স্থান ~ শ্রীরামপুর, অসীম ব্যানার্জীর বাড়ি । সময় ~ ১৯৯০ খ্রীষ্টাব্দ । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ সব্যসাচী মান্না, প্রশান্ত ভট্টাচার্য, কানাই মুখার্জি, তৃষাণ মহারাজ, ন’কাকা ইত্যাদি ।

জিজ্ঞাস :— সবই যদি প্রাররূবশতই হয়, তাহলে ক্রিয়মাণ কর্মের আবার ভূমিকা কি ? আর আপনারা তাে ক্রিয়মাণকেই জোর দিতে বলেন—এটা কেন ?

গুরুমহারাজ :– শ্রীমদ্ভগবদগীতায় তিন প্রকার কর্মেরই তাে কথা রয়েছে বা তার ব্যাখ্যা রয়েছে— এগুলিই তাে এতক্ষণ আলােচনা হচ্ছিল ! প্রারব্ধবশত জাতক পিতা-মাতা লাভ করল, তার পূর্বপূর্ব জন্মের না মেটা কামনা-বাসনা মেটানাের উপযুক্ত পরিবেশ পেল। কিন্তু এই সবকিছু প্রারব্ধকর্ম হেতু লাভ করার পরেও এই জীবনে সে কি কাজ করবে, কিভাবে তা করবে—সেইসব সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা সেই ব্যক্তির রয়েছে। এইটাই মায়ের লীলা জগৎ। এখানে কাউকেই জোর করে কিছু করানাে হয় না ! তবে কোন ব্যক্তি পূর্ব-পূর্ব জন্মের সংস্কার থেকে উপযুক্ত পিতা-মাতা বা গুরুর guidance-এ একটা সুশৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্থ হতে পারে, নিয়ম-বিধি মেনে, Routine মাফিক জীবন কাটাতে পারে—এমনটা করলে তার অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে। আবার অন্যেরা Indisciplined Life-Lead করতে পারে, তাতে তাদের অগ্রগতি ব্যাহত হবে। যেন জড়বৎ জীবন—একই জায়গায় থেকে যাবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। কারও হয়তাে গতি আছে কিন্ত খুবই শ্লথ। আমি দেখেছি অনেককে, এখানে আসে–কয়েক কল্পকাল ধরে শরীর নিচ্ছে অগ্রগতির কোন চেষ্টাই করেনি ! অবশ্য এবার তাদের‌ও হবে।

“স্বাধীন ইচ্ছা”_ কেমন হবে বােঝাচ্ছি—ধরাে, কয়েকজনকে মােমবাতির আলাের সামনে বই নিয়ে বসিয়ে দেওয়া হােল! তাদের কেউ পড়া মুখস্থ করলো, কেউ বসে বসে নকল করলো—এটাই নিজস্বতা বা স্বাধীন ইচ্ছা, আর এগুলোই ক্রিয়মাণ কর্ম ! এই ক্রিয়মাণ কর্মের ফল সঞ্চিত হয় –পূর্ব পূর্ব জন্মের কর্মফলের সাথে।

 দ্যাখাে, এইটা না থাকলে তো সকলেই মুক্তপুরুষ হয়ে যেতো। যদিও বা কোন সময়ের সঞ্চিত কর্ম থেকে থাকে তাহলে প্রারন্ধবশত সেগুলি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে তার ভােগ করে নিলেই সঞ্চিতের ভাণ্ডার শূন্য হয়ে যেতাে—ফলে কয়েকজন্ম পরেই সকলেই মুক্ত। তাই হােত না কি ? কিন্তু এটা হয় না বা হবেও না। মহামায়ার ভুবনমােহিনী মায়ার জগতে মানুষকে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার দেওয়া হয়েছে আর এতেই “ফাঁস গিয়া !”

গীতা নিয়ে আলােচনা হচ্ছিল—তাই গীতা দিয়েই বোঝানোর চেষ্টা করছি! প্রথমদিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন যখন যুদ্ধ করব না বলল_ তখন তাকে ভগবান বােঝাচ্ছেন, “হে অর্জুন ! তুমি, ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ ইত্যাদি তােমরা সকলেই প্রারব্ধবশত এই যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছ। এবার সিদ্ধান্ত নাও তুমি কি করবে ? তুমি যুদ্ধ করবে না বলছো, কিন্তু তাহলে এরা তােমাকে মেরে ফেলবে। আর যদি যুদ্ধ করে মর—তাহলে বীরগতি পাবে, স্বর্গলাভ হবে। হে অর্জুন ! যদি তুমি বিজয়ী হও তাহলে তােমরা রাজ্যলাভ করবে। আর রাজ্যলাভই ছিল তােমার ইচ্ছা বা তােমার বাসনা ! ওদেরকে মারার বা রাজ্যলাভ করার জন্য বারবার তুমি প্রতিজ্ঞা করেছ, এখন যদি তুমি যুদ্ধ না করাে—তাহলে তুমি সত্যভ্রষ্ট হবে। অতএব তােমার যুদ্ধ করাই উচিৎ।

 এইভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বােঝাতে লাগলেন—কিন্তু এখানে লক্ষ্য রাখতে হবে তিনি কোথাও কোন জোর খাটালেন না। হ্যাঁ, জোর খাটালেন কখন যখন অর্জুন ভগবানের কাছে সম্পূর্ণরূপে Surrender বা আত্মসমর্পণ করলাে। তখন ভগবান আদেশ করলেন—“তােল অস্ত্র ! যুদ্ধ কর। কারণ যুদ্ধের ফলে হত্যার কোন কর্মফল তােমাকে স্পর্শ করবে না—কারণ আমি পূর্বেই এদের মেরে রেখেছি !” এইবার নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পারলে ? গীতাতেই রয়েছে গীতার ব্যাখ্যা।

আচ্ছা আপনি কি চাকরি করেন ? ও–রাজ্য সরকারের অ্যাকাউন্টেসে রয়েছেন ! আচ্ছা, তাহলে আপনাকে ঐ ভাবেই বােঝাবার চেষ্টা করি। কারণ যে Term-গুলাে ব্যবহার করব তা আপনার খুবই পরিচিত। ধরুন _আপনার কিছু টাকা fixed deposite হিসাবে ব্যাঙ্কে দশ বছরের জন্য রাখা আছে, যার Interest আপনি নির্দিষ্ট সময় অন্তর পেতে পারেন। ধরে নিন প্রতি বছরে একবার আপনার Interest আসতে শুরু করলো– কিন্তু পুরাে দশ বছরের Interest কখনই একেবারে আপনার account-এ আসবে না ! এদিকে আপনার Capital-টা কিন্তু ব্যাঙ্কে রয়েই যাবেসেটার কোন ক্ষয় হবে না। এবার যদি আপনি ব্যাঙ্কে আরও কিছু টাকা invest করেন বা জমা দেন—তাহলে আপনি প্রতি বছরে অথবা নির্দিষ্ট সময় অন্তর যে পরিমাণ Interest পেতেন, তার থেকে আরও বেশী পরিমাণে Interest পেতে শুরু করবেন—তাই নয় কি ? এবার দেখুন এর উল্টোটাও হতে পারে অর্থাৎ যদি আপনি প্রতিমাসের Interest ছাড়াও মূল Capital থেকে কিছু কিছু টাকা তুলে নেন, তাহলে প্রতিমাসে পাওয়া আপনার Interest-ও কমে যাবে। ধরুন আপনি এইভাবেই চালাতে শুরু করলেন তাহলে একটা সময় আসবে যখন আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ব্যালান্স 0 হয়ে যাবে। আর শূন্য (0) টাকার যেহেতু কোন Interest হয় না—তাই Interest-টাও 0 হয়ে যাবে।

এবার কর্ম ও কর্মফলের সাথে এই উদাহরণটা মিলিয়ে দিচ্ছিশুনুন। আপনার পূর্ব পূর্ব জন্মের সঞ্চিত কর্মফল যেন গচ্ছিত টাকা ! যার প্রাথমিক Interest বা প্রারব্ধ কর্মফল হিসাবে আপনি এই জীবন পেয়েছেন, এইবার ক্রিয়মাণ কর্ম খারাপ করে আপনি কর্মফল বাড়িয়ে ফেললেন, তাহলে পরবর্তীকালে Interest-ও বেড়ে গেল। ফলে ভােগ ও ভােগান্তি দুটোই বাড়বে। এবার যদি আপনি নিষ্কামকর্মের দ্বারা একটু একটু করে কর্মক্ষয় করতে পারেন— তাহলে Interest বা ভােগ ভােগান্তি কমতে থাকবে। আর কমতে কমতে একদিন balance_ শুন্য হয়ে যাবে। এটাকেই আধ্যাত্মিক জগতে মুক্তি বলা হয়েছে। এই অবস্থা প্রাপ্ত হলে সাধককে আর জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ফিরে আসতে হবে না।

