স্থান ~ শ্রীরামপুর, হুগলি ৷ সময় ~ ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ । উপস্থিত ব্যক্তিগণ ~ সব্যসাচী মান্না, প্রশান্ত ভট্টাচার্য, কানাই মুখার্জি, প্রমুখ ব্যক্তিগণ ।

জিজ্ঞাসু :– আচ্ছা গুরুজী ! আপনি তাে ইউরােপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে এলেন ? শুনেছি জার্মানীতেও গিয়েছিলেন। তা এখন জার্মানীর পরিস্থিতি কেমন ? দুটো বিশ্বযুদ্ধতেই তাে জার্মানীর অগ্রণী ভূমিকা ছিল, আর দুটো যুদ্ধেই সবচাইতে বেশী মার খেয়েছে ওরাই। প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটি! পরে অবশ্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন তাে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ দোরগােড়ায় এসে গেছে—এবারেও কি জার্মানীর সেই একই ভূমিকা হবে ?

গুরুমহারাজ :– দ্যাখো, ‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়’–একথাটি সমাজে চালু রয়েছে ঠিকই, কিন্তু এক্ষেত্রেও যে তাই হবে এমন কথা আমি বলতে চাই না। তবে এখানে আমি একটা কথা নিশ্চয়ই বোলবো যে, এই যে দুই জার্মানী এক হয়েছে (পূর্ব জার্মানী ও পশ্চিম জার্মানী) এটা কিন্তু বিংশ শতাব্দীর একটা উল্লেখযােগ্য ঘটনা বলে জানবে। এখানকার T.V., ঐ “এক হওয়ার” ঘটনাটা কতটা দেখিয়েছে তা জানি না, কিন্তু ইউরােপের বিভিন্ন T.V. চ্যানেলে কয়েকদিন ধরে বার্লিনের প্রাচীর ভাঙ্গার দৃশ্য এবং ইষ্ট-বার্লিন ও ওয়েষ্ট-বার্লিনের এক হওয়ার দৃশ্য দেখিয়েই গেছে। বাঁধভাঙ্গা জলের মতাে যখন পূর্ব জার্মানীর লােকেরা পশ্চিম জার্মানীর ভিতর ঢুকেছিল—তখন পরস্পর পরস্পরকে “ভাই” বলে সম্বােধন করে একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছে। কখনাে কেউ কাউকে Refugee ভাবেনি, যেন ভাইয়ের কাছে ভাই ফিরে এসেছে–এমন আচরণ করেছে। এই দুই জার্মানীর মিলন কিন্তু প্রথম বিশ্বের অন্য দেশগুলির খুব একটা ভালাে লাগেনি, অবশ্য ভালাে লাগার কথাও নয় ! কারণ ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স এইসব দেশ যেটুকু মার খেয়েছে, তাতাে জার্মানীর হাতেই।

তারপর পর পর দুটো বিশ্বযুদ্ধে (1914–1919 এবং 1939–1945) জার্মানীর যা ক্ষতি হয়েছিল তা অবর্ণনীয় এবং সবাই ভেবেছিল এই ক্ষতি পূরণ হবার নয় ! গোটা দেশটার একটাও শহর অক্ষত ছিল না। তার উপর দেশটাকে দু’ভাগে ভাগ করে দেওয়া হােল ! এছাড়াও ছিল বিজয়ী পক্ষের নানারকম অপমানজনক ও দেশের অগ্রগতির পক্ষে ক্ষতিকারক শর্ত। কিন্তু এই তলানিতে ঠেকা অবস্থা থেকে কি দ্রুত ওরা নিজেদেরকে তৈরী করে নিয়েছে ভাবাে দেখি ! স্বামী বিবেকানন্দ জার্মানদের সম্বন্ধে বলতেন—ওরা অসুর জাতি। বিরােচনের বংশধর। প্রকৃতপক্ষে জার্মানরা প্রচণ্ড পরিশ্রমী জাতি, দারুণ খাটতে পারে। মাত্র এই কয়েকটা বছরে সমগ্র দেশটাকে একেবারে আধুনিক ভাবে গড়ে তুলতে কি প্রচণ্ড পরিশ্রমটাই না করতে হয়েছে তা এখানকার অর্থাৎ ভারতের মানুষ চিন্তা করতেই পারবে না ! এখন দ্যাখাে–অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত উন্নতির বিচারে আন্তর্জাতিক তালিকায় একেবারে উপরের দিকে রয়েছে জার্মানী।

