স্থান ~ পরমানন্দ মিশন । সময় ~ ১৯৯২। উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~স্বরূপানন্দ মহারাজ, জয়দীপ, সব্যসাচী মান্না, দেবীপ্রসাদ মুখার্জি, আশ্রমস্থ মহারাজগণ ও বহিরাগত ভক্তবৃন্দ ।
জিজ্ঞাসু :— মহারাজ, বহুপূর্বে প্রকৃতি দূষণমুক্ত ছিল এবং সেই সাথে জনসংখ্যাও কম ছিল বলেই কি মানুষ সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিল?
গুরুমহারাজ :— হ্যাঁ, এটাই তো কারণ। দেখোনা, এই সমস্ত অঞ্চল আগে বনজঙ্গলপূর্ণ ছিল। এখানকার ব্যাণ্ডেলের আগে যে আদিসপ্তগ্রাম স্টেশন, এটাই তো পূর্বের সপ্তগ্রাম বন্দর ! তখন সমুদ্র ওই স্থানের প্রায় কাছাকাছি ছিল। বর্তমানের কলকাতা তখন সুন্দরবনের লাগোয়া ছিল। কালীক্ষেত্র থেকেই তো কলিকাতা। বর্তমানের কালীঘাটই ছিল কালীক্ষেত্র। ঐ সমস্ত অঞ্চলে হিউয়েন সাঙ যখন ভ্রমণ করছিলেন সেইসময় স্থানগুলি জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। তাঁর বিবরণ থেকে জানা যায় — ওখানকার কাপালিকরা নাকি হিউয়েন সাঙকে ধরেছিল, তারপর কোন কারণে তাঁকে ছেড়ে দেয়। তখনও ভারতবর্ষের কোন কোন অঞ্চলে নগরসভ্যতা ছিল বটে কিন্তু বেশিরভাগ অঞ্চল জলা-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। লোকসংখ্যা কম থাকার জন্য মানুষের খাদ্যাভাব ছিল না। বিশেষত বঙ্গদেশে তো নয়ই। কারণ এখানে চাষ করলেই ফসল ফলে। প্রশস্ত ও অবারিত গোচারণ ভূমি থাকায় মানুষ সহজে গোপালন করতো। তাই তখন গোয়ালভরা গরু আর গোলাভরা ধান থাকত কৃষকের ঘরে ঘরে। আর বনের ফল, জলাশয়ের শাকসবজি এবং খাল-বিল-নদী-নালার মাছ ইত্যাদি দ্বারা বাঙালির জীবন সুখেই অতিবাহিত হোত — অন্যপ্রকার ভোগৈশ্বর্যের প্রত্যাশা তারা করতো না। বাঙালি গৃহস্থের চিরকালীন চাহিদা কবির ভাষায় ফুটে উঠেছে — “আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে।” সমগ্র ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষই কমবেশি এই একই মানসিকতাসম্পন্ন! এটাকে বর্তমানে middle class mentality বলে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে বটে_কিন্তু এটাই সঠিক জীবন যাপন_simple living and high thinking!
গোটা বিশ্বে যখন ভোগ-বিলাসের প্রতিযোগিতা, যেখানে সে সব দেশে মুদ্রার মূল্য, জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির সাথে সাথে হু হু করে কমে গেছে, সেখানে ভারতবর্ষের মুদ্রার মূল্য কিন্তু জিনিসপত্রের দামের তুলনামূলক হারে অতটা কমেনি! এটা পৃথিবীর অর্থনীতিবিদদের কাছে একটা বিস্ময়! এর কারণ কি বলতো, ঐ যে বললাম ভারতীয় মানসিকতা — ‘simple living…’!