এবার কথা হচ্ছে যে, ঐ যে বলা হােল Interest ছাড়াও মূল Cepital থেকে খরচ করার কথা ! কিন্তু সেই খরচটা করা যায় কি করে ? বলা হচ্ছে যে গুরুমুখী বা ইষ্টমুখী অথবা আত্মমুখী হয়ে কর্ম করলে তবেই এটা হয়। সাধারণত নিষ্কামকর্মের দ্বারাই কর্মক্ষয় হয়। কিন্তু গুরুনির্দেশিত পথ অবলম্বন না করে উল্টোপাল্টা পথে চললে অর্থাৎ এককথায় গুরুর সাহায্য ব্যতিরেকে নিষ্কাম কর্ম করা সহজ কথা নয় ! সঞ্চিত কর্মের ভাণ্ডার শূন্য করতে গেলে প্রথম ধাপ হ’ল সদগুরুর শরণাপন্ন হওয়া। তার কৃপালাভ এবং আপনার প্রচেষ্টা এই দুটির মেলবন্ধন হয়ে গেলে শতশত বৎসরের, সংস্কারের পাহাড় নিঃশেষ হয়ে যাবে এক জন্মেই। সংস্কারের পাহাড় আসলে কি জানাে তাে যেন তুলাের পাহাড়–যা দমকা হাওয়া এলেই উড়ে যায়। মুমুক্ষুত্ব আর মহাপুরুষসংসর্গ হচ্ছে যেন আগুন আর সেই ঝড় ! সদগুরু বা কোন মহাপুরুষের সংসর্গে কোন মুমুক্ষু মানুষ এসে পৌছালেই সংস্কারের পাহাড়ে আগুন ধরে যায় আর দমকা ঝড়ে ঐ আগুন লেলিহান রূপ নিয়ে একেবারে ভস্মীভূত করে দেয়। এক জন্মেই জন্ম-জন্মান্তরের চক্র অতিক্রম করে ফেলে, অপূর্ণতার জ্বালা বুকে নিয়ে আর বারবার ঘুরতে হয় না।

জিজ্ঞাসু :— জন্ম-জন্মান্তর বলছেন ! কিন্তু জন্মান্তরবাদ তাে অনেকে মানতেই চায়না ?

গুরুমহারাজ :— অনেকেই মানে কি না মানে–তা দেখে তােমার কি লাভ ? তুমি কি মানাে— অথবা মানাে না সেটাই আসল। আর ভারতীয় পরম্পরার শিক্ষা মানায় থেমে থাকতে বলেনি, জানতে বলা হয়েছে ! বেদ বলেছে “জানাে ?” আরে বিজ্ঞান মানেও তাে ‘বিশেষরূপে জানা’। যে কোন ‘বাদ’-কে মানা হয় আর ‘বিজ্ঞান’কে তাে জানতে হয়। এখানেও তুমি বললে ‘জন্মান্তরবাদ’, কিন্তু আমি বলছি ‘জন্মান্তরবিজ্ঞান’। তাহলে আমায় জিজ্ঞাসা করতে পারাে যে এই বিজ্ঞানটা তুমি জানতে পারছ না কেন–বা কিভাবে জানতে পারবে ? তার উত্তরে আমি বলব—তুমি জানার চেষ্টাটাই বা কি করেছ ? জড়বিজ্ঞানের ছাত্রদের বিজ্ঞানীদের দেওয়া কয়েকটা সূত্র মুখস্থ করে তার Explantion করতে করতেই ১০/১২টা বছর পার হয়ে যায়। তেমনি করে জন্মান্তরবিজ্ঞান জানার জন্য কটা ছাত্র প্রচেষ্টা করছে যে জানতে পারবে ?

দেখবে একই পিতামাতার ভিন্ন ভিন্ন চেহারায়, ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির সন্তান জন্মাচ্ছে—এটাই তাে জন্মান্তর বিজ্ঞানের একটা অন্যতম প্রমাণ ? একই ‘ওভাম’, একই ‘সিড’, একই গর্ভ কিন্তু তাও আলাদা –জড়বিজ্ঞান দিয়ে এর ব্যাখ্যা হবে ? জাইগােট Formation-এর সময় ক্রোমােজোম বিন্যাসের পার্থক্যই বা হয় কেন ? এর উত্তর কে দেবে ?