এবার কথা হচ্ছে ইউরােপের অন্য দেশগুলি জার্মানীর উন্নতিতে চিন্তিত কেন ! মুশকিলটা হােল এই যে, জার্মানজাতি প্রচণ্ড প্রতিশােধ-স্পৃহ জাতি ! কোনরকম অপমানকেই এরা সহজে ভােলে না ! তাই প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই দেশটির প্রতি যে অন্যায়-অবিচার হয়েছিল তা এরা কখনই ভােলেনি। এখন আবার দুই জার্মানী এক হয়ে গেল__ এতে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিপক্ষ দেশগুলি যথেষ্ট চিন্তায় পড়েছে। ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ঐ ঘটনার (দুই জার্মানীর এক হবার ঘটনায়) প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিল, “আমরা এতে খুবই চিন্তিত !” চিন্তিত হবারই কথা। কারণ ফরাসি জাতির ইতিহাস পর্যালােচনা করে দেখা যায় ওরা যেটুকু মার খেয়েছে তা জার্মানীর হাতেই খেয়েছে।

 বর্তমানে (1990–91) ইরাক, কুয়েত দেশগুলির মধ্যে যে যুদ্ধ চলছে তাতে আমেরিকা এবং ইউরােপের কিছু দেশ মাথা ঘামিয়েছে। কিন্তু জার্মানী আশ্চর্যজনক ভাবে চুপ থেকে গেছে, কোনভাবেই প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করেনি _তেমন কোন বিশেষ মন্তব্যও করছে না ! আন্তর্জাতিক কুটনীতিবিদরা এগুলাে লক্ষ্য রাখছে—এতে ইউরােপের অন্য দেশগুলির চিন্তাও বাড়ছে। তুমি জিজ্ঞাসা করলে (জার্মানজাতি আবার ‘মার’ খাবে কি না!) তাই জার্মানীর বর্তমান অবস্থা এবং এই জাতির চরিত্র বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করলাম। এই জাতির বৈশিষ্ট্য যে, সুযােগ পেলে ছােবল এরা মারবেই ! তবে তার ফল কি হবে সে উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ !

জিজ্ঞাসু :— আচ্ছা গুরুমহারাজ! ভারতবর্ষও তাে পরমাণু গবেষণা, মহাকাশ গবেষণা, ইলেকট্রনিক্স বা অন্যান্য প্রযুক্তিতে বর্তমানে বিশেষ উন্নতি করেছে, তবু এগুলাে উন্নত দেশগুলির সঙ্গে তুলনীয় হচ্ছে না কেন ?

গুরুমহারাজ :— দ্যাখাে, ভারতবর্ষের বর্তমানে যে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারসমূহ বা উন্নতি—এগুলাের গােপনীয়তা ঠিকমতাে রক্ষা হয়নি। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে কিন্তু এই ব্যাপারগুলাে এতটা খােলামেলা নয়। ভারতবর্ষে এমনটা হওয়ার অবশ্য কিছু কিছু কারণও রয়েছে। এখানকার বেশীরভাগ গবেষণাগারের যন্ত্রপাতিই তাে বিদেশের অর্থাৎ পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলিতে তৈরি, তাছাড়া প্রযুক্তিগত শিক্ষার জন্য এখনও বড় বড় বিজ্ঞানীদের ঐ দেশগুলির উপরেই নির্ভর করে থাকতে হয়। ওখানকার বিশেষজ্ঞরাই এখানে এসে সবকিছু Monitering করে। তাহলে আমাদের দেশের গবেষণালব্ধ বিষয়সমূহের গােপনীয়তা থাকবে কি করে ? সেই অর্থে ভারতবর্ষে এখনও পর্যন্ত যা যা বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে, প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে– সেগুলির সব খবরই ঐ উন্নত দেশগুলি রাখে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, যেমন ধরাে– মহাকাশ গবেষণায় ভারত এখন যথেষ্ট উন্নত, কারণ এদেশের মহাকাশ বিজ্ঞানীরা খুবই মেধাবী এবং প্রচন্ড নিষ্ঠাভরে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এরা হয়তাে কোন Satelite মহাকাশে উৎক্ষেপণ করতে চায় কিন্তু রকেট তাে ভারতে তৈরি হয় না (1990 খ্রীষ্টাব্দ) ! হয়তাে জার্মানী কিম্বা রাশিয়া থেকে এগুলাে আসে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে উৎক্ষেপণ কেন্দ্রও বাইরের দেশে ভাড়া করতে হয়। আর ঐ দেশের Super Computer-গুলি এত উন্নত যে, একটু-আধটু clew পেলেই যে কোন যন্ত্রে র সমস্ত code, তার Mechanism সবটা জেনে যাবে।

