স্থান ~ বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন ৷ উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ হাওড়ার মুখার্জী, চিত্তবাবু, সব্যসাচী মান্না ও আশ্রমিকগণ ।
জিজ্ঞাসু :– ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কি আবার শরীর ধারণ করবেন ? আর তিনিই কি পূর্বে পূর্বে রাম বা কৃষ্ণরূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ?
গুরু মহারাজ :– তোমার মাথায় এসব কি জিজ্ঞাসা গজালো বলোতো ? তোমরা, যারা কোলকাতা অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি– তাদের মনে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নিয়ে সব সময় একটা ভাবনা চলেএটা আমি জানি। কিন্তু তাই বলে শুধু জিজ্ঞাসার জন্য জিজ্ঞাসা করো না ! ‘জিজ্ঞাসা’ যদি শ্রদ্ধামিশ্রিত হয় এবং যে জিজ্ঞাসার উত্তর শুনলে তোমাদের কল্যাণ বা মঙ্গল হবে– সেইসব জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে আমারও ভালো লাগে। এখনকার বেশিরভাগ শিক্ষিত মানুষ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সম্বন্ধে পড়াশোনা করে, তাছাড়া বিভিন্নসংবাদপত্র,পত্র-পত্রিকা বা টেলিভিশনের মাধ্যমে শ্রীরামকৃষ্ণ এখন ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু তোমরা যারা পাঁচ রকমের আলাদা আলাদা ধরনের বই-ম্যাগাজিন ইত্যাদি পড়াশোনা করো– তাদের আবার ভাবনার জগতে নানা সমস্যা এসে দানা বাঁধে। বুঝতে পারছিতােমার জিজ্ঞাসাও সেইরকম কোন সমস্যা থেকে এসেছে। যাইহােক, তোমার জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছি শােন, ধারণা থাকলে বুঝতে পারবে।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ শরীর ছাড়ার ঠিক কয়েকদিন পূর্বে নরেন্দ্রনাথ (স্বামী বিবেকানন্দ) -কে বলেছিলেন, “যে রাম, যে কৃষ্ণ, ইদানীং সেই রামকৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হয়েছেন"। এবার কথা হচ্ছে যে __রাম, কৃষ্ণ অথবা শ্রীরামকৃষ্ণ এঁদের যদি আর পাঁচজন ব্যক্তির ন্যায়—শুধু ব্যক্তিসত্তা হিসাবে কল্পনা করে থাকো বা বুঝে থাকো, তাহলে কিছুই ধারণা করতে পারবে না। কারণ ব্যক্তি যখন জন্মায় তখন তার মৃত্যুও অবশ্যম্ভাবী। আর মৃত্যুর পর সেই ব্যক্তির আর কোন কার্যকারিতা থাকে না। তার সৃষ্টি, তার জীবনী ও বাণী, তার আচার-আচরণ পরবর্তীকালের মানুষকে কিছুদিন প্রভাবান্বিত করে রাখে এই মাত্র, ব্যক্তিটির কোন অস্তিত্ব আর থাকে না। কিন্তু