জিজ্ঞাসু:—তাহলে আপনি বলতে চাইছেন_ সমগ্র ভারতীয়দের মধ্যে বাঙালিদের special কিছু গুন রয়েছেযেটা অন্য প্রদেশের মানুষদের মধ্যে নাই ?

গুরু মহারাজ:—-সব জাতির বা সব প্রদেশের মানুষের‌ই কিছু নিজস্বতা থাকে _ বাঙালিদের‌ও রয়েছে ! বাঙালি জাতির আরও একটা গুনের কথা বলছি শোনো এই বাংলায় লোকসংখ্যা যদি বর্তমানে আট কোটি(১৯৯১/৯২সাল) ধরা হয়, তাহলে তাদের মধ্যে বাঙালি রয়েছে সাড়ে 6 কোটি এবং অবাঙালির সংখ্যা হয়ে যাবে প্রায় দেড় কোটি ! এবার ভাবো যদি অসমীয়াদের মতো(তখন আসামে “বাঙালি খেদাও” মুভমেন্ট চলছিল) এখানেও “অবাঙালি খেদাও” আন্দোলন শুরু হয় __তাহলে কি হবে, তা ভাবো একবার ! বাংলা কিন্তু সেটা করেনি !

ভারতবর্ষের সমস্ত প্রদেশের মধ্যে বাংলায় এবং কেরলে ‘মার্ক্স দর্শন’ ঢুকলো(ত্রিপুরাও বাঙালি অধ্যুষিত), বাকি প্রদেশগুলি কিন্তু গ্রহণ করলো না ! কারণ তারা এখনো উঁচু-নিচু sentiment কাটিয়ে উঠতে পারেনি । তবে, বাংলায় এই দর্শন ঢুকাতে গিয়ে যেমন কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভালো হয়েছে_ তেমনি ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চরম আঘাত নেমে এসেছে ! ভারতে এতো মহান এবং উচ্চ আদর্শযুক্ত দর্শন থাকতেও ‘মার্ক্স দর্শন’ কেন এখানে ঢুকলো বলতো ? কারণ, এখানে অশিক্ষিতের সংখ্যা বেশি ! আমাদের পরের জেনারেশন যেভাবে শিক্ষায় এগিয়ে আসছে, দেখবে এসব ছুঁড়ে ফেলে দেবে !

তবে যেটা বলছিলাম_’প্রাদেশিকতা’ একটা মস্ত বড় sentiment ! যেটা থেকে বাঙালিরা অনেকটাই মুক্ত ! আমাদের আশ্রমের একজন নর্থ ইন্ডিয়ান ভক্ত ‘ঊষা’ জার্মানীর ‘হ্যানাওয়ে’-তে থাকে ! আমি জার্মানিতে ঘোরার সময় ওর ওখানে উঠেছিলাম ! মেয়েটি ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেছে, কিন্তু কি দেখলাম জানো সেই মেয়েটিও তার প্রদেশ ভারতবর্ষের অন্য প্রদেশের থেকে কতটা ভালো সেই সব কথাই বলে গেল ! অর্থাৎ সে-ও প্রাদেশিকতার কথাই বলছে, এই sentiment থেকে মুক্ত হোতে পারছে না ! সেই জন্যই বলছিলাম স্বদেশিকতা এমন একটা সেন্টিমেন্ট যেখান থেকে মুক্ত হওয়া সহজ কথা নয় ! স্বদেশ থেকে অতদূরে বসবাস করা সত্ত্বেও মেয়েটি তার নিজস্ব প্রদেশের কথাই বড় করে ভাবছে ! আমি ওখানে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করছিলাম, তাতে “হিন্দি বলয়”_ এই কথাটা ব্যবহার জন্যই ওই মেয়েটির sentiment-এ লেগেছিল ! যেহেতু মেয়েটি originally U.P-র বাসিন্দা, তাই ও আমার কথার প্রতিবাদ করেছিল ! ওর reaction দেখেই আমি অবশ্য সাথে সাথেই চুপ করে গেছিলাম কারণ আমি কারো নিজস্বতা ভাঙতে চাই না, নতুন ভাবে তার নিজস্বতা গড়ে উঠুক_এটাই আমি চাই !

