স্থান: বনগ্রাম পরমানন্দ মিশন। সময়:–২/২/৯১

উপস্থিত ব্যক্তিগণ:---সিঙ্গুরের ভক্তবৃন্দ, প্রভাত ডাক্তার,আরতি(রায়না),আশ্রমস্থ মহারাজগণ।।

     জিজ্ঞাসু:--- মহারাজ ! আজকে রাস্তায় আসার পথে দেখলাম 'সাদ্দাম হোসেনে'-র নামে যাত্রাপালা বেরিয়েছে ! এই যাত্রাপালার প্রচুর পোস্টার চারি দিকে টাঙানো রয়েছে_দেখলাম। তাছাড়া আজকাল মুসলমান সমাজে নবজাতকের নাম‌ও রাখা হচ্ছে সাদ্দাম ! কিন্তু উপসাগরীয় যুদ্ধে মাত্র (১৯৯১/৯২) 42 দিনের মাথায় আমেরিকার কাছে হেরে লজ্জাজনক শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হোল সাদ্দাম ! তাহলে সে আর এমন কি বীরপুরুষ ? তবুও মানুষ একে এতোটা বীরের সম্মান দিচ্ছে কেন?

  গুরু মহারাজ:---দ্যাখো সব্য ! তুমি এইসব কথা বলতেই পারো_ কারণ যে কোনো ব্যক্তি তার নিজস্ব চিন্তাজগতের কথা তো তার বাক্যের মধ্যে দিয়েই প্রকাশ করে থাকে ! সেইজন্য‌ই বললাম__ তুমি তোমার মতামত বলতেই পারো ! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জেনে রাখবে যে, এই জগৎ-সংসার মা জগদম্বার ইচ্ছাধীন ! এখানে যা কিছু ঘটে চলেছে, সব তাঁর ইচ্ছায় ঘটে চলেছে ! তোমার আমার চিন্তায় যদি কাজ হোতো, তাহলে হয়তো ফল অন্যরকম হোতো ! কিন্তু তা তো হবার নয় ! মায়ের জগতে ✓রী-মা যেটা সঠিক মনে করেন সেটাই হয়ে থাকে ! এখানে সাধারণ মানুষের খুব একটা তেমন ভূমিকা থাকে না।

   দ্যাখো, ইরাক দেশটি তার বর্তমান রাজধানী "বাগদাদ" বা "বোগদাদ" __প্রকৃতপক্ষে এমন একটা দেশ এবং এর এমন ভৌগোলিক অবস্থান যে, এই দেশটি কোনোকালেই নিরুপদ্রব ছিল না আর এখনো নাই ! রক্তপাত, ধ্বংসলীলা এখানে আগেও হয়েছে, এখনো হোচ্ছে_ আবার পরেও হবে ! মহাভারতে এই দেশটির উল্লেখ রয়েছে 'ভগদত্ত' নগরী হিসাবে ! ভগদত্ত মানেও 'ভগবানের দান', আবার বর্তমান বোগদাদ কথার মানেও 'আল্লাহ বা ঈশ্বরের দান' !  'ভগদত্ত' নামে তৎকালীন এক রাজা এই রাজ্যটি তার নামানুসারেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন !  এখানকার সুমের সভ্যতা বা মেসোপটেমিয়া সভ্যতা যে প্রাচীন_ তার বহু নিদর্শন পাওয়া গেছে !

