স্থান ~ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন । সময় ~ ১৯৯১, বৈশাখ মাস । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ সিঙ্গুরের ধীরেনবাবু, সব্যসাচী মান্না, কলকাতার পল্লব ইত্যাদি ।

জিজ্ঞাসু:– আপনি অনেককেই দুপুরে rest নিতে বলেন কিন্তু দুপুরে ঘুমালে দেখেছি হজমের গণ্ডগোল হয়, তাহলে এমন বলেন কেন?

গুরুমহারাজ :– তুই আচ্ছা আহাম্মক তো! কি কথার কি মানে করলি! হ্যাঁ, এটা ঠিক যে,আমি সকলকেই দুপুরে বিশ্রাম নিতে বলি। বিশেষত এখন গ্রীষ্মকাল, দুপুরে খেয়ে কি রোদে রোদে ঘুরে বেড়াবি? তার চেয়ে বিশ্রাম নিলে শরীর সুস্থ থাকবে – এইজন্য বলি! তাই বলে তুই নাক ডাকিয়ে ঘুমাবি নাকি? বসে বসে আধ্যাত্মিক পুস্তকাদি পড়বি অথবা কয়েকজন মিলে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক আলোচনা করবি! নাক ডাকিয়ে ঘুমালে তো মহা অনিষ্ট হবে। দিবানিদ্রা অত্যন্ত খারাপ, শাস্ত্রে একে মহাপাপ বলেছে। কেন বলা হয়েছে জানিস! এতে শুধু indigestion-ই হয়না – ব্রহ্মচর্যেরও হানি হয় এবং মস্তিষ্ক কোষের ক্ষয় হয়। যুবকদের তো কোনমতেই দিনে ঘুমানো চলবে না, তবে যারা Night duty-র চাকরি করে তারা আর কি করবে_তাদের তো দুপুরে ঘুমাতেই হবে। সুতরাং তাদের কথা স্বতন্ত্র। কিন্তু তোদের বলছিলাম – দুপুরে অকারণে ঘুমাবিনা, কারণ দিবানিদ্রার অভ্যাস ঠিক যেন Vampire-এর মতো। Vampire বা রক্তচোষা বাদুড় প্রকৃতই আছে কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে নানা মত রয়েছে, তবে এদের নিয়ে অনেক কল্প-কাহিনী তৈরি হয়েছে! এরা নাকি ঘুমন্ত ব্যক্তির দেহ থেকে সমস্ত রক্ত চুষে খেয়ে নেয়। আর যখন এরা রক্ত খায় তখন এদের শরীর থেকে এমন কোন chemical বেরিয়ে আসে যাতে ক্ষতস্থানটি অবশ থাকে। ফলে যে ব্যক্তির রক্ত চোষা হচ্ছে তার কোন sense থাকে না। এছাড়া আরও কথিত আছে যে, এরা নাকি সেই সময় তাদের ডানা দিয়ে এমন মৃদুমন্দ হাওয়া চালায় যে, ঘুমন্ত ব্যক্তির ঘুম নাকি আরও গভীরতম হয়ে যায়।

 যাইহোক, এসব কল্প-কাহিনীর কথা থাক_যা বলছিলাম সেই প্রসঙ্গে ফিরে আসি, যুবকদের বা ব্রহ্মচর্য-রক্ষাকারীদের নিকট দিবানিদ্রা__ রক্তচোষা বাদুড়ের ন্যায় ভয়ঙ্কর। কেননা কেউ যদি এই কুঅভ্যাসটিএকবার করে ফেলে, তাহলে তার এখন বেশ ভালই লাগবে_ আরামও লাগবে, কিন্তু কালে যখন সে বুঝতে পারবে তখন আর তার করার কিছু থাকবে না কারণ তখন শরীরের বারোটা বেজে যাবে। সুতরাং তোমাদের সকলকেই বলছি দুপুরে ঘুমিওনা, যদি কারও সে অভ্যাস থাকে, তাহলে একেবারে ত্যাগ করো।