যাঁদেরকে ভগবান বলা হয় তাঁরা শরীর ছাড়ার বহুকাল পর্যন্ত অস্তিত্ব-সম্পন্ন হয়েই ভক্তদের কাছে থেকে যান। বহু ভক্ত শত শত বছর ধরে তাঁদেরকে সূক্ষ্ম শরীরে এমনকি স্থুল শরীরেও দর্শন পেতে থাকেন ! এঁদেরকে "ভগবান" অর্থাৎ ঈশ্বরের অবতার বলা হয়েছে, অখণ্ড সত্তা যখন খণ্ড সত্তায় লীলাশরীর ধারণ করে যুগপ্রয়ােজনে কিছু কাজ সম্পন্ন করেন, সেই শরীরধারীই "ভগবান"। এবার দ্যাখো—ঈশ্বর তাে কোন ব্যক্তি নন—ঈশ্বর একটি তত্ত্ব। তাই 'রাম' শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নন–মর্যাদা পুরূষোত্তম রাম, ভগবান 'রাম' _একটি তত্ত্ব, সেইরূপ কৃষ্ণ-তত্ত্ব এবং রামকৃষ্ণ-তত্ত্ব। রামকে জানতে হলে তােমাকে রামতত্ত্ব জানতে হবে। এবার রামকৃষ্ণকে জানতে হোলে__ শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে যে রামতত্ত্ব ও কৃষ্ণতত্ত্ব বিদ্যমান ছিল—সেই রামকৃষ্ণ-তত্ত্বকে জানতে হবে। কোন ব্যক্তিকে জানতে হোলে _ তার বহিরাচরণ বা কিছু কথাবার্তা জানলে ঐ ব্যক্তির কতটাই বা জানা যায় ? একমাত্র তত্ত্ব ধরে অগ্রসর হতে পারলে, যে কোন বিষয়ের সঠিক ধারণা হয়। তবে জেনে রাখবে যে ধারণাও চূড়ান্ত নয় _ প্রকৃত প্রয়ােজন তাে ‘বােধের’ ! বােধ বা realisation-ই চূড়ান্ত ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যখন জীবিত ছিলেন—তার জীবদ্দশায় ক’জন ঠাকুরকে পরিপূর্ণভাবে বােধ করেছিলেন ? হয়তাে স্বামিজী আর সারদা মা, আর বাকিদের মধ্যে হয়তো কয়েকজন আংশিক বুঝেছিলেন । এর বাইরে যারা ছিল, তারা তাে তাঁকে ব্যক্তি শ্রীরামকৃষ্ণরূপেই দেখেছিল। 'কৈবৰ্ত্তদের কালীবাড়ীর পুরােহিত', 'পাগলা-বামুন' এসব নামেই তৎকালে তাঁর অধিক পরিচয় দেওয়া হােত। সাধারণ মানুষ যে শ্রীরামকৃষ্ণকে পায় সেটা তাে ১৮৮০-৮১ সাল থেকে ৮৬ পর্যন্ত। তার আগে কলকাতার কয়েকটি বিশেষ মানুষ ছাড়া (কেশব,বিজয় প্রমূখ) সাধারণ মানুষ ঠাকুরকে মােটেই পাত্তা দেয়নি !
দ্যাখাে, যে কোন কিছুকে মাপতে গেলে বা পরিমাপ করতে গেলে–চাই উপযুক্ত মাপনযন্ত্র। সাধারণ মানুষের কি “মিটার” আছে যা দিয়ে সে রামকৃষ্ণকে মাপবে ; অথবা শ্রীরাম বা শ্রীকৃষ্ণকে মাপবে ? মানুষ শুধু নয়, সব কিছুই ব্রহ্মের প্রকাশ —একথা সত্য। আচার্য শঙ্করও বলেছেন— ‘জীবঃ ব্ৰহ্মৈব নাপরঃ'। কিন্তু শক্তির তারতম্য রয়েছে তাে ? সচ্চিদানন্দ সাগরের ঢেউ আর বুদ্বুদ কি একই শক্তিসম্পন্ন ? যদিও দুটোই সমুদ্র থেকেই সৃষ্ট। সাধারণ মানুষ সেইরকম-ই বুদ্বুদ বইতাে নয় ! আর ঈশ্বরের