স্থান ~ আজিমগঞ্জ ৷ সময় ~ ২৬/২৭ ডিসেম্বর, ১৯৯১ ৷ উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ পঙ্কজবাবু, তপনবাবু, নগেন, সিঙ্গুরের ভক্তগণ ও অন্যান্য ভক্তরা ৷
জিজ্ঞাসু :– সংসারে বড়ই অশান্তি, এই বৃদ্ধ বয়সে এত অশান্তি ভালাে লাগছে না। আমার স্ত্রী খুব খিটখিটে—ওর মনটা একটু ঠিক করে দিন না ?
গুরুমহারাজ :– দেখেছ ! আমাকে জড়ি-বুটি, তাবিজ-কবজ দেওয়া বাবা ভেবে বসেছে ! দ্যাখাে বাবা, আমি ঐসব জানি না, আর এমন কোন Magic-ও জানি না যে তােমাকে তােমার মনােমত কথা বলে আশ্বস্ত করব বা জড়ি-বটি দিয়ে দেব। আমি জানি মানুষ এই সংসারে শরীর ধারণ করে প্রারকর্ম হেতু, আর তার যে ভােগ-ভােগান্তি সেগুলি তার পূর্ব পূর্ব কর্মেরই ফল। আর ক্রিয়মাণ কর্ম ভালাে করে মানুষ তার কর্মফল নষ্ট করতে পারে। সুতরাং তুমি যদি আমার কাছে Suggestion চাও যে কি করলে সংসারে শান্তি পাওয়া যায় সেটা আমি তােমাকে বলতে পারি। আর যদি তুমি চাও যে তােমার স্ত্রীর মনটা ঠিক করে দিতে হবে, পুত্রকে ঠিক করে দিতে হবে তাহলে বলব এমন কোন মন্ত্র বা Magic আমার জানা নেই। তাছাড়া তােমার স্ত্রীর মনটা ঠিক করা বলতে তুমি কি বলতে চাইছ, তােমার মনের মত হয়ে ওঠা—তাইতাে ? জেনে রাখবে সেটা কখনই হয় না। তােমাকে সংসারের আর সকলের অনুকুল হয়ে উঠতে হবে—তবেই তুমি তাদেরকেও তােমার অনুকুলে দেখতে পাবে।
সংসারে অশান্তির মূল কারণ আসক্তি ! এই যে ও বলল “স্ত্রীকে নিয়ে অশান্তি” —তার মানে অতি অবশ্যই জানবে প্রথম যৌবনে ও ওর স্ত্রীকে অধিক পাত্তা দিয়েছে, স্ত্রীতে অধিক আসক্তি দেখিয়েছে। স্বামী স্ত্রৈণ হলে শেষ জীবনে স্ত্রীই তার যন্ত্রণার কারণ হয়, বা স্ত্রীর জন্য সেই স্বামী নানান অশান্তিতে ভােগে। প্রথম যৌবনের রূপ-লালসা, রস-লালসা কাটতে থাকার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই স্ত্রীর ব্যবহার, তার চালচলন, তার রুচিবােধ স্বামীর কাছে অসহ্য মনে হয় ফলে শুরু হয় ঝগড়াঝাঁটি আর উভয়েই জ্বালাযন্ত্রণা ভােগ করে। ঠিক উল্টোটাও হতে পারে প্রথম জীবনে স্বামী dominating, শ্বশুর-শাশুড়ীর অত্যাচার, পরবর্তীতে স্ত্রী সেইসব শােধ তুলছে–তার অবচেতন মনে একটা প্রতিশােধ স্পৃহা রয়েই গেছে, তারই বহিঃপ্রকাশ এই অশান্তি। এইরকম ভাবে পুত্র বা কন্যাকেও অত্যধিক আসক্তিবশত প্রথম থেকে যদি খুবই প্রশ্রয় দেওয়া হয় বা আদিখ্যেতা দেখানাে হয়, পরবর্তীতে সেই পুত্র বা কন্যাও সংসারে অশান্তির কারণ হয়ে দেখা দেয়।
