স্থান ~ বনগ্রাম, পরমানন্দ মিশন । সময় ~ ১৯৯১, জানুয়ারি । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ পঙ্কজবাবু, তরুণবাবু (নৈহাটি), নগেন, আশ্রমের মহারাজগণ ও অন্যান্য ভক্তবৃন্দ ।

জিজ্ঞাসু :– বর্তমানে দেখছি সমগ্র ভারতবর্ষে রামকে নিয়ে খুব মাতামাতি চলছে ৷ একে তো রামায়ণ পৌরাণিক গ্রন্থ_ ঐতিহাসিক নয়, অর্থাৎ রাম নামক কোন চরিত্র বাস্তবে ছিল কিনা তারই ঠিক নেই । তাছাড়া রামায়ণ যদি আর্যদের গ্রন্থ হয়, তাহলে আর্যরাও তো ভারতবর্ষের বাইরের লোক– আবার বাবরি মসজিদ সৃষ্টিকারী মুঘল সম্রাট বাবর সেও বিদেশি। আর্যরা দুদিন আগে এসেছিল বাবর না হয় পরে এসেছে – সেই একই ব্যাপার তো হলো, এই নিয়ে বিরোধের কি আছে ? এ ব্যাপারে আপনি কি বলবেন ?

গুরু মহারাজ :– খুব সম্ভব তুমি রাজনীতির লোক । এখানে পশ্চিমবঙ্গে তো এখন Left-পার্টির রমরমা (১৯৯১-৯২)৷ তুমিও বোধ হয় বাম সমর্থকআবার এখানেই বসে আছে এমন কেউ কেউ হয়তো রাম সমর্থক। আমি কিন্তু কোন রাজনীতির মানুষ নই। কোনো পলিটিক্যাল পার্টি-কেই আমি সমর্থন করি না । কারণ আমি জানি যে পলিটিক্স দিয়ে কখনই মানুষের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল বা কল্যাণ করা সম্ভব নয়। আর যদি তা হতো তাহলে আমি পলিটিকাল লিডার হিসাবেই কাজ করতাম ৷ সুতরাং রাজনৈতিক Angle থেকে যদি কোনো আলোচনা করতে চাও তাহলে আমি চুপ করে যাবো_ কোন মন্তব্যই কোরবো না। আর যদি শ্রদ্ধাপূর্বক জিজ্ঞাসা করে থাকো অর্থাৎ যদি জিজ্ঞাসু হও তাহলে তোমার কথার উত্তর দিচ্ছি –চুপ করে বসে শােন।

  রামায়ণকে পৌরাণিক গ্রন্থ বলা হচ্ছে, কিন্তু কে বলছে ? রাজনীতির লােকেরা বলছে ! কোন গবেষক, প্রত্নতাত্ত্বিক একথা বলেছে কি ? বিজ্ঞান যত উন্নত হচ্ছে এবং মানুষের চেতনা যত উন্নত হচ্ছে ততই তাে রামায়ণ বা মহাভারতের ঘটনা সমূহের প্রমাণ মিলছে। একটা কথা জেনে রাখবে রাম কোন বিদেশী নয় এবং আর্যরাও বাইরে থেকে আসেনি ! এইসব তত্ত্ব  ইংরেজরা এদেশে এসে উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে চালিয়ে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে ইংরেজদের তাঁবেদারি করা কিছু শিক্ষিত দেশীয় মানুষ সেগুলিকেই স্ট্যাম্প মেরে দিয়েছে_আর সেটাই এখনো চলছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়ােগ করে এবং অন্যান্য গবেষণায় জানা গেছে যে হিমালয়কেন্দ্রিক সভ্যতাই আর্য সভ্যতা। আর গোটা পৃথিবীতে এই সভ্যতাই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন।