দ্যাখো, ঠিকমত বাঁচার জন্য, জীবনধারণের জন্য আমি অনেক কথাই বলি, কিন্তু ক’জন ঠিক ঠিক শোনে আমার কথা! জীবনের কলা বা বাঁচার কলাই তো আধ্যাত্মিকতা। তাই আমি এই সমস্ত কথাই বলি বা শিক্ষা দিই। কজন সেই সব কথা শুনে জীবনে প্রয়োগ করে? দ্যাখোনা _ আমাদের আশ্রমে সকাল-সন্ধ্যায় যখন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের আরাত্রিক বন্দনা হয় , ঐ প্রার্থনায় যোগ দেবার কথা আমি সকলকেই বলি, দেখি তো ক’জন যোগ দেয়! জানো, ঐ বন্দনাটি স্বামী বিবেকানন্দের নিজের লেখা, নিজের সুর দেওয়া। এটি সন্ধ্যার সময় গাইলে মানবের চিত্তশুদ্ধি হয়। এই গানের সুর এবং ছন্দ এমন ভাবে ব্যবহার করা আছে যে, এটি শরীরের পক্ষে একটি সুন্দর সহজ প্রাণায়াম। প্রত্যেকেরই এটা করা উচিৎ। কিন্তু দেখি সন্ধ্যার সময় বেশিরভাগই এখানে-ওখানে আড্ডা মারছে – যেন সব ব্রহ্মজ্ঞানী হয়ে গেছে। এখনতো আবার বললাম কথাটা__দেখব এবার কজন ঠিক ঠিক পালন করে আমার কথা।

জিজ্ঞাসু:— চর্যাপদ কি বাংলা ভাষার আদি কাব্য বা এই ভাষাটাই টি প্রাচীন বাংলা ভাষা?

গুরুমহারাজ :— চর্যাপদ রচিত হয়েছিল সান্ধ্য ভাষায়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবার থেকে ওর কিছুটা collection করে নিয়ে এসে ওটাকেই প্রাচীন বাংলা ভাষা বলে চালিয়ে দিতে চাইল! “উঁচা উঁচা পাবত তঁহি বসই শবরী বালি”_প্রকৃতপক্ষে এগুলো কোন কালেই বাংলার ভাষা ছিল না। সহজিয়া সাধকদের বিভিন্ন তত্ত্ব বা তথ্য চর্যাপদের মাধ্যমে রূপকাকারে লেখা ছিল। এখনও যেমন বাউল গানে অদ্ভুত সব শব্দবিন্যাসের দ্বারা কোন ভাবকে রূপকের আকারে পরিবেশন করা হয়, ঠিক তেমনি। বাউল গানের ওইসব আজগুবি শব্দ নিশ্চয়ই আজকের বাংলা ভাষা নয়। একটা উদাহরণ দিচ্ছি, যেমন ধরো বাউল গানে রয়েছে :— “দিল দরিয়ার মাঝে একটা সর্প ভাসতেছে — তার মাথায় একটা ময়ূর নৃত্য করতেছে, কি বাত শোনাইলি আলেখে বাত আজব পয়দা হইয়াছে।” এটাই কি বর্তমানের বাংলাভাষা? কি_নয় তো! ওগুলিও ঠিক এমনই!

