সময় ~ ১৯৮৬-৮৭ ৷ স্থান ~ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ আশ্রমস্থ বিভিন্ন মহারাজগণ ও উপস্থিত ভক্তবৃন্দ ।

জিজ্ঞাসু :— একটু আগে আপনি আলোর গতিবেগের গমনাগমনের কথা বলছিলেন এগুলো কি অলৌকিক নয় ? আর পৃথিবীতে আলোর গতিই কি সর্বাপেক্ষা বেশি ?

গুরু মহারাজ :– দ্যাখো, কথা আছে না “শেষ নাই যার শেষ কথা কে বলবে !” এতক্ষণ কি বুঝলে – জগতটাই তো আপেক্ষিক, ফলে সবই আপেক্ষিক, মনে কি হচ্ছে, এটা অপেক্ষা ওটা বেশি বা কম – তাই না ! একমাত্র শাশ্বত, সনাতন, নিত্য কি – এরই তো অন্বেষণ ৷ আর এই অন্বেষণের জন্যই গবেষণা ।

যাইহোক বিজ্ঞানের ছাত্র যারা তারা জানে যে শক্তি তরঙ্গের আকারে বিস্তারিত হয়, তাই বলা হয় শব্দতরঙ্গ, আলোকতরঙ্গ ইত্যাদি । এবার যে তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত কম, তার গতি তত বেশি ৷ শুধু যদি আলোই নেওয়া যায় তাহলে দেখা যাবে সাতটি ভিন্ন ভিন্ন রঙের আলোর গতিবেগ ভিন্ন ভিন্ন ৷ তাছাড়া এই যে প্রাকৃতিক শক্তিগুলির কথা বলা হচ্ছে – এদের অনেক সীমাবদ্ধতাও আছে ৷ যেমন ধর, আলোর সামনে কোন অস্বচ্ছ মাধ্যম রাখলে সাদা আলোর রশ্মি যেতেই পারে না, কিন্তু X-রশ্মি সেটা ভেদ করে চলে যাচ্ছে, Laser রশ্মি হয়তো আরও ঘন বা অস্বচ্ছ বাধাকে গ্রাহ্য করছে না ।

ব্যাপারটা বুঝতে পারলে, এইভাবে Step by Step বিজ্ঞানও এগিয়ে চলেছে ৷ কিন্তু আর্য ঋষিরা এসব বিজ্ঞান অনেক আগেই জেনে ফেলেছিলেন । তাঁরা দেখলেন যে, মনের গতি বা চিন্তাশক্তির গতি এইসব স্থূল গতির থেকেও তীব্র ৷ এই গতিকে কোন বাধাই আটকাতে পারছে না এবং এটা এত দ্রুত যে সময়ের উল্লেখের যেন কোন অবকাশই নেই ৷ তুমি চিন্তা শক্তির দ্বারা এখানে বসে আমেরিকা, রাশিয়া, নরওয়ে এমনকি মহাবিশ্বের অন্য গ্রহেও যদি যেতে চাও, Immediate যেতে পারবে । অবশ্য যদি সেসব স্থানে যাবার তোমার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে ৷ এই রহস্য বুঝতে পেরে যোগসাধনার গভীরে পৌঁছে ঋষিরা আবিষ্কার করলেন আরও নতুন এবং চমকপ্রদ তথ্য । তাঁরাও দেখলেন গভীর ধ্যানে অথবা মন সম্পূর্ণ একমুখী হলে, চিত্ত সম্পূর্ণরূপে বিষয়শূন্য হলে সশরীরেও এই ধরনের গতি লাভ করা সম্ভব হয় ৷ তোমরা বিভিন্ন মহাপুরুষদের জীবনীতে দেখতে পাবে যে তাঁরা কোন ভক্তের সংকটকালে অথবা বিশেষ কোনো প্রয়োজনে হঠাৎ প্রকট হলেন – এগুলো সত্য ৷ তবে জড়বিজ্ঞান দিয়ে নয়, জীবনের গভীরে ঢুকে জীবনবিজ্ঞান দিয়েই এই সত্যকে বোধ করতে হবে ৷ আর এরও উপরে আছে আত্মবোধ অর্থাৎ চরাচর বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে অভেদত্ব বোধ ৷ সেখানে গতি শব্দটাই হাস্যকর, তখন সবই তোমার শরীর, কারণ তৎ-ত্বম অসি । এসব কথা শুনে মনন বা নিদিধ্যাস না করলে ধরতে পারবে না, তাই যা শুনলে সেগুলোকে ভালোভাবে মনন করবে তাহলেই অনেকটা ধারনা করতে পারবে ৷

