জিজ্ঞাসু:— আপনি একবার বলেছিলেন_”পঞ্চকোষ বিবেকাভেদাঃ”! এই পঞ্চকোষের ব্যাপারটা কি?
গুরু মহারাজ:----ভারতীয় ঋষিরা বলেছেন পঞ্চকোষ দিয়ে মানব শরীর গঠিত । জীবন বিজ্ঞানের মতে যে কোনো জীবশরীর অসংখ্য আণুবীক্ষণিক কোষ দ্বারা গঠিত । সেইসব কোষকলার গঠন, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সবই অবস্থান ভেদে আলাদা আলাদা । আর বৈদিক ঋষিরা বলে গেছেন পঞ্চকোষ যুক্ত মানব শরীর ! পঞ্চকোষ বলতে বোঝায়_ অন্নময় কোষ, প্রাণময় কোষ, মনোময় কোষ, বিজ্ঞানময় কোষ এবং আনন্দময় কোষ । নিম্নতর প্রাণীতে শুধু অন্নময় ও প্রাণময় কোষ ক্রিয়াশীল থাকে । জীবন চক্রে প্রাণীরা যত উন্নত অবস্থা লাভ করে, তখন ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে যথাক্রমে মনোময়, বিজ্ঞানময় ও আনন্দময় কোষের ক্রিয়া প্রকটিত হোতে শুরু করে । একমাত্র মনুষ্যশরীরে পাঁচ প্রকারের কোষ-ই ক্রিয়াশীল থাকে !
কোনো সাধক তার সাধনার দ্বারা চেতনার উন্নতি ঘটাতে পারছে_ মানেই হোলো ওই সাধকের পঞ্চকোষের পুষ্টিসাধন হোচ্ছে ! পাঁচ প্রকারের কোষের পুষ্টি সাধন কিভাবে হয় _ তা তোমাদের বলছি শোনো ! সর্বদা শুদ্ধ অন্নগ্রহণ করলে অন্নময় কোষ পুষ্ট হয় । ‘শুদ্ধ অন্ন’ বলতে স্বপাক নিরামিষ অন্নগ্রহণ অথবা শুদ্ধাচারে বাড়িতে বানানো সহজপাচ্য এবং সাধন সহায়ক অন্নকে বোঝানো হয়ে থাকে। নিয়মিত ও নিষ্ঠার সাথে প্রাণায়াম ক্রিয়ার অভ্যাস করলে সাধকের প্রাণময় কোষ পুষ্ট হয় ! নিষ্ঠাপূর্বক নিরন্তর মন্ত্র (গুরুমন্ত্র) জপের মাধ্যমে সাধকের মনোময় কোষের পুষ্টিসাধন হয় ! গভীর ধ্যানে অন্তর্লীণ হবার নিত্য অভ্যাসের ফলে সাধকের মস্তিষ্ক স্থিত বিজ্ঞানময় কোষের পুষ্টিলাভ হয় ! আর সাধকের আনন্দময় কোষ জাগ্রত হয় সাধুসঙ্গে বা সৎসঙ্গে ! প্রকৃত সাধুর পদপ্রান্তে বসে তাঁর শ্রীমুখ থেকে অধ্যাত্ম আলোচনা শোনার সৌভাগ্য হোলে __তবেই ভক্ত সাধকের মস্তিষ্কস্থিত আনন্দময় কোষের পুষ্টিসাধন হয় ! তখনই সাধক ঈশ্বরানন্দের বা ভূমার স্পর্শ পায় ! সে অপার্থিব, পরমার্থিক আনন্দের স্বাদ পায় ! এই ক্ষণিক আস্বাদন-ই ভক্ত সাধককে পরিপূর্ণ আনন্দের আস্বাদ গ্রহণের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে ।
জিজ্ঞাসু:—এখন প্রায়শই শোনা যায় __অনেক জায়গাতে “অনাথ আশ্রম” গড়ে উঠছে ! সরকারি ‘হোমে’-র সংখ্যাও অনেক বেড়েছে ! হটাৎ করে এই সবের বাড়বাড়ন্তের কারণ কি কিছু আছে ?
গুরু মহারাজ:—ঠিকই শুনেছো ! বর্তমানে ভারতবর্ষে অনাথ শিশুদের বা পরিত্যক্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে_ এটা ঠিক ! একটা পরিসংখ্যানে বলছে কলকাতাতেই পথশিশুদের সংখ্যা বেশ কয়েক হাজার ! এইসব অসহায় অনাথ-আতুর পথশিশুদের ভবিষ্যৎ কি বলোতো ? ছোট থেকেই স্নেহ-ভালোবাসা না-পাওয়ার যে বঞ্চনা, এটা মারাত্মক ! এর ফলে সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি reaction নিয়েই এরা বড় হয়ে উঠছে ! তাই দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় হয়ে এরা criminal হোচ্ছে ! সরকারিভাবে যে সমস্ত সমীক্ষা-রিপোর্ট বেরোয় সেখান থেকেই এসব কথা জানা যায় । তাই মানবিক কারণেই সরকারিভাবে আজকাল বিভিন্ন ‘হোম’ তৈরি করা হোচ্ছে ! যাতে সমাজের অবহেলিত, বঞ্চিত পথশিশুরা বা এই ধরনের মানুষেরা সেখানে একটু স্থান পায় ! যাতে করে ছোটরা স্বাধীনভাবে সেখানে থাকতে পারে বা বড় হয়ে একটু লেখাপড়া শিখতে পারে ! যেন তারা বড় হয়ে সমাজের আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো হয়ে জীবন কাটাতে পারে !
