স্থান ~ পরমানন্দ মিশন (বনগ্রাম) । সময় ~ ১৯৯৫, অক্টোবর । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ সিঙ্গুরের ভক্তগণ, আশ্রমস্থ মহারাজগণ ও অন্যান্য ।
জিজ্ঞাসু :— কিছুদিন আগে ভূমিকম্পে বেশকিছু মানুষ মারা গেল, ভূমিকম্প হবার কারণ কি ? আর পশুপাখিরা কেন আগে থেকে তা জানতে পারে ?
গুরুমহারাজ :— ভূমির সঙ্গে যে সমস্ত প্রাণীর সরাসরি যােগাযােগ তারা সর্বপ্রথম পৃথিবীর কোন আলােড়ন বা কম্পন বুঝতে পারে। পিঁপড়ে-উই সহ বিভিন্ন কীট বা সরীসৃপদের শরীরের প্রায় সমগ্র অংশটাই মাটির সাথে touch থাকে—তাই এদের মধ্যে প্রথম reaction লক্ষ্যকরা যায়। এদের অনিয়মিত আচরণ অন্যান্য পশুপাখি বা মানুষকেও সতর্ক করে দেয়। তবে যে কোন পশুপাখি, আদিম অরণ্যচারী—যারা প্রকৃতিতে থাকে ও প্রকৃতি নিয়েই বেঁচে থাকে অর্থাৎ যারা কোন artificiality-র মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করেনি__ তারা প্রাকৃতিক কোন ঘটনা বা অঘটনের টের তাে আগে পাবেই ! জলের জীবেরাও পৃথিবীর যে কোন কম্পনের টের আগে পায়, তাদের মধ্যেও ভূমিকম্পের আগে একটা অস্থিরতা পরিলক্ষিত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্র থাকে ভূ-অভ্যন্তরে আর ভূমিকম্প মাপার যন্ত্র থাকে মাটির উপরিতলে, ফলে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম vibration যন্ত্রে পৌঁছানাের পূর্বেই সরীসৃপাদি প্রাণীরা স্পন্দন অনুভব করে। যেমন ঝড়বৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস পিঁপড়ে-উই ইত্যাদিরা এবং অনেক পাখিরা আগে থেকে জানতে পারে। এক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলের vibration change-টা ওরা আগেই ধরে ফেলে।
ভূমিকম্পের প্রকৃত কারণ কি ?–এর উত্তরে বিজ্ঞানীরা অনেক কারণ বা তত্ত্ব খাড়া করছে, কিন্তু একেবারে সঠিক কারণ কি তা নির্ণয় করতে পারেনি। বিজ্ঞানীরা দেখেছে প্রাকৃতিক কারণসমূহ ছাড়াও কৃত্রিম কারণ অর্থাৎ বড় বড় জলাধার নির্মাণ, পারমাণবিক বিস্ফোরণ এগুলিও ভূমিকম্প সৃষ্টির কারণ হতে পারে। তবে প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে আগ্নেয়গিরি এবং সঞ্চরণশীল পাত তত্ত্বই অন্যতম প্রধান কারণ বলে মনে করছে বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর অভ্যন্তরে ৭টি সঞ্চরণশীল পাত বা Plate রয়েছে যার ১৬টি Sub-Plate আছে। কড়াইয়ে দুধ ফুটলে যেমন উপরে ঘন স্তর জমে আবার সেই অবস্থায় আরও উত্তপ্ত করলে উপরের ঘনস্তর ফেটে পৃথক পৃথক হয়ে যায়, সেইরূপ পৃথিবীর অভ্যন্তরে গলিত লাভা অতি উষ্ণতায় তরলায়িত হয়ে আছে, আর উপরের অংশ কঠিন। কিন্তু এই দুয়ের সংযােগস্থলে দুধের সর পড়ার মতাে অংশগুলিই পাত বা Plate, যেগুলাে বিচ্ছিন্ন হয়ে কখনও পরস্পরের কাছে আসছে বা পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কাছে আসতে আসতে একটা অপরটার উপর চেপে যেতেও পারে, তাহলে তার ফল হবে ভূপৃষ্ঠে হিমালয় পর্বতের মতাে কোন উচ্চতর ভূমিরূপের সৃষ্টি হওয়া। আবার দূরে সরে গেলে ভূত্বকের চ্যুতি ঘটে—কোন স্থানের অবনমন, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা নতুন আগ্নেয়গিরির সৃষ্টিও হতে পারে।
