স্থান ~ পরমানন্দ মিশন (বনগ্রাম) । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ সন্তোষ মান্না, ধীরেনবাবু, তপন অধিকারী এবং সিঙ্গুর সহ অন্যান্য স্থানের উপস্থিত ভক্তবৃন্দ ৷
জিজ্ঞাসু :– বনগ্রাম আশ্রমে এসে মনে হয় পৃথিবীতে এখনও অনেক ভালাে মানুষ আছে, আর সমাজে যখন ঘুরি _তখন মনে হয় সমাজের সব মানুষই বােধহয় মনুষ্যত্ব হারিয়েছে।
গুরুমহারাজ :– বর্তমান কালটা এই রকমই খানিকটা চলছে _ corruption-এ ভরে গেছে সমাজ ! ভােগবাদী মনােভাব মানুষকে অর্থলােলুপ করে তুলছে, আর তারজন্যই কে কত টাকা রােজগার করতে পারে তার যেন প্রতিযােগিতা শুরু হয়েছেসেটা সদুপায়েই হােক আর অসদুপায়েই হােক না কেন! এর ফলে কি হচ্ছে জানাে—মানুষ টাকা জমানাের নেশায় পড়ে যাচ্ছে। হয়তাে একটা-দুটো সন্তান—তার জন্য কত টাকা জমানাে প্রয়ােজন বা কটা ব্যবসা খুলে রাখা দরকার—এর পরিমিতিবােধ হারিয়ে ফেলছে! এইভাবে ব্যবসা বাড়াতে বাড়াতে অথবা অসৎ উপায়ে টাকা জমাতে জমাতে আয়কর ফাঁকি দেবার প্রবণতা আসছে। কারণ একটা নির্দিষ্ট amount-এর পর আর তােমার রােজগার white থাকছে না। তখন বেনামে টাকা জমাও অথবা বেনামে জায়গা কেনাে! তারপর সেটাও যখন saturated হয়ে যাচ্ছে তখন বিদেশী ব্যাঙ্কে জমা করাে ! এইভাবে দেশের টাকা বিনা utilisation-এ বাইরে চলে যাচ্ছে। এইভাবে সমাজের একটা শ্রেণী সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে_ আর একটা শ্রেণী মাথা কুটে মরছে কিন্ত উঠতে পারছে না।
এবার বলো, কোন academic education দিয়ে কি মনুষ্যত্বের শিক্ষা হবে ? কোন রাজনৈতিক আদর্শ কি পারবে রাজনৈতিক ক্ষমতালােভীর ‘লােভ’ কমাতে ? তাহলে এর remedy কি ? উত্তর একটাই –“ধর্মাচরণ করা”। কোন বােধিব্যক্তির চরণতলে কৃতাঞ্জলিপুটে বসে সত্য, ত্যাগ, প্রেম ও শান্তি শিক্ষার অনুশীলন শিক্ষা করা। কোন বােধি- ব্যক্তিকে না পেলে স্বামীজীর (বিবেকানন্দ) ন্যায় সমাজ শিক্ষকের আদর্শে নিজেকে গড়েতুলতে হবে বা নিজেদের সন্তানদেরকে.অনুপ্রাণিত করতে হবে। স্বামীজী বললেন—“হে ভারত, ভুলিও না–....তােমার উপাস্য উমানাথ সর্বত্যাগী শঙ্কর”। এখানে ভারত অর্থে ‘ভা'–'রত’ অর্থাৎ যিনি জ্ঞানকে বা জ্যোতিকে আদর্শ করে চলেন। সুতরাং স্বামীজীর এই বাণী বিশ্বের সকল উন্নত আদৰ্শকামী মানুষের জন্যই প্রযােজ্য। অনেকে ভাবে স্বামীজী বােধ হয় ভারতবাসীর জন্যই সব কথা বলেছেন, কিন্তু তা নয় ! স্বামীজী একালের ঋষি, তিনি যা বলেছেন তা সবই তাে উপনিষদ। ফলে তা সর্বদেশে সবার জন্যই প্রযােজ্য। কোন দেশে, কোন সমাজে ত্যাগ ছাড়া কোন উন্নত আদর্শ রূপ পেয়েছে কি ? সত্য, ত্যাগ, প্রেম ও শান্তির অনুশীলন ছাড়া কোন্ মানুষ ‘মহাপুরুষ’ অ্যাখ্যা পেয়েছে ? আজও মানুষ যখন তাদের ছােট ছােট ছেলে-মেয়েদের বা অধস্তনদের সামনে নিজেদের কোন অতীত গৌরবময় ঘটনার উল্লেখ করে তখন দেখবে তার মধ্যে heroic ভাব থাকলেও সত্যনিষ্ঠা, কর্তব্যবােধ, ত্যাগ, পরােপকার, ভালবাসাজনিত উদাহরণই বেশী থাকে। হয়তাে কোন মানুষ ঠিকমতাে সততা, সংযম নিজের জীবনে পালন করতে পারে না – কিন্তু সে তার বন্ধু, সন্তান বা অধস্তনের কাছে সততা, সংযম ইত্যাদি আশা করে।
