জিজ্ঞাসু:—প্রাচীন ভারতে আমরা ‘আর্যাবর্ত’ এবং ‘দক্ষিণাবর্ত’ বা দাক্ষিণাত্য এই সব নাম পাই পাই কিন্তু ‘পূর্বাবর্ত’ বলে তো কিছু পাই না?
গুরু মহারাজ:---ঠিকই বলেছ ! পূর্বে বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে আর্যাবর্ত এবং দক্ষিণাবর্ত এই দুটোর উল্লেখ পাওয়া যায়, এমনকি পূর্ব ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের নামও পাবে কিন্তু সেই অর্থে এই বাংলার কথা বিশেষ পাওয়া যায় না। তার কারণ_বহুদিন পর্যন্ত বাংলা অন্যদের কাছে ব্রাত্য ছিল। বাংলায় ছিল লোকায়ত সংস্কৃতি এখানে প্রাচীনকাল থেকেই শিব পূজা হতো অনেক পরে এই স্থানের আর্যীকরণ হয়েছিল অর্থাৎ বেদ ও অন্যান্য দেবদেবী পূজা এবং যাগযজ্ঞ ইত্যাদি প্রবর্তন হয়েছিল। বাংলা কিন্তু তার স্বাতন্ত্র্যতা বরাবর বজায় রেখেছে । বাঙালিরা সাধারণত ভাব প্রধান জাতি, এরা ঈশ্বরকে বা তার আরাধ্যকে যেভাবে অন্তরঙ্গ করে নিতে পেরেছে_ শুধু ভারতবর্ষ কেন পৃথিবীর কোনো অংশের কোনো জাতিই এমনটা পারেনি ! রবীন্দ্রনাথ যথার্থই লিখেলেছেন "দেবতারে প্রিয় করি প্রিয়রে দেবতা "! এই ভাবটা এসেছে শুধুমাত্র এখানকার ঋষি পরম্পরার জন্য ! এই ভাব হৃদয় থেকে আসে ! ঐজন্যেই বললাম বাঙালীরা ভাবপ্রবন বা হৃদয়প্রবন জাতি !
এই বাঙালী জাতিটির নিজস্বতাও বজায় রাখার জন্য এখানকার atmosphere-ও অনেকাংশেই দায়ী ! কারণ ভারতবর্ষে তথা সমগ্র পৃথিবীতে ছটা ঋতু একমাত্র এই বাংলাদেশেই দেখা যায়, অন্য কোন দেশে বা কোনো স্থানে এটি হয়না ! এই রকম আরো অনেক প্রাকৃতিক সুবিধা এই দেশের স্থানে রয়েছে ।
আমার বাঙালি শরীর তাই অন্যান্য ভাষাভাষীরা ভাবতে পারে যে, যেহেতু আমি বাংলায় শরীর গ্রহণ করেছি __তাই বাংলা ভাষার প্রতি বা বাঙালী জাতির প্রতি আমার একটা বিশেষ sentiment রয়েছে ! কিন্তু এটা ঠিক নয় ! আমি সত্য কথা বলি ! নিরপেক্ষভাবে যদি কেউ বিচার করে তাহলে ইতিহাস থেকে আমার কথার সত্যতার প্রমাণ পাবে !
বৌদ্ধপ্লাবনে যখন সমগ্র ভারতবর্ষ প্লাবিত হয়ে গিয়েছিল, সেই সময় ভারতবর্ষের বাইরে অর্থাৎ বিশ্বের দরবারে বৌদ্ধধর্মকে পৌঁছে দিয়েছিলেন কয়েকজন বাঙালী ! এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হোলেন_ অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, শীলভদ্র, জীনভিক্ষু প্রমুখেরা । তাঁদের হাত ধরেই বৌদ্ধদের চিন্তাভাবনা বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল ! মহাবীর জৈনকে বাংলা গ্রহণ করলো না ! কথিত আছে কুকুর লেলিয়ে তাকে এখান থেকে বিতাড়িত করেছিল বাঙালীরা ! জৈন্-ধর্মগ্রন্থ “দিঘার-নিকায়”_তে লেখা আছে এখানকার মানুষরা মোটেই সভ্য ছিল না, তাই মহাবীরকে মানতে পারেনি ! তাছাড়া ঐ গ্রন্থে আরও অনেক গালাগালি দেওয়া আছে এই বাঙালী-জাতিকে !