ভূপৃষ্ঠের উপরিস্তরে পদার্থসমূহ প্রধানত তিনটি অবস্থায় থাকে অবস্থাগুলি হোল যথাক্রমে solid, liquid, gaseous । ভূ-অভ্যন্তরের গভীরে অতি উষ্ণতায় পদার্থগুলি চতুর্থ এক অবস্থায় রয়েছেযাকে বলা হয়েছেPlasmic অবস্থা ! এই অবস্থাই আগ্নেয়গিরি সৃষ্টির জন্য দায়ী। মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় যে ভয়ঙ্কর তাপমাত্রার সৃষ্টি হয়েছিল, ভূ-অভ্যন্তরে তার অংশ এখনও রয়েছে। পৃথিবীর উপরিপৃষ্ঠে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম স্পন্দন সাধারণত ভূ-অভ্যন্তরের প্লাজমিক স্তরে পৌঁছায় না তার আগেই absorb হয়ে যায়। কিন্তু কোন কারণে যদি কোন স্পন্দন প্লাজমিক স্তরে পৌঁছায় তাহলে সেখান থেকে reflection হয়। এর ফলেই ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত –এমনকি নতুন নতুন আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হওয়াও কোন বিচিত্র নয়। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেরযে কোন action, ঐ স্তরে পৌঁছালে তার reaction-টা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে ঘটে যেতে পারে। যাইহােক, এই plasmic স্তরের অভ্যন্তরে রয়েছে space বা vacuum অবস্থা। বিজ্ঞানীরা একে ‘অতি ঘন অবস্থা’ বলে বর্ণনা করেছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি space অবস্থা ! ভূ-অভ্যন্তরে অর্থাৎ crust, mantle আর core এই তিনটি স্তরের অভ্যন্তরে আছে vacuum অবস্থা। এটাই center of the core–center of gravity ! এই স্তরটিই হচ্ছে energy field ! যােগীরা বলেন এটিই পৃথিবীর কুলকুন্ডলিনী_মূলাধার থেকে সহস্রারের ক্ষেত্র ! দেখতে static কিন্তু প্রচণ্ড dynamic। এই স্তর থেকে প্রচুর শক্তির জোগান হতে পারে। অগ্ন্যুৎপাত বা ভূমিকম্পের ফলে plasmic স্তর থেকে যে শক্তি ব্যয়িত হয়, space থেকে তৎক্ষণাৎ তা supply হয়ে যায়। এভাবেই একটা complete network প্রকৃতির বা পৃথিবীর এই সুসামঞ্জস্য বজায় রেখেছে। মানুষ তাে পৃথিবীকে অহরহ কম আঘাত দিচ্ছে না বা প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করার চেষ্টাও কম করছে না। তবু প্রকৃতি সব সময় প্রত্যাঘাত করছে না কেন ? যতক্ষণ না অত্যাচার অসহনীয় হয় ততক্ষণ প্রকৃতি reaction করে না—এটাই রহস্য।
যােগবিজ্ঞান মতে মানবশরীরের মূলাধার থেকে সুষুম্নাপথে প্রাণশক্তিকে চালনা করলে যেমন energy field সহস্ৰারে পৌঁছানাে যায়, ঠিক তেমনি পৃথিবী শরীরেরও মূলাধার থেকে সহস্ৰারে যাতায়াতের উপায় আছে। স্বামী বিবেকানন্দ যােগের চরম ভূমিতে পৌঁছে পৃথিবীর মূলাধার থেকে সহস্ৰারে যাবার সুষুম্নপথ যখন আবিষ্কার করেছিলেন, তখন উনি ভেবেছিলেন পৃথিবীর সুষুম্নাকে জাগিয়ে পৃথিবীগ্রহকে দ্রুত উন্নত অবস্থায় নিয়ে চলে যাবেন। এটা ঘটেছিল হিমালয়ের জম্মু-কাশ্মীর এলাকায় ক্ষীরভবানীর মন্দিরে। তখন মা জগদম্বা নিষেধ করেন তাঁকে। মা জগদম্বার ইচ্ছাতেই সবকিছু চলছে, তাই সে নিয়ম লঙঘন করা যায় না। সাধন period-এ আমার সামনেও যখন এই রহস্য উন্মােচিত হোল_ তখন আমার মধ্যেও এই একইরকম ইচ্ছা ক্রিয়াশীল হয়েছিল কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতার জন্য আমার ইচ্ছাকে control করতে অসুবিধা হোল না। পৃথিবীর মানুষের দুর্বলতা, অগ্রগতির চেষ্টা হীনতা এসব দেখে করূনাপরবশ হয়ে এই গ্রহের কুলকুণ্ডলিনী ধরে ঝাঁকুনি দেওয়ার খুবই ইচ্ছা জেগেছিলকিন্তু ✓রী মায়ের জগতের লীলায় ব্যাঘাত হোতে পারে জেনে সে চেষ্টা করিনি। তবে আমি নৈরাশ্যবাদী নই _দেখছি পৃথিবীগ্রহের উন্নতি হচ্ছে আর মোটামুটি দ্রুতই হচ্ছে।