এইভাবেই nature বা প্রকৃতি তথা মহাপ্রকৃতির কিছু সার্বজনীন রীতি বা নিয়ম রয়েছে। তার মধ্যে দিয়েই সকলকে যেতে হয়! সাধনার গভীরে, ধ্যানের গভীরে, এই সত্যেরই বােধ করেন ঋষিরা। এরপর তারা মানবসমাজের কল্যাণের নিমিত্ত কিছু সত্যপালনের নির্দেশ দিয়ে যান মানুষকে। যারা সেটা গ্রহণ করে জীবনে পালন করে তারাই সুখ বা শান্তি খুঁজে পায়_আর বাকিরা শিক্ষিত হয়, ধনী হয়, ক্ষমতাশালী হয়, সমাজনেতা হয় কিন্তু সুখ বা শান্তির সন্ধান পায় না ! তাছাড়া ইহজন্মের কৃতকর্মের ফল পরজন্মাদিতে সংস্কাররূপে, কর্মফলরূপে সঞ্চিত হয় ফলে পরজন্মে এইগুলির অপব্যবহারজনিত ভােগ বা ভােগান্তি ভুগতে হয়। কিন্তু ঠিক ঠিক জ্ঞান বা শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনকে কোন না কোন উন্নত আদর্শের সঙ্গে জুড়ে দিলে আর ভয় থাকে না। তাই অর্থ রােজগার নিশ্চয়ই করবে—সন্তান-সন্ততির জন্য সঞ্চয় নিশ্চয়ই করবে—কিন্তু সেটা একটা limit পর্যন্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তােমার পরিবারের উত্তরসূরিদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়। ব্যস্ তারপর রােজগার হলে তোমার প্রতিবেশীর জন্য ভাবোতোমার দেশবাসীর জন্য ভাবাে। তারপরেও যদি ভাবতে চাও, তাহলে শুধু দেশ নয় বিশ্বের কোণে কোণে যত মানুষ অন্ন বস্ত্র-বাসস্থানের অভাববােধ করছে, তাদের পাশে দাঁড়াও। এইগুলিই ভগবৎ প্রীত্যর্থে কর্ম, আর শুধু নিজের পরিবার-পরিজনদের জন্য সঞ্চয় করা বা ভােগবিলাসের ব্যবস্থা করা—এটা আত্মেন্দ্রিয় প্রীত্যর্থে কর্ম। ‘মনুষ্যত্ব অর্জন’ বলতে এই জ্ঞানটুকুই লাভ করা! এই জ্ঞান লাভ করা অতি সহজ, কিন্তু ব্যবহারিক জীবনে বা আচরণে আনতে পারছে না মানুষ। হয়তাে ব্যাপারটা বুঝছে কিন্তু পরিবেশ ও পরিস্থিতি তাকে অন্য দিকে নিয়ে চলে যায়, আর পাঁচজনের দেখাদেখি তাদের মতাে হতে চায়। এখানেই প্রয়ােজন personality-র। তােমাকে দেখে আর পাঁচজন অনুপ্রাণিত হােক—তুমি আর পাঁচজনের দ্বারা প্রভাবিত হবে কেন? মানুষ হয়ে জন্মেছ—মানুষের জন্য ভাববে না! আর পাঁচজন মানুষ তােমারই মত সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নায় গড়া। তার দুঃখ তােমার দুঃখ ভাবতে পারছো না—তার সুখে সুখী হতে পারছো না! তাহলে ধিক্ তােমার শিক্ষায়, ধিক্ তােমার ধনে অথবা সম্মানে !