যাইহোক যা বলছিলাম, তখনকার বঙ্গদেশ যেন প্রকৃত অর্থেই সুজলা-সুফলা-শস্যশ্যামলা ছিল। প্রকৃতির উপর মানুষ যথেচ্ছাচার না করায় প্রকৃতিও ঠিক সময়ে ঠিক ঠিক ঋতুর কাজ করে যেত। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি এইরকম প্রাকৃতিক বিপর্যয় হোত কিন্তু কমই হোত। কোনরকম কৃত্রিম উপায়ে খাদ্য উৎপাদন, ফসল উৎপাদন ইত্যাদি না হওয়ার জন্য মানুষের শরীর-স্বাস্থ্যের উপর খাদ্যজনিত কোন প্রতিক্রিয়া হোত না। যানবাহনের অভাব থাকায় মানুষকে পায়ে হেঁটেই দূর-দূরান্তে যেতে হোত।
তখনকার দিনে এইভাবে যাতায়াত করাটা খুবই কষ্টকর ছিল। এতে প্রচণ্ড সাহস এবং শক্তির প্রয়োজন হোত। কারণ রাস্তাই বা তেমন কোথায়? শুধু জলা এবং জঙ্গল আর তার মাঝ দিয়ে মেঠো পথ। কেঁদোবাঘ, গুলবাঘ, চিতাবাঘ ইত্যাদি বন্যপ্রাণীরা প্রায়ই পথচারীদের আক্রমণ কোরতো। তখনকার দিনে প্রায়ই শোনা যেত কোন না কোন গ্রামে কেউ না কেউ খালিহাতে বাঘের মোকাবিলা করেছে! এখনকার কোন যুবকছেলের সে সাহস আছে কি! আর তখন ছিল ফাঁসুড়ে, ঠ্যাঙাড়ে এবং ডাকাতের ভয়! ঠ্যাঙাড়েরা ছোট ছোট লাঠি ছুঁড়ে নিখুঁত লক্ষ্যে চলন্ত পথিকের পায়ে আঘাত কোরতো, এতে পথিক যেই পড়ে যেতো অমনি চারিপাশ থেকে ওরা ছুটে এসে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে তার সর্বস্ব লুঠ কোরতো। তখনকার দিনে জমিদাররাও লেঠেল পুষতো — ডাকাত পুষতো। ফলে সেই সময়কার মানুষদের প্রকৃতির সঙ্গে এবং জীবজন্তু ও দুষ্টপ্রকৃতির মানুষের সঙ্গেও সরাসরি physically সংগ্রাম করতে হোত। এইভাবে নাননভাবেলড়াই করে এবং নির্ভেজাল দূষণমুক্ত খাদ্য থেকে পুষ্টি পেয়ে মানুষের শরীরগুলি শক্ত-পোক্ত বা মজবুত হয়ে উঠতো।
আমরা ছোটবেলায় দেখেছি বাড়ির কেউ যখন দূর-দূরান্তে যাবার জন্য বের হোত, তখন বাড়ির মা তাকে এক গ্লাস দই-এর সরবৎ অথবা ঘোল খাইয়ে দিত। এর ফলে প্রচণ্ড পরিশ্রমেও ওই ব্যক্তির শরীর ঠাণ্ডা থাকত এবং গ্যাস-অম্বল হয়ে Sun stroke বা ওই ধরনের কিছু হোত না। পরবর্তীকালে অর্থাৎ এখন দই-এর অভাবে মায়েরা ছেলেরা বাইরে কোথাও গেলে দই-এর ফোঁটা দেয়। যে কোন অনুষ্ঠানে দধিমঙ্গল-এর পিছনে এটাই রহস্য। অনেক মাকে দেখেছি ছেলেরা বাইরে যখন কোথাও যাচ্ছে তখন এক গ্লাস বা এক কাপ গরম দুধ তাকে খেতে দিচ্ছে। এটা কিন্তু খুবই খারাপ। গরম দুধ খেয়ে ভিড়-বাসে বা ট্রেনে চলাচল করে দেখবে যে, শরীরে খুবই অস্বস্তি হবে -প্রচণ্ড ঘাম হবে- শরীর আনচান্ করবে অর্থাৎ গ্যাস-অম্বল হয়ে যাবে। হার্ট দুর্বল থাকলে হার্ট অ্যাট্যাকও হয়ে যেতে পারে! কিন্তু যদি এক কাপ দই-এর সরবৎ খেয়ে কেউ বের হয়_ তাহলে কোন অনিষ্ট তো হবেই না বরং শরীর শীতল থাকবে বা শরীরে একটা সাম্যভাব বজায় থাকবে।
এসব কথা আমার বলার উদ্দেশ্য কি বুঝতে পারছ — এখনকার মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে কিন্তু গার্হস্থ্য-বিজ্ঞান জানে না। ছেলে-মেয়েদের মানুষ করার বিজ্ঞানসম্মত শিক্ষাও জানে না। গোটাকয়েক বই মুখস্থ করে কি লাভ হবে যদি সেই শিক্ষা তার জীবনে নাম সই করা আর দোকানের হিসাব কষা ছাড়া অন্য কোন কাজে না লাগে! এখন তো বিশাল জনসংখ্যার চাপে দেশটা ধুঁকছে। স্বাধীনতার আগে কবি লিখেছিলেন _অবিভক্ত ভারতের জনসংখ্যা ছিল ৩৩ কোটি। আজ অর্থাৎ ১৯৯০ সালে মাত্র ৫০ বছরের ব্যবধানে তা শুধু ভারতবর্ষেই ৯০ কোটিতে দাঁড়ালো। ভাবতো একবার কি সাংঘাতিক ব্যাপার! স্বাধীনতার আনন্দ কি শুধু এই একটা ব্যাপারেই পালন করল ভারতীয়রা! কি দেশপ্রেম এখনকার মানুষের আর কি সন্তানপ্রেম! গাদাগাদা সন্তান উৎপাদন করে দেশটাকে চরম সংকটে তো ঠেলে দিয়েছেই আর তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গেছে একরাশ অন্ধকার! বেচারারা দিশেহারা, বুঝতে পারছে না কি করা উচিত। স্বাধীনতার সময়কালীন ওই লোকগুলির অবিমৃস্যকারিতায় ভুগছে এখনকার