জিজ্ঞাসু:— ভারতবর্ষের বর্তমান (7/2/1991, সেই সময় পরপর প্রধানমন্ত্রী বদল হচ্ছিলো_ভি.পি.গেল,চন্দ্রশেখর গেল…)রাজনীতির যে চরম সংকট চলছে এর থেকে ভারত কিভাবে মুক্ত হবে বর্তমান রাজনীতির সম্বন্ধে আপনার মতামত যদি একটু বলেন?
গুরু মহারাজ:---দ্যাখো, আমি তো রাজনীতির লোক নই__ তাই রাজনীতির কথা বলতে পারবো না ! তবে এটা বলতে পারি যে, যত দিন যাচ্ছে_ ততই ভারতবর্ষের সর্বাঙ্গীণ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে ! রাজনীতিতেও প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসনে পূর্ব অপেক্ষা আরো বেশি ভালো লোকেরা বসতে শুরু করেছে ! প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পদে যতবেশি pure ভারতীয় লোক বসবে, সে ততো ভালো প্রধানমন্ত্রী হবার উপযুক্ত বিবেচিত হবে ! প্রথম দিকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পরে গদিতে আসীন রাজনীতির লোকেরা নিজেদের ভারতীয় ভাবতেই ঘৃনা বোধ কোরতো ! নেহেরু বলতো _" I am by chance Indian" অথবা "I am out and out European" ! বল্লভ ভাই প্যাটেল বলেছিলেন__ "বাংলা পাঞ্জাব বাদ দিয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করুক" ! আগেকার প্রধানমন্ত্রী বলতে এক লালবাহাদুর ছাড়া বাকিদের মধ্যে একটাও ঠিকঠিক ভারতীয় কেউ ছিলনা !
দ্যাখো, ভারতবর্ষ যত বড়ই হোক বা বিভিন্ন ভাবে যত খন্ড-বিখন্ডই হোক__ আসলে তো এটা একটা দেশ ! সুতরাং এই দেশের একটি নিজস্বতা আছে ! যে ব্যক্তি, যে নেতা বা যে রাজনৈতিক দল ভারতবর্ষের সেই নিজস্বতাকে অক্ষুন্ন রেখে রাজনীতি করবে আমার মতে সেই ব্যক্তি বা তার দলই ততো ভালো এবং ভারতবর্ষের মানুষের কাছে সেই দলই ততো বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে !
ভারতবর্ষের বর্তমানের রাজনীতির লোকেদের নিয়ে যদি একটা পরিসংখ্যান করো__ তো দেখতে পাবে, এদের মধ্যে 90% লোক carrierist বা opportunist অর্থাৎ সুবিধাবাদী, 4% লোক anarchist বা নৈরাজ্যবাদী, 5 % লোক টেরোরিস্ট বা সন্ত্রাসবাদী, আর 1% লোক patriot বা দেশপ্রেমিক ! এটা অবশ্য গোটা বিশ্বের রাজনীতিবিদদের পরিসংখ্যান বললাম, সুতরাং ভারতবর্ষেও এই একই চিত্র দেখতে পাবে।
ফলে বুঝতেই পারছো, দেশপ্রেমিক সংখ্যা গোটা বিশ্বে যেমন কম__ ভারতবর্ষেও খুবই কম রয়েছে ! যারা আছে, তারা নীরবে কাজ করছে_ হয়তো লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকেই কাজ করছে ! এদের মধ্যে এক-দুজন সামনে আসছে । তবে এটাও দেখবে যে, যারা সামনে আসছে তাদেরকে আবার দমিয়ে রাখার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে ! তবে এটা নতুন কিছু নয়_এই ব্যাপারটা আগেও ছিল ! নেতাজি সুভাষচন্দ্র বা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে এই ভাবেই দমিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছিল, শেষে হত্যা করার চেষ্টাও হয়েছিল (শ্যামাপ্রসাদকে তো হত্যা করাই হয়েছিল) ! সে যাই হোক, আমার
মতে ভারতের রাজনীতি ভারতীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি-রীতিনীতি কে বাঁচিয়ে রেখে বা সেইগুলির অনুকূলে চলুক তাহলেই দেশের যথার্থ মঙ্গল হবে ! অন্যথায় রাজনৈতিক দলাদলি যতই হোক না কেন, কাজের কাজ হবে না অর্থাৎ ভারতবর্ষের প্রকৃত কল্যাণ করা রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে সম্ভব হবে না।
জিজ্ঞাসু:---আপনি নেতাজির কথা বললেন এরকম একজন দেশপ্রেমিকের হাতে এই দেশটি পড়লে ভারতের অবস্থা নিশ্চয়ই ভাল হোত __তাই না?