আমার এখানে যারা আসে তাদেরকে আমি এই কথাই বলি। তাদের অনেকে পালনও করে—আর তুমি সেইসব দেখছ বলেই ‘এখানে অনেক ভালো মানুষ রয়েছে’_এরূপ ধারণা করছো। তবে জানবে পৃথিবীর সবদেশেই অনেক ভালাে মানুষ আছেন—তারা মানুষকে ভালােবাসেন, মানুষের কথা চিন্তা করেন—কিসে তাদের ভালাে হবে তার ব্যবস্থাও করেন ! তুমিও তাদের যে কোন কারও সাথে মিলেমিশে মানুষের ভালাের জন্য কাজ করাে।
জিজ্ঞাসু :– ‘এখানে অনেক ভালো মানুষ আছে’ বললেন, এখানে যারা আসেতারা সবাই নয় কেন ?
গুরুমহারাজ :– দূর পাগল ! এতক্ষণ ধরে বুঝলে কি ? পৃথিবীর সব মানুষ কি একই প্রকৃতির হয় নাকি ? সারা জীবনে তােমার সাথে ক’জনের মনের মিল খুঁজে পেয়েছ ? তাছাড়া দ্যাখোএখানে যারা আসে তাদের সকলেই কি জীবনের পরিবর্তন সাধনের জন্য আসে নাকি ? কেউ আসে স্রেফ বেড়াতে, কেউ রুচি বদলাতে, কেউ আসে সমালােচনার খােরাক খুঁজতে, কেউ লৌকিক কিছু পেতে, কেউ অলৌকিক বা অতিলৌকিক কিছু আছে কি না তার খুঁজতে_ আবার কেউ পারমার্থিক সাধনে। কিন্তু শেষের অর্থাৎ পারমার্থিক সাধনের জন্য আসা ব্যক্তির সংখ্যাটি তাে কম, তবে অবশ্য_ এটাই রীতি। পিরামিড দেখেছ বা পর্বতশীর্ষ, গােড়াটা বিশাল কিন্তু চূড়াটি যেন বিন্দু বা অত্যল্প। যে কোন ক্ষেত্রে এটাই হয়, সেরা বা ভালাের সংখ্যা অল্পই হয়। এই যে সিঙ্গুরের সন্তোষবাবু বসে আছেন—সব্য (ওনার ছেলে) যখন এখানে প্রথম এল, আমাকে বলল, “অলৌকিক (miracle) কিছু দেখাতে পারেন ?” অলৌকিক বা miracle নিয়ে বেশীর ভাগ মানুষ খুবই নাচানাচি করে কিন্তু প্রকৃত miracle হবে যদি কোন মানুষের জীবনে জীবনযােগ করে তার জীবনের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া যায়! এতে সমাজ মনুষ্যত্ববােধে উপনীত একটা মানুষ উপহার পায়, মহাপুরুষেরা এটাই করে থাকেন। তাঁদের সংস্পর্শে এসে দানব মানব হয়, মানব মাধব হয়।
যাইহােক_সব্যর কথায় ফিরে আসি! আমাদের আশ্রমের পুকুরের পাড়গুলাে তখন সবে কেটে কেটে পরিষ্কার করে সমান করা হচ্ছিল। একজন ভক্ত কিছু পটলের গেঁড়াে দিয়ে গেছিল_ মুরারী মহারাজ সেগুলাে লাগানাের সময় আমাকে ডেকে নিয়ে গেল। ওখানে তখন আমি মাটি সরিয়ে পটলের গেঁড়ােগুলাে লাগাচ্ছি, সেই সময় সব্য প্রথমবারের জন্য বনগ্রামে এসে পৌঁছেছিল।এর- কাছে খবর নিয়ে আমরা যেখানে কাজ করছিলাম ও সেখানে গিয়ে হাজির! সব্য আমার দিকে না তাকিয়েই আমাকে ঐ জিজ্ঞাসাটা করেছিল। কারণ ওর ধারণা হয়েছিল _চোখে চোখ রেখে কথা বললে বােধ হয় আমি ওকে hypnotise করব এবং ওকে আমার শিষ্য করে নেব। আমি তো মাটির দিকে তাকিয়েই কাজ করছিলাম, তাই ওর দিকে না তাকিয়েই বলে দিলাম— “আমি miracle জানি না, তবে তুমি আমার miracle হও!” কি গো সন্তোষবাবু ! আজকের সব্য miracle-ই তাে ? (সন্তোষবাবু জোড়হাত করে বললেন, “হ্যাঁ বাবা ! সব্যর পরিবর্তন miracle-ই তাে !")