যুবসমাজ। লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি শিক্ষিত বেকার পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকারেরও চরম উদাসীনতা বেড়েছে এই ব্যাপারে। নানান সমস্যায় ভারতবর্ষের মানুষ আজ জর্জরিত। তবুও দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির চেয়ে ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকাংশে ভাল। আর এইটার জন্য তোমরা দুহাত তুলে জয় দাও তোমাদের পূর্বসূরি ঋষিদের উদ্দেশ্যে। যারা তোমাদের অস্থিতে মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেছেন সেই মহান শিক্ষা, ‘হে ভারত ভুলিও না তোমার আদর্শ সর্বত্যাগী শংকর’।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হচ্ছে অন্য জায়গায়। যেখানে ২০টি ইঁদুরের থাকার জায়গা সেখানে ৮০টি ইঁদুরথাকলে যেমন হয় ভারতের জনসংখ্যার ঠিক সেই অবস্থা। আজ আর কোথায় জলা, কোথায় জঙ্গল, কোথায় বা কেঁদোবাঘ, গুলবাঘের দল? জঙ্গল কেটে জলা বুঁজিয়ে কৃষিজমি তৈরি করেও খাদ্যের সমস্যা মিটছে না। ফলে বাধ্য হয়ে উচ্চফলনশীল hybrid production-এর ব্যবস্থা করল কৃষি বিজ্ঞানীরা। ওরা আর কি করবে, পরিস্থিতির মোকাবিলায় ওদের এটাই করার ছিল! আর এল রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ঔষধাদি যা ওই hybrid শস্যগাছগুলিকে যথাক্রমে পুষ্টি জোগাবে ও রক্ষা করবে। এতেই ঘটে গেল বিপত্তি! প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে চলা শরীরের D.N.A. বা জিন, হঠাৎ করে কৃত্রিমভাবে গঠিত জিনবিন্যাসযুক্ত খাদ্যকণার গুণাবলীকে ঠিকমত adopt করতে পারল না। ফলে এক জেনারেশনের মধ্যেই হু হু করে ভারতীয়দের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়তে লাগল। আর তার সঙ্গে এসে গেল কঠিন কঠিন মারাত্মক ব্যাধিসমূহ। এইভাবেই ভারতীয়দের জাতীয় স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটতে লাগল। তবে প্রকৃতিতে দেখা যায় তিন generation-এর মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যায়। সুতরাং আগের প্রজন্ম, বর্তমান প্রজন্ম এবং হয়ত আরএকটা প্রজন্ম এই সমস্যা ভোগ করবে। তারপর কিন্তু দেখবে আবার natural way-তে ফিরে আসবে সবকিছু।
জিজ্ঞাসু :– শালগ্রাম শিলায় নারায়ণ আছে – এরূপ বলা হয়। এর প্রকৃত রহস্যটা কি যদি একটু বুঝিয়ে বলেন?
গুরুমহারাজ :—-কথাটা শালিগ্রাম, ‘শালি’ অর্থাৎ অনন্ত আর ‘গ্রাম’ অর্থে অবস্থান। অনন্তের যেখানে অবস্থান তাই শালিগ্রাম। সাধারণত হিমালয়ের পাদদেশে বুড়ীগন্ডক বা গণ্ডকী নদীর উৎসমুখে এক ধরণের বিশেষ শিলা পাওয়া যায় যেগুলির রঙ কালো, আর যেগুলিকে বজ্রকীট নামক একপ্রকার কীট কেটে কেটে খেয়ে তাদের জীবন-ধারণ করে! সেই পাথরগুলিকেই শালিগ্রাম বা শালগ্রাম শিলা হিসাবে মান্য করা হয়। ওগুলি নদীর উৎসমুখের পার্বত্যপথ বেয়ে চড়াই উতরাই ভেঙে প্রচন্ড গতিতে নীচে নামে, ফলে ছোট ছোট শিলাগুলি পাথরের সঙ্গে ঘর্ষণে ঘর্ষণে মসৃণ, গোলাকৃতি বা ডিম্বাকতি এবং চকচকে হয়। আর শালগ্রাম শিলার গায়ে যে বিশেষ চিহ্নগুলি থাকে সেগুলি বজ্রকীটে কাটার ফলেই সৃষ্টি। এই চিহ্নের আকার, আয়তন, অবস্থান অনুযায়ী এক একটি শালগ্রামের এক-একরকম নামকরণ হয়। কিছুদিন আগে একজন লোক আমার কাছে এসে বলল যে, তার শালগ্রাম শিলায় আগে নাকি তিনটে চক্র ছিল, এখন সেটায় চারটে চক্র দেখা যাচ্ছে। তাহলে সেটা আর রাখা ঠিক হবে কিনা – এই বিধান সে নিতে এসেছে আমার কাছে। এখানে জ্যাঠামশাই (দেবীবাবু) বসে আছেন, উনি ব্যাপারটা জানেন যে, শিলার গায়ে চক্রের অবস্থান এবং সংখ্যা অনুযায়ী নারায়ণের নামকরণ পৃথক হয়ে যায়। এখন আমি আর ওকে কি বলি! হয়ত এখনও শিলাটিতে কোন কীট রয়ে গেছে, ফলে নতুন করে দাগ কেটেছে অথবা হয়ত আগে থেকেই ভিতরটা কাটা ছিল_ পরবর্তীকালে উপরের অংশটা খুলে গিয়ে ঐরূপ হয়েছে !