কিন্তু সরকারি ‘হোম’গুলিতে সমস্ত পরিকাঠামো থাকলেও, অনাথ প্রতিপালনের উপযুক্ত মানবিকগুণবিশিষ্ট মানুষ না থাকায় সরকারি এই ধরনের project-গুলো থেকে বিশেষ কোনো উপকার পায় না সমাজ ! ‘হোম’ থেকে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের অধিকাংশই সেই অন্ধকার জগতেই ফিরে যায় ! কিছুতেই এদের মন থেকে reaction-এর মনোভাব নষ্ট করা যায় না ! কারণ এরা ঐ সব হোমে-ও বঞ্চনার শিকার হয়, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা ইত্যাদি ভোগ করে, নানাভাবে অত্যাচারিত হয় ! সেইজন্যই তাদের মনোজগতে reaction টা থেকে যায় ! আর এইজন্যই সাধুরা বা
ত্যাগব্রতীরা অনাথ-আশ্রম তৈরি করার কাজে এগিয়ে এসেছে ! আমাদের আশ্রমেও এই ধরনের ছেলেদেরকেই ভর্তির ব্যাপারে প্রাধান্য দেওয়া হয়, অর্থাৎ যাদের পিতার মৃত্যু ঘটেছে অথবা মা -টি স্বামী পরিত্যক্তা এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ! কমবয়সী ওই মা-টির কাছে তখন শিশুটা একটা বোঝাস্বরূপ হয়ে যায় ! সে(মা) চায় তার সন্তানটিকে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দিতে_ যাতে সে আবার নতুন ক’রে তার জীবনকে গুছিয়ে নিতে পারে । সেই মা-টি হয়তো আবার বিবাহ করে এবং সেখানে সে নতুন গৃহে স্বামী-সন্তান নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেয় । কিন্তু যে সন্তানটিকে সে ফেলে এলো, সেই সন্তান যদি কোন সৎ প্রতিষ্ঠানে স্থান না পায়, অনাদরে-অবহেলায় বড় হয়_ তাহলে তার মধ্যে জন্ম নেয় সংসারের প্রতি, সমাজের প্রতি একটা ভয়ঙ্কর reaction ! আর এটাই তাকে পরবর্তীতে সমাজের negative element হয়ে উঠতে সাহায্য করে ! সে সবকিছুর মধ্যেই শুধু negative-টাই দেখে । তাই প্রাতিষ্ঠানিক সবকিছুকেই সে বিরোধ করতে চায়। এইখানেই প্রয়োজন হয় স্নেহ-ভালোবাসার ! ওইসব শিশুসন্তানদের যখন কোনো সাধুর আশ্রমে নিয়ে আসা হয়_ তখন তারা সেখানে ভালোবাসা পায়, স্নেহ পায় ! ফলে তাদের মনে reaction জন্মাতে পারেনা এবং তারা যখন বড় হয় _তখন তারাও এক একজন সৎ নাগরিক হয়ে ওঠে !
দ্যাখো, সাধুদের নিজেদের কোন ঔরসজাত সন্তান নাই, তবু তারা ওই শিশুদের সন্তানস্নেহে পালন করে ! শরীর খারাপ হোলে রাত জেগে তাদের সেবা করে ! ছোট বয়সে পায়খানা-পেচ্ছাপ করে ফেললে তারাই পরিষ্কার করে ! এইগুলি তো মায়ের ভূমিকা পালন তাই নয় কি ! ঐ শিশুটি বড় হবার পরও, তাদের স্মৃতিতে সাধুদের ওই আচরণগুলির কথা থেকে যায় ! ফলে, তাদের মধ্যেও একটা কর্তব্যবোধ, বিবেকবোধ জাগ্রত হয় ! তারা আর reactionist হয় না বরং মানবিক গুণসম্পন্ন হয়ে এক একজন সমাজ গড়ার কারিগর হয়ে ওঠে ! সাধু আশ্রমগুলিতে সেবাকার্যের এটা একটা বিরাট সার্থকতা !
জিজ্ঞাসু:—মায়েরা তাদের শিশু সন্তানকে home-এ বা অনাথ আশ্রমে দেয় ই বা কেন ? তাদের কি কষ্ট হয় না ?