 ভারতবর্ষ সহ বহু দেশে অনেক অনেক প্রাচীন সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে যেগুলাের বেশিরভাগেরই কোন লিখিত ইতিহাস নাই। সেইসব হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার ধ্বংসস্তূপ খুঁজে __ এখনকার মতোই দুতলা-তিনতলা পাকা ইটের বাড়ী, ড্রেন, স্নানাগার, শস্যাগার, বিদ্যালয়, লাইব্রেরী সবই পাওয়া গেছে। তাহলে সেখানে স্কুল ছিল, কলেজ ছিল__সেখানে ডাক্তারী, ইঞ্জিনীয়ারিং সবই পড়ানো হােত। তার মানে সেখানে পুস্তক ছিল, ছাপাখানা ছিল _এককথায় এখন যা কিছু রয়েছে সে সব কিছুই সেখানেও ছিল। কিন্তু কোন সভ্যতা যখন প্রাকৃতিক কারণে বা অন্য কোন কারণে ধ্বংস হয়ে যায় __তখন বহুকাল পরে লোকগাথা হয়ে,ভাট-চারণ ইত্যাদি কবিদের গানের মধ্যে __সেই সব গৌরবগাথার কাহিনী পরম্পরাক্রমে বাহিত হোতে থাকে। পরবর্তীকালের মানুষ সেগুলিকে শুনে শুনে মুখস্থ করে নেয় বা কেউ হয়তাে লিপিবদ্ধ করে ফেলে। এইভাবেই পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাবিশিষ্ঠ সব দেশে Mythology বা পুরাণ কাহিনীর জন্ম হয়েছে ! ভারতবর্ষ বহু প্রাচীন দেশ তাই পৃথিবীর অন্যান্য দেশ অপেক্ষা _পূর্বাপূর্ব অনেক সভ্যতার উত্থান-পতনের ঘটনাও এখানে বেশী, ফলে পুরাণ-মহাকাব্যের সংখ্যাও বেশী। তুমি কি আমার কথাগুলো বুঝতে পারলে ?

এবার আমাদের জানতে হবে _আর্যরা কি বিদেশাগত অথবা তা নয় ? সেই সম্বন্ধে আমি তােমাকে কয়েকটা জিজ্ঞাসা করছি, তুমি সেগুলির উত্তর দাও তো দেখি ! ধরে নেওয়া যাক যে আর্যরা ভারতের বাইরে থেকে এসেছিল এবং তারা মধ্য এশিয়ার কোন দেশ থেকেই এসেছিল ! আরও ধরে নেওয়া যাক এখানে এসেই সেই সুউন্নত জাতিটি বেদাদি শাস্ত্র লিখেছিল, (যা শ্রুতি হিসাবে বহুকাল ছিল) তাহলে কোন উন্নত জাতি তাদের রচিত গ্রন্থে (বেদে) তাদের স্বদেশের বা মাতৃভূমির কোন উল্লেখ করবে না ? তাদের সেখানকার পােশাক-পরিচ্ছদ, তাদের সেখানকার সামাজিক জীবন এসবের কোন উল্লেখ থাকবে না ? বেদে তৎকালীন মানুষের যে সমাজচিত্র পাওয়া যায় তার কোনটির সাথেই মধ্য এশিয়ার কোন জাতির জীবনচর্যার সাদৃশ্য কেন নেই ? এগুলোর কোনটারই উত্তর তুমি কেন_কোন পন্ডিতেরাই দিতে পারে না।

আসলে আর্যরা এখানকার‌ই লোকতার সপক্ষে অনেক প্রমান‌ও রয়েছে ! যেমনবেদে যে সমস্ত পর্বতের উল্লেখ আছে সেগুলি সবই ভারতে অবস্থিত। গঙ্গা, যমুনা, গােদাবরী_ আদি যে সমস্ত নদীর গুণাবলী বা মহিমার উল্লেখ রয়েছে সেগুলি সবই ভারতে অবস্থিত। পূজা বা যজ্ঞে ব্যবহৃত যে সমস্ত উপাচারের উল্লেখ রয়েছে অর্থাৎ পঞ্চগব্য, পঞ্চশস্য, পঞ্চফল ও বিভিন্ন পুষ্প বা পত্র এগুলির প্রায় সবই ভারতবর্ষে পাওয়া যায়—মধ্য এশিয়ার ফসলই নয় সেগুলি। তাহলে বলােতাে চাঁদ ! তুমি কি করে বলবে যে বেদস্রষ্টা আর্যরা ভারতের বাইরের ?