এখন অলৌকিক সম্বন্ধে বলছি শোনো । সাধারণ লোকে সচরাচর যা দেখে না বা শোনে না সেগুলো দেখলে বা শুনলে সেগুলোকে অতিলৌকিক বা অলৌকিক আখ্যা দেয় ৷ কিন্তু জানবে যে কোন কার্যের, এমনকি চিন্তাভাবনা বা কল্পনারও কারণ রয়েছে ৷ একে শাস্ত্রে কার্যকারণ সূত্র বলা হয় । তুমি কোন জিনিস দেখোনি অথবা শোননি অথবা তোমার বুদ্ধি-বিচারে যা ধরা পড়েনি তা বলে সেটা ঘটতে পারে না এমন ভাবাটা মূর্খতা অথবা ভ্রান্তি । এই বিরাট মহাবিশ্বে কত কি ঘটে চলেছে – তুমি তার কতটুকু খোঁজ রাখো ? দ্যাখো, সাধারণ মানুষ আহার, নিদ্রা, মৈথুন, ও ভয় এই চারটি নিয়েই থাকে – এদের চাহিদা মেটাতে গিয়েই তার নাজেহাল অবস্থা আর কথা বলার সময় মুখে বড় বড় কথা এটা ঠিক নয় । ‘মহাজনো যেন গতঃ স পন্থা’!– মহাজনগণ যে পথে গমন করেছেন সেটাই পথ । মহাজ্ঞানী মহাজনেরা আহার-নিদ্রা-মৈথুন ভয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে, জাগতিক রূপ-রসাদির মোহকে অগ্রাহ্য করে তীব্র বৈরাগ্যের দ্বারা আত্মসুখের ইচ্ছা ত্যাগ করে জীবনের গভীরে ডুব দিয়ে, ডুবুরির ন্যায় একটি একটি জীবনরহস্য, জগতরহস্য তুলে তুলেএনে উপহার দিয়েছেন জগতকে । পারলে সেগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও – সেগুলোর যথার্থতা নিরূপণে নিজেকে আত্মনিয়োগ করো, অন্যথায় না পারলে পাশে সরে দাঁড়াও, বিরোধ করো না – উপহাস করো না । তা করলে তো তোমারই অপমান । তাই তোমার পূর্বজদের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তুমি কি করে নিজে সম্মানিত হতে পারো ৷

মহাপুরুষদের জীবনে যা কিছু ঘটেছে সেগুলো সবই প্রকৃতই ঘটেছিল, আর তা আজও ঘটতে পারে, অলৌকিক বলে কিছু নেই, সমস্ত ঘটনার পিছনে কার্যকারণ সূত্র রয়েছে, বিজ্ঞান রয়েছে ৷ যদি জানতে চাও –সাধুসঙ্গ করো, সব রহস্য জানতে পারবে ।

জিজ্ঞাসু :— (জনৈক মহিলা ভক্ত) – আপনাকে আমার ভগবান বলে মনে হয় ?

গুরু মহারাজ :– তাই নাকি ? তাহলে আপনি ধন্য । কারণ “যত্রজীবঃ তত্রশিবঃ” এই সত্য আপনি বোধ করেছেন । কিন্তু আপনি এখানে যারা বসে আছে তাদের সকলকেই ভগবান দেখছেন তো ? তা যদি না দেখেন তাহলে কিন্তু আপনার দেখায় ভুল আছে এবং এটা একরকম ধান্দা মেটানো ৷ তাই সঠিক অর্থে ভগবান দর্শন হলে সর্বভূতে-সর্বজীবে তাঁর দর্শন হবে – ব্যক্তিবিশেষে না ।

জিজ্ঞাসু:— ধ্যানে বা ঘুমের মধ্যে অনেক সময় অনেক দর্শন হয় এগুলো কি ঠিক?

গুরুমহারাজ :— দেখো, স্বপ্ন দেখা আলাদা আর যেটা দর্শন বলছ সেটা স্বপ্ন নয়। কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা বা কল্পনা অথবা চিন্তার রূপ মানুষ স্বপ্নে দেখে থাকে। মনের যে তিনটি অবস্থা Conscious, Pre-Conscious এবং Sub-Conscious, এই Sub-Conscious বা অবচেতন মনের ক্রিয়ায় মানুষ স্বপ্ন দেখে। চেতন মন যেগুলোকে আটকে দিচ্ছে বা পাত্তা দিচ্ছে না, অবচেতনে সেগুলো ঢুকে যাচ্ছে বা ক্রিয়াশীল হচ্ছে — এটাই স্বপ্ন দেখার রহস্য।