এছাড়াও রয়েছে দুর্নীতি, যা ভারতবর্ষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে গেছে। সরকারি নিম্নপদস্থ থেকে উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা কেউ কম যায় না। ভারতবর্ষের বিভিন্ন দপ্তরের কত গােপন ফাইল, গােপন তথ্য বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, শুধুমাত্র মােটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে—তার হিসাব করতে পারবে না। এই জন্যেই দেখা যায় ভারতবর্ষের অনেক গােপন খবর যা ভারতবাসীরাই জানে না—এখানকার সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত খবরটা পায়নি, অথচ দেখবে হয়তাে B.B.C-র কোন চ্যানেলে ভারতের ঐ বিশেষ খবরটা পরিবেশিত হচ্ছে !

যে কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রেই হােক বা দেশের ক্ষেত্রে নিয়মটা একইরকম। আর সেটা হােল__ ঐ ব্যক্তি বা ঐ দেশটির ক্ষমতা বা শক্তি সম্বন্ধে যদি অন্য কোন ব্যক্তি বা দেশের সম্যক ধারণা না থাকে—তবে তাে সেই ব্যক্তি বা সেই দেশ অন্যের কাছ থেকে সম্মান বা সমীহ পাবে। এইজন্যেই গােপনীয়তার প্রয়ােজন। কিন্তু সে যাইহােক, ভারতের সবটা খারাপ নয়—কিছু ভালােও রয়েছে। যদিও ভারতবর্ষ পাশ্চাত্যের কোন উন্নত দেশের কোন গােপন খবর পায় না, কারণ তাদের সে সুযােগ নেই। সুতরাং তুমি যে জিজ্ঞাসা করছিলে বা ঐসব দেশের সাথে ভারতবর্ষের বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির উন্নতির তুলনা করতে চাইছিলে, এটা করতেই পারবে না। আর এটা পারবে না কারণ তুমি তাে একপক্ষের পরিসংখ্যানই জানাে না! তাহলে তুলনা হবে কি করে ? তবে আমি তােমাদের এটা বলতে পারি যে, এই সমস্ত অসুবিধা সত্ত্বেও দিনকে দিন ভারতবর্ষের উন্নতি হবে—শুধু প্রযুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেই উন্নতি নয়—সবদিক থেকেই উন্নত হবে। বিশ্বকে পথ দেখাবে, আলাে দেখাবে ভারতবর্ষ। আর এই লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে চলেছে সাধুসমাজ অর্থাৎ আধ্যাত্মিকভাবে উন্নত মহা মহা সাধকেরা।

জিজ্ঞাসু :— এই যে কিছু কিছু মানবকে মহামানব, অতিমানব বলা হয় এবং ওঁদের মধ্যে কিছু অতিমানবিক বল বা শক্তির প্রকাশ দেখা যায় এবং মানুষের মধ্যে থেকেই অতিমানুষ তৈরি হচ্ছে তা এর একটা Formulla করে দিচ্ছেন না কেন ? তাহলে দু-একজন নয়, হাজার হাজার মানুষ অতিমানবিক শক্তির অধিকারী হােত !