দ্যাখাে, মূলত “অহং-মম” এই বােধ থেকেই তাে আসক্তি! “আমার সংসার” –এটা ভেবে বসাতেই তাে যত অশান্তির বীজ বপন করা হয়ে গেছে। সেখান থেকে বৃক্ষ হয়ে ডালপালা তাে ছড়াবেই, আবার ফুল-ফলও হবে। আমার সংসার নয় এই বিশ্বচরাচর ব্যাপী যে সংসার সে সবই ঈশ্বরের সংসার, ঈশ্বরই বিশ্বব্যাপী জগৎ-সংসার রচনা করে লীলা আস্বাদন করে চলেছেন। আমরা যেন সেই বিরাট লীলার এক একজন ক্ষুদ্র অংশগ্রহণকারী মাত্র। সুতরাং ক্ষুদ্র অহংবােধে “আমার সংসার'’ না ভেবে “ঈশ্বরের সংসারে" আমরা সবাই নিজ নিজ কর্তব্য করছি মাত্র—এই বােধ থাকলেই আর কোন জ্বালা নেই। সংসারাশ্রমে থেকে শান্তিলাভের এটাই একমাত্র Art বা কৌশল। এই কৌশল শিখে এবং তার প্রয়ােগ ঘটিয়ে সংসার করলে সংসার তােমাকে আর কোন জ্বালা-যন্ত্রণা দিতে পারবে না।
অনিত্যে মনােযােগ দিলে বা আসক্ত হলেই দুঃখ, আর নিত্যে অনুরক্ত হলেই আনন্দ। স্ত্রী-পুত্র-পরিবার, বিষয়াদি সবই অনিত্য, এগুলির যে কোন একটিকে বা একাধিককে গুরুত্ব দিলেই তা তোমার অশান্তির কারণ হয়ে দাড়াবে। কোন পুরুষ মানুষকেই ধরাে–ছােট থেকে বড় হল, তারপর বিবাহ হ’ল। তখন সে ভাবল এই স্ত্রী (যৌবনে সকলেই তার নিজের স্ত্রীকে সুন্দরীই ভাবে) কত সুন্দরী। একে নিয়েইতার যত সুখ, যত শান্তি। ফলে সে তাকেই গুরুত্ব দিয়ে বসল। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই তার স্ত্রীর আচার-আচরণে কিছু কিছু ভুল-ত্রুটি ধরা পড়তে শুরু করল, স্ত্রীর বায়নাক্কা, চালচলন অসহ্য মনে হতে শুরু করল, তার শারীরিক অসুস্থতা বা রােগ-ভােগ মনে বিরক্তির উদ্রেক ঘটাল। এবার ধীরে ধীরে সেগুলি বাড়তে বাড়তে যখন অশান্তি চরমসীমায় পৌঁছাল তখন মামলা-মকদ্দমা, কোর্টকেস, ডিভাের্স ! এইভাবে সংসারে যাকে কেন্দ্র করে সুখ বা শান্তির স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল সেইই হয়তাে ঐ ব্যক্তির সারাজীবনের দুঃখ ও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল।