শালগ্রাম শিলার প্রকৃত তাৎপর্য তোমাদের কাছে বলছি শোনো_ বৈদিক যে পঞ্চশাখা অর্থাৎ সৌর, শাক্ত,শৈব, বৈষ্ণব ও গাণপত্য - এদের মধ্যে বৈষ্ণবদের শালিগ্রাম শিলা পূজার বিধি রয়েছে, তেমন শৈবদের রয়েছে অনাদি শিবলিঙ্গ পূজার বিধি। ব্যাপারটা একই ! বর্তমানে বৈষ্ণব বলতে এখানকার(বাংলা) লোকেরা গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের বোঝে। এখন আবার এখানে নতুন সংযোজন Iscon -পন্থী বৈষ্ণব !তেমনই উত্তর ভারতের রামানুজ পন্থী এবং দক্ষিণে নিম্বার্ক বা মধ্বাচার্য্য পন্থীদের বোঝায়(শ্রী বা রামানুজিয়,মধ্ব,নিম্বার্ক,গৌড়িয়_বৈষ্ণবদের এই প্রধান চারটি পরম্পরা রয়েছে।)। এদের সবার মধ্যে আবার শালগ্রাম শিলাপূজার রীতি অতটা নেই। এরা রাধাকৃষ্ণ অথবা লক্ষ্মীনারায়ণ অথবা শুধুই নারায়ণের মূর্তি পূজা করে। বৈদিক পঞ্চশাখায় যে বৈষ্ণবদের কথা বলা হচ্ছে, তাদের ছিল শালগ্রাম শিলাপূজার বিধান। প্রাক-বৈদিক যুগ, বৈদিক যুগ, পৌরাণিক যুগ এইভাবে যদি সমাজের বিবর্তনের ইতিহাস পর্যালোচনা করো_ তাহলে দেখবে উপাসনার রীতিতে প্রাক-বৈদিক যুগে ছিল অনন্ত বা অমূর্তের উপাসনা, বৈদিক যুগে যাগযজ্ঞ ও প্রতীক উপাসনা এবং পৌরাণিক যুগে প্রতিমা বা মূর্তি উপাসনা। অনন্তকে যখন সাধারণ মানুষ চিন্তার জগতে, ধ্যানের গভীরে ঠিক ঠিক ধারণা করতে পারছিল না তখন তৎকালীন চিন্তাবিদরা প্রতীকের মাধ্যমে তাদের কাছে অনন্তের রহস্যকে ধারণা করতে শিখিয়েছিলেন। সেই অর্থে অনাদি শিবলিঙ্গ, ওঁকার বা শালগ্রাম শিলা ইত্যাদি প্রতীকগুলি সেই অনন্তকেই বোঝানোর প্রয়াস!
এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, শুধুমাত্র গণ্ডকী থেকে প্রাপ্ত ঐ শিলাকে বেছে নেওয়া হল কেন? উত্তরে বলা যায় – এটা ভক্তিভাব আনয়নের ব্যপার। হিমালয়ের পূণ্যভূমি থেকে উৎসারিত শুদ্ধ গণ্ডকী নদী-উৎসমুখ তৎকালীন দূর্গমতম অঞ্চলগুলির মধ্যে একটি। ফলে ঐ শিলা সংগ্রহ করতে হলে মানুষকে শুধু পাহাড়-পর্বত ভাঙার কষ্টই নয় – বাঘ-ভাল্লুকের হাত থেকেও রক্ষা পেতে হবে। ওখানে পৌঁছাতে গেলে অনেক তীর্থদর্শন, অনেক ত্যাগ, অনেক সহিষ্ণুতার প্রয়োজন, অর্থাৎ এককথায় একটা মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ঘটে যাবার সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। তাছাড়া শালিগ্রাম শিলা এক বিশেষ ধরনের নরম এবং চকচকে পাথর _এটি গড়িয়ে গড়িয়ে গোল বা ডিম্বাকৃতি আকার ধারণ করে-যা এই সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক হিসাবে বোঝাতেও সুবিধা হয়! এইসব চিন্তা করেই হয়ত তখনকার দিনে সমাজবিদরা বুড়িগণ্ডকের উৎসস্থলে প্রাপ্ত এ বিশেষ শিলাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
এইসব কথা বললাম বলে মনে কোরনা আমি শালগ্রাম শিলাপূজার অপ্রয়োজনীয়তার কথা বলছি। তোমরা এখানে যারা রয়েছ তারা বেশিরভাগই যুবক আর তাদের মনোজগতে দেখছি এইসব ব্যাপারে interest কম, তাই কথাগুলো বললাম।