দ্যাখো, এইটা তো ঈশ্বরের জগৎ—তিনিই সকল কাজ করিয়ে নেন, ভালাে-মন্দ সকল কাজের তিনি নিয়ন্তা। কিন্তু কোন মহাপুরুষের মধ্যে ঈশ্বরের প্রকাশ মানে তাঁরা যেন Power House, এঁদের সংস্পর্শে মানুষের জীবনধারার পরিবর্তন হয়ে যায়, ফলে কম শক্তিসম্পন্ন কোন ব্যক্তিও হয়তাে বড় বড় কাজের বীজ বপন করে ফেলে। এটা মহাপুরুষের সান্নিধ্যের প্রভাব বা তার কৃপা!
তাঁরা ছাগল দিয়েও যব মাড়াই করে নিতে পারেন। এই উদাহরণটা দেওয়ার উদ্দেশ্য হল এই যে, যব মাড়াই কাজটা খুবই কঠিন! কারণ যব শিষের সাথে এমনভাবে শক্ত অবস্থায় লেপ্টে থাকে যে, তাকে আলাদা করা খুবই কঠিন। আর এদিকে ছাগল ছােট প্রাণী, ছােট এবং সরু পা-বিশিষ্ট প্রাণী। তার দ্বারা ধান বা গম–কি কলাই অর্থাৎ যেগুলি অল্প আয়াসে মাড়াই হয়, সেগুলিকেই মাড়াই করা যায় না তাে যব মাড়াই ! কিন্তু মহাপুরুষদের ক্ষেত্রে অলৌকিক বলতে এটাই। তারা অতি নগণ্য— একান্ত সাধারণ কোন মানুষকে দিয়েও বিশাল কোন কাজ করিয়ে নিতে পারেন। আবার কোন শক্তিশালী যােগী বা জ্ঞানীকে কোন কাজ না করিয়ে খেলার মাঠের বাইরে বা side line-এ বসিয়ে রাখতেও পারেন। এটাকেই ‘লীলা’ বলা হয়েছে, যা বােঝা যায় না_ বুঝতে গেলে ‘বােঝা' বাড়ে। তবে কোথাও কোন জ্ঞানী বা যােগী বা কোন শক্তিশালী আধ্যাত্মিক মানুষ যদি সমাজ-উন্নয়নমূলক কাজ করেন, জানবে সেই কাজটা নিশ্চয়ই খুবই ভালাে হবে, সেই কাজটি শ্রীমণ্ডিত হবে, কারণ সেখানে যে আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্যের প্রকাশ থাকে।
স্বামী বিবেকানন্দ যখন ভারত ভ্রমণ বা বিদেশভ্রমণ করছিলেন, তখন তাঁর সংস্পর্শে বিভিন্ন যুবক বা বিভিন্ন মানুষ এসেছিল। তাদের অনেকের কথা হয়তাে মানুষ জানে না কিন্তু কয়েকজনের কথা তাে মানুষ জানে_যেমন বালগঙ্গাধর তিলক, টাটা কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা জামসেদজী ইত্যাদি। 'স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার’–এই কথাটা প্রকৃতপক্ষে স্বামীজীই তিলককে বলেছিলেন _যখন তিলক কলেজের ছাত্র। তিলক কথাটা মনে রেখেছিল এবং সকলকেই এইকথা বলে উদ্বুদ্ধ করতাে ফলে পরবর্তীকালের মানুষ জানে যে—এটা তিলকের বাণী, কিন্তু তা নয়। টাটার সঙ্গে স্বামীজীর দেখা হয়েছিল ইংল্যাণ্ড যাবার পথে জাহাজের ডেকে। তখনকার দিনে জাহাজের যাত্রায় দীর্ঘদিন সময় লাগতাে, ফলে স্বামীজীর সঙ্গে ওনার শুধু একবারই নয় দীর্ঘ কথাবার্তা হয়েছিল। স্বামীজীই ওনাকে ভারতবর্ষে কলকারখানা করার কথা বলেন এবং কোন অঞ্চলে করতে হবে, পরিকাঠামাে কেমন হবে—এই সব কিছুর সম্পূর্ণ রূপরেখা করে দিয়েছিলেন। তাছাড়া স্বামীজী ওনাকে একটা মহামন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছিলেন,যেটা হোল __"labourer বা শ্রমিকই হচ্ছে যে কোন কারখানার লক্ষ্মী। তাদেরকে বঞ্চিত করলে, তাদের শ্রমের উপযুক্ত মর্যাদা না দিলে তারা ‘কামচোর’ হবে, হতাশায় ভুগবে, বিক্ষোভ হবে। সুতরাং কখনও যেন শ্রমিকদের বঞ্চনা কোরাে না। তাদের সঙ্গে এমন কোন আচরণ কোরাে না যাতে তারা ভাবে তুমি তাদের শােষণ বা বঞ্চনা করছ বরং তােমার আচরণে তারা যেন তােমাকে বা তােমার প্রতিষ্ঠানকে ভালােবাসতে শেখে। তাহলেই তােমার কোম্পানী বহুকাল স্থায়ী হবে বা এর উত্তরােত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে—আমার আশীর্বাদ তােমার সঙ্গে রইল"।