অবতরণ হয় যে শরীরে– তাঁরা যেন মহাসমুদ্রের এক একটা বিশাল তরঙ্গ। অসংখ্য বুদ্বুদ প্রতিনিয়ত সাগরের বুকেই সৃষ্টি হচ্ছে, আবার তৎক্ষণাৎ সাগরেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর একটা বিশাল তরঙ্গ সৃষ্টি হয়ে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, আর তা শুধু সাগরের বুকেই সীমাবদ্ধ না থেকে উপকুলকেও প্লাবিত করে। নিয়মের মধ্যে থেকেও যেন তাঁরা নিয়মকে ছাপিয়ে যান, একই তত্বে সৃষ্টি হয়েও তাঁরা সৃষ্টির সীমাকে অতিক্রম করে যান _এঁদেরকেই বলা হয় ভগবান।
তবে, এই যে উদাহরণ দিয়ে বােঝানাের চেষ্টা করা হচ্ছে--এটা শুধু ঐ চেষ্টাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। জীবন বা মহাজীবন কোনটিরই কোন জড়বস্তু দিয়ে উদাহরণ দেওয়া যায় না। তবু উদাহরণ টেনেই বােঝাতে হয়—বেদ বা উপনিষদের ঋষিগণও এভাবেই সমস্ত রহস্য উদাহরণ সহযােগে বােঝানাের চেষ্টা করেছেন। যাইহােক, বুঝতেই পারছাে—এক একটা বিশালাকার তরঙ্গ যা পারে—বুদ্বুদ তা কখনই করে উঠতে পারে না। কোন বুদ্বুদ যদি ভাবে তরঙ্গকে পরিমাপ করব তাও তার দ্বারা সম্ভব নয়। স্বামী বিবেকানন্দ মাত্র ৩৯বছর শরীর ধারণ করেছিলেন, এই স্বল্পকালের মধ্যে তিনি যা করে গেলেন—ভেবে দ্যাখাে তাে, সাধারণ কোন মানুষের পক্ষে কি তা করা সম্ভব ছিল ?
তবে এখানে একটা কথা রয়েছে—বুদ্বুদের যে উদাহরণ দিচ্ছিলাম, সেখানে দেখা যায় বুদ্বুদ সৃষ্টি হয় জল আর বায়ুর সমন্বয়ে। যদি বুদুদের বায়ুটা না থাকে, তাহলে সাগরের জল আর বুদ্বুদের জল-এ পার্থক্য থাকে না। তেমনি মানবের অহঙ্কাররূপী বায়ু অপসারিত হলেই মানব মাধব হয়, জীব শিব হয়। আবার দ্যাখাে, এক ফোঁটা-এক ফোঁটা করে জল দিয়ে একঘটি পরিমাণ জলকে মাপা সম্ভব হোলেও,এভাবে সাগর বা মহাসাগরের জলকে পরিমাপ করা যায় না। কিন্তু এক ফোঁটা জলকে বিশ্লেষণ করলে বিজ্ঞানের যে জ্ঞান হয়, সেই একই তত্ত্ব দিয়ে সাগরের জলের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণও সম্ভব হয়। জলে যে ২ ভাগ হাইড্রোজেন এবং এক ভাগ অক্সিজেন রয়েছে তা জানা যায়।
এই ভাবে ব্যক্তিজীবনে নিজেকে জেনে পরতত্ত্ব বা পরমতত্ত্বকে জানার চেষ্টা করাই সাধনা। নিজেকে না জেনে শুধু অপরের খোঁজখবর রাখতে যাওয়ায় কোন লাভ হয় না–সাময়িক মস্তিষ্কচর্চা হতে পারে, কিন্তু আখেরে কোন উপকার হয় না।
জিজ্ঞাসু :– সাধন-ভজন ছাড়া তাে নিজেকে জানা যায় না। কিন্তু এই নিজেকে জানার কি একমাত্র সাধন-ভজনই পথ ?