আর তোমরা যারা এইসবে বিশ্বাসী রয়েছো_ তাদের যেন আবার ভাব ছুটে না যায় ! যার যাতে বিশ্বাস - তাতেই ফললাভ হয়। কোন বিরোধ নেই। এখনকার ছেলেরা সবেতেই কারণ খোঁজে, বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা চায় তাই আমাকে তাদের মত করে বলতে হয়। যারা শালগ্রাম শিলাকে নারায়ণজ্ঞানে পূজা করে_ তারা ঐটার মধ্যে দিয়েই আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করবে। আর যাদের শালগ্রাম শিলা ভাল লাগে না তারা স্বামী বিবেকানন্দকে গ্রহণ করুক। স্বামীজীকে আদর্শ করে জীবনপথে এগিয়ে চললেই তাদের সব হবে। এটা স্বামীজীরই আশীর্বাদ যা সমস্ত যুবসমাজের উপর সবসময়ই রয়েছে।]
স্থান ~ পরমানন্দ মিশন । সময় ~ ১৯৯০, জুন । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ পূর্ণানন্দ মহারাজ, নগেন, পঙ্কজবাবু ইত্যাদি ।
জিজ্ঞাসু ;– জয়দেব গোস্বামীর জীবনীমূলক গ্রন্থে ওনার ছোটবেলার কোন ঘটনা বিশেষ জানা যায় না, এ সম্বন্ধে যদি কিছু আলোকপাত করেন তাহলে বড়ই কৃতার্থ হই।
গুরুমহারাজ ;— জয়দেব গোস্বামীর পিতা ও মাতার নাম ভোজদেব ও বামাদেবী…। তাঁর পিতা আপনভোলা ঈশ্বরপরায়ণ লোক ছিলেন। জয়দেব অতি অল্প বয়সেই পিতাকে হারান। কিন্তু তাঁর পিতা নিজে একজন বিদ্যানুরাগী ছিলেন বলে তিনি জয়দেবকে বাল্যকালেই তৎকালীন বঙ্গদেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাদান-কেন্দ্র নবদ্বীপে তাঁর গুরুদেবের টোলে ভর্তি করে দেন। তখনকার দিনে ছাত্ররা গুরুগৃহে অন্তেবাসী হয়ে লেখাপড়া করত। আর যেহেতু জয়দেব দূরাগত ছাত্র এবং অত্যন্ত মেধাবী, ভদ্র, নম্র ও অন্তর্মুখী ছিলেন_ফলে আচার্য ও আচার্যপত্নী তাঁকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। ছাত্রাবস্থায় গুরুদেবের সাথে এবং পরবর্তীকালে বহুবার তিনি নীলাচলে মহাপ্রভুর সন্দর্শনে গিয়েছিলেন। তাঁর আচার্য যেহেতু প্রভু জগন্নাথের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন, তাই ছোট বয়স থেকেই জয়দেবের মধ্যেও প্রভু জগন্নাথের প্রতি একটা আন্তরিক টান ছিল। এই দেখেই হয়তো পরবর্তীকালের পদকর্তারা জয়দেব গোস্বামীকে প্রভু জগন্নাথের অংশ বা বন্ধু হিসাবে বর্ণনা করেছেন। এগুলি ভক্তের ভাব, ভক্তেরা তাদের ইষ্ট বা আরাধ্যকে যে কোনো ভাবে বর্ণনা করতে পারে বা উপস্থাপনা করতে পারে — এতে দোষের কিছু হয় না। ‘মন্নাথঃ শ্রীজগন্নাথো মদগুরু শ্রীজগদগুরুঃ’— এই ভাব। ফলে জয়দেব পুরীধামে পণ্ডিত হিসাবে বিশেষত সুগায়ক হিসাবে খুবই পরিচিত ছিলেন। ওখানেই নর্তকী পদ্মাবতীর সাথে তাঁর পূর্ব থেকেই পরিচয় হয়েছিল।
যাইহোক নবদ্বীপে পড়াশুনা করার সাথে সাথে তিনি সঙ্গীতের চর্চাও করতেন। সুরধুনীর তীরে তীরে প্রত্যুষে ও প্রদোষে চারিদিকে যখন শাঁখ, কাঁসর-ঘন্টাধ্বনিতে ভগবানের জয়গানে মুখরিত হোত__একাকী জয়দেব তখন পুণ্যতোয়া ভাগীরথীর তীরে বসে সুললিত সংস্কৃতের অনুপম ছন্দে উদাত্ত সংগীতের মূর্ছনায় আকাশ-বাতাস আমোদিত করে তুলতেন! কলুষনাশিনী গঙ্গার তীরে সমাজের কলুষমুক্তকারী নররূপী ভগবানের আগমন প্রার্থনা করতেন। তাঁর সেই আকুল প্রার্থনারই রূপ পরবর্তীকালের প্রেমাবতার শ্রীশ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু। 