স্থান ~ শ্রীরামপুর, অসীম ব্যানার্জীর বাড়ি । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ সব্যসাচী মান্না, প্রশান্তদা, শিবপুরের মুখার্জী বাড়ির লোকেরা, ন’কাকা প্রমুখেরা ৷

জিজ্ঞাসু :– প্রকৃত সদ্গুরুর কাছে দীক্ষালাভের সৌভাগ্য আর ক’জনের হয় ? আমারও হয়নি। কুলগুরুর কাছে দীক্ষা নিয়েছি——আর তখন থেকেই তার নির্দেশমত জপ-তপ করি, কিন্তু বুড়ো হয়ে গেলাম এখনও পর্যন্ত উপলব্ধি তাে কিছুই হােল না ?

গুরুমহারাজ :– আপনার জীবনে কোন সদগুরুর সংস্পর্শ লাভ যদি কখনাে ঘটে—তাহলে তাে আপনি বুঝতেও পারবেন না যে আপনার কখন দীক্ষা হয়ে গেছে ? আপনার কি ধারণা – দীক্ষাপদ্ধতি কি একরকমের ? তা নয়—বিভিন্ন পদ্ধতিতে দীক্ষা দেওয়া যায়, সদগুরু ইচ্ছা করলে দৃষ্টিদানের মাধ্যমেই দীক্ষা দিতে পারেন। কথাটা বুঝতে পারলেন ? তিনি একবার আপনার চোখের দিকে তাকাবেন তাে আপনার মধ্যে আধ্যাত্মিক শক্তি Transfer করে আপনাকে দীক্ষিত করে দিতে পারেন। এছাড়াও তিনি হয়তো সেখানে উপস্থিতই নেই, সেই অবস্থাতেও তিনি আপনাকে সূক্ষ্মে দীক্ষা দিয়ে দিতে পারেন। সুতরাং সদগুরুর ব্যাপারটাই আলাদা ! তাঁরা জগতের বা মানুষের কল্যাণ করার জন্যই শরীরধারণ করেন, ফলে তাঁদের কাছে মানুষ এলে—মানুষের কোন না কোন কল্যাণ হবেই হবে ! আর আপনি যে বলছিলেন ‘কুলগুরু’র কথা ! এখানেও বােঝার ভুল রয়েছে ‘কুল’ বলতে ‘বংশ’ ধরে নেওয়া হয়েছে। এবং বংশ পরম্পরার গুরুকেই কুলগুরু ভাবা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়, কুলগুরু কথাটি এসেছে ‘কৌল’ থেকে। ‘কৌল’——অর্থাৎ যিনি অকূলে কূল পেয়েছেন, যাঁর কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়েছে। এই ধরণের ব্যক্তিকে অন্বেষণ না করে আপনি বংশ পরম্পরার কোন গুরুর কাছে দীক্ষাগ্রহণ করেছেন, তার ফল যা হওয়া উচিত তাই হয়েছে।