টাটা কিন্তু স্বামীজীর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। আজও যারা মালিকপক্ষ তারা ঐ নির্দেশিকা follow করে চলার চেষ্টা করে। দ্যাখােনা_ ভারতবর্ষে যখন ভালাে ভালাে কারখানা কর্মীবিক্ষোভের জন্য হয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথবা লালবাতি জ্বলছে __সেখানে টাটারা দিনকে দিন নতুন নতুন কারখানা খুলছে আর তা ছাড়াও ওদের ব্যবসা দেশের গণ্ডী ছাড়িয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। আর এখনও পর্যন্ত ভারতবর্ষে record রয়েছে যে, টাটাদের কোন কারখানায় কখনও কর্মীবিক্ষোভ হয় না! ভারতবর্ষে এটা ভাবা যায়! কিন্তু টাটারা তা করেছে এবং তার সুফল পেয়েছে।
এইরকম বিভিন্নভাবে কোন মহাপুরুষ দেশের বা জনগণের জন্য বিভিন্ন কাজ করে যান। একটা জাতিকে সামগ্রিকভাবে চাগিয়ে তুলে আনা চারটিখানি কথা নয় ! পরাধীন ভারতবর্ষে যেখানে মানুষ জাতীয়তাবােধ হারিয়ে ফেলেছিল, স্বাভিমান ভুলে গিয়েছিল সেই অবস্থায় "আধমরাদের ঘা মেরে বাঁচানাে"-র মতাে স্বামীজী কাজ করে গিয়েছিলেন। আবার দেখাে, বিশ্বভারতী বা শান্তিনিকেতন সৃষ্টির পিছনে প্রথম অনুপ্রেরণাকারী ছিলেন বামদেব। দেবেন ঠাকুর ভেবেছিলেন ওখানে ব্রাহ্মসমাজের প্রার্থনাগৃহ করবেন যাতে মাঝে-মধ্যে কলকাতা থেকে সকলকে নিয়ে নির্জনবাসে সাধন-ভজন করা যায়। উনি হিমালয়ে প্রায়ই যেতেন, কিন্তু সকল মানুষের তাে দূরবর্তীস্থানে ধ্যান করতে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই তিনি বােলপুরকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন যাতে কলকাতার কাছেও হয় আবার প্রকৃতির কোলে শান্ত-নির্জন পরিবেশও পাওয়া যায়।
জায়গা দেখার সময় ঘােরাঘুরি করতে করতেই উনি তারাপীঠের বামদেবের কথা জানতে পারেন। পরবর্তীকালে ঠাকুর পরিবারের অনেকেই বামদেবের খুবই ভক্ত হয়েছিল এবং ওরাই কয়েকবার বামদেবকে কলকাতায় নিয়েও গিয়েছিল। সে যাইহােক বামদেব দেবেন ঠাকুরকে দেখেই খুব সম্মান দিয়েছিলেন এবং স্থান mention করে বলে দিয়েছিলেন যে, “ছাতিমতলার ওখানে মায়ের কাজ হবে, বড় বড় building হবে—মা আমাকে দেখিয়েছে।”
এই কথার তাৎপর্য কি তখনই দেবেন ঠাকুর করতে পেরেছিলেন ? উনি প্রাথমিকভাবে ব্রাহ্মমন্দির বা আশ্রম মতাে কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রবীঠাকুরের প্রচেষ্টায় ওটি ধীরে ধীরে একটি বিশাল শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হল। এখনতাে এটা আন্তর্জাতিক University—পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ছেলে-মেয়েরাশান্তিনিকেতনে পড়ে—একে সংস্কৃতির পীঠস্থানও বলা যায়।