   ইউরােপের বিভিন্ন দেশের পণ্ডিতমহলের সঙ্গে যখন আমার কথা হয়েছিল তখন তাদেরকেও আমি এই ধরণের যুক্তি দিয়ে জিজ্ঞাসা ছুঁড়ে দিয়েছিলাম--তারা আমার জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে পারেনি, বরং আমার যুক্তিগুলি মেনে নিয়েছে। ঋগ্বেদের যে প্রাচীনতম পুঁথিটি পাওয়া গেছে (যা লণ্ডন মিউজিয়ামে আছে) তার আনুমানিক বয়েস ২০০০০ (কুড়ি হাজার) বছর। পুঁথির বয়স বা লিপির বয়স পর্যালােচনা করেও কিন্তু বেদের বয়স নিরূপণ করা যাচ্ছে না—কারণ বেদ লিপিতে আসার আগে হয়তাে কয়েক হাজার বছর শ্রুতিতে ছিল। ইংরেজদের পৃষ্টপােষকতায় বেড়ে ওঠা আধুনিক গবেষকরা যে দাবী করছে খ্রীষ্টপূর্ব ২/৩ হাজার কিংবা ৪/৫ হাজার বছর আগে আর্যরা মধ্য এশিয়ার কোন দেশ অথবা এশিয়া মাইনর থেকে ভারতে এসেছিল এবং তাদেরই আর একটা শাখা ইউরােপে গিয়ে ওখানকার সভ্যতা বিস্তার করেছিল। তারা আরও বলেছে__ আগে ইউরোপীয় বা ভারতীয়রা অসভ্য-আদিম জনজাতি ছিল__আর্যরাই সবাইকে সভ্য করেছিল!

এবার এই গল্পটা ইংরেজরা কেন চালিয়েছিলসেটা বলছি ! এইটার মধ্যে দিয়ে ইংরেজরা সকলকে এটাই বোঝাতে চেয়েছিল যে, এই যে ইংরেজরা ভারতে সাম্রাজ্য বিস্তার করতে এসেছে সেটা নতুন কিছু নয়! এইরকম ঘটনা আগেও ঘটেছে অর্থাৎ আর্যরাও এমনিভাবেই বাইরে থেকে এদেশে এসেছিল ! ওরাও যেহেতু আর্যদের বংশধরতাই ওদের স্বভাবে রয়েছে ভারতে এসে অসভ্য ভারতবাসীদেরকে সভ্যতা শেখানাের !

  কেমন সুন্দর গল্পটা বানিয়েছিল বলো তো ! সেইসময় ইংরেজদের বুদ্ধিজীবীরা ভারতে এই গল্পটা চালিয়েছে আর তৎকালীন মুষ্টিমেয় শিক্ষিত ভারতবাসীর মাথায় এটা ঢােকানাের প্রাণপণ চেষ্টা করেছে এবং Success-ও হয়েছে অনেকাংশে। ইংরেজরা চলে যাবার পর ও ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত ভারতীয়রাও সেই একই গল্প বলতে লাগল, “আর্যরা বাইরে থেকে ভারতে এসেছে।” –এটাই ওদের Success ! কিন্তু ৪/৫ হাজার বছর আগে যদি আর্যরা বাইরে থেকে ভারতে এসে থাকে তাহলে অন্তত কুড়ি হাজার বছর আগের বেদ রচনা করল কারা? কাজেই ইংরেজদের চালানো গল্পটা _এই যুক্তিতে একদমই টেকে না ! সেই সুসভ্য, সুউন্নত, সুশিক্ষিত জাতি যারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বেদ-উপনিষদ সৃষ্টি করেছিল_তারা এদেশের‌ই মানুষ! ইংরেজরা এসেছিলো এদেশে ব্যবসা কোরতে_পরে কায়দা কোরে দেশটার রাজা হয়ে বসেছিল! ওরা জানতো_ভারতবর্ষ প্রাচীন সভ্যতার দেশ।সে তুলনায় তাদের গর্ব করার মতো কিছুই নাই_তাই মিথ্যা এই গল্প তারা চালিয়েছিল !