 কিন্তু দেখুন ! আপনি ব্রাহ্মণ, উচ্চকুলজাত, শিক্ষিত_ আপনাদের পদবী মুখার্জী, তাহলে আপনার মতাে ব্যক্তি যদি জীবন-সায়াহ্নে এসে “কিছু হলাে না” বলে দুঃখ প্রকাশ করেন__ তাহলে আমাদের মতো যারা এখানে বসে আছে, যারা উচ্চকুলজাত নয়_ অতটা শিক্ষিত বা প্রতিষ্ঠিত নয় তাদের তাে বড়ই ভয়ের ব্যাপার মশাই ! (গুরুমহারাজের কথা বলার ধরণ দেখে উপস্থিত সকলেই ‘হাে হাে ' করে হেসে উঠেছিল)। দেখুন মুখার্জীবাবু (গুরুমহারাজ তখনই ওনার নাম এবং গােত্র পরিচয় জানলেন--ভদ্রলােক তেমন খুব একটা পূর্ব পরিচিত নয়।) __আপনাদের তাে গােত্রপিতা ভরদ্বাজ ! বাবাঃ _কত বড় একজন ঋষি ছিলেন এই ভরদ্বাজ ! তাহলে আপনার তাে উচিত ছিল এই জীবনে ঋষি ভরদ্বাজ হয়ে ওঠা বা অন্ততঃ হয়ে ওঠার চেষ্টা করা ! জানেন—ব্যাপারটা হচ্ছে কোন ব্যক্তির যেটি'গোত্র', তার ultimate যাত্রাপথ বা লক্ষ্য হচ্ছে গােত্রপিতা_যে ঋষি, তার স্বরূপ প্রাপ্ত হওয়া ! সেই অর্থে, আপনাদের গােত্রপিতা যেহেতু ভরদ্বাজ—তাই ভরদ্বাজ গােত্রভুক্ত যে কোন ব্যক্তির লক্ষ্য হওয়া উচিত এক একজন ‘ভরদ্বাজ’ হয়ে ওঠা ! ভরদ্বাজ ঋষির কথা রামায়ণে উল্লেখ রয়েছে, সেখানে আছে যে ইনি রাবণবধের পূর্বে রামচন্দ্রের সাথে দেখা করে তাঁকে ঋষিদের সাধনলব্ধ 'দিব্যাস্ত্রসমূহ' দিয়েছিলেন। রাবণ এই অস্ত্রগুলি (দিব্যাস্ত্র) লাভ করার জন্য বার বার ঋষিদের আশ্রম আক্রমণ কোরতো, তাঁদেরকে অত্যাচার কোরতাে—কিন্তু ঋষিরা রাবণকে দিব্যাস্ত্র ব্যবহারের অযােগ্য বিবেচনা করে কখনই এগুলাে দেননি। রাম স্বয়ং ভগবান একথা বুঝতে পেরেই দিব্যাস্ত্র ব্যবহারের উপযুক্ত ব্যক্তি, এটা বুঝে ওঁরা রামকে অস্ত্রগুলি দিয়েছিলেন। তাহলে বুঝতে পারছেন তাে, আপনারা কত মহান ঋষির বংশধর !

 যাইহােক, এবার আপনার নিজের কথায় আসি--আপনি এক্ষুনি দুঃখপ্রকাশ করলেন যে, যৌবন বয়সে দীক্ষা নিয়েছেন এবং তখন থেকে ধ্যান-জপ করেন, কিন্তু আধ্যাত্মিক উন্নতির কোন লক্ষণ আপনার জীবনে প্রকাশ ঘটেনি ! আচ্ছা, আপনি কখন এবং কিভাবে ধ্যান-জপ করেন এবং কতক্ষণই বা করেন ? (ভদ্রলােক উত্তর দিলেন) শুনে তখন গুরুজী বললেন---আচ্ছা ! আপনি আসনশুদ্ধি- ভূতশুদ্ধি করে তারপর তো জপে বসেন ? (ভদ্রলােক সম্মতি জানাল)। প্রাণায়ামাদি করেন ? আচ্ছা-- আপনি গায়ত্রীর ধ্যান করেন বললেন–ওটি কি ভাবে করেন ? (ভদ্রলােক বললেন যে তিনি ‘ধ্যান’ তেমন একটা করেন না। বিভিন্ন দেবদেবীর ধ্যানের মন্ত্র উচ্চারণ করেন, প্রণামমন্ত্র উচ্চারণ করেন, কমপক্ষে দশবার সম্ভব হলে আরাে বেশীবার গায়ত্রী জপ করেন ইত্যাদি। সব শুনে গুরুমহারাজ আবার বলতে শুরু করলেন–) তাহলে তাে আপনার আসলেই ফাঁকি হয়ে যাচ্ছে। কাজের কাজটিই হচ্ছে না। আর এইজন্যেই আপনি taste পাচ্ছেন না। পূজায় বসার পর আসনশুদ্ধি-ভূতশুদ্ধি করার পর ন্যাস করবেন–ন্যাস ! যদি ন্যাস না করতে পারেন তাহলে ‘সহজ প্রাণায়াম' করবেন। সহজ প্রাণায়াম জানেন তাে–ডান হাতের বুড়াে আঙুল দিয়ে ডান নাসারন্ধ্র চেপে ধরে বাম নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রশ্বাস নেবেন এবং সম্পূর্ণ বাতাস টানা হয়ে গেলে ডান হাতের বাকী আঙুলগুলাে দিয়ে বাম নাসারন্ধ্র চেপে ধরে ডান নাসারন্ধ্র দিয়ে সমস্ত বায়ু ছেড়ে দেবেন। সব বাতাস ছাড়া হয়ে গেলে ঐ ডান নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রশ্বাস নেবেন এবং সম্পূর্ণ হলে ঐটিকে বন্ধ করে বাম নাসারন্ধ্র খুলে সব বাতাস বের করে দেবেন। এইভাবে এই ক্রিয়া বেশ খানিকক্ষণ করবেন। আপনি তো Retired Man ! সংসারে বিশেষ কাজও নেই– তাই অনেকক্ষণ এই ক্রিয়াটা করুন না ! এতে দেহে ও মনে সাম্যভাব আসবে। ধীরে ধীরে অনেকক্ষণ এই ক্রিয়া করলে দেখবেন আপনার চিত্ত স্থির হয়ে আসবে। আসলে প্রাণায়ামে প্রাণ স্থির হয়—আর প্রাণ স্থির হলে চিত্তে শান্তভাব আসে। এইরকম একটা ভাব যখন আসবে তখন ধ্যান করবেন। দেখবেন ধ্যানে কেমন মন বসে যাচ্ছে। আপনার মধ্যে একটা আনন্দের বােধ জাগ্রত হতে থাকবে আর এরকমটা হতে শুরু করলেই আপনার নিজেরই ধ্যান করার একটা নেশা জেগে যাবে। তখন আর ধ্যান না করে আপনি থাকতেই পারবেন না।