ভারতবর্ষ বারবার বিদেশী শক্তির কাছে পরাজিত হওয়ার পিছনে কারণ ছিল এই ‘প্রাদেশিকতা’ ! আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে পরবর্তী যে কোনো বিদেশীরা, যখনই ভারতবর্ষের কোনো এক অঞ্চল আক্রমন করতো_ তখন শুধুমাত্র সেই অঞ্চলের রাজারাই তার বিরোধ করতো_ পার্শ্ববর্তী রাজারা কখনোই সমবেত হয়ে বিদেশিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি । এটা যদি সম্ভব হোত, তাহলে কোনো দিন কোনো বিদেশী লুটেরারা ভারতবর্ষে ঢুকতেঈ পারতো না_ এ দেশকে শাসন করা তো দূরের কথা ! আধুনিক ভারতবর্ষে স্বামী বিবেকানন্দ-ই প্রথম_ যিনি ‘সমগ্র ভারত ভাবনা’-য় সকলকে ভাবিত করে তুললেন ! যেদিন তিনি পরাধীন ভারতের একজন সামান্য নাগরিক হয়েও আমেরিকায় গিয়ে ‘বিশ্বধর্ম সম্মেলনে’ ভারতবর্ষের মাথা উঁচুতে তুলে ধরতে পেরেছিলেন, সেদিন থেকেই গর্বে তৎকালীন পরাধীন ভারতবর্ষের সমগ্র অংশের মানুষের মধ্যে ‘আমরা ভারতবাসীরাও অনেক কিছু করতে পারি’এইরূপ একটা গৌরববোধ জাগ্রত হয়েছিল ! তার আগে অবশ্য স্বামীজী ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বেড়িয়ে নিজের একটা পরিচিতি তৈরি করে নিয়েছিলেন ! এইটা খুব‌ই কাজে লেগেছিল ! ভারতবাসীরা সেই সময় কতোটা গৌরবান্বিত বোধ করেছিল এর প্রমাণ হিসেবে বলা যায় স্বামীজী যখন আমেরিকা থেকে জাহাজে করে ফিরছিলেন_ তখন কলম্বোতে জাহাজ পৌঁছাতেই লক্ষ লক্ষ জনগণ যেভাবে স্বতঃস্ফূর্ত অভিবাদনের আয়োজন করেছিল __সেটা বিগত কয়েক শত বছরের ইতিহাসে একেবারে নতুন ও বিস্ময়কর ঘটনা ছিল ! পরে চেন্নাই সহ বিভিন্ন স্থানে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল ! তাতেই ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল !

আধুনিক ভারতবর্ষে সমগ্র ভারতবাসীর মধ্যে ‘প্রাদেশিকতা’-বোধ থেকে ‘দেশাত্মবোধ’ জাগিয়ে তোলার ব্যাপারে স্বামী বিবেকানন্দ-ই অগ্রগণ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন ! তবে জানো__ স্বামীজীর‌ও অনেক আগে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের মহামন্ত্রী চাণক্য বিদেশি আক্রমণের বিরুদ্ধে তৎকালীন উত্তর ভারত ও পশ্চিম ভারতের রাজন্যবর্গকে একত্রিত করতে চেয়ে ছিলেন ! হয়তো উনি সেভাবে successful হননি, কিন্তু ‘স্বদেশ-ভাবনা’ বা ‘ভারত ভাবনা’ এই ব্যাপারটা তাঁর মধ্যে ছিল।

জিজ্ঞাসু:—বাবা আপনার ছোটবেলার অনেক কথা অপরের কাছে শুনেছি । কিন্তু আপনার নিজের মুখে কখনো শুনিনি ! আপনার ছোট বয়সে একবার খুব জ্বর হয়েছিল_ আর শিব-পার্বতী এসে আপনার প্রাণ রক্ষা করেছিলেন __ ওই ঘটনাটা যদি দয়া করে একটু নিজের মুখে বলেন ?

গুরু মহারাজ:— হ্যাঁ, ওই ঘটনাটি যখন ঘটেছিল, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র দু’বছর ! আমার তখন ধুম্ জ্বর ! আমাদের সংসারে সেই সময় খুবই অভাব ছিল ! বাবা ছিলেন সংসারের প্রতি উদাসীন । পরিবারে অনেকগুলো ছেলে মেয়ে থাকায়__ আমার মায়ের তখন খুবই কষ্টের জীবন ছিল ‌ তবু তিনি কোনক্রমে দু-মুখ সমান করে সংসারটা চালিয়ে যাচ্ছিলেন । কিন্তু ওই অবস্থায় পরিবারের কোনো সদস্যের শরীর খারাপ হোলে এবার তিনি আর কি-ই বা করতে পারেন ! তবুও স্থানীয় চিকিৎসককে দিয়ে প্রাথমিকভাবে আমার চিকিৎসা করা হয়েছিল, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি ! আমি তখন জ্বরে প্রায় বেহুঁশ ! মা সেই অবস্থায় কোনো ঝুঁকি না নিয়ে আমাকে কোলে করে, সঙ্গে একজন মহিলাকে নিয়ে মায়ের বাপের বাড়ি বিজারার দিকে রওনা হয়ে যান !