গুরু মহারাজ:----নিশ্চয়ই ! নেতাজি সুভাষচন্দ্রের মত দেশপ্রেমিকের হাতে ভারতবর্ষের ভার পড়লে, ভারতবর্ষের চিত্রই অন্যরকম হয়ে যেতো। উপযুক্ত লোকের হাতেই তো উপযুক্ত কাজের ভার ন্যস্ত হওয়া উচিত এবং তা যদি হয়, তবেই কাজের perfection দেখতে পাওয়া যায় ! স্বাধীনতার আগে থাকতেই (অর্থাৎ ১৯৪৭-সালের ১৫-আগষ্টের আগে) নেতাজী সুভাষচন্দ্রের হাতে যদি ভারতবর্ষের ভার পড়তো, তাহলে কি ভারত-পাকিস্তান বিভক্ত হতো ? হতো না ! আর তা হোতে না দিলেই ইংরেজদের সমূহ বিপদ হোত ! তারা যেমন নিশ্চিন্তে নিরাপদে ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিল, ততটা নিশ্চিন্তে ফিরে যেতে পারতো না । শেষ জাহাজে মাত্র কয়েকজন ইংরেজ অফিসার স্বদেশের অভিমুখে পাড়ি জমিয়েছিল__ তখন ভারতীয়দের সংখ্যা খুব কম হোলেও 35 কোটি তো ছিলই !
দ্যাখো, ভারত আর স্বাধীনতা "অর্জন" কোরলো কোথায় ? ইংরেজরা যখন চুক্তিপত্র করেছিল সেখানে কোথাও তো একথা লেখা নাই যে "ভারতবর্ষ নিজের চেষ্টায় স্বাধীনতা লাভ কোরলো"! সেখানে, "ক্ষমতার হস্তান্তর করা হইল"_ এরূপ লেখা রয়েছে ! তাহলে বুঝতে পারছো তো, অবস্থাটা কি ! দ্যাখো না, স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করাচ্ছে কে--না লর্ড মাউন্টব্যাটেন, শেষ ভাইসরয় হিসেবে ! এতেও কি বলবে ভারত স্বাধীনতা "অর্জন" করেছে ?
ইংরেজরা নেতাজির ন্যায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গকে চিনতে ভুল করেনি ! তাই তাদের নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ভারতে "দ্বিজাতি তত্ত্ব"_ চালানোর সহযোগী লোক খুঁজছিল এবং তা যখন পেয়ে গেল, তাদের হাতেই এদেশের ভার তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত করেছিল ! তৎকালীন সময়ে__বিদ্বোৎসমাজের আধিক্য বা রাজনীতিসচেতন ব্যাক্তির আধিক্যবিশিষ্ট রাজ্য বলতে তো এই বাংলা ! তৎকালীন ভারতের elite society-র সভ্য(member)-রা বেশিরভাগই সব এখানকার লোক ছিল ! নতুন নতুন চিন্তাধারার জনক বাংলার লোকেরাই ! সুতরাং ভারতবর্ষের ভালোমন্দের সিদ্ধান্ত নেবার ব্যাপারে তখন বাংলার রাজনীতির লোকেরাই চূড়ান্ত ছিল ! ইংরেজরা এটাই নেহেরু আর জিন্নাকে বোঝালো ! সেই জন্যই ভারত যখন বিভক্ত হোল _হিন্দুস্তান এবং পাকিস্তান এই দুই অংশে তখন তার সঙ্গে বিভক্ত হল বাংলা। বাংলার একটা বড় অংশ পূর্ব পাকিস্তান নাম দিয়ে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হোলো ! যেটা একেবারেই ছিল বিসদৃশ ব্যাপার ! কোথায় পশ্চিম পাকিস্তান আর কোথায় পূর্ব পাকিস্তান ! এই রকম ভাগ আবার হয় নাকি ? কিন্তু কতকগুলি দূর্বল নেতার জন্য তাও হয়েছিল !