গুরুমহারাজ :— তুমি যে ভাবে ভাবছো, ঐরকমভাবে কখনই কিছু হয় না। সমস্ত কিছুর কার্যকারণ সম্পর্ক আছে। কোথায়, কখন কোন মহাপুরুষ কাজ করবেন, তা নির্দিষ্ট হয়ে আছে। তােমার ধারণা নেই, তাই বুঝতে পারছে না। তােমার জায়গায় কোন প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি এখানে থাকলে তিনি বলে দিতে পারতেন যে, এখন কোথায় কোন মহাপুরুষ কাজ করছেন ! আর মানুষের মধ্যে অতিমানবিক শক্তির কথা বলছিলে না, সেটা তাে এমনিতে __সব মানুষের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। কথাটা বুঝতে পারলে না তাে, আচ্ছা বুঝিয়ে বলছি ! দ্যাখাে, যে কোন মানুষের জীবনে বিশেষ অবস্থায় এই শক্তির প্রকাশ ঘটে যায়। যেমন ধরাে—আমরা সবাই দেখেছি যে, ক্রোধােন্মত্ত অবস্থায় একটি লােককে ৪/৫ জনে আটকাতে পারে না—অন্যসময়ে হয়তাে ঐ লােকটাকে একজনেই আটকে রাখতে পারতাে! এইভাবে দুঃখ, ভয়, শােক ইত্যাদি বিশেষ অবস্থায় মানুষের মধ্যে থেকেই বিশেষ শক্তির প্রকাশ ঘটে যায়। এই শক্তিটা যে ওর মধ্যেই ছিল তা সে নিজেও জানতাে না এবং শুধু তাই নয়, অন্যসময়ে সে চেষ্টা করলেও ‘ঐ মুহূর্তের বিশেষ শক্তি’টাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

যে কোন মানুষের মধ্যেই সাধারণ শক্তি অপেক্ষা বেশী শক্তি প্রকাশের আরাে দু-চারটে উদাহরণ দিচ্ছি। যেমন ধরাে, রাগ করে দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকা, তর্ক করে বা বাজি রেখে নিয়মিত খাদ্যের তুলনায় দু’গুণ বা তিনগুণ বেশী খেয়ে নেওয়া—এগুলাে সবই তাে একজন মানুষের অতি-মানুষিকতা। দ্যাখাে সব্য, তােমার জীবনেই এই ক’দিন আগে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার উদাহরণ দিচ্ছি। এবার 25-th december আজিমগঞ্জে আমার জন্মদিন পালনের জন্য তুমি গিয়েছিলে কিন্তু কোন কারণে রাগ করে গভীর রাতে একা একা শেওড়াফুলি যাবার ট্রেন ধরতে আজিমগঞ্জ ষ্টেশনে চলে গিযেছিলে ! কিন্তু সেই রাত্রে, রাগের মুহূর্তে যা করেছিলে তা কি অন্য সময় হলে পারতে ? শুধুমাত্র রাস্তার কুকুরের ভয়েই তুমি যাবার কথা ভাবতে পারতে না ! তাহলে বুঝতে পারছাে তাে, সাধারণভাবে যা অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে, তােমার মনােজগতের এক বিশেষ অবস্থায় ঐ অতিমানবিকশক্তি তােমার শরীরকে দিয়ে সেই কাজটাকেই সম্ভব করছে বা বাস্তবায়িত করছে। সুতরাং এটা সত্য যে, তােমার মধ্যেই সূক্ষ্মভাবে ঐ সমস্ত শক্তি রয়েছে। এইবার কোন সাধক যদি সাধনার দ্বারা তার মধ্যে থাকা শক্তি ভাণ্ডারের মজুত বাড়াতে পারে তাহলে তার শক্তির প্রকাশ আরও অনেক বেশী বেশী ঘটাটাই তাে স্বাভাবিক ! উন্নত সাধককুল বা মহাপুরুষের জীবনে ঘটে যাওয়া কোন বিশেষ ঘটনাও এইরকমই বিশেষ শক্তির প্রকাশ।

আশাকরি যা বললাম তা বুঝতে পারলে ! তবে এটা ঠিকই যে, কোন উন্নত সাধকের ব্যাপার-স্যাপার বুঝতে হলে তোমাকেও উন্নত হতে হবে– না হলে কি করে বুঝবে ? কিছুই বুঝতে পারবে না। তখন মনে হবে এসব বুজরুকি, এসব মিথ্যা–এসব চালাকি। কিন্তু জেনে রাখবে “সত্য–সত্যই”! পরমসত্যে যে উপনীত হতে পেরেছে সেই জানে সত্যের সন্ধান– অপরে কি করে তার কূল-কিনারা পাবে বলো৷

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।৷