এবার তােমার নিজের জীবন দিয়ে বিচার করাে—তুমি তােমার জীবনের অতীতে ফিরে যাও। এখন তুমি যুবক–তােমার যৌবনকাল, এর আগে ছিল কৈশাের, তার আগে বাল্য, আরাে আগে শৈশব, তারও আগে তুমি ছিলে মাতৃগর্ভে। তার আগে তুমি ছিলে পিতৃদেহে শুক্ররূপে। শুক্রের অতীতরূপ পিতৃদেহের মজ্জা, মজ্জার অতীতরূপ অস্থি, এইভাবে বসা, মাংস, রক্ত, রস। এই রস এসেছিল খাদ্য থেকে। খাদ্য এসেছে শস্য থেকে, শস্য পুষ্ট হয়েছিল চন্দ্রকিরণ এবং শিশিরকণার দ্বারা—এগুলি আবার সৃষ্টি হয়েছে সূর্যকিরণের দ্বারা। তাহলে সুর্যকিরণ পর্যন্ত তােমার জন্মান্তরের ধাপগুলি জানলে তাে এবং মানলেও। আর পুরাে প্রক্রিয়াটা বুঝতে পারলে ! স্থূল বিজ্ঞান দিয়েই ব্যাখ্যা করা গেল তাই নয় কি ? এবার এই যে পাঞ্চভৌতিক দেহ বা শরীর এইটি যখন মৃত্যুর পর বিনষ্ট হয়, তখন তা পঞ্চভুতেই বিলীন হয়ে যায়। এর ক্ষিতিতত্ত্ব মাটিতে মেশে, অপতত্ত্ব জল বা জলীয় বাষ্পেতে মেশে, তেজঃতত্ত্ব বায়ুতে (Gas) মেশে, মরুতত্ত্ব (Plasma) তেজ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়, আর ব্যোমতত্ত্ব বা মহাশূন্যে সবকিছুরই অবস্থান হয়। আবার নতুন শরীর যখন গঠন হয়, এই পঞ্চভূতের সাহায্যেই ধীরে ধীরে তা রূপ প্রাপ্ত হয়। প্রাণই শক্তি, এটি শস্য অবস্থায় প্রথম ক্রিয়াশীল হয়। এইটিই বিবর্তনে মানবশরীরে শুক্রাণুতে এসে উন্নত রূপ নেয়। নারী শরীরের ডিম্বাণুও প্রাণশক্তির আধার। শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলিত রূপ থেকেই পূর্ণাঙ্গ মানবের জীবনের জয়যাত্রা শুরু হয়।

এবার কথা হচ্ছে, কোথাও কোন জাতকের জন্ম হােল, এটা কি কোন আকস্মিক ঘটনা ? না তা নয়। কারণ ছাড়া কখনই কোন কার্য হয় না। এবার মানবের পুনরায় জন্মগ্রহণের কারণ বলছি শােন। মানুষের জীবনকালে তার সমস্ত কামনা-বাসনা মেটে না, এই অতৃপ্ত কামনা-বাসনা মৃত্যুর পূর্বে চিত্তে প্রসুপ্ত হয়ে যায়। এগুলিকেই চিত্তের সংস্কার বলা হয়। উপযুক্ত পরিবেশ, উপযুক্ত শরীর পেলে সেই অতৃপ্ত কামনা-বাসনা মিটতে পারে বা পরিতৃপ্ত হতে পারে, এই পরিতৃপ্তির আশায় চিত্তের সংস্কারাদি পুনরায় ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। পরবর্তী শরীর গ্রহণের এটাই কার্য-কারণ সূত্র। এই বৈদিক সূত্র নির্ভেজাল বিজ্ঞানসম্মত। জন্মান্তর নিয়ে এত ব্যাপক গবেষণা ভারতবর্ষ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও হয়নি। জীববিজ্ঞানী বা শরীরবিজ্ঞানীরা (Physician) মানবশরীরের বা মানবজীবনের যে সকল সমস্যার মীমাংসা করতে পারে না—ভারতীয় বৈদিক তত্ত্ব দিয়ে, ভারতীয় যােগীরা অনায়াসে সে সমস্ত কিছুর সমাধান করে দিয়ে গেছেন। তবে দ্যাখাে, ভাসা-ভাসা জ্ঞান লাভ করলে উপরে ভাসতে হয় কিন্তু যে কোন তত্ত্বের বােধ করতে চাইলে গভীরতায় ডুব দিতে হবে। জন্মান্তরবিজ্ঞানের বােধ আনতে হলে নিজের জীবনের গভীরেই ডুব মারাে—দেখবে, সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। তখন শুধুই “বােধে বােধ”।