গুরুমহারাজ :– মানুষ অহরহ ত্রিতাপ-জালায় ক্লিষ্ট হচ্ছে –আধিদৈবিক, আধিভৌতিক ও আধ্যাত্মিক। আধিদৈবিক বা মনের জ্বালায় সবসময় পুড়ছে মানুষ, মনঃকষ্ট আর কার নেই বলো ? এছাড়া রয়েছে আধ্যাত্মিক জ্বালা বা প্রাণের জ্বালা। এই জ্বালা যখন আসে, তখন বাকি সব জ্বালা তুচ্ছ বলে প্রতীয়মান হয়। যাইহােক, তাহলে এই যে তিন ধরণের ক্লেশের কথা বলা হোল—এইসব ক্লেশমুক্ত হতে গেলে সাধন-ভজন তাে করতেই হবে। জীবনধারণ যখন করেছো তখন এটা তাে হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছাে, যেসব ত্রিতাপ-জ্বালার কথা বলা হােল–এর থেকে পরিত্রাণের অন্য কোন উপায় নেই।
এবার বলা যেতে পারে পরিত্রাণের উপায় যখন রয়েছে, তখন মানুষ সেই উপায় অবলম্বন করছে না কেন ? দ্যাখাে, কৃমিকীট মলে বসবাস করে, সেখানেই বংশ বিস্তার করে অর্থাৎ সেখানে বসবাসেই তার আনন্দ–অন্যত্র স্থানান্তর ঘটালে হয়তাে মৃত্যুই হয়ে যাবে। তেমনি বদ্ধজীব ক্লিষ্ট হচ্ছে--তবু বেরােবার কোন চেষ্টা করছে না। মুমুক্ষজীব চেষ্টা শুরু করেছে—চেষ্টা না ছাড়লে ঠিকই বেরােবে। কারণ চেষ্টা থাকলেই গুরু এসে তার হাত ধরবেন——আর গুরুর নির্দেশ মেনে এগিয়ে গেলেই বদ্ধজীব মুক্ত হবে। তাহলে দেখা গেল গুরুর নির্দেশ মেনে সাধন-ভজনের দ্বারাই বদ্ধজীব মুক্ত হয়। শাস্ত্র চার প্রকার জীবের কথা বলেছে, (১) বদ্ধজীব (২) মুমুক্ষজীব, (৩) মুক্তজীব (৪) নিত্যমুক্তজীব। অবতার বা মহাজনগণ নিত্যমুক্ত। ওঁরা জীবন-ধারণ করে সাধন-ভজন যা করেন তা লোকশিক্ষার জন্য আর জগৎ কল্যাণের জন্য,__ তাঁর নিজের এসবের কোন প্রয়ােজন নাই। কথা হচ্ছিল বদ্ধজীব নিয়ে–আসক্তিরূপ বন্ধনই জীবের বদ্ধতার কারণ। আসক্তিযুক্ত-জীবই বদ্ধজীব এবং আসক্তিহীনতা বা অনাসক্তিতেই জীবত্বের মুক্তি ! তবে এই যে কথাটা বললাম _শুনে মনে হোতে পারে যে__তত্ত্বটা সহজ-সরল কিন্তু অভ্যাসের দ্বারা এটিকে আচরণে আনা অনেকটাই জটিল। কারণ এটিকে আচরণে আনতে হলে দু-চার দিনের অভ্যাসে কোন কাজ হবে না__দীর্ঘ অভ্যাসের প্রয়ােজন, আর নির্দিষ্ট পদ্ধতির অভ্যাস-পালনকেই তুমি হয়তো বলছো সাধন-ভজন, কেউ বলছে যােগ __ব্যাপারটা বুঝতে পারছো তো ?