যাইহােক, আমাদের কথা হচ্ছিল প্রকৃতি নিয়ে। প্রকৃতিতেই সব জ্ঞান রয়েছে। পশু-পাখিরা সহজ জীবনযাপন করে, প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রকৃতির সাথে মিশে থাকে। তাই প্রাকৃতিক বিষয়ের অনেক জ্ঞান তারা প্রকৃতি থেকেই শিখে নেয়। কিন্তু তাই বলে ভেবাে না সেই জ্ঞানসমূহ মানুষ শিখতে পারবে না। মানুষ অসহজ, nature-এর পরিপন্থী, তাই তার প্রাকৃতিক জ্ঞান কম। যােগীরা যােগের গভীরে সবই জানতে পারেন। মানুষ যেহেতু পশুস্তর থেকেই বিবর্তনে উন্নীত হয়েছে তাই মানুষের মধ্যে পশুর সব সংস্কার বা গুণসমূহ রয়েছে। মানুষের মধ্যে পশুর খারাপ গুণগুলাের প্রকাশ তাে হামেশাই দেখা যায়। তাহলে পশু-পাখির ভালাে গুণগুলাে মানুষের জীবনে প্রকাশিত হবে না কেন? এইজন্যেই মানুষকে বলা হয় “চোখ থাকতে কানা”। যােগীরা যা পারেন সাধারণ মানুষ তা পারে না। এর পিছনেও কারণ রয়েছে। মানুষ বহিঃপ্রকৃতিকে তার অন্তঃপ্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলেছে, বিরােধী করে গড়ে তুলেছে। বহিঃপ্রকৃতির একটি নির্দিষ্ট ছন্দ এবং গতি রয়েছে, মানুষ তারও ছন্দপতন ঘটানাের চেষ্টা করে চলেছে কিন্তু প্রকৃতি নিজেই disharmony-কে আবার harmonise করে নিচ্ছে বা করার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা আমাদের অন্তঃপ্রকৃতির অনুকূলে না গিয়ে প্রকৃতি-বিরুদ্ধ কার্যসমূহ করে আমাদের জীবনটাকেই disharmonise করে ফেলছি, বহিঃপ্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারছি না। ফলে বহিঃপ্রকৃতিরই জ্ঞান হচ্ছে না অন্তঃপ্রকৃতি জয় করে আত্মজ্ঞান লাভ তাে দূর অস্ত ! মহাপুরুষগণ বলেছেন, “প্রকৃতির অনুকূলবর্তী হও।” গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন “স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ”। সচ্চিদানন্দস্বরূপ আত্মাকে বােধেবােধ করাই মানবজীবনের ধর্ম। যাঁরা এটা করতে পারেন তাঁরাই আধ্যাত্মিক। ধর্মজগতের সকলেই আধ্যাত্মিক নয়, তারা religious কিন্তু spiritual নয়। সুতরাং আত্মার বােধ না করে আত্মবিস্মৃত হওয়াই অধর্ম। এইরূপ অধার্মিকদের বলা হয় পশুমানব, এরা বিবেকহীন।
প্রকৃতপক্ষে বহিঃপ্রকৃতি আর অন্তঃপ্রকৃতি দুটি সম্পূর্ণ পৃথক মনে হলেও এদের মধ্যে নিবিড় যােগ রয়েছে। একটির বােধ হলেই অন্যটিরও বােধ হয়। কিন্তু বহিঃপ্রকৃতি বিশাল, তার সমস্তকিছুকে অধিগত করা সম্ভব হয় না। ঋষিরা এটা বুঝে বহিঃপ্রকৃতির রহস্য জানতে না চেয়ে নিজ অন্তঃপ্রকৃতির গভীরে ডুব দিলেন। সাধন করে যখন সিদ্ধ হলেন তখন দেখলেন তাঁর অন্তঃপ্রকৃতি জয়ের সাথে সাথেই বহিঃপ্রকৃতির যাবতীয় রহস্য তাঁর কাছে উন্মত্ত হয়ে গেছে, সবকিছু তাঁর করায়ত্ত হয়ে গেছে। এটাই “জগৎজ্ঞান”। সাংখ্যকার কপিল প্রকৃতির রহস্যকে, জীবনের রহস্যকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন সেটা কি যােগসাধন ছাড়া সম্ভব ছিল ? মহর্ষি কণাদ কত হাজার বছর আগে কণাবিজ্ঞান নিয়ে আলােচনা করলেন, ঐটা কি করে সম্ভব ? না যােগ সাধনার সাহায্যেই সম্ভব হয়েছে !
তাই_ তােমরা যারা এখানে বসে আছো__তারা অন্তঃপ্রকৃতির অনুকূলে জীবনযাপন করে চলো, কখনই জীবন-বিরােধী কর্ম কোরাে না। প্রত্যেকের স্বভাব বা প্রকৃতি ভিন্ন, তাই সকলের জন্য একই কর্ম বা একই সাধনা নয়। সদগুরুর কাছে গিয়ে নিজের প্রকৃতি অনুযায়ী সাধন-ভজন বা কর্ম জেনে নিতে হয়। এইবার সেই অনুযায়ী কর্ম করলেই উন্নতি হবে। যে কোন মানুষ, যে যেরূপ অবস্থায় রয়েছে, অন্তঃপ্রকৃতির অনুকুলে কর্ম করলেই উন্নতি হবে—এর কোন অন্যথা হবে না। তােমাদের মধ্যে যারাই এই শিক্ষা গ্রহণ করে অনুশীলনে নেমে পড়বে, তারাই অনুভব করবে– “আনন্দ প্রতিষ্ঠিত –পরমেশ্বরের মহিমা অপার।”
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।।