তখন কৃষ্ণদেবপুর থেকে বিজারা হাঁটাপথেই বেশিরভাগ মানুষ যাতায়াত করতো ! মা ও তাই যাচ্ছিলেন ! পথে সিংরাইল যাবার আগে বেহুলা নদী পড়ে ! ওখানে তখন সাঁকো পার হোতে হতো । ওই নদীর ধারেই একটা নিম গাছের তলায় একজন সন্ন্যাসী এবং একজন সন্ন্যাসীনী দাঁড়িয়েছিলেন ! মা কাঁদতে কাঁদতে দ্রুতপদে অসুস্থ ছেলে কোলে করে যাচ্ছেন দেখে_ তাঁরা আমার মা-কে দাঁড় করান এবং বলেন মা! তুমি কাঁদছো কেন ? তোমার কি কিছু বিপদ ঘটেছে ?” মা কাঁদতে কাঁদতেই তাঁদেরকে আমার শরীর খারাপের সমস্ত কথা খুলে বলেন ! তখন সেই সন্ন্যাসিনী মা-কে বলেন “মা ! তোমার ছেলেকে একবার আমার কোলে দাও তো ! আমি একবার দেখি !” মা একটু ইতঃস্তত করছিলেন কিন্তু সঙ্গের মহিলাটি মায়ের মনে জোর দেওয়ায়, মা তখন ঐ সন্ন্যাসিনীর কোলে আমাকে দিয়েছিলেন ! ওই সন্ন্যাসিনী আমাকে কোলে নিয়ে খুব আদর করতে লাগলেন _ যদিও আমি তখন জ্বরগ্রস্থ অবস্থায় চুপচাপ শুয়েছিলাম ! সন্ন্যাসীটিও ঐ মা সন্ন্যাসীনীর সাথে আদরে যোগ দিলেন ! কিছুক্ষণ পরেই সন্ন্যাসিনী আমাকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন “কই তোমার ছেলের তো দেখছি কিছুই হয়নি ওকে দুধ দাও, ওর খিদে পেয়েছে !” ছেলেকে কোলে ফেরত পেয়ে মা দেখেন শিশু (অর্থাৎ গুরুজী) দিব্যি চোখ মেলে তাকাচ্ছে ! গায়ের জ্বর‌ও নাই ! ব্যাকুল হয়ে মা আমাকে খাওয়াতে চাইলেন। কিন্তু একজন পুরুষ সন্ন্যাসী সামনে রয়েছে বলে ঘুরে বসে আমার মা যেই না দুধ দিতে শুরু করেছে এবং সঙ্গের মহিলাটি মাকে সাহায্য করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে__ সেই সুযোগেই ওই সন্ন্যাসী এবং সন্ন্যাসীনী অদৃশ্য হয়ে যান ! ফলে মা বা সঙ্গের মহিলাটি আর তাদেরকে দেখতে পাননি! যদিও জায়গাটা একদম‌ই ফাঁকা ছিল এবং বহুদূর পর্যন্ত দেখাও যাচ্ছিলো !

অনেক পরে মায়ের কাছে এই ঘটনাটা যখন যখন‌ই শুনতাম, তখনই আমার সব মনে পড়ে যেতো ! সেদিন সাক্ষাৎ বৈদ্যনাথ সর্বরোগহর “হর” এবং জীবের সর্ব দুঃখের মুক্তিদাত্রী স্বয়ং “পার্বতী”, আমার মা-কে দর্শন দিয়েছিলেন, আর আমার শরীরের সমস্ত ব্যাধির উপশম করে দিয়েছিলেন।

জিজ্ঞাসু:—আপনি একবার বলেছিলেন চূড়ান্ত ভয়ে কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হয়ে যায় ! এইরূপ অভিজ্ঞতা আপনার ছোটবেলায় কোথায় যেন ঘটেছিল ?