ঘটনাটা কি ঘটেছিল_ সেটা বলছি। ভারতবর্ষে যখন পার্সী, তুর্কী, মোঙ্গল বা মুঘলরা ঢুকতে লাগল বা সাম্রাজ্য বিস্তার করতে লাগল, তখন ওদের সৈন্যরা এদেশের সমস্ত সংস্কৃতি বা পুঁথিপত্র, শাস্ত্র-গ্রন্থগুলিকে একেবারে নষ্ট করে দিতে চেয়েছিল। কারণ ওরা ভেবেছিল পুরাতনকে নষ্ট করতে পারলেই এখানকার মানুষ নতুনকে তাড়াতাড়ি গ্রহণ করে নেবে। এই একই কায়দায় ওরা পারস্য, গান্ধার বা অন্যান্য দেশকে করায়ত্তও করেছিল। খুঁজে দ্যাখো, ইতিহাস এর সাক্ষী। পারসিকরা মাত্র কয়েকশ বছর আগেও অগ্নি উপাসক ছিল, এখনকার ইরাণ সম্পূর্ণভাবে মুসলিম রাষ্ট্র হয়ে গেছে। হয়তো অগ্নি উপাসক পার্সী কিছু আজও ভারতবর্ষে রয়ে গেছে, কিন্তু ইরাণে আর একটাও পাবে না। এই একই উদ্দেশ্যে ওরা এখানেও যথেচ্ছ অত্যাচার, লুটপাট ও ক্ষয়ক্ষতি চালাচ্ছিল। কিন্তু বরাবরই ভারতে প্রচুর মতবাদ আর এক এক মতবাদের সমর্থকের সংখ্যাও প্রচুর। ফলে বিভিন্ন পরম্পরার সাধকেরা তাদের পরম্পরাগত মূল তত্ত্বগুলি , মুসলমান শাসকদের হাত থেকে বাঁচানো বা সংরক্ষণের জন্য নানান কায়দা বের করল এবং নিরাপদ স্থানে সেগুলোকে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করল। হিমালয় এ ব্যাপারে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। আর নেপাল হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত। তাছাড়া নেপালে কখনও মুসলিম আগ্রাসন হয়নি। তাই ঐ সব অঞ্চলে অনেক পরম্পরার পুঁথিপত্র চালান করা হয়েছিল। ওখানকার রাজারা সেগুলির মধ্যে কিছু কিছুcollection করে রেখেছিল, এইভাবেই নেপালের রাজদরবার থেকে পাওয়া গেল কিছু সান্ধ্যভাষায় লিখিত সহজিয়া সাধকদের সংরক্ষিত পুঁথি। এরকমঅনেক পুঁথি রয়েছে তিব্বতে বা চীনে। কারণ তখন চীনের সঙ্গে ভারতের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দিকের খুবই সুসম্পর্ক ছিল। তাই নিরাপদ স্থান হিসাবে ওখানেও অনেক প্রাচীন গ্রন্থাদি বা পুঁথিপত্র রয়ে গেছে। স্বামী নিগমানন্দ সরস্বতীর বই-এ পাবে উনি কোন এক প্রাচীন সন্ন্যাসীর সাহায্যে পার্বত্য অঞ্চলে এমন এক গুহা দেখেছিলেন যেখানে সহস্র-সহস্র প্রাচীন পুঁথি সযত্নে সংরক্ষিত আছে। এইরকম আরো কত রয়েছে_তার সন্ধান কে রাখে!

যাইহোক এবার পূর্বের কথায় ফিরে আসি, দ্যাখো শুধু বাংলাভাষা কেন ভারতীয় প্রায় সমস্ত ভাষারই জননী হচ্ছে সংস্কৃত। সেখান থেকে কথ্য ভাষারূপে এল পালি। এবার এক-একটা প্রদেশের মানুষের মুখের গঠন, পরিবেশের পার্থক্য, ভাষার টান ও প্রয়োগ অনুসারে ভাষার বিবর্তনে এখন যেখানে যেমন রূপ দেখছ সেইরকম হয়েছে। একই বাংলা ভাষার মুর্শিদাবাদে একরকম টান, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় সব আলাদা আলাদা। আর বাংলাদেশে তো ‘শ’ কে ‘হ’ করেছে আরও কত কি পরিবর্তন করেছে বাংলাভাষার ! লেখ্যভাষার কথা যদি বলোতাহলে দেখা যায় ভারতের প্রাচীন তিনটি লিপি অর্থাৎ ব্রাহ্মী-লিপি, খরোষ্টী লিপি এবং সিন্ধুলিপির মধ্যে _অসমিয়া, বাংলা ও উড়িয়া ভাষার লিপি ব্রাহ্মী লিপি থেকে এসেছে। বাঙালিরা লেখার জন্য পাখির পাখার সরু মুখ বিশিষ্ট কলম বা সূচালো মুখবিশিষ্ট শরের কলম ব্যবহার করতো, ফলে লিপির বাঁকগুলো বা কোণগুলো (Angle) সূক্ষ্ম জ্যামিতিক আকার পেয়েছে। উড়িষ্যা এবং দক্ষিণের লোকেরা খোন্তার মত দণ্ডের সাহায্যে লিখতো, তাই বাঁকগুলো গোল গোল হয়ে গেছে, কোণ ঠিকমতো হয়নি — যেখানে সেখানে একাধিক আঁচড় পড়ে গেছে বলে একটু অন্যরকম হয়েছে। একটু ভালভাবে লক্ষ্য করলে এসব তোমরাও ধরতে পারবে। যাইহোক, বাংলা ভাষার আদিরূপ চর্যাপদের ভাষা নয় — ওটা সান্ধ্য ভাষা।