  সে যাই হোক, প্রাচীনকালে ভারতীয় রাজারা বারবার এই দেশটি আক্রমণ করে তাদের নিজের নিজের মনোমতো রাজাকে এখানে সিংহাসনে বসিয়েছিল _সেইসব ঘটনা লিপিবদ্ধ রয়েছে মহাভারতে ! মহাভারতের যুগে এইরকম বেশ কয়েকবার ঘটনা ঘটেছিল _প্রথমে রাজা পান্ডু ভগদত্ত নগরী আক্রমণ করেন এবং ওখানকার রাজাকে পরাস্ত করে , তাঁর মনোমতো একজনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এরপর দুর্যোধনের বন্ধু হিসাবে কর্ণ দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে পুনরায় ভগদত্ত নগরীকে অধিকার করে পূর্বের রাজার পতন ঘটিয়ে নিজের পছন্দের রাজাকে বসিয়ে চলে আসেন ! এরপর যুধিষ্ঠীর  অশ্বমেধ যজ্ঞ করার সময় ভীম পরপর তিনবার আক্রমণ চালিয়ে এই রাজ্যকে রক্তাক্ত করেছিল ! এইভাবে দেখা যাচ্ছে__ নগরীটি যতই প্রাচীন হোক না কেন, এর অধিবাসীরা শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন কোনমতেই করতে পারেনা !

  কিছুদিন আগে আমেরিকার সঙ্গে ইরাকের যে যুদ্ধটি হয়ে গেল, অর্থাৎ যেটার তুমি উল্লেখ করলে__ তার আগে বেশ কয়েক দশক ধরে ইরানের সঙ্গে ইরাকের যুদ্ধ চলছিল ! ওটাmainly ছিল শিয়াপন্থীদের সঙ্গে শুন্নিদের লড়াই ! সেটার রেশ কাটতে না কাটতেই গোটা দেশটার বুকে বর্তমান বিপর্যয় নেমে এলো !

 তবে প্রাচীনকাল থেকেই ভারতের সঙ্গে ঐসব অঞ্চলের অনেক রাষ্ট্রেরই যোগাযোগ ছিল ! কারণ হামুরাবি বা সম্বরাসুর নামে পুরাণাদিতে যে রাজার উল্লেখ রয়েছে সে ঐ এলাকারই লোক ছিল ! অসুর অর্থে মানুষেরই একটা শ্রেনী বা বিশেষ কোনো নিমগ্ন চেতনাসম্পন্ন জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হোতো ! আসুরবানিপাল নামে একজন রাজাও ঐ অঞ্চলের ই রাজা ছিলেন ! আসুরবানিপালের পর থেকেই ওই অঞ্চলের লোকেদেরকে ভারতীয়রা "অসুর" বলতো !

   বর্তমানে ইরাকের রাষ্ট্রীয় নেতা ছিলেন সাদ্দাম হোসেন । সাদ্দামের ঐ অঞ্চলে শরীর গ্রহনের ব্যাপারটা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করলে কিন্তু অন্যরকম হবে ! দক্ষিণ ভারতের কয়েকজন শৈব-উপাসক ছিলেন, যাঁরা মুসলমানদের দ্বারা খুবই নির্যাতিত হয়েছিলেন এবং নিরীহ সাধারণ মানুষের উপর তাদের দুঃসহ অত্যাচার স্বচক্ষে দেখেছিলেন ! এরপর এঁরা মুসলমান মজহব অবলুপ্ত করার সংকল্প গ্রহণ করে শরীর ত্যাগ করেছিলেন ! বর্তমানে তারা বিভিন্ন স্থানে মুসলিম শরীরে জন্মগ্রহণ করেছেন ! তাঁদেরই একজন আয়াতুল্লাহ খোমেইনি, আর একজন সাদ্দাম, কর্নেল গদ্দাফি আরেকজন _এরা ছাড়াও আরো অনেকেই শরীর নিয়েছেন ! আবার এরপরেও আরও অনেকে এই কাজের জন্য শরীর গ্রহণ করবেন !  যদি আরো কিছু বছর বেঁচে থাকো, তাহলে এই সমস্ত ধর্মীয় নেতাদের কার্যকলাপ এবং তার ফল নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করতে পারবে !

  জিজ্ঞাসু:---- আপনি যখন বলছেন _সেটা তো হোতেই পারে ! সত্যিই তো কি সাংঘাতিক যুদ্ধটাই না হোল ? ইরাকের কত যে ক্ষয়ক্ষতি হোল,  তার ইয়ত্তা নাই ! কত হাজার লোক মারা গিয়েছে এই যুদ্ধে__ তার হয়তো কোনো নথিও পাওয়া যাবে না __তাই নয় কি?