গুরু মহারাজ:—হ্যাঁ ঠিকই বলেছো ! এটাও আমার ছোটবেলাতেই ঘটেছিল ! কৃষ্ণদেবপুরে আমাদের বাড়ি থেকে বাঘনাপাড়া স্টেশনের দিকে যেতে রেল লাইনের উপরে একটা কালভার্ট রয়েছে ! আমার তখন 5/6- বছর বয়স হবে । সেই সময় আমি প্রায়ই গভীর রাতে উঠে ওই কালভার্টে গিয়ে একা একা বসে থাকতাম ! ওই জায়গাটির এমনই বিশেষত্ব ছিল যে, ওখানে প্রচুর লোক আত্মহত্যা করতো বা রেলে ঐখানেই খুব বেশি accident হোতো ! আমি নিজেও একদিন ছোট বয়সে, ঐ কালভার্টে বসে থাকা অবস্থায়_ গভীর রাতে একটি মহিলাকে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করতে দেখেছিলাম ! গ্রামের সবাই একটু রাত হোলে ওই স্থানটি এইজন্য‌ই এড়িয়ে চলতে চাইতো !
তখনও পূর্ববাংলার লোকেরা আমাদের ওদিকে বসতি তৈরি করেনি, ফলে কৃষ্ণদেবপুর গ্রামটি তখন ফাঁকা ফাঁকা ছিল ! ওদিকটায় লোকসংখ্যাও ছিল অনেকটাই কম । এইসব বিভিন্ন কারণে ওই জায়গাটি খুবই নির্জন থাকতো । তাই আমি বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে __ বিশেষতঃ বাবা যখন ঘুমিয়ে পড়তেন তখন চুপি চুপি দরজা খুলে ঐ কালভার্টে এসে বসতাম‌।

একদিন ওইখানেই আমার স্কন্ধকাটা “কবন্ধ” দর্শন হয়েছিল ! ঘটনাটা কি হয়েছিল জানো আমি ওখানে বসে থাকতে থাকতেই শুনতে পেলাম সাইরেনের মত একটা শব্দ “ওঁ-ও-ও-ও…” তারপর “ধপ্”-“ধপ্” করে বিকট আওয়াজ আসছিল ! আওয়াজটা কাছে আসতেই দেখলাম আমার কাছ থেকে মাত্র 4/5 হাত দূর দিয়ে রেললাইন বরাবর একটা কাটা মুন্ডু প্রবলবেগে ঘুরতে ঘুরতে লাফাতে লাফাতে যাচ্ছে, আর একটা বিশাল মুন্ডহীন দেহ সামনে দুহাত বাড়িয়ে সেইটাকে ধরার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছে ! কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হোচ্ছে ফলে ওর হাত দুটো তার নিজের বুকে গিয়ে আঘাত করছে ! তার পায়ের শব্দ আর বুক চাপড়ানো শব্দ মিলেমিশে ধপাস্ ধপাস্ করে আওয়াজ হোচ্ছে ! আর ওই কাটা মুন্ডু প্রচন্ড বেগে ঘোরার জন্য সাইরেনের মতো আওয়াজ বেরোচ্ছে । চোখের সামনে এই ঘটনাটা দেখেই আমার ভয়ে শরীর হিম হয়ে যাবার যোগাড় হোলো ! সত্যি সত্যি আমার গায়ের তাপমাত্রা খুবই কমে গিয়েছিলো ! কিন্তু আমার কুণ্ডলিনী শক্তি থেকে তাপ বেরিয়ে আবার শরীরের তাপমাত্রাকে স্বাভাবিক করে দিচ্ছিলো ! কবন্ধটি চলে যাবার পর_ যেই মুহুর্তে আমার শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হোলো অর্থাৎ আমার শরীরের জোর যেইমাত্র আমি ফিরে পেলাম আমি আর দেরি না করে অমনি লাগালাম ছুট্ ! একছুটে বাড়ির ভেতরে ঢুকে ঘরের ভিতর শুয়ে থাকা বাবার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম ! অনেকক্ষণ কথা বলতে পারিনি ! বাবা বারবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন _”কি হয়েছে?” কিছুক্ষণ পর বাবাকে সমস্ত ঘটনা খুলে বলেছিলাম ! বাবা আমাকে খুব সাহস দিয়েছিলেন । উনি বলেছিলেন উনিও গভীর রাতে গান বাজনার জন্য বিভিন্ন গ্রামে যাতায়াত করেন এবং এমন বহু ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন ! কিন্তু উনি দেখেছেন যে, প্রেতযোনিরা সাধারণত কোনো মানুষের ক্ষতি করতে পারে না !