এইভাবেই মানুষের জীবনে তার পরিবারের কোন না কোন Member-কে নিয়ে অশান্তি চলে, হয় সে স্ত্রী, নয় পুত্র বা কন্যা, না হয় অন্য কেউ। হয়তাে সবার হয় না কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই হয়। তাই নিজের না ঘটলেও সমাজের অন্যক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হয়। তাছাড়া বিষয়-পিপাসু মানুষের বিষয়ই বিষ হয়। অনেক সময় দেখা যায় মানুষের জীবনে সারাজীবনের ক্লেশের কারণ হয়ে দাড়ায় বিষয়-সম্পত্তি। এইসব দেখে বা জেনেই ঋষিরা অনিত্য বিষয়সমূহ থেকে তাঁদের মন তুলে নিয়ে নিত্য বস্তুতে নিবদ্ধ করলেন। তাঁরা উপলব্ধি করলেন ব্রহ্মই একমাত্র নিত্যবস্তু। ব্রহ্মের প্রকাশমান রূপ ঈশ্বর। তাই তাঁরা ঈশ্বরকে গুরুত্ব দিলেন, ঈশ্বরের সৃষ্টি-বৈচিত্র্যে আর নিজেদের জড়ালেন না। আধ্যাত্মিকতা বা অধ্যাত্মবিদ্যা অর্থাৎ অধিত আত্মবিদ্যাতেই তাঁরা পেলেন শান্তির সন্ধান। আর আত্মবিদ্যা বা আত্মতত্ত্ব অধিগত করে তাঁরা ঈশ্বরত্বে উপনীত হলেন। ঈশ্বরত্বই পূর্ণত্ব। এই পূর্ণত্বে উপনীত হতে পারলে তবেই জানা যায় পরম শান্তিময় জীবনযাপনের কলা। উন্মােচিত হয় শান্তিলাভের প্রকৃত রহস্য। আরও জানা যায় মানবজীবনে দুঃখ ও ক্লেশের কারণ কি ! ঋষিরা সাধনার গভীরে আত্মতত্ত্বের বােধে এই সমস্ত রহস্য উন্মােচন করলেন। তারা বললেন, “হে মানব ! অনিত্যে আসক্তিবশতই চিত্তে বিকার উৎপন্ন হয়। এই চিত্ত বিকারের ফলে হয় রসাভাস।” রসে বৈ সঃ—যে সচ্চিদানন্দরূপ অমৃতরস আস্বাদন করার উদ্দেশ্যেই মানবের এগিয়ে চলা (জন্ম-জন্মান্তরের সাধনার মাধ্যমে) তার আভাস হয় মাত্র। এই আভাসের জন্যই মানবের এত দুঃখ বা জ্বালা। অপরপক্ষে নিত্যকামী মানবের অর্থাৎ যারা সাধনার গভীরে আত্মবিদ্যা অধিগত করেছেন তাদের হয় আবেশ, রসাবেশ। এই আবেশ থেকেই আনন্দের আস্বাদন হয়, আনন্দই আনন্দ, পরমানন্দ ! এই অবস্থাতে দুঃখ, জ্বালা এসব থাকে না তখন বােধ হয় সব কিছুই লীলা। সব লীলাবিলাস। নিশ্চিন্ত, নির্লিপ্ত, নিরাপদ ও শান্ত অবস্থায় আনন্দের আস্বাদন করা যায়। বাবা ! এই হ’ল রহস্য ! জীবনে জগৎসংসারের জ্বালা-অশান্তি থেকে আন্তরিকভাবে যদি কেউ মুক্তি চায় তাহলে তাকে গুরুনির্দেশিত পথ অবলম্বন করে এগিয়ে যেতে হবে। আর এই এগিয়ে চলাই ‘চরৈবেতি’, যা একদিন তােমাকে তােমার অন্তিম লক্ষ্যে—তােমার গন্তব্যে পৌছে দেবে। পরমেশ্বরের মহিমা অপার !!
জিজ্ঞাসু :– আপনি যে বলেন মানুষ অন্তর্মুখী হলে নিশ্চুপ হয়ে যায়, শান্ত হয়ে যায় – কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এঁরা তো ভাবস্থ অবস্থায় লম্ফঝম্ফ করে হরিনাম সঙ্কীর্তন করতেন বলে শোনা যায়?