গুরু মহারাজ:--- দূর বোকা ! যুদ্ধ আবার কোথায় হোল _ তাই লোক মরবে ? যুদ্ধের শেষে নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব

করেই তো বেশি লোক মারা গেল ! এখনো (১৯৯১/৯২) মরছে ! আমেরিকা যেরকম বাজে কৌশলে যুদ্ধ কোরলো, আর যেসব অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল_ সেগুলো চীনের মতো কোনো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে হোলে নিজেরাই ল্যাজে-গোবরে হয়ে যেতো ! ভারতের সঙ্গে হোলেও নাস্তানাবুদ হোতে হোতো ! আমেরিকান যুদ্ধকৌশল কোনোকালেই ভালো নয় ! ওখানকার যুদ্ধটা তো দেখলাম প্রতিদিন 100 থেকে 110 টা ফাইটার জঙ্গিবিমান একসাথে বেরিয়ে গিয়ে, প্রায় চল্লিশ দিন ধরে হাজার সতের হাজার / আঠারো হাজার মেট্রিক টন বারুদ ফেলেছে ভাবা যায় !! ইরাকের আয়তন বড় জোর ভারতবর্ষের উড়িষ্যা রাজ্যের মতো ! দেখা গেছে জনসংখ্যার নিরিখে মাথাপিছু 40 কিলোগ্রাম বারুদ পড়েছে ওখানে ! তাহলে ঠিক ঠিক লক্ষ্যবস্তুতে মারতে পারলে প্রতি ইঞ্চি মাটি কালো হয়ে যেতো ! সেরকম কোথায় হয়েছে ?

    বহুজাতিক বাহিনীর সৈন্যরা সবাই আমেরিকার নির্দেশ‌ই ভালোভাবে মানেনি ! এছাড়া বৈমানিকদের  প্রচুর পরিমাণে "ড্রোপ" করানো হয় অর্থাৎ নেশা-দ্রব্য খাওয়ানো হয় ! শুধু ঝাঁকে ঝাঁকে বিমান বেরিয়ে গেছে _আর মরুভূমির বালিতে বম্বিং করে ফিরে এসেছে ! আর তারপর বিশ্বের সকলকে বেশ গর্ব করে বলেছে,__ "এই করেছি", "ওই করেছি"__ এইতো হয়েছে ! গোটাকয়েক বাড়ি, আর কয়েকটি সেতু ভেঙে গেছে _আর একটা আন্ডারগ্রাউন্ড কেবিনে সাধারণ লোক ভরা ছিল __ওই লোকগুলো মারা গেছে ! ইরাকি সৈন্যরা সংখ্যায় এমন বেশি কিছু মারা যায়নি ! তাও বা মারা গেছে, সেটা এমন কিছুই নয় ! অর্থাৎ এককথায় বলা যায়, ক্ষতি যেমনটি হওয়া উচিত ছিল, তেমনটা হয় নি !

  উপসাগরীয় এই যুদ্ধটা কেমন হয়েছে জানোতো__ যেন মোটা ফাটা বাঁশের বাড়ি একটা লোকের পিঠে দমাদ্দম্ কোরে আঘাত করা হোল !  খুব শব্দ হোল কিন্তু যাকে মারা হোল, সে মার খেয়ে হেঁটেই বাড়ি চলে গেল !