 দেখুন মন্ত্র উচ্চারণটা বড় কথা নয় ! মন্ত্রে যেমনটি বলেছে তেমনটি করতে হবে। তবে বৈদিক মন্ত্র যদি হয় সেগুলি ঠিকমতাে উচ্চারণ করলে Natural ভাবেই প্রাণায়াম হয়ে যায়। কিন্তু দেব-দেবীর প্রণাম-মন্ত্রগুলি তাে বৈদিক নয়, এগুলি অনেক পরে বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিদের দ্বারা সৃষ্ট। ফলে এগুলি শ্রুতিমধুর হলেও ঋষিদের দ্বারা সৃষ্ট মন্ত্রের মতাে অতটা Scientific নয় ! সামবেদের মন্ত্রগুলির ছন্দ, সুর, মাত্রা ঠিকমতাে উচ্চারিত হলে শুধু ব্যক্তিরই নয়—চারিপাশের পরিবেশেরও মঙ্গল হয়। এমন শােনা যায় শুধুমাত্র বেদমন্ত্র উচ্চারণ করে ঋষিরা আগুন জ্বালাতেন, বৃষ্টি নামাতেন, ঝড়ের তাণ্ডব থামাতেন।

যাইহােক, আপনাকে যা বলছিলাম—আপনি তাে বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রণামমন্ত্র উচ্চারণ করেন বলছিলেন, কিন্তু ওতে কি হবে ? মন্ত্রে বিভিন্ন কল্পিত দেব-দেবীর বর্ণনা, স্তুতি এসব করা আছে। পূজা পদ্ধতিতে দেখবেন ন্যাসের সময় আপনারই শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন দেব-দেবীর অবস্থান—এইরকম বর্ণনা করা আছে। আপনি পুজো করার সময় ঐ পদ্ধতিগুলাে follow করবেন অর্থাৎ আপনার দেহের অভ্যন্তরের নির্দিষ্ট জায়গায় নির্দিষ্ট মূর্তি-র ধ্যান করবেন। প্রথম প্রথম অন্তত আধঘণ্টা অভ্যাস করুন—ধীরে ধীরে সময় বাড়াবেন। এইভাবে নিয়মিত করতে থাকুন—দেখবেন তিন মাসের মধ্যে ফল পাবেন।

জিজ্ঞাসু (ঐ ভদ্রলােক) :– খুব ভালাে লাগলো_মহারাজ ! আপনার কথায় মনে অনেকটা জোর পেলাম। এতকথা যখন বলেই দিলেন, তাহলে আর একটু কষ্ট করে দয়া করে যদি আর একটা জিজ্ঞাসার উত্তর দেন, তাহলে বড়ই অনুগৃহীত হই। ঐযে আপনি ফল পাবার কথা বললেন, এটা ঠিক কি রকম ? অর্থাৎ কেমন উপলব্ধি হলে আমি বুঝতে পারবাে যে আমার সাধন-ভজন ঠিকঠাক চলছে ?