বদ্ধজীব আর মুক্তজীবের ব্যাপারটা বােঝাতে তােমাদের একটা ঘটনা বলছি শােন——যদিও গল্পের মত মনে হবে কিন্তু পুরাে ব্যাপারটা সত্যিসত্যিই কাশী (বেনারস) -তে ঘটেছিল। বেনারসে গঙ্গার ধারে দুটো খ্যাপা একসাথে ঘুরে বেড়াতো। এরা কখনও ভিক্ষা করতাে—কখনও চেঁচামেচি করে ছুটে বেড়াতো আরমানুষজন তাড়া করলেই ছুটে গঙ্গার জলে নেমে জল ছোড়াছুড়ি করে খেলা করতাে। লােকে ঠিক বুঝতে পারতাে না— এরা পাগল না পরমহংস ! ফলে ওদেরকে কেউ কেউ ভিক্ষা দিতাে বা ডেকে খাওয়াতাে আবার কেউ কেউ গালাগালি দিয়ে তাড়িয়ে দিতাে। প্রকৃত ব্যাপারটি ছিল খুবই মজার, কারণ ওদের মধ্যে একজন ছিল পাগল কিন্তু অপরজন ছিলেন সত্যি সত্যিই পরমহংস স্থিতির এক সিদ্ধযোগী, যিনি আপাতদৃষ্টিতে খ্যাপার ন্যায় আচরণ করলেও সহজস্থিতিতে ঐরকম ভাবে থাকতেন। ফলে একটা খ্যাপার সাথে __তাঁর মতো একজন সিদ্ধপুরুষের থাকা বা ঘুরে বেড়ানােয় কোন অসুবিধা হোত না, বরং খ্যাপার সাথে তিনি সর্বদা আনন্দ করেই সময় কাটাতেন। একদিন হয়েছে কি–গঙ্গার জলে ওরা দু’জনে যখন জল ছিটিয়ে খুব আনন্দ করে খেলা করছিল হঠাৎ করে তখন একটি পচা-গলা মৃতদেহ গঙ্গায় ভাসতে ভাসতে সেখানে হাজির হোল। পচা গন্ধ নাকে যেতেই খ্যাপাটি নাক টিপে ধরে বলল “ইস্, কি বাজে গন্ধ, চলো-চলো জল থেকে উঠে পড়ি।” খ্যাপারূপী পরমহংস বললেন “কি গন্ধ ! কোথায় গন্ধ ! ঐসব গন্ধ একটু সময়ের জন্য এসেছে_এক্ষুনি আবার চলে যাবে, ওই ব্যাপারে মাথা ঘামিয়ে লাভ নাই__এসো আমরা খেলা করি।” খ্যাপা বলল, “দেখছো না একটা পচা মরা মানুষের দেহ ভেসে আসছে_ সেখান থেকেই গন্ধ বেরোচ্ছে!" পরমহংস বললেন– “ও -ঐ মৃতদেহটি ! ওটা এক্ষুনি ভেসে চলে যাবে—এসো আমরা খেলি !” খ্যাপা কিন্তু একটু দূরে নাক টিপে দাঁড়িয়ে রইল—কাছে আসতেই চাইল না। হঠাৎ খ্যাপাটির নজরে পড়ল, মৃতদেহের আঙুলে একটি সােনার আংটি রৌদ্রে চকচক্ করছে। অমনি সে পুনরায় জলে নেমে জল ঠেলে ঠেলে মৃতদেহটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং সেটিকে এক হাতে ধরে অন্য হাতে আংটি ধরে মারে টান। পচা-গলা মৃতদেহের আঙুলগুলাে ফুলে গেছিল তাই আংটি সহজে বেরোতেই চাইছে না ! কিন্তু খ্যাপা ছাড়বে কেন_সে প্রাণপণে আংটিটি বের করার প্রবল চেষ্টা করে যাচ্ছিল। আর তার এই কাণ্ড দেখে পরমহংস দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হো হো করে হাসতে লাগলেন। সে হয়তো মনে মনে ভাবছিল__যে খ্যাপা দুর থেকে, মৃতদেহের পচা গন্ধ পেয়ে নাক টিপে ধরে পালাচ্ছিল—সেই ব্যক্তিই এখন একটুকরাে সােনার লােভে নাক ছেড়ে দিয়ে দু’হাতে