পাঞ্জাব কে বিভক্ত করার কারণ হোল__ ওখানে শক্তিশালী বিপ্লবী সংগঠন গড়ে উঠেছিল ! যারা চরমপন্থী আন্দোলন এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্রের অনুগামী ছিল ! এই ভাবেই দিল্লী হয়েছিল ভারতের রাজধানী আর দিল্লীর মসনদে দুর্বল চরিত্রের লোকেরা বসে পড়েছিল ! জেনে রাখবে, সেই থেকেই বাংলা আজও উপেক্ষিত ! কারণ যে ধারা একবার চলতে থাকবে __তা বেশ কিছু দিন চলতে থাকে_ এটাই প্রকৃতির নিয়ম ! তবে এবার পরিবর্তনের সময় এসেছে ! কাল সবকিছুর বিচার করে । প্রকৃতির নিয়মকে অস্বীকার করার তো কোনো দোষ নাই ! আমার গুরুদেব রামানন্দ অবধূত বলতেন _ সময়(কাল) বহুৎ বলবান হোতা হ্যায় বেটা ! অচ্ছা সময়কে লিয়ে ইন্তেজার করো !" আমিও তোমাদের সেই কথাই বলবো __আগামীতে সুদিন আসছে ! তোমরা সেই দিনের অপেক্ষা করো এবং সবাই সৎ, সুন্দর ও ধর্মপরায়ন হয়ে জীবন অতিবাহিত করো!
জিজ্ঞাসু:---ভারতবর্ষের অবস্থা বর্তমানে যা চলছে তা দেখে তো খারাপই মনে হয় ভাল কিছু হচ্ছে বলে তো মনে হয় না সত্যি সত্যিই কি ভালো হবে?
গুরু মহারাজ:--দেখো বাবা ! তোমার মনে কি হোল বা তোমার দৃষ্টিতে তুমি কি বিচার করলে সেই দিয়ে তো প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয় না ! এটা ঠিকই যে, ভারতবর্ষের অবস্থা দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছিলো__ যে কোনো রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান স্বদেশপ্রেমিক না হলে, সেটা সেই রাষ্ট্রের পক্ষে খুব একটা ভালো দিক নয় _এটা তো স্বাভাবিক ঘটনা ! তবে 1980 সালের পর থেকে ভারতের অবস্থা আবার ভালোর দিকে যেতে শুরু করেছে ! কারণ ওই সময় যে কুম্ভ মেলা হয়েছিল, সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের সাধুসমাজ একত্রিত হয়ে ভারতবর্ষের উন্নতিকল্পে এবং সেই সাথে বিশ্বের ভালোর জন্য সংকল্প গ্রহণ করেছেন ! তারা এটা জানেন যে, ভারতবর্ষ-ই হচ্ছে পৃথিবী গ্রহের মাথা ! তাই ভারতবর্ষের উন্নতি না হোলে পৃথিবীর মঙ্গল হবে না । আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করেই এই কথাটা তারা নির্ধারণ করেছেন ! ফলে, ভারতের যা কিছু ভালো হচ্ছে _ তা ওই সময়ের পর থেকে শুরু হয়েছে ! 2002 সাল পর্যন্ত খারাপ দিক গুলো
শেষ হয়ে যাবে, তারপর ভারত প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন হোতে শুরু করবে ! আর শুধু তা-ই নয় আগামী দিনে ভারতবর্ষ-ই গোটা বিশ্বকে গাইড লাইন দেবে ! আর তা শুধু আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেই নয়, সমাজনীতি- অর্থনীতি- রাজনীতি সকল বিষয়েই ভারতবর্ষ সব দেশের আদর্শস্থানীয় হবে ! 2002 সাল থেকে 2056 সাল পর্যন্ত সময়কালে এই ঘটনা ঘটতে থাকবে ! তারপর ভারতের গৌরব পতাকা গোটা বিশ্বে মাথা উঁচু করে সর্বোচ্চ স্থানে থাকবে ! তবে অবশ্যই এই ভালো সময়কালেরও একটা নির্দিষ্ট মান রয়েছে ! সেই সমযয়কাল কেটে যাবার পর__ আবার ধীরে ধীরে এই দেশের উপর বিপর্যয় নেমে আসতে থাকবে ! এইভাবেই উত্থান পতনের মধ্যে দিয়েই পৃথিবীর অগ্রগতি হয়ে চলেছে!
তবে আগামী 50 বছর, তোমরা যারা বেঁচে থাকবে __তারা ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ উন্নতির দিকটাও দেখতে পাবে ! তোমরা বর্তমান ভারতবর্ষ নিয়ে এতো চিন্তা ভাবনা করছো বলেই ভারতবর্ষের ভালো দিকের বা ভালো সময়ের একটু ইঙ্গিত দিয়ে দিলাম ! এবার তোমরা নিশ্চয়ই মনে একটু শান্তি লাভ করেছো!!