'মানুষের মাঝে আমরা দেখেছি মানুষের ঠাকুরালি' — কবি জয়দেবের সেদিনের সাধনাকে মর্যাদা দেবার জন্যই পরবর্তীতে আমরা দেখতে পাই_ মহাপ্রভূ সুরধুনীর তীরে বসে কখনও শিষ্যদের কাছে জয়দেবের পদাবলীর ব্যাখ্যা করেছেন, কখনও 'জগন্নাথঃস্বামী, নয়নপথগামী ভবতু মে' গাইতে গাইতে নীলাচলের দিকে ছুটে চলেছেন।
পড়াশুনার পাঠ শেষ হয়ে গেলেও সাধক জয়দেব নবদ্বীপেই থেকে গিয়েছিলেন। হঠাৎ একদিন তীর্থযাত্রী স্বগ্রামবাসী জনৈক ব্যক্তির কাছে খবর পান যে, তার মা মৃত্যুশয্যায়। দীর্ঘদিন বৃদ্ধা মায়ের খবর পাননি জয়দেব। এখন মায়ের কথা মনে পড়ায় প্রাণটা যেন হু- হু করে উঠল। মায়ের দর্শনের মানসে ছুটে চললেন সুরধুনীর তীর ছেড়ে অজয়ের তীর ধরে কেন্দুবিল্বের পথে। কয়েকদিনের পথশ্রমে ক্লান্ত জয়দেব সেখানে পৌঁছে কি দেখলেন? তিনি দেখলেন তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়েছে, আর তাঁর পৈতৃক ভিটাবাড়ির জায়গা তাঁর জ্ঞাতিরা দখল করে নিয়েছে। তাঁর নিজের বলতে আর কেউ নাই-- কিছুই নাই। তাঁর মাতুলেরা ধনী ছিলেন কিন্তু তাঁরাও জয়দেবকে স্থান দিতে অস্বীকার করেন। ফলে ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই জন্ম-ফকির, জন্ম-বাউল জয়দেব পথে পথে ঘুরতে লাগলেন ___অজয়ের তীরে তীরে, বনে-জঙ্গলে, শ্মশানে-মশানে! সঙ্গী শুধু ঈশ্বর। তাঁর উদ্দেশ্যে নিবেদিত হতে থাকল প্রাণের স্বতোসারিত সংগীত, সংগীতের মাধ্যমে ই সাধনা।এইসময় মনুষ্যসমাজের সবাই তাঁকে ত্যাগ করলেও একজন বন্ধু কিন্তু সর্বদা জয়দেবের সঙ্গে সঙ্গে থাকার চেষ্টা করত। সাধনার চূড়ান্ত পর্যায় চলছে তখন জয়দেবের, ফলে সেইসময় তাঁর অন্ন-বস্ত্রের প্রয়োজনের হুঁশ থাকত না। বন্ধুটিই সময় মত তাঁকে সেগুলির জোগান দিত।
কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছা ছিল ভিন্ন। বিশুদ্ধ বাউল বা উদাস বাউলরূপে ভগবান স্বয়ং লীলা করবেন, তাই যুগল সাধনার ধারাকে সিদ্ধ করার জন্য শক্তিশালী সাধক জয়দেবকে হয়তো তিনিই নির্বাচিত করলেন। ফলে একক সাধনায় যতদূর পৌঁছানো যায় ততটা পৌঁছানোর পর _ভগবান যুগল মূর্তিতে জয়দেবের ইষ্ট তথা আরাধ্যরূপে, একদিন সহসা কদম্বখণ্ডীর ঘাটে আবির্ভূত হলেন ! জয়দেব ঈষ্টকে দর্শন করে নয়ন সার্থক করল। এইবার ঈশ্বর তাঁর যুগলসাধনার সাথী হিসাবে লক্ষী-অংশভূতা পদ্মাবতীকে পাঠালেন তাঁর কাছে। লোকমুখে জয়দেবের করুণ অবস্থা শুনেই ব্যাকুলা পদ্মাবতী পিতাকে সঙ্গে করে কেন্দুবিল্বের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই সবকিছু হয় একথা ঠিকই। কিন্তু জয়দেব-পদ্মাবতীর মিলন যে শুধুই স্বপ্নাদেশ লব্ধ এরূপ নয়, ওদের মধ্যে যথেষ্ট পরিচয় ও প্রেমপূর্ণ সম্পর্ক পূর্ব থেকেই ছিল।