গুরুমহারাজ :– শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অথবা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে সাধারণ মানুষের তুলনা করছ? কি হীনবুদ্ধি তোমাদের! আমি দেখেছি কলকাতার শিক্ষিত লোকেদের মধ্যে বেশিরভাগের এই ধরণের হীনবুদ্ধি কাজ করে। ওরা নিজের দেশের মহাপুরুষ, মনীষীদের অবহেলা অনাদর করে আর বিদেশীয় দার্শনিক বা মনীষীদের মতবাদগুলি follow করে। তুমিও কি কলকাতায় থাকো নাকি খোকা? দ্যাখো, তোমার হয়তো ধারণা নেই বলে তুমি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে সাধারণ মানুষকে একই দলে ফেলতে চাইছো – কিন্তু তাই কি হয়! মহাপ্রভু বাহ্য দশায় ভাবস্থ হয়ে নৃত্য করতেন, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণও করতেন কিন্তু অন্তর্দশায়? এই অবস্থার সন্ধান কে পেয়েছিল ? বাসুদেব সার্বভৌম মহাপ্রভুর এইরূপ দশায় জিভের উপর চিনি ফেলে দিয়েছিল, কিন্তু বাতাসে সেই চিনি ফরফর করে উড়ে গিয়েছিল। বুঝতে পারছো বাহ্যদেহের কি অবস্থা! লালাগ্রন্থি শুকিয়ে গেছে – জিহ্বা একদম dry, তবেই চিনি ভিজছে না – তাই নয় কি?
তাছাড়া তাঁর নৃত্যের সঙ্গে সাধারণের নৃ্ত্য? সাধারণ মানুষের একটু-আধটু ভাব এলে লম্ফঝম্ফ করে, নৃ্ত্য করে ! কীর্তনের আসরে, হরিবাসরে এইরকম দৃশ্য অনেক দেখা যায়, এগুলি বৃন্দাবনী ঢঙ। কিন্তু শ্রীবাস অঙ্গনে কিম্বা অন্যত্র যখন মহাপ্রভু সিংহের মতন নৃত্য করতেন তখন উপস্থিত জনেদের মধ্যেও ভাবাবেশ হোত ফলে তারাও নিজেদের অজ্ঞাতসারে নাচতে শুরু কোরতো। ভক্তিমার্গের লোক না হলেও আবেগে তারা আপ্লুত হোত। আর তিনি যাকে স্পর্শ করতেন – সে পাগলের মত হয়ে যেতো। আনন্দে অধীর হয়ে সে নৃত্য তো করতই আবার নাচতে নাচতে মহাপ্রভুর পিছন পিছন ছুটত। এরকম কতবার হয়েছে যে হরিসঙ্কীর্তনের আসর থেকে নৃত্যরত অবস্থায় মহাপ্রভু ছুটে বাইরে চলে গেছেন – ভক্তবৃন্দের হুঁশ ফিরতে দেরী হোত, ফলে তারা হঠাৎ দেখত মহাপ্রভু সেখানে নেই। ছোট্ ছোট্, খোঁজ্ খোঁজ্! রাস্তায় দেখা যেতো কেউ কেউ পাগলের মত হাত-পা ছুঁড়ছে আর নাচছে_ মহাপ্রভুর সহচররা বুঝতে পারতো তিনি এই পথেই গেছেন। তাঁর গায়ের ছোঁয়া লেগে গাছপালা, ঝোপঝাড়ের পাতাও উর্ধ্বমুখ হয়ে থাকতো – যেন তাদেরও রোমাঞ্চ লেগেছে। বলা হয় বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ যেদিকে হেঁটে যেতেন সেখানের দুর্বা ঘাস, লতা-গুল্ম রোমাঞ্চিত হতে থাকতো। এইগুলি কি সাধারণ মানুষের লম্ফঝম্ফযুক্ত ভাববিকার? একে বলা হয় ভাবাবেশ। এঁদের শরীরকে বলা হয় ভাগবতী তনু ! একমাত্র এইরূপ শরীরেই পূর্ণ প্রেম প্রকাশিত হতে পারে – অন্য শরীরে এই প্রেমপ্রবাহ ধরে রাখতে পারবে না – শরীর নষ্ট হয়ে যাবে। আর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের নাচের কথা বলছিলে না? উনি তোমাদের কলকাতার বুকে এমন নাচ নাচলেন যে অতবড় এবং অত শক্তিশালী ব্রাহ্ম Movement-টাকেই নেচে-কুঁদে বারোটা বাজিয়ে দিলেন ! তুমি শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত অথবা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বিষয়ক