   কিন্তু এটা কি কোনো দেশের অন্য দেশকে আক্রমণের কৌশল, না অন্য কাউকে আঘাত করার ভঙ্গিমা ? জানোতো, মানব শরীরে এমন বেশ কয়েকটা পয়েন্ট আছে__ যে পয়েন্টে অল্প আঘাত করলেই সেই শরীরটা হয় অকেজো হয়ে যাবে, নয়তো মারা পড়বে ! তেমনি বৃহত্তর ক্ষেত্রে অর্থাৎ যুদ্ধেও কোনো দেশকে আক্রমণ করে কাবু করতে হোলে, সেই দেশের ওইরকম বিশেষ বিশেষ পয়েন্টগুলোতে আক্রমণ করতে হয় __তবেই successful হওয়া যায়।

  এখনই তুমি বললে __42 দিন ধরে যুদ্ধ চলেছিল, কিন্তু দ্যাখো, তাতেও ইরাকের টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা ছিন্ন হয়নি ! সমস্ত ঘটনাই CNN টেলিভিশন দেখিয়েছে ! এমনকি সাদ্দামকেও যুদ্ধকালীন সময়ে meeting করতে দেখা গেছে ! অতএব বোঝা যাচ্ছে, হয় বহুজাতিক বাহিনীর ইরাকের ক্ষতি করার কোনো মানসিকতাই ছিল না, নাহলে স্ট্রাটেজিতে ভুল ছিল !  সঠিক পয়েন্ট নির্বাচন করা এবং সেখানে আঘাত হানাই যুদ্ধের প্রকৃত কৌশল ! সেই সঠিক কৌশল অবলম্বন করা হয় নি !

   যেমন ধরো, কেউ যদি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতিসাধন করতে চায়, তাহলে তাকে বাঁকুড়া-পুরুলিয়া বা দিনাজপুরে বোমা ফেললে কি হবে ? কলকাতার দুটো important point হচ্ছে লালবাজার আর ফোর্ট উইলিয়াম, এই দুটোকে hit করতে পারলেই তো রাজ্যটির চরম ক্ষতি হয়ে যাবে_তাই নয় কি ?  শুধু অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ঠিক করতেই রাজ্যের 15 দিন লেগে যাবে ! ফলে সেই সুযোগে রাজ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, সন্ত্রাস ইত্যাদি বৃদ্ধি পাবে ! আর সেই সঙ্গে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থাকলে রাজ্যটির বারোটা বেজে যাবে!

    উপসাগরীয় যুদ্ধের আরেকটা দিক যেটা বলছিলাম, কমান্ডাররা বা পাইলটদের এই যুদ্ধের প্রতি অনীহা ! যদিও প্রচন্ডভাবে ড্রোপিং করানো হয়, তবুও horrors of war দেখে যুদ্ধের পরে যখন ওরা rest period-এ থাকে, তখন ওদের মধ্যে প্রচণ্ড মানসিক প্রতিক্রিয়া ঘটতে দেখা যায় ! কেউ হয়তো বাড়ি ফিরেই স্ত্রীকে খুন করে, কেউ বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যায়, কেউ সংসারে বৈরাগী হয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায় _এইরকম আরো অনেক কিছু করে থাকে ! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অনেকে শান্তির আশায় ভারতে এসেছিল ! ভিয়েতনাম যুদ্ধে অনেক আমেরিকান ইসকনে যোগ দিয়েছিল ! আমেরিকান সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ অফিসার তো বর্তমানে ভারতে ইসকনের বেশ উঁচু পদে রয়েছে !  তার নাম 'জয়পতাকা স্বামী'  ! ভিয়েতনাম যুদ্ধে বেশকিছু অপারেশন উনি নিজের হাতে ঘটিছিলেন এবং যুদ্ধের বীভৎসতা, মানুষের আর্তনাদ, হাহাকার এবং ধ্বংসলীলা দেখে ওই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসে আর সংসারজীবন বা সমাজজীবনে নিজেকে অ্যাডজাস্ট করতে পারেননি__ অধ্যাত্মজীবন বেছে নিয়ে চলে এসেছিলেন ভারতবর্ষে এবং ইসকনের যোগদান করে সন্ন্যাসব্রত গ্রহন করেছিলেন ! বর্তমানে (১৯৯১/৯২) উনিই ইসকনের প্রেসিডেন্ট।

          ( ২০২১/৩_ পর্যন্ত )