কিন্তু মজার ব্যাপারটা দ্যাখো, বাঙালীরা জৈনকে নিল না বলেই জৈনধর্ম, বহির্বিশ্বে ছড়াতে পারলো না ! ইতিহাসে হয়তো লেখা নেই কিন্তু এটা সত্যি জানবে যে, ভগবান বুদ্ধ তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় বাংলায় কাটিয়েছিল ! তখনকার বাংলা অবশ্য এখনকার দ্বারভাঙ্গা বা দ্বার-বঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, আর এদিকে প্রায় সমগ্র ঝাড়িখণ্ড(ঝাড়খণ্ড) পড়ে যাবে । ভগবান বুদ্ধ এইসব অঞ্চল খুব ঘুরেছিলেন।
আবার দ্যাখো, ভক্তি movement-এ বৈষ্ণবদের মধ্যে গৌড়ীয় বৈষ্ণব-ই মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছে ! বহু পূর্ব থেকেই দক্ষিণ ভারতের মধ্বাচার্য নিম্বার্কাচার্য, রামানুজাচার্য এবং বল্লভাচার্য এই সমস্ত পরম্পরার বৈষ্ণবেরা তাদের নিজ নিজ পরম্পরার ধারা পৃথকভাবে বজায় রেখে কাজ করে চলেছিল ! কিন্তু এরা নিজেদের sentiment এবং বাধ্যবাধকতা কাটিয়ে _এগুলির উর্ধে উঠতে পারেনি ! ‘কৃষ্ণ গোলোকের, বিষ্ণু বৈকুন্ঠের, মানুষ মর্তের লোক ! মানুষ কখনো কৃষ্ণ হোতে পারে না’ ! এইসব হোল ওদের চিন্তাধারা !
কিন্তু গৌড়ীয় বৈষ্ণব কৃষ্ণকে আপন করে নিল। দাসভাব, সখ্যভাব, বাৎসল্য ভাব, মধুর ভাব ইত্যাদি সমস্ত ভাব দিয়েই কৃষ্ণকে আপন করে নিল ! গোটা বিশ্বের বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মানুষ, গৌড়ীয় বৈষ্ণবের মতকে গ্রহণ করলো। আজ বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই ইসকন্(ISKON) রাধাকৃষ্ণের মন্দির প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে !
দ্যখো, প্রমাণ হিসেবে আরো বলছি _মুসলমানরা যখন তাদের জয়যাত্রা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছিলো, সেই সময় একমাত্র এই বাংলায় এসেই মুসলমান ধর্মের সাধকেরা উদারপন্থী সুফী হোল । তারা বাউল হোল, দরবেশ হোল। লালন সাঁই, কাজী নজরুল যেভাবে পরমেশ্বরকে বা ভগবানকে বর্ণনা করেছে সেভাবে ভারতবর্ষের অন্য প্রান্তের সুফি সাধকেরা করতে পেরেছে কি ? নিজামউদ্দিন আউলিয়া, মৈনুদ্দিন চিস্তিরাও এতোটা উদারপন্থী হোতে পারে নি।
বৃন্দাবনের আজকে যে মহাত্ম্য দেখছো তার পিছনেও বাঙালিরাই রয়েছে ! চৈতন্যদেব নিজে এবং তাঁর পার্ষদদের দিয়ে বৃন্দাবন উদ্ধার করলেন ! এখন ওখানকার শতকরা আশি ভাগ সাধুই বাঙালি ! আবার দ্যাখো, চৈতন্য মহাপ্রভুর মাহাত্ম্য প্রচার করে আজ খ্রীস্টানরা রাস্তায় রাস্তায় খোল বাজিয়ে কীর্তন করে বেড়াচ্ছে বাঙালী অভয়চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামীর জন্য ! আধুনিককালের যুগপুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ বনের বেদান্তকে বহির্বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে ছড়িয়ে দিলেন । “যোগ”কে বহির্বিশ্বে ছড়ালেন ঋষি অরবিন্দ, স্বামী যোগানন্দ প্রমুখেরা ! তন্ত্রে যত আচার্যের নাম পাবে _তার মধ্যেও বাঙালিরা অগ্রগণ্য ! এখনো তন্ত্রসাধক হিসেবে বামদেবের নাম, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের নাম, রামপ্রসাদ, কমলাকান্তের নাম সবার উপরে থাকবে।
বাঙালিরা অন্যান্য প্রদেশের মানুষ অপেক্ষা সভ্য, সংযত, উদার ! সেইজন্য এদেরকে বহুকাল ধরে অনেক নির্যাতন সহ্য করেছে ! এরা রাজন্যবর্গের অত্যাচার সহ্য করেছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিশেষতঃ বন্যা, খরা, সাইক্লোনের ইত্যাদির প্রভাবে এই অঞ্চলের মানুষের খুবই কষ্ট গেছে ! তবুও এরা টিকে রয়েছে __এইসব বিভিন্ন কারণের জন্য ঈশ্বর এই বাঙালী জাতিটির উপর প্রসন্ন !
মহাপ্রকৃতি এই জাতিটিকে দিয়েছেও অনেক ! রবীন্দ্রনাথই ভারতে প্রথম নোবেল পেয়েছে, সত্যজিৎ রায় প্রথম অস্কার পেয়েছিল ! অষ্টাদশ শতকে সতীদাহের বিরুদ্ধে আন্দোলনে এই জাতির রামমোহন-ই প্রথম success পেয়েছিল ! বিদ্যাসাগর নারী শিক্ষা এবং বিধবা বিবাহের প্রচলন করেছিল প্রথম এখানেই ! অথচ দ্যাখো, এই দেশ ভারতবর্ষেরই রাজস্থানে আজ একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় পৌঁছেও ওখানকার মানুষ সতীর স্বপক্ষে মিছিল করছে !