যে কথাগুলি আমি বললাম, সেই যুক্তির কাছে অন্য যুক্তি টিকবে না। সুতরাং সিদ্ধান্ত হচ্ছে__ আর্যরা কোন বাইরের দেশ থেকে আসেনি, আর্যরা ভারতেরই লােক। এই যে বলা হচ্ছে আর্যজাতি-—এটাই ভুল ! আর্য কোন জাতি নয়_ আর্য হচ্ছে একটা সংস্কৃতি বা Culture ! একটা বিশেষ সংস্কৃতির মানুষরা ছিলেন আর্য আর তার বাইরে যে সংস্কৃতি অর্থাৎ তা আর্য নয়_ সেই অর্থে 'অনার্য'। অনার্য মানে বুনাে, অসভ্য, বর্বর জাতি এমন নয়। আর্য   মানেই সভ্য জাতি আর অনার্য মানেই অসভ্য জাতি---এই ধরণের মনােভাব তৈরী করে দেওয়াটাও ইংরেজদের একটা বড় Success। কিন্তু ইতিহাস পর্যালোচনা করে দ্যাখো__রাক্ষস, অসুর ইত্যাদি জাতি যারা অনার্য হিসাবে উল্লিখিত হয়েছে প্রাচীন গ্রন্থাদিতে –এরা কিন্তু উন্নত ছিল! অনার্য রাবনের সাম্রাজ্য কিন্তু ছিল_ আর্য রামের রাজধানী থেকেও উন্নত। নগর সভ্যতায়, অর্থকৌলিন্যে শস্ত্রবিদ্যায় __অযােধ্যার থেকে লঙ্কার অবস্থা কত উন্নত ! এমন কি হনুমান, জাম্বুবান, বালি, সুগ্রীব, অঙ্গদ এরাও সব কত বড় বড় বীর _এরাও কত বিদ্বান বা সংস্কৃতিবান ছিল __এ সবকিছুই তাে রামায়ণে উল্লেখ রয়েছে !

  তাছাড়া ঐসব রাজ্যেও রাজতন্ত্র ছিল, উন্নত শাসনব্যবস্থা ছিল—তাহলে তারা অসভ্য বর্বর বা বুনাে তাে নয় ! অথচ ইংরেজদের গল্পটা এমনিভাবে বানানাে হয়েছিল যে __আর্যরা এসে অনার্যদের সবকিছু কেড়ে-কুড়ে নিয়ে তাদেরকে বনে-জঙ্গলে তাড়িয়ে দিয়েছিল __সেই হিসাবে বনে-জঙ্গলে,পাহাড়-পর্বতের গায়ে যারা বসবাস করে __তারাই এদেশের "আদিবাসী" ! এখনও খ্রীষ্টানরা বনে-জঙ্গলে থাকা বিভিন্ন উপজাতিদের Baptise করছে—ওরাও জনজাতিদেরকে এই কথাগুলােই বােঝায়। কিন্তু দ্যাখাে, শিব তো তিব্বতীয়ান পাহাড়ি উপজাতির লােক তাকে ভারতীয় শাশ্ত্রে দেবাদিদেব হিসাবে স্থান দেওয়া হােল কি করে ? আসলে যেটা হয়েছিল,তা হোল__ তৎকালে ভারতবর্ষের যে তিনটি শ্রেষ্ঠ সংস্কৃতি ছিল_ দীর্ঘদিন ধরেই এই সংস্কৃতিগুলির মধ্যে ভাব বিনিময় হয়েছে, ভাবের দেওয়া-নেওয়া হয়েছে। আর এক সংস্কৃতির সাথে অন্য সংস্কৃতির মেলামেশায় নতুন কিছু সৃষ্টি হওয়াটাই তাে নিয়ম_কোথাও কোথাও তেমনটাই হয়েছে ! আর সামাজিক বিরােধ বলছো—সে বিরােধ আজ কি নেই ? বিরােধ তাে মানুষের মনে, মানুষের স্বভাবে রয়েছে !