সেই পচা মৃতদেহ ধরে আংটি খােলার জন্য ব্যাকুল হচ্ছে_তাই ঐ হাসি ! টানাটানিতে অবশেষে খানিকটা পচা মাংস সমেত আংটিটি খুলে এল। গঙ্গার জলে সেটাকে বারবার ধুয়ে একটু পরিস্কার করার পর খ্যাপার আনন্দ দেখে কে ! খ্যাপার আনন্দ দেখে পরমহংসেরও আনন্দ! খ্যাপাও নাচছে _উনিও নাচছেন ! উনি খ্যাপাকে বললেন—“একবার দাওতাে দেখি—ওটা কেমন ?” খ্যাপা দু’হাতে আংটিটা চেপে ধরে বলল— “উঁ ! তা দেবাে কেন, আমি পেয়েছি_ ওটা আমার !” পরমহংস বললেন ‘হ্যাঁ, ওটা তােমার, তবু একবার হাতে নিয়ে দেখি, একবার দাও।' খ্যাপা দিল না যদি জলে পড়ে যায়—বলল, “পাড়ে গিয়ে দেব”। গঙ্গার জল থেকে পাড়ে উঠে ওরা আংটিটি দেখছে—ও একবার হাতে নিয়ে আনন্দ করছে, এ একবার হাতে নিয়ে আনন্দ করছে। এমন সময় কয়েকজন দুষ্কৃতীর এটা নজরে পড়ে গেল। ওরা দেখল খ্যাপাদুটো একটা মূল্যবান সােনার আংটি নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। ওরা হৈ হৈ করে কাছে আসতেই খ্যাপা আংটিটা বুকে চেপে ধরে আঁকড়ে থাকল। দুষ্কৃতীরা এসে দু-চারটে চড়-থাপ্পড় দিয়ে আংটিটি কেড়ে নিয়ে চলে গেল। ঘটনাটা দেখে পরমহংস হাে হাে করে হাসতে লাগলেন, আর খ্যাপাটি ভেউ-ভেউ করে কাঁদতে লাগল ! পরমহংস বললেন, “কি গাে—কাঁদছো কেন, মড়াটা অনেকদূর ভেসে চলে গেছে_আর কোন গন্ধ নাই, চলো এবার আমরা গঙ্গায় গিয়ে আবার জল ছোঁড়াছুঁড়ি খেলি।” খ্যাপা উত্তর না দিয়ে শুধু কাঁদতে লাগল। পরমহংস জিজ্ঞাসা করলেন, “ওরা মারলো বলে তােমার খুব লেগেছে—এই জন্য কাঁদছো, এস আমি হাত বুলিয়ে দিই !” খ্যাপা হাত সরিয়ে নিল, কাঁদতে কাঁদতে বলল, 'ওরা আমার আংটিটা নিয়ে চলে গেল উঁ-উঁ-উঁ ..! পরমহংস তখন বােঝালেন, বললেন, “দ্যাখাে, ঐ বস্তুটা একটু আগেও তােমার কাছে ছিল না—এখনও নেই। যতক্ষণের জন্য বস্তুটা তােমার কাছে এসেছিলো, ততক্ষণ তুমি কত ঝামেলা পােয়ালে ! দুর্গন্ধ সহ্য করলে-মৃতদেহ ধরে টানাটানি করলে- আবার শেষে দু-চার ঘা মার-ও খেলে ! সুতরাং দেখলে তাে--ঐ আংটিটাই ছিল যতরকম অশান্তির মূল। ওটা গেছে—ভালােই তাে হয়েছে, আপদ গেছে ! ঐটা থাকলে তােমার আমার মধ্যেও বন্ধুত্বের বিরােধ শুরু হোতে পারতাে। তাই ওটার কথা ভুলে যাও _এসো আমরা আবার খেলা করি।” খ্যাপা কিন্তু গঙ্গার তীরে বসে বসে আংটির জন্য বিলাপ করতে লাগলো—আর সে কোনদিনই সেই পরমহংসের সাথে আনন্দ করতে পারে নি ।