জয়দেবের জীবনীর যে ঘটনাগুলো এখানে আলোচনা করা হল তার একটা ইতিহাস আছে। আমি একবার ন’কাকার সঙ্গে জয়দেব-কেঁদুলি বেড়াতে গিয়েছিলাম। রাত্রে আমরা ওখানকার একটা আশ্রমে থাকার জায়গা পেলাম। অনেক রাত পর্যন্ত সাধক বাউলরা বাউলগানের মাধ্যমে ঈশ্বরের আরাধনা করল। সে এক নৈসর্গিক পরিবেশ! আনন্দের রেশ নিয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা শুতে গেলাম। ন’কাকা ঘুমিয়ে পড়লেও আমার আর ঘুম এল না। উন্মুক্ত আকাশের নিচে নিশীথরাতে একা একা বসে বহুদিন পূর্বের সাধককবি জয়দেবের কথাই একান্তে ভাবতে লাগলাম। ভাবতে ভাবতে কখন তন্ময়তা এসেছে। ফিরে গেছি অতীতের অতলে। হঠাৎ একটি সুদর্শন বালকের ডাকে আমার চেতনা বাস্তবে নেমে এল। বালক নিজের পরিচয় দিয়ে বলল
—”আমিই জয়দেব।” এরপর সে তার সমগ্র জীবনী আমার কাছে বলতে লাগল এবং এও বলল বিভিন্ন গ্রন্থে যে জীবনী লেখা আছে তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। তারপর ওনার সাথে বাউলতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা হলো। এসব করতে করতেই পুবের আকাশে লালিমা দেখা দিল। বালকবেশী কবি জয়দেব আমাকে বিদায় জানিয়ে সহসা অন্তর্হিত হলো।
ওসব কথা এখন থাক্_তবে জেনে রাখবে যে, কোন মহাপুরুষ বা মহাসাধকের সাধন-ভূমিতে সদাসর্বদাই তাঁর উপস্থিতি থাকে, উপযুক্ত ব্যক্তির চোখে ঠিকই ধরা পরে যায়।
জিজ্ঞাসু ;– আচ্ছা গুরুজী! শিষ্য বিপদে পড়লে কি সবগুরুই শিষ্যকে রক্ষা করতে পারেন?
গুরুমহারাজ :— আমি তো বারবার তোমাদের কাছে এই কথাটা বলি যে, গুরু কোন ব্যক্তি নন, গুরু একটা post বা পদ, আর এছাড়া রয়েছে গুরুপরম্পরা। “জয়গুরু” বলে তুমি যদি আন্তরিক প্রার্থনা করো তাহলে তোমার আবেদন সঠিক স্থানে পৌঁছায় বইকি। কোন বোধি বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিকে যদি সরাসরি তুমি গুরু হিসাবে পেয়ে থাক, তাহলে তিনি তাঁর যোগশক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে তোমাকে বিপদমুক্ত নিশ্চয়ই করতে পারেন। আবার তেমন কোন বিশেষ প্রয়োজনে তিনি সেখানে প্রকটও হতে পারেন। স্থূলশরীরে না থেকেও স্থূলশরীর ধারণ করে আসতে পারেন তোমার কাছে!
বহু মহাপুরুষের জীবনীমূলক গ্রন্থে এমন বহু ঘটনার উল্লেখ পাবে! স্বামী যোগানন্দ লিখিত'যোগীকথামৃত' গ্রন্থে রয়েছে যে, তাঁর গুরু যুক্তেশ্বরানন্দ মহারাজ শরীর ছাড়ার বহু বছর পরে স্থূল শরীরে প্রকট হয়ে যোগানন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এরকম আরও অনেক আছে। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক পরম্পরার গুরুরা এরকম অনেক কিছুই করতে পারেন। আর সাধারণ গুরু বা গৃহী গুরুদের ক্ষেত্রেও এইরূপ সাহায্য আসতে পারে যদি সেই গুরু তাঁর পরম্পরার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন এবং শিষ্যদের সঠিক ধারণা দিতে পারেন _তাহলে 'জয়গুরু' বললে বিপদের সময় সেই গুরুপরম্পরা থেকেও সাহায্য আসবে। তবে জগতে এমন কিছু গুরু আছেন যাঁরা শুধুমাত্র বুদ্ধি খাটিয়েই হয়তো শিষ্যের কিছু জাগতিক কল্যাণ করে দেন। তোমাদেরকে এমন একজনের উদাহরণ দিচ্ছি _শোনো!
