পিতা-মাতার স্বার্থ-কেন্দ্রিকতার প্রভাব কি ভয়ানকভাবে পড়ছে! ঐ শিশুরা বড় হয়ে সমাজের কি মঙ্গলসাধন করবে?
তাই আমি তোমাদেরৎসকলকে শিক্ষা দিই — ঈর্ষাবর্জিত হও, দ্বেষমুক্ত হও, সৎ-সরল-নিষ্কপট হও। বৈচিত্র্য প্রকৃতির ধর্ম, সুতরাং বৈচিত্র্য থাকবেই কিন্তু তার মধ্যে ঐকতান রয়েছে, সেটাকে খুঁজে বের করো। 'ঈশ্বরই সব হয়েছেন' — ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ধ্যানের গভীরে — জ্ঞানের গভীরে ঢুকে এই রহস্য জানলেন ! তারপর উনি সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন — "ঘটিটাও ঈশ্বর, বাটিটাও ঈশ্বর।" এইভাবে শুধু মানুষ নয়, যে কোন জীব-জন্তুও ঈশ্বরেরই প্রকাশ। কাকে ছোট ভাববে, কাকে হেয় করবে? ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলি হীনমন্যতায় ভুগছে — তাই সৃষ্টি হচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদ! ধর্মীয় গোঁড়ামি পৃথিবীকে অশান্তিময় করে তুলছে, অথচ ধর্ম মানুষের জীবনে শান্তি ও আনন্দ এনে দেবার কথা বলে! এরকমই একটা বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলছে বর্তমান পৃথিবী। যুগের প্রভাব বা কালের প্রভাব — এটা মানতে হয়। তবে বেশিদিন এরকম চলবেনা। ধর্মজগতে এই যে বিশৃঙ্খলা বা disharmony, একেই ধর্মের গ্লানি বলা হয়েছে। যখন যখন এমন হয় তখনই ভগবান অবতীর্ণ হন, ধরার বুকে অধরা ধরা দেন। আর তিনিই ধর্মকে সংস্থাপিত করে যান অর্থাৎ disharmonized অবস্থার harmony এনে দেন।
আগামী ভারতবর্ষ তথা পৃথিবী এর সুফল লাভ করবে, ধর্মের গ্লানিসমূহ কেটে গিয়ে সংস্থাপিত ধর্মের সুফল লাভ করবে মানুষ। কিন্তু তারজন্য মানুষকে কিছু মূল্যও দিতে হবে কারণ ধ্বংসের মধ্যেই তো লুকিয়ে থাকে সৃষ্টির বীজ।
জিজ্ঞাসু:– আপনি কোনো সম্প্রদায়ভুক্ত নন, কিন্তু আপনি যে সংঘ প্রতিষ্ঠা করেছেন সেটাকেও তো একটা সম্প্রদায়-ই বলা যায়?
গুরুমহারাজ:– দেখুন, পরমানন্দ মিশন কোন সম্প্রদায় হতে যাবে কেন? এখানে মানুষ মানুষের জন্য ‘বহুজনহিতায় — বহুজন সুখায়’ অর্থাৎ পরের হিতে আপনার জীবনকে উৎসর্গ করবে — এই কথা মহাজনগণও বলেন। সুতরাং সম্প্রদায় নয় পরম্পরা বলতে পারেন। আমি সম্প্রদায় মানিনা, কিন্তু পরম্পরাকে সম্মান করি, কারণ আমি এটা জানি যে, ঈশ্বরের শক্তিই গুরুশক্তি রূপে ক্রিয়া করে আর এই শক্তি গুরু-পরম্পরায় বাহিত হয় লোককল্যাণের জন্য বা সমাজকল্যাণের জন্য। পরমানন্দ মিশন সাধুদের দ্বারা পরিচালিত। চলতি বাংলায় কথা আছে “পুড়বে সাধু উড়বে ছাই, তবে সাধুর গুণ গাই”। সাধু-সন্ন্যাসী হবে ধূপের মতো — নিঃশেষে পুড়ে পুড়ে নিজেকে ছাই করে ফেলবে শুধু অপরের হিতার্থে। বলুন তো এমন হলে কি কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকতেই হবে! সাধু-পরম্পরাকে রক্ষা করার জন্যই তো সাধুর জীবন। যে চারটি কথাকে পরমানন্দ মিশনের সিমবল-এ রাখা হয়েছে — সত্য, ত্যাগ, প্রেম ও শান্তি — এই কথাগুলির সার্থক প্রয়োগ হবে সাধুর জীবনে। সত্যের আচরণ হবে সদাচারে, অর্থাৎ সাধু সদাচারী হবেন। ত্যাগের আচরণ হবে পরোপকারে অর্থাৎ সাধু নিঃস্বার্থ পরোপকারী হবেন। প্রেমের আচরণ হবে ভালোবাসায় অর্থাৎ সাধু বর্ণ, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে জীব সকলকে প্রত্যাশাবিহীনভাবে ভালবাসবে। শান্তির আচারণ সংযমে। সাধু, বাক্যে, কর্মে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে সংযমী হবেন।
তাহলে এবার বুঝুন এই যে সাধুর জীবন, এই জীবন নিয়ে সাধু যদি আরবেও থাকেন তিনি জগতের হিতে কাজ করে যাবেন এবং সেখানকার মানুষও তাঁকে গ্রহণ করবে। যদি তিনি পৃথিবীর উত্তরপ্রান্তে অথবা পৃথিবীর দক্ষিণ-প্রান্তেও অবস্থান করেন তাহলেও কি সেখানকার মানুষ তাঁর দ্বারা উপকৃত হবেনা, না তাঁকে তারা গ্রহণ করবে না! সুতরাং সাধুর জীবনই তার পরিচয় — এর জন্য কোন সম্প্রদায়ের স্ট্যাম্প লাগানোর তো প্রয়োজন নেই! আমি আমার সন্তানদের ঐরূপ আদর্শ সাধু হবার শিক্ষা দিই। তারা তা হতে পারলে সমাজের যেখানেই থাকুক, মানবকল্যাণ-সাধন করতে পারবে, যা সাধুজীবনের উদ্দেশ্য — “আত্মানোমোক্ষার্থং জগৎ-হিতায় চ্”।