  মানুষের সমাজে এক শ্রেণীর মানুষ অন্য শ্রেণীকে সর্বদাই Dominate করতে চাইছে। সাধারণত উচ্চশ্রেণীরাই নিম্নশ্রেণীকে Dominate করে। উচ্চশ্রেনীর উচ্চতাটা নির্ভর করে__ ধনের শক্তি, জনতার শক্তি, যৌবনের শক্তি ইত্যাদির উপর। এই একই ভাব_ অর্থাৎ এই Dorninating tendency__ পশুদের জগতে, পাখীদের জগতে এমনকি গাছপালাদের মধ্যেও রয়েছে ! সুতরাং মানুষের স্বভাবের শুধু এই একটি দিক-কে Highlight করে আর কতটুকু লাভ হবে? নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ইংরেজদের চালিয়ে দেওয়া তত্ত্ব, আজও আমরা কপচে যাচ্ছি–এটা আমাদের লজ্জা! আসলে ইংরেজরা যখন ভারতবর্ষে উপনিবেশ স্থাপন করলো তখন ওরা দেখলো_ এই দেশটা খুবই প্রাচীন, তাছাড়া সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশসহ অন্যান্য উপনিবেশগুলি নিয়ে ওদের এই অসুবিধায় পড়তে হয়নি। কিন্তু ভারতবর্ষে এসে ওরা দেখলো_ এই জাতি তাে তাদের থেকেও সুপ্রাচীন সভ্যতার অধিকারী ! তখন ওদের Think Tank-রা নানান চিন্তা-ভাবনা শুরু করে অনেক theory বাতলে দিয়েছিল। তারমধ্যে অন্যতম ছিল যে ভারতবাসীকে বােঝাতে হবে যে তারা অনুন্নত, অসভ্য, অশিক্ষিত, কুসংকারাচ্ছন্ন ! অপরপক্ষে ইংরেজরা দেবতার জাতি, আর্যজাতি, সুসভ্য জাতি, শিক্ষিত জাতি, বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে উন্নত জাতি ! আর দ্বিতীয়ত _ওরা আরও বােঝাতে চেয়েছিল যে আর্যরাও বাইরে থেকে এসে এদেশে একদিন অনার্যদের আর্যীকরণ করে এই দেশকে সভ্যতা দিয়েছিল, আর এখন তারাও বাইরে থেকে এসেছে এই দেশকে পুনরায় সভ্য, শিক্ষিত করতে ! সুতরাং এই কম্মো করাটা ওদের অন্যায় কিছুই নয় ! এমনকি ওরা এই theory-গুলো ভারতীয় পাঠ্যপুস্তকের syllabus-এও অন্তর্ভুক্ত করে ছাত্র-ছাত্রিদের পাঠ দিতে শুরু করে দিলো যে, আর্যরা বাইরে থেকে এসেছে (যেটা এখনও পর্যন্তও ইতিহাস বই-এ পড়ানাে হয়)। এখনও ভারতের ইতিহাসের পাঠ্যপুস্তক রচনা হয় _জন মার্শাল বা আরো দু-একজন ইউরোপীয়ের লেখা বই থেকে_অনুবাদ করে। পরবর্তীকালে রমেশচন্দ্র মজুমদার, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, সুনীতি চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদি ভারতীয় ঐতিহাসিকরা কিছু ভারতের ইতিহাস গ্রন্থাকারে লিখেছে এবং কিছু পুরাতাত্ত্বিক গবেষণা করে সত্য উদঘাটনের চেষ্টাও হয়তাে করেছে__ কিন্তু ইউরোপীয় প্রভাব মুক্ত হোতে পারে নি । অবশ্য তৎকালে ভারতীয়দের কি-ই বা করার ছিল ! কোনকিছু লিখলে Manuscript-টা ইংরেজ পণ্ডিতদের দিয়ে চেক করিয়ে নেওয়া হােত। ওদের মনােমত হলে প্রকাশিত হবে অন্যথায় হবে না ! তাছাড়া ডিগ্রী দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন খেতাব, পারিশ্রমিক বা পুরষ্কার অথবা গবেষণার সুযােগ ___সব‌ই তাে তখন ইংরেজদেরই হাতে, কাজেই তাদেরকে তুষ্ট না করে কে রুষ্ট করতে চাইবে বলো? তাই ওরা বোলতো _“স্যার দরকারমতাে addition-alteration করে ছাপার উপযুক্ত করে নেবেন !” ইংরেজরাও ঐ Manuscript-এ ভারতের এবং ভারতীয়ত্বের গৌরব যেখানে যেখানে ফুটে উঠেছে_ সেই জায়গাগুলাে বাদ দিয়ে ছাপানাের অনুমতি দিতো। আমি এগুলাে যা বলছি তা একেবারে সত্যিকথা_একটুও বাড়িয়ে বলছি না। তৎকালে যে সমস্ত সৎসাহসী ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করতে চায়নি তাদের পাণ্ডুলিপি হয় নষ্ট করে দেওয়া হােত, না হোলে সেগুলি আর কখনই ছাপার অনুমতি পেতো না। স্বাধীনতার পূর্বে ইংরেজরা এটা করেছিল আর স্বাধীনোত্তর যুগে নেহেরু বা নেহেরুপন্থীরা এটা করেছে। কত যে এই ধরণের পাণ্ডুলিপি অপ্রকাশিত থেকে গেছে তার হিসাব ক’জন রাখে ?