এই বাংলায় মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম মহিলা বিপ্লবী ! ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার প্রথম লগ্নে সভাপতি ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, উমেশ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় ! তখন তোদের করমচাঁদ গান্ধী কোথায় ? গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিল ভাগ্যান্বেষণে বৌদির গয়না বিক্রি টাকায় ! তার আগেই ব্যারিস্টারি পাস করেছিল । কিন্তু ব্যা্রিস্টারি পাশ করার পর বাড়ীতে যখন বেকার সময় কাটাচ্ছিল, তখন পরিবারে খুবই গঞ্জনা সহ্য করতে হোতো তাকে ! সেই গঞ্জনা এড়াতেই গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিল। ওখানে গিয়ে কিছু একটা কাজ যোগাড় করে, সেই কাজটা করতেও শুরু করেছিল । এইভাবে কিছুদিন চলার পর একদিন বকের ধারে বেড়াতে গিয়ে ও দেখলো যে, ওখানে ভারতীয় কুলি-মজুরেরা খুবই নির্যাতিত হোচ্ছে। ওদেরকে ওখানে অল্প পয়সায় অধিক খাটানো হোত। তাছাড়া তারা ওখানে ফল-মূলের গাছ বা তরিতরকারি লাগাতো বলে তাদেরকে এক টাকা করে ট্যাক্স দিতে হোতো। তখনকার দিনে এক টাকার অনেক মুল্য ছিল।
সদ্য ব্যারিস্টারি পাস করা যুবক মোহনচাঁদ গান্ধী এইসব ঘটনার প্রতিবাদ করলো । ও ওখানকার ভারতীয় কুলি মজুরদের নিয়ে একটা সংগঠন করলো এবং তার নেতা হয়ে বসলো ! এই সংগঠন থেকে ও ভারতীয় শ্রমিকদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করলো। ইংরেজ অফিসারদের সঙ্গে বিরোধ করলো । এইসব করতে গিয়ে গান্ধী দুচারবার মারও খেয়েছে ! একবার তো চলন্ত ট্রেন থেকে ওকে luggage সহ ফেলে দেওয়া হয়েছিল ! ভাগ্যজোরে ব্যাগটার উপর পড়েছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল, নাহলে সেদিন ওখানেই ওর মৃত্যু হবার কথা ছিল !
1906 সালে কলকাতায় কংগ্রেসের অধিবেশন হচ্ছিলো ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে জাহাজে করে ফিরছিল স্বদেশের অভিমুখে ! পথেই খবর পেল কলকাতায় তখন জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হোচ্ছে ! তাই
বোম্বাইতে না নেমে সোজা চলে এলো কলকাতায় ! তখন গোখলে, মতিলাল নেহেরু ইত্যাদিরা ছিল জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ! এরা সুরেন্দ্রনাথ, উমেশচন্দ্র প্রমুখের next generation ! গান্ধীজী এদের কাছে এসে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রবাসী ভারতীয়দের অত্যাচারের বিরুদ্ধে_ প্রতিবাদ জানাবার আবেদন জানালো।
শিক্ষিত যুবক ছেলেরা তখন বিশেষ কেউই জাতীয় কংগ্রেসে নাম লেখাতো না ! কতকগুলো বৃদ্ধ এবং প্রৌঢ়রা পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছিলো। সেই অবস্থায় এমন একটা যুবক ব্যারিস্টার ছেলেকে পেয়ে ওরা আঁকড়ে ধরলো ! গোখলেই প্রথম গান্ধীজীর মধ্যে ভারতীয়বোধ বা স্বদেশী মনোভাব জাগালো ! বলল --'নিজের দেশেই মানুষ অত্যাচারিত হোচ্ছে, ভিনদেশে তো হবেই ! তুমি নিজের দেশের মানুষের জন্য কিছু করো ! এর জন্য যা টাকা লাগে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস তোমাকে দেবে ! তাছাড়া তুমি দক্ষিণ আফ্রিকায় যে টাকা বেতন হিসেবে পাও __সেটাও মাসোহারা হিসেবে তোমাকে দেওয়া হবে ! তুমি দেশে থেকেই জাতীয় কংগ্রেসের কাজ করো !" গান্ধীজী রাজি হয়ে গেল এবং প্রায় দেড় বছর মত সময় গোখলের প্রাইভেট সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করেছিল। নানান দপ্তরে চিঠিপত্র লেখালিখি, বিভিন্ন অফিসের সাথে যোগাযোগ রাখা __এই সমস্ত কাজ গুলি ওকে করতে হোত ।
পরবর্তীতে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন সহ অন্যান্য বাঙালি নেতাদের, বিশেষতঃ সুভাষচন্দ্রকে টেক্কা দেবার জন্য __হিন্দি lobby গান্ধীজীকে তাদের নেতা হিসেবে প্রজেক্ট করলো এবং ধীরে ধীরে গান্ধীজীই ভারতবর্ষের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করলো ! সেই অর্থে গান্ধী তো projected নেতা ! এই তো তোমাদের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাদের ইতিহাস বাবা !