এইভাবে অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়—যেখানে কোন না কোন ভালমানুষ তৈরীর ব্যাপারে অথবা ভালাে কাজ করার ব্যাপারে মহাপুরুষদের প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ ভূমিকা থাকে। কোন জাতির জাতীয় বিপর্যয় বলতে প্রকৃতপক্ষে কাকে বলে জানাে—যখন সেই জাতি এইসকল মহান মানুষদের অমর্যাদা করে, তাদের জীবন বা জীবনমুখী শিক্ষাসমূহের ভুল ব্যাখ্যা করে। কোন জাতির উত্থানের জনক এঁরাই। তাই ধার্মিক পিতার অমর্যাদা করে যেমন পুত্রের গৌরব বৃদ্ধি পায় না, তেমনি জাতির প্রকৃত জনক যাঁরা, তাঁদের অমর্যাদা কোরে_ কি করে সেই জাতির গৌরব বৃদ্ধি পেতে পারে ! ভারতবর্ষ আবার স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে বিশ্বের দরবারে নিজেকে তুলে ধরতে পারবে সেইদিন—যেদিন সমস্ত ভারতবাসী তার দেশের মহাপুরুষদের মর্যাদা দেবে, তাঁদের আদর্শকে সকলে গ্রহণ করবে বা জীবনে পালন করবে। আর এটা যত তাড়াতাড়ি হবে ততই ভারতের মঙ্গল। এখনতাে দেখতে পাচ্ছি মহাপুরুষদের অমর্যাদা করার বা ভারতের সনাতন ঐতিহ্য বা আদর্শকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার একটা বিরাট প্রবণতা চলছে। আর এর পিছনে বিদেশীদের হাত রয়েছে—কিছু ভারতীয় ক্ষমতালােভী ও অর্থলােভী বুদ্ধিজীবি মানুষ এই বিশাল চক্রান্তের শিকার হচ্ছে। বিদেশীচক্র এই সমস্ত দেশীয় মানুষের দ্বারাই বিভিন্নভাবে সনাতন ধর্মের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, অধ্যাত্মের যে ধারা, যা একদিন গােটা পৃথিবীকে আলাে দিয়েছে, বাঁচা ও বাড়ার পথ বাৎলে দিয়েছে, তার অবমূল্যায়ন করে সাধারণ মানুষের কাছে project করছে। আর বেচারা layman—যারা অশিক্ষিত, দরিদ্র, চিন্তাশক্তিরহিত—তারা এগুলিকেই সত্য বলে মনে করছে। বাকী শিক্ষিত বা বুদ্ধিজীবীরা সুবিধাভােগী হওয়ায় জোরালাে প্রতিবাদও করছে না। এইভাবে বিদেশীদের এই project ভারতবর্ষে successfull হচ্ছে। সমাজে দর্শনের মাধ্যমে, সিনেমা-সাহিত্য-শিল্পের মাধ্যমে, ধর্মীয় আগ্রাসনের মাধ্যমে, সনাতন ধর্মের বিরােধী আদর্শ হু হু করে ঢুকে পড়ছে ভারতে। তােমাদের মতাে শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের এসব কথা বুঝতে হবে, বােঝাতে হবে মানুষকে। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে অনুপ্রাণিত হতে হবে তােমাদের। স্বামীজীর স্বপ্ন সফল করতে তােমরা আবার কবে জাগবে ?
ঋষিবাক্য অবহেলা কোরাে না—মহাপুরুষদের মর্যাদা করতে শেখাে। ‘তােমরা ভারতবাসী—ভারতীয় দৃষ্টিতে পৃথিবীকে দেখাে। অপরের চোখে নিজেকে দেখাে না। তাহলেই দেখবে তােমাদের দেশের মানুষও সৎ, সহজ ও সুন্দর হয়েছে’। তখন আর ভালাে মানুষ খুঁজতে আশ্রমে আসতে হবে না—সমাজের সর্ব স্তরেই ভালাে মানুষদের দেখা যাবে। মা জগদম্বা আমাকে অনেক ভালো মানুষ দেখিয়েছেন।