এবার দর্শন প্রসঙ্গে আসছি। দেখো মরুভূমিতে মরীচিকা দেখাও তো দর্শন। ‘ইন্দ্রজালং মিদং সর্বং যথামরু মরীচিকা’ — এটাই সত্য জানোতো। ব্রহ্মই সত্য আর সব দর্শনই তো মিথ্যা অর্থাৎ অনিত্য। তাই বেশিরভাগ দর্শনই হয় Illusion অথবা Delusion না হয় Hallucination. শরীর-মন শুদ্ধ হয়নি অথচ ধ্যান করছে আর এই সব দর্শন হচ্ছে। স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন ধর্মজগতের ৯০ ভাগ লোক বায়ুবিকারগ্রস্ত, ১০ ভাগ হয়তো ঠিক পথে চলছে। আমি দেখেছি এই ১০ ভাগের মধ্যে আবার ৫ জন ধর্মভীরু, ৪ জন ধর্মোন্মাদ আর ১ জন প্রকৃত ধার্মিক।

তাহলেই বুঝতে পারছো ‘ঠগ্ বাছতে গাঁ উজাড়’। আমার কাছে অনেকেই আসে, পুরুষ হলে বলে তার দর্শন হয়েছে সে নাকি রামকৃষ্ণের অবতার আর বেশিরভাগ নারীই বলে সে নাকি ‘সারদা মা’। এইতো সেদিন একজন এসে বলল যে তার স্বামী রামকৃষ্ণ, সে সারদা মা আর তার ছেলে স্বামী বিবেকানন্দ — এটা ধ্যানে বসে তার দর্শন হয়েছে। চিন্তা করো! আমি মনে মনে ভাবলাম কি ধৃষ্টতা! কি আহাম্মকি! তুই সংসারী মানুষ — তুই সারদা মায়ের গু। অথচ নিজেকে মহীয়সী ভেবে বসে আছিস। এরা রোগগ্রস্ত। দেখো ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও বলেননি ‘আমি ভগবান আমাকে মানো গো’, শ্রীশ্রীমা কখনও বলেননি ‘আমি জগদম্বা, আমাকে পুজো কর — করেছেন কি?’ করেননি। কারণ সূর্যকে মশাল জ্বেলে, লণ্ঠন জ্বেলে দেখতে হয় না — তিনি স্বয়ং-প্রকাশ। আত্মপ্রচারের দ্বারা আত্মপ্রতিষ্ঠা করাটা জীবের একটা বৈশিষ্ট্য। কোথাও এমনটা দেখলেই জানবে সেখানে ব্যক্তিটি ধান্দাবাজ। “আপ-কথা, বাপকথা ও দেশকথা” সাধু কখনও বলেনা —আর যদিও বলে খুব অন্তরঙ্গ মহলে, তাদের বিশেষ অনুরোধে। কিন্তু হেঁকে-ডেকে সকলকে ‘আপকথা’ বলছে মানেই জানবে ধান্দাবাজ; কখনও এদের দ্বারা বিভ্রান্ত হবেনা। দেখো বর্তমানে মানুষ ভণ্ডামি দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কেউ আর এই জন্যই অপর কাউকে বিশ্বাস করতে চাইছেনা। সাধু হচ্ছে Cream of the society. ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত, বৈরাগ্যের অনলে পরিশোধিত এক দিব্য জীবনের অধিকারী হবে সাধু-সন্ন্যাসীরা। কিন্তু তা না করে নানান ভাবে লোক-ঠকানো সাধুর বেশধারী ভণ্ডেরা আত্মপ্রচারের মাধ্যমে মিথ্যাকথা বলে তারা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে আর এর ফলে মানুষ বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে।

ওই জন্যই বললাম সূর্য উঠলে মশাল জ্বেলে দেখতে হয় না, ফুলের সৌরভ ছড়ালে মৌমাছিদের ডাকতে হয় না। সাধুর সাধুত্ব জাগলে তাকে বলতে হয় না যে “আমাকে দেখো — আমি কত বড়”। মানুষ তো নানান জ্বালায় সবসময় জ্বলছে। সবসময় একটু শান্তি, একটু আনন্দের স্পর্শ খুঁজছে। কাজেই তা যদি কোথাও পায় আপনি ছুটবে মানুষ তার কাছে, এরজন্য Advertisement করতে হবে না তো! জীবন-যাপনের মধ্য দিয়েই জীবনের বেদীতে ফুটে উঠুক — প্রকাশিত হোক সাধুর জীবন।

জিজ্ঞাসু:– ‘আপকথা, বাপকথা’- এসব কিবললেন আর এগুলো অন্তরঙ্গদের কাছেই বা বলতে হয় কেন ?