তবে 1995 খ্রীষ্টাব্দে ভারতের স্বাধীনতার 50-বর্ষ হয়ে যাবে। এরফলে অনেক File লাল ফিতার বাঁধন খুলে বেরােবে বা অনেক গ্রন্থ যেগুলি Banned হয়ে ছিল সেগুলাের প্রকাশ ঘটবে। আর 2002 খ্রীষ্টাব্দের পর ভারতের প্রকৃত ইতিহাস উদঘাটনের কাজ শুরু হবে ! সুতরাং বেশী দেরি আর নেই–একটু ধৈর্য ধরলেই তখন তোমরা সব জানতে পারবে। তবে ভারতবর্ষ তথা গােটা পৃথিবীর এখন খুব সংকটকাল চলছে। পৃথিবীর দ্রুত পট পরিবর্তন হয়ে চলেছে। নানান দেশের মধ্যে অন্তর্ঘাত, যুদ্ধবিগ্রহ এমনকি বিশ্বযুদ্ধের মত পরিস্থিতিও তৈরী হয়ে যেতে পারে ! তার সঙ্গে জুটবে Natural Calamities।

সুতরাং এই চরম সঙ্কটকালে আজেবাজে চিন্তায় সময় না কাটিয়ে যতটা পারা যায় _তোমাদেরকে অধ্যাত্মচিন্তায় সময় কাটাতে হবে, অন্তর্মুখী হয়ে নিজের চেতনাকে উন্নত করার চেষ্টায় ব্রতী হতে হবে। এতে নিজেরও মঙ্গল হবে আবার দেশের বা দশেরও মঙ্গল হবে।