গুরুমহারাজ :— আমি যেমনটা বললাম ঠিক ঠিক তেমন যদি আপনি করতে পারেন তাহলে প্রথমেই আপনি আপনার শরীরের অভ্যন্তরে যে নানারকম ক্রিয়া শুরু হয়েছে তা feel করতে পারবেন। ঠিকমত প্রাণায়াম-ন্যাসাদি করে আপনি যদি আপনার ইষ্টের ধ্যান শুরু করেন, প্রথমে বক্ষদেশে বা অনাহত চক্রে, যেটাকে আপনি ‘হৃদয়ে ধ্যান করেন’ বলছিলেন (ভদ্রলােক নিজের বক্ষপ্রদেশ দেখিয়ে একটু আগেই বলছিলেন যে তিনি হৃদয়ে ধ্যান করেন। কিন্তু গুরুমহারাজ অন্য একটা Sitting-এ বলছিলেন যে ব্যক্তিবিশেষে হৃদয়ের অবস্থান বদলে যায়। ‘হৃদয়’ অর্থে Heart নয় উনি বলেছিলেন ‘হৃদয়’ হল শরীরের Center of gravity, স্থূলশরীরে center of gravity বা ‘হৃদয়’ হল ‘অনাহত চক্র’ বা বক্ষপ্রদেশে, সূক্ষ্মশরীরের Center of gravity বা ‘হৃদয়’ হল আজ্ঞাচক্রে বা কপালের মধ্যে এবং কারণ শরীরের Center of gravity হল সহস্রারে বা মস্তকের উপরিভাগে। এছাড়াও উনি বলেছিলেন—সাধকের চেতনার Level অনুযায়ী সদগুরু শিষ্যকে ধ্যানের কেন্দ্র নির্বাচন করে দেন। এক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তিকে তার গুরু যেহেতু বক্ষপ্রদেশে ধ্যান করতে বলেছিলেন, তাই ঐ ব্যক্তি ঐ স্থানকেই ‘হৃদয়’ বলে উল্লেখ করেছিল।)_ ওখানেই মনঃসংযােগ করে ধ্যান করতে থাকুন। কিছু দিনের মধ্যেই আপনি দেখবেন যে আপনার শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা গরম স্রোত উপর দিকে বয়ে যাচ্ছে। এইভাবে কিছুক্ষণ ধ্যানে থাকলেই আপনার কপালে বিন্দু বিন্দু স্বেদ জমবে। শিরদাঁড়া দিয়ে ঐ গরম প্রবাহ বয়ে যাবার সময় আপনার শরীরে কম্পন হতে পারে, আপনি হয়তাে সামনে বা পিছনে ঝুঁকেও যেতে পারেন।

এইরকম বেশ কিছুদিন চলার পর যদি আপনি আপনার সাধন-কর্মে একনিষ্ঠ থাকেন তাহলে দেখবেন আপনি ধ্যানে বসে শরীরের যে কোন স্থানে মনঃসংযােগ করলেই উর্ধ্বগামী জ্যোতিদর্শন করতে থাকবেন। অর্থাৎ জ্যোতির অনুভূতি হতে থাকবে (এটা দর্শন—দেখা নয় অনুভূতি)। এইভাবে চলতে থাকলে আপনি আপনার ধ্যানের কেন্দ্রও ঊর্ধ্বমুখী করতে থাকবেন—এবং যখন দেখবেন আপনার মন আজ্ঞাচক্রে কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্থির হচ্ছে, তখন ঐ জ্যোতি উজ্জ্বলতর হচ্ছে। এরপর দেখবেন তুবড়ির ফুলঝুরির ন্যায় জ্যোতিস্ফুলিঙ্গ যেন উন্মুক্ত হৃদয়াকাশে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। সেই সঙ্গে সঙ্গে আপনার শরীরে একপ্রকার অদ্ভুত শিহরন হবে, ক্ষণে ক্ষণে পুলকিত হবেন আপনি। সেই অবস্থায় পাশ থেকে যদি কেউ আপনাকে দেখে তাহলে সে দেখবে ঘুমন্ত শিশুর মতাে আপনার অবস্থা। আপনার মুখমণ্ডলে কখনও ফুটে উঠছে হাসির আভা, কখনও ফুঁপিয়ে কান্নার মতাে Expression.

  এরপর যদি আপনি আরো আগাতে পারেন তাহলে আপনি হিরণ্যগর্ভের সন্ধান পাবেন। 'হিরণ্য’ জানেন গলিত ‘সােনা’ বা ‘স্বর্ণ’ –স্বর্ণের প্রবাহ যেন সদাসর্বদা বিরাজ করছে। এই বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সবই যেন তরল সােনা। এতদূরই আপনি আপনার শক্তিতে পৌঁছাতে পারেন—সুতরাং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যান। ভারতীয় ঋষি পরম্পরার শক্তি নিশ্চয়ই আপনাকে সাহায্য করবে।