অন্য গ্রন্থ পাঠ করে দেখো – সেখানে দেখতে পাবে তৎকালীন কলকাতার সেরা সেরা মানুষ, জ্ঞানী-গুণী মানুষ, শিক্ষায়-দীক্ষায় বংশ মর্যদায় উন্নত সব মানুষ ঠাকুরের নাচ দেখে ভাবস্থ হয়ে নিজেরাই নাচতে শুরু করে দিতো। তখন কলকাতায় কেশব সেনের খুব নাম-ডাক। গোঁড়া ব্রাহ্ম আর অসাধারণ বাগ্মী, মেয়ের বিয়ে ছোট বয়সে দিয়েছে বলে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ থেকে বহিঃষ্কৃত হয়ে নিজেই একটা দল গঠন করল ‘নববিধান’। দোর্দণ্ড ঠাকুর পরিবারের নিষেধ উপেক্ষা করে তখনকার কলকাতার শিক্ষিত যুবকেরা ‘নববিধানে’ যোগ দিল। কেশব এমন সুবক্তা ও সুলেখক ছিল যে দলে দলে মানুষ তার বক্তৃতা শুনে অথবা তার লেখা পড়ে _তার প্রতি আকৃষ্ট হোত। তৎকালীন ইংল্যান্ডের মহারানী একবার কেশবের বক্তৃতা শুনে তাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেছিলেন। এহেন কেশব সেনও ঠাকুরের কাছে এলেই তার দলবল নিয়েই নাচতে শুরু কোরতো।
আবার এমন মজা, এককালে কেশবের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী (যিনি শান্তিপুরের অদ্বৈত ঠাকুরের বংশধর ছিলেন) নববিধান issue-তে কেশবের সঙ্গে মতভেদে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের group) থেকে গেলেন। কিন্তু বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী যখন যখন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আসতেন_ভাবস্থ অবস্থায় তিনিও নাচতেন ! পরবর্তীকালে বিজয় ব্রাহ্মসমাজ ছেড়ে দিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছিলেন এবং হিমালয়ে উত্তরকাশীতে বিমলেশ্বর পাহাড়ের কাছে কঠোর সাধন-ভজনও করেছিলেন। কিন্তু ঐ নাচ তিনি ছাড়েননি ভাবস্থ অবস্থা প্রাপ্ত হোলেই তিনি নাচতে শুরু করতেন। তাঁর জীবনীতে জানা যায় যে বিজয়কৃষ্ণের আশ্রমে যে কোন উৎসব-অনুষ্ঠানে তিনি ভাবস্থ অবস্থায় বীর-বিক্রমে নৃত্য করতেন। একবার অনেক স্থান পরিব্রাজন শেষে বিজয়কৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বরে এসেছেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে দেখা করতে। ঠাকুর জিজ্ঞাসা করলেন, “বহু দেশ তো ঘুরলে তা কি সব দেখলে?” বিজয়কৃষ্ণ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছিলেন, “দেখলাম, কোথাও একপয়সা, কোথাও দুপয়সা, কোথাও কোথাও বড়জোর দু’আনা-চার আনা কিন্তু আজ্ঞে, ষোল আনা এখানেই।”
তাহলে কি বুঝলে? সাধারণ মানুষ মহাপুরুষ বা অবতার পুরুষকে কিভাবে চিনবে? একজন মহাপুরুষই পারেন আর একজন মহাপুরুষের মূল্যায়ন করতে। শ্রীচৈতন্য, শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসেরা সাক্ষাৎ ঈশ্বরের অবতরিত রূপ। তাঁদের লীলা কি বুদ্ধি দিয়ে বোঝা যায় বাবা! হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে হয়। বই পড়েই বা কি হবে, আর কথা শুনেই বা কি হবে – ঠিক ঠিক বোঝা যায় কি? যায় না – তবে হ্যাঁ শ্রদ্ধাপূর্বক পড়লে বা শুনলে ধারণা বা conception হয়। তবে perception-টা তোমার হাতে। সাধন-ভজনের দ্বারা তা ধীরে ধীরে তোমার অন্তর্জগতে উন্মেষিত হবে।