গুরুমহারাজ :– আধ্যাত্মিক রহস্য বা গুরুর কাছে প্রাপ্ত তার নিজস্ব সম্পদকে শাস্ত্র নারীর পয়ােধরের সঙ্গে তুলনা করেছে। যা তার স্বামী এবং সন্তানের কাছেই উন্মােচিত অন্য সবার কাছে একান্ত গােপ্য। এখানে সাধক বা সাধিকার নিজস্ব কিছু কথা বা জীবনরহস্য ও সাধনরহস্য যা গুরুর কাছে একান্তভাবে পাওয়া তা সর্বজনের কাছে প্রকাশিত করা মানে নিজের নিজস্বতাকে, নিজের সম্পদকে বা পাওয়ার মর্যাদাকে অবমাননা করা। অপরপক্ষে এটাকে সযত্নে লালিত করে পুষ্ট করতে পারলে উত্তরকালে তা পরবর্তী উত্তরসূরীদের কাছে জীবনদায়ী, জীবনীশক্তি-দায়ী হয়ে অমৃতধারায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু অহেতুক আত্মপ্রচারকারী নিজের স্বকীয়তা হারিয়ে আপন লক্ষ্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়। আর স্বামী বলতে এখানে গুরু বা গুরুস্থানীয়রা। যাদের কাছ থেকে আরও কিছু নেবার আছে বা যাদের আধ্যাত্মিক রহস্যগুলি উন্মোচনের উপায় জানা আছে। তাদের কাছে তাে নিজেকে Open করতেই হবে—এটা শরণাগতি। জ্ঞানলাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায় প্রকৃত সাধুর কাছে, গুরুর কাছে নিজেকে অনাবৃত করা। ভক্তকে ভগবানের কাছে অনাবৃত হতেই হবে – এটাই তো শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক গােপীদের বস্ত্রহরণ।

জিজ্ঞাসু:– সমাজে যে বিভিন্ন মহাপুরুষদের পরম্পরা রয়েছে, এদের মধ্যে অনেকে গ্রামে গ্রামে আসছে দীক্ষা দেবার জন্য, ওদের Organisation-ও বড়, এগুলোতে দীক্ষা নিলে কি ইষ্ট সাক্ষাৎকার হবে ?

গুরুমহারাজ :— ভালটুকু নিলে সব পরম্পরাতেই সার রয়েছে। কিন্তু বাছার মতাে ক্ষমতা তাে সবার নেই। বিবেকের দ্বারা চালিত বুদ্ধি প্রয়ােগ করতে পারে কজন বল। লেজা-মুড়ো সব খেলেই তাে গড়হজম হবার সম্ভাবনা। কেউ সাধু-সন্ন্যাসীকে সহ্য করতে পারে না, কেউ বহুবিবাহ-প্রথা সমর্থন করে ( অবশ্য সবার জন্য নয় তাহলেও করে, ) কিন্তু এগুলি মেনে তাদের নিজেদের পরিবারের লােকেদের কি আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়েছে যে তারা সাধারণ লােকের আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটাবে ? প্রকৃত জগৎ কল্যাণের জন্য নির্দিষ্ট লােক পৃথিবীতে খুব কমই আসে বাবা, এটা জেনে রাখবে। অন্যদের দ্বারা সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। ঐ যে বললে বড় Organisation ইত্যাদি দেখে মানুষ ঢলে যায়। বিবেকাশ্রিত বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে পারে না—যে প্রকৃত ব্যাপারটা কি ? আর একবার কোন ব্যক্তি কোন Organisation-এ চলে গেলে সে ওই লেজ-কাটা শেয়ালের মতাে আর সবার লেজ কাটতে চায় অর্থাৎ তার সম্প্রদায়টাই যে ভাল সেটা প্রচার করতে থাকে। মানুষেরকোন মত বা পথকে গ্রহণ করার আগে তার সব কিছু ভালমন্দ দেখে—বিচার করে তারপর গ্রহণ করা উচিত, তাহলেই অসুবিধা হয় না। সত্য সবসময়, সবার মধ্যেই স্বয়ং প্রকাশিত, খুজলেই সন্ধান মেলে। তবে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন জলে-দুধে মিশে রয়েছে জলটা ফেলে শুধু দুধটা খাও। এইটা করবে “সব সে বসিয়ে সবসে রসিয়ে সব কা লিজিয়ে নাম। হাজী হাজী করতে রহিয়ে বৈঠিয়ে আপনা ঠাম।” এখানে। ‘আপনা ঠাম’ মানে নিজের বিবেককে জাগ্রত রাখা। বিবেক হচ্ছে আত্মার আলাে বা প্রকাশ। বিবেক জাগ্রত থাকলে মানুষ বিভ্রান্ত হয় না। আর সাধুসঙ্গেই বিবেকের জাগরণ হয়। তাই প্রকৃত সাধুসঙ্গ কর, নিজে নিজেই কোনটি ঠিক বা কোনটি বেঠিক বুঝতে পারবে।