পরে মা-ও ঘটনাটা শুনেছিলেন ! মা বাবাকে খুব বকেছিলেন ! কারণ তখন আমার ভাইবোনেরা ছোট ছোট ছিল বলে আমি বাবার সাথে আলাদা ঘরে শুয়ে থাকতাম, তাই আমাকে আগলে রাখার দায়িত্ব ছিল বাবার ! বাবা আমাকে জানতেন বলে বিশেষ কোনো কাজে আমাকে বাধা দিতেন না ! কিন্তু মায়ের হৃদয় কোমলতায় ভরা ! যে কোনো মা সর্বদাই সন্তানের অমঙ্গল আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন থাকেন ! আমার মা-ও আমার জন্ম সর্বদাই চিন্তায় থাকতেন !

আমাদের পাড়ার তেমাথা মোড়ে অনেকেই নানারকম তুকতাক করতো । প্রায়ই সকালে দেখা যেতো কোনো সিঁদুর মাখা ফল পড়ে আছে অথবা ক্ষীরের তৈরি পুতুল পড়ে রয়েছে ! মা বারণ করে দিয়েছিলেন_ ওখানে পড়ে থাকা কোনো জিনিস যেন কখনো তুলে না দেখি ! বাবা বলতেন _”ওই সব জিনিস দেখলে সেখানে পেচ্ছাপ করে দিয়ে চলে আসবি!”

ছোটবেলাতেই আমাকে ধরা দিতে হয়েছিল দুজন বৃদ্ধার কাছে একজনকে সবাই বলতো ‘রামকেষ্টর মাসি’ এবং অপরজন মায়ের ‘বুনটিদিদি’ ! ‘রামকেষ্টর মাসি’ বা ‘রামকৃষ্ণের মাসি’ বলা হোতো _ ওই অঞ্চলের একজন বৃদ্ধা মহিলাকে, যিনি কালনায় ভগবান দাস বাবাজির আখড়ায় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে বালিকা অবস্থায় দেখেছিলেন ! সেই কথাটা উনি বুড়ো বয়স পর্যন্ত সবাইকে ধরে ধরে বলতেন । বেশিরভাগ মানুষই এটা বিশ্বাস করতো না তাই ওকে সবাই ‘রামকেষ্টর মাসি’ বলে খ্যাপাতো ! আর ‘বুনটিদিদি’ এইরকম নামকরণের পিছনে কারণটি হোলো_ ওই ভদ্রমহিলা অনেকদিন ধরেই আমার মায়ের কাছে আসতেন ! আমার মা ওঁকে ‘দিদি’ বলতেন, আর উনি আমার মাকে বলতেন “বুন”(বোন) ! তাই পরবর্তীতে সকলে ওনাকে ‘বুনটিদিদি’ বলে ডাকতো ! উনি গোপাল ভাবে সাধনা করতেন । কিন্তু আমি যখন শিশু তখন থেকেই ওই মা-টি আমাদের বাড়িতে এলেই আমাকে কোলে নিয়ে আদর করতেন, আর ‘গোপাল’ ‘গোপাল’ করতেন । তারপর আমার যখন 5 বছর বয়স_ সেই সময় ওই মা-টির আমার মধ্যে তাঁর গোপালের দর্শন হয় ! ওই বৈষ্ণবী আমার মাকে বলতেন__ ” এই গোপাল(শিশু গুরু মহারাজ) শুধু তোমার ছেলে নয়, ও আমাদের ছেলে ! দেখবে ও বাড়িতে বেশিদিন থাকবে না, ঠিক আমাদের কাছে চলে আসবে !” ওই মহিলাই ছিল শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের ‘কমললতা’ চরিত্র ! শরৎচন্দ্র কালনা, ধাত্রিগ্রাম এই সব অঞ্চলে খুব আসতেন। ‘দেবদাস’ উপন্যাসের ‘পার্বতী’-চরিত্র‌ও ঐ অঞ্চলেরই একটি মহিলাকে নিয়ে তৈরি ! আমার বাবার কাছে এসব ঘটনা আমি শূনেছিলাম। গানবাজনা করার সুবাদে আমার বাবার সাথে শরৎচন্দ্রের ভালোই যোগাযোগ ছিল।