উত্তরভারতে ‘টাঁটবাবা’ (‘চটবাবা’) নামে একজন গুরু ছিলেন। তাঁর বেশ কিছু ব্যবসাদার শিষ্য ছিল যারা পাট বা চটজাতীয় জিনিসের ব্যবসা করত। একসময় বাজারে নাইলন, পলিথিন ইত্যাদি আমদানি হতে শুরু করায় চটব্যবসায় মন্দা দেখা দিল। শিষ্যেরা গুরুদেবের শরণাপন্ন হল। গুরুদেব বললেন, ‘ঘাবড়াও মৎ বেটা, কুছ না কুছ বেওয়স্তা হো যায়েগা।’ এরপর দিন সমস্ত ভক্তদের অবাক করে গুরুদেব চটের পোশাক পরে ভক্তদের দর্শন দিলেন! এরপর থেকে তিনি সবসময়ই চটের পোশাক পরতে লাগলেন। কৌতুহলী হয়ে ভক্তরা গুরুদেবকে হঠাৎ করে তাঁর চটের পোশাক পরার কারণ জিজ্ঞাসা করল। গুরুদেব তখন সুযোগমত চটের গুণাগুণ ব্যাখ্যা করে একটা নাতিদীর্ঘ ভাষণ দিয়ে দিলেন। মুখে মুখে চটের গুণের কথা শুনে এবং গুরুদেবের চটবস্ত্র পরা দেখে বাবার চেলারাও চটবস্ত্র পরা শুরু করল। একটা শহরের হাজার হাজার নারী-পুরুষ যদি সমস্ত পোশাক ফেলে চটবস্ত্র পরতে শুরু করে তাহলে চটের দাম তো বাড়বেই ! এর ফলে সেইসব ব্যবসায়ীর ব্যবসায় লাভ হতে লাগল খুব। আশ্রম উন্নয়নকল্পে কিছু মোটা Donation-ও দিয়ে দিল তারা। কিন্তু মজাটা হোলো এই যে, ভক্ত-শিষ্যরা পরম্পরাক্রমে এখনও চটবস্ত্রই পরে থাকে। পুরুষগুলো তো চটবস্ত্র পরেই — মেয়েরাও চটের শাড়ি পরে, যারা অফিসার তারা চটের কোট-প্যাণ্ট-টাই ব্যবহার করে।
তাহলে এখন বুঝলে তো_কতরকম ভাবে গুরুরা শিষ্যদের উপকার করতে পারে!!
জিজ্ঞাসু :— গুরুর প্রতি অন্যায় আচরণে কি ধরনের দোষ হয়?
গুরুমহারাজ :—- গুরুর প্রতি অন্যায় আচরণ করলে গুরু যদি রুষ্ট হন_ তাহলে অপরাধকারীর মহাপাতক হয় ! এর ফলে আধ্যাত্মিক উত্তরণের পথ তো বন্ধ হয়ই, ত্রিবিধ ক্লেশ উপস্থিত হয়,বিভিন্ন প্রারব্ধের কষ্টও ভোগ করতে হয়। তবে_ গুরু বলতে তোমরা যেন যজমানগিরি করা সাধারণএকজন ব্যক্তি অথবা বৃত্তিভোগী গোঁসাই-গুরুর কথা বুঝো না! গুরুপরম্পরার গুরু – যাঁরা লোককল্যাণের নিমিত্যই শুধু শরীরধারণ করেনআমি তাঁদের কথা বলছি! তাঁরা ঠিক যেন মালার পুঁতির মত। একটা পুঁতিতে টান পড়লে যেমন সমস্ত মালাটাই কেঁপে ওঠে, তেমনি যে কোন আধ্যাত্মিক গুরুকে আঘাত করলে গোটা গুরুপরম্পরাকেই আঘাত করা হয়, এমনকি জগৎগুরুর chain-এ পর্যন্ত টান পড়ে। এবার বোঝ, এই বিরাট chain-এর যদি reaction হয় তাহলে কি সাংঘাতিক ব্যাপার হতে পারে ! তাই গুরুদ্রোহিতার ন্যায় মহাপাতক আর হয় না। এজন্য অবতারকল্প মহাপুরুষগণ বা প্রকৃত সদগুরুগণ কখনই কোন শিষ্যের কোন অপরাধ নেন না। যেহেতু তাঁরা এই রহস্য সম্বন্ধে অবগত তাই পিতামাতা যেমন অবোধ শিশুর সমস্ত অপরাধ-অত্যাচার হাসিমুখে সহ্য করে নেন তেমনি এঁরাও শিষ্যের কোন অপরাধ নেন না, কখনই নিজেরা মানসিকভাবে আহত হ’ন না।
এইজন্যই গুরুর প্রতি ‘গুরুভাব’ আরোপ করতে নেই__ অন্য কোন ভাব অর্থাৎ পিতা, মাতা, সখা বা পুত্রভাব আরোপ করে তাঁর সেবা করতে হয়। ফলে সেবাকার্যে যদি কোন বিচ্যুতি ঘটেও তাহলে সরাসরি শিষ্যের উপর কোন আঘাত আসে না। আমি তো এখানকার দীক্ষিতদেরকে ছেলে বা মেয়ে ভাবি, অথবা ভাবি পিতা বা মাতা, অনেককে সখাও ভাবি। ফলে এরা কোন অন্যায় করলেও আমি তাদের দোষ দেখি না। দোষ দেখলে তো প্রতিনিয়তই সকলের হাজার দোষ দেখা যাবে। কারণ ক’জন সেবা করতে জানে? তাছাড়া অনেকেই তো আমাকে কথা দিয়ে কথা রাখে না। সকলেই তো সেবা না করে ‘খেদমত’ খাটে, নিঃস্বার্থ সেবা হয় কোথায়! নাহলে তো সকলেই শুধু সেবার দ্বারাই রামদাস কাঠিয়া বাবার ন্যায় সিদ্ধ হয়ে যেত! তা আর ক’জনের হ’ল! তাই ঠিক ঠিক সেবা হলে শুধু সেবার দ্বারাই সিদ্ধ হওয়া যায়।