জিজ্ঞাসু:– অনেক প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ দীক্ষা নেয় কিন্তু গুরুর সাথে শিষ্যের প্রায় যােগাযােগই থাকে না এতে কিভাবে শিষ্যের আধ্যাত্মিক কল্যাণ হবে।

গুরুমহারাজ :– গুরু ও শিষ্যের মধ্যে যদি আন্তরিক যােগাযােগ না থাকে তাহলে গুরুর শিক্ষা নিস্ফল হয়। সাধারণতঃ এই আন্তরিক যােগাযােগ-সাক্ষাৎ সংস্পর্শ, মেলামেশা, সেবা করার সুযােগ এসবের মাধ্যমেই গড়ে ওঠে, আর বিভিন্ন জিজ্ঞাসার উত্তর বা সমস্যা সমূহের সমাধানের মধ্য দিয়ে হয় শিষ্য এবং গুরুর পারস্পরিক পরিচিতি ও শিক্ষার আদান-প্রদান। এভাবেই সংযােগ, সম্পর্ক ও সম্বন্ধ এই তিনটি Stage রয়েছে। সংযােগ হলেই সম্পর্ক গড়ে ওঠেন আবার সম্পর্ক স্থাপন হবার পরও সম্বন্ধ তৈরী হতে আরও অনেক দেরি লাগে। তবে একবার সম্বন্ধ হয়ে গেলে আর কোন চিন্তা থাকে না। তুমি যখন যেখানে যে অবস্থাতেই থাক না কেন গুরুই তােমাকে খুঁজে নেবে, তােমার আর গুরু খোঁজার। প্রয়ােজন থাকবেনা তখন। যাইহােক বৈদিক যে পরম্পরা রয়েছে দীক্ষাদানের, সেখানে গুরু এবং শিষ্যের মধ্যে নিবিড় যােগাযােগ হত সাধারণতঃ সংস্পর্শ ও পারস্পরিকভাব বিনিময়ের মধ্য দিয়েই । ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন গুরুকে রাতে দেখবি, দিনে দেখবি, বাজিয়ে নিবি। একথা থেকেই বােঝা যাচ্ছে যে, কত নিবিড় মেলামেশার পর গুরু ও শিষ্যের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

জিজ্ঞাসু:– মাইকে দীক্ষা দেওয়া কি ঠিক ?

গুরুমহারাজ:– মাইকে দীক্ষাদানের পদ্ধতিও ঠিক নয়। কারণ প্রথমতঃ উপস্থিত সকলের একই মন্ত্র হতে পারে না। ব্যক্তি বিশেষে স্বভাব বা সংস্কার ভেদে মন্ত্র ভিন্ন হয়। আর তাছাড়া ইষ্টমন্ত্র প্রতিটি ব্যক্তির নিজস্ব সম্পদ, তার গুরু ও সে ছাড়া কেউ জানবে না। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর ও মন্ত্র ভিন্ন হতে পারে এবং তাও পরস্পরের কাছে অপ্রকাশ্য, এটাই বৈদিক ধারা। আর বেশী সংখ্যক শিষ্য সংগ্রহের জন্য মাইকে দীক্ষা দেওয়া হচ্ছে বা গুরুর কষ্ট লাঘব করার জন্যও এটা হয়। কিন্তু ঐ যে বললাম গুরু ও শিষ্যের মধ্যে যদি মধুর সম্পর্ক গড়ে না ওঠে তাহলে গুরুবাক্যে বিশ্বাস বা গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা এগুলােও শিষ্যের ক্ষেত্রে দৃঢ় হয় না। ঠুনকো বিশ্বাসে একটু ঘা লাগলেই ভেঙে যায়। এভাবেই সামান্য আঘাতে বারবার গুরু পরিবর্তন করতে করতে দেখা যায় অনেককে। এইরকম নানা ঘটনা ঘটে যাতে গুরুরও ক্ষতি হয়, শিষ্যেরও আধ্যাত্মিক জীবন গড়ে ওঠে না ।