তাহলে এই ঘটনাটি থেকে শিক্ষা পাওয়া গেল--'আসক্তিই দুঃখের কারণ'। যে কোন মানুষের জীবনের দিকে তাকিয়ে দ্যাখাে— তারা যেগুলিকে আঁকড়ে ধরে "আমার আমার" করছে_সেগুলির কোনটিই কিন্তু আগেও ছিল না, পরেও থাকবে না ! এটা চরম বা পরম সত্য, তবু মানুষ আসক্ত হয়। যার যত টুকু বিষয় সে ততটুকুতেই আসক্ত। দরিদ্রের পর্ণকুটির, ধনীর প্রাসাদ, কারো ব্যবসা-বাণিজ্য-সম্পদ—যার যেটুকু রয়েছে তাতেই আসক্ত, আর এই আসক্তিই সবরকম ক্লেশের মূল। সারাজীবন 'আমার’ ‘আমার’ করে ছুটে বেরিয়ে মৃত্যু _ আবার জন্মগ্রহণ _আবার ক্লেশ ভােগ ! এই ত্রিতাপ-ক্লেশের হাত থেকে মুক্ত যাঁরা _ তাঁরাই পরমহংস। তাঁদের আসক্তি নেই, তাই ক্লেশও নেই। অভ্যাস এবং বৈরাগ্যের দ্বারা মানুষ ধীরে ধীরে এই অবস্থা লাভ করতে পারে।
কোন সাধকের যখন এই ধারণাটি পাকা হয়ে যায় তখন ঐ সাধক আর দেরি না করে জীব-অবস্থা থেকে শিব-অবস্থা প্রাপ্ত হবার চেষ্টায় নেমে পড়েন এবং গুরুর নির্দেশ মেনে সাধন-ভজনে ব্রতী হন। মে কোন মানুষকে যেটা ultimately করতেই হবে, সেটা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল ! কিন্তু বিশ্বজোড়া এই মনুষ্য-সমাজের বেশিরভাগের এখনো "মানব জীবনের উদ্দেশ্য" সম্বন্ধে ধারণা তৈরিই হয় নি, তো "পাকা ধারণা' ! প্রকৃতপক্ষে, ধারণা পাকা হতে মানবের বহু জন্ম লেগে যাচ্ছে ! সেই জন্যই বলা হয়_ "পৃথিবীর মানুষ যেন এখনো শিশু অবস্থায় রয়েছে, মানুষের এখনো তার জীবনের উদ্দেশ্য সম্বন্ধে ধারণা হয়নি" ! আবার দেখা যাচ্ছে_ জন্ম-জন্মান্তরের অভিজ্ঞতাপুষ্ট অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হচ্ছে কিন্তু সেই ধারণাসম্পন্নদের অধিকাংশের আর অগ্রগতির চেষ্টা নাই, যাদের চেষ্টা আছে তাদের অধিকাংশের নিষ্ঠা নাই। এইভাবে দেখা যায় একেবারে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পরিসংখ্যান খুবই কম।
আবার কি দ্যাখা যায় জানো_যাঁরা কৃতকার্য হয়ে গেলেন_তাঁদের অধিকাংশরা সমাজে কাজ করতে চান না, নির্লিপ্ত হয়ে থাকতে চান। এঁদের মধ্যে একমাত্র যুগপুরুষরাই করূণাবশতঃ সমাজে নেমে এসে মানুষের জন্য, সমাজের জন্য কিছু কাজ করে যান। সেই সময়েও সব মানুষ এঁদের চিনতে পারে না—এঁরা কৃপা করে চেনা দেন তাই তাঁর জীবদ্দশায় কেউ কেউ চিনতে পারে। এটা পৃথিবীগ্রহের একটা পরমক্ষণ _যখন ঈশ্বর অবতীর্ণ হ'ন মানুষের দেহে ! যারা তাঁকে দর্শন করে, স্পর্শ করে বা সান্নিধ্য লাভ করে, তারা ধন্য ! জন্ম-জন্মান্তরের প্রারব্ধের ক্ষয় হয়ে যায়–কত জন্ম এগিয়ে যায় তারা৷ কোন মানুষ শত্রুভাবে তাঁর সান্নিধ্যে এলেও তার মঙ্গল হয়। ভগবানের সংস্পর্শে এলে মানুষের অন্তর্মুখিতার ভাব আসে, অন্তর্মুখী হলে মানুষ ঈশ্বরমুখী হয় এবং ধীরে ধীরে সে ক্লেশমুক্ত হয়ে এগিয়ে চলে পূর্ণত্বের দিকে।