গুরু মহারাজ:—-কষ্ট হয় বৈকি বাবা _ যথেষ্ট কষ্ট হয় ! সন্তানটিরও কষ্ট হয়, মায়েরও কষ্ট হয় ! তবে সেটা কয়েক দিন স্থায়ী হয় _ তারপর আর থাকেনা । পরিবেশ-পরিস্থিতি-সময় সব কিছুকেই বদলে দেয়, সবকিছুকেই adjust করে নিতে শেখায়, আবার অনেক কিছুকে গ্রাসও করে নেয় । আর মায়ের মাতৃত্বের কথা বলছো ? সেটা কতজনের আছে ! নারীর মধ্যে মাতৃত্ব জাগ্রত হোলে তো তার মধ্যে পূর্ণতা এসে যাবে ! সন্তান জন্ম দিলে যে কোনো নারী ‘মা’ হয় ঠিকই কিন্তু তার মধ্যে পরিপূর্ণ মাতৃত্ব কি জাগ্রত হয় ? তা হয় না ! তার মধ্যে পরিপূর্ণ মাতৃত্ব আসে একমাত্র তার পূর্ণতাপ্রাপ্তি ঘটলে !
মাতৃত্ব জাগার জন্য বা নারীর পূর্ণতা লাভের জন্য সন্তানের জন্ম দেবার তো কোনো প্রয়োজন হয় না ! তা যদি হোতো, তাহলে সারদা মায়ের মধ্যে কি করে পূর্ণ মাতৃত্বের প্রকাশ ঘটেছিল ? তাঁর নিজের তো কোনো সন্তান ছিল না ! সরলা গ্রাম্য কিশোরী হিসাবে এবং পাড়াপড়শি আত্মীয়-স্বজনের শেখানো কথায় প্রভাবিত হয়ে একবার মা সারদা, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে ‘সন্তান’-এর প্রসঙ্গ তুলেছিলেন ! ঠাকুর সেই সময় সারদা-মাকে ওনার বাপের বাড়ির উদাহরণ দিয়েছিলেন ! সারদা মায়ের অনেকগুলি ভাইবোন ছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ মারাও গিয়েছিল ! ঠাকুর বলেছিলেন “তুমি তো জানো, সংসারী মানুষদের সন্তান হোচ্ছে আবার হয়তো কেউ কেউ মারাও যাচ্ছে ! তবুও বাবা-মা কিছুদিনের মধ্যেই সব ভুলে আবার খাওয়া-দাওয়া করছে, হাসছে, আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছে ! তাহলে এইসব মায়ের মধ্যে মাতৃত্ব কোথায় ?” ঠাকুর উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন “এগুলো উটের কাঁটাগাছ খাওয়ার মতো !” কাঁটাগাছ খাবার সময় উটের মুখ রক্তাক্ত হয়, জিভে কাঁটা বিঁধে যায় _তখন হয়তো ভাবে আর কাঁটাগাছ খাবে না, কিন্তু খিদে পেলে আবার সেই কাঁটাগাছই খায় !
এরপর ঠাকুর কিশোরী সারদা মাকে সেই বিখ্যাত কথাটি বলেছিলেন _”তুমি চিন্তা করো না, তোমার নিজের সন্তান নাই থাক কিন্তু ‘মা’ ডাক শুনতে শুনতে তোমার কান ঝালাপালা হয়ে যাবে ! তুমি সবার ‘মা’ হয়ে উঠবে !”
আবার দ্যাখো, ‘মা টেরেসা’ কটা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন ? তবুওতো তাঁর মধ্যে মাতৃত্বের জাগরণ ঘটেছিল ! তাইতো জাত, কুল, শীল না দেখে পরিচয় পরিচিতি না বিচার করে সকল শ্রেণীর অনাথ-আতুরদেরকে তিনি কোলে তুলে নিতেন, সাদরে তাদেরকে তাঁর আশ্রমে স্থান করে দিতেন ! সমাজের সর্বস্তরের দুস্থ, অসুস্থ, রোগ-ব্যাধিগ্রস্থ মানুষদেরকে তাঁর আশ্রমে নিয়ে এসে নিজের হাতে সেবা-শুশ্রূষা করতেন_ যেমনটা মায়েরা তার সন্তানদের জন্য করে করে থাকে ! এইটাকেই “মাতৃত্ব” বলা হয় ।
আর নিজের গর্ভজাত সন্তানের প্রতি ‘বাৎসল্য’ প্রর্দশন_ সেটাতো প্রকৃতিগত ব্যাপার ! এটা শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই যে হয় _তা তো নয় ! সকল প্রজাতির জীবের মধ্যেই এই গুনটি বিদ্যমান ! কোনো গাভীর বাছুর হোলে কেমন বাৎসল্য স্নেহে মা-টি বাছুরের গা চাঁটে, তা দেখেছো ! বনে জঙ্গলে যে সমস্ত পশুরা থাকেতাদের মধ্যেও এই একই বাৎসল্য বিদ্যমান ! বাচ্চাটির কোনোরকম বিপদ-আপদ হোলে মা-পশু নিজের প্রাণের বিনিময়ে তাকে রক্ষা করে ! পশু-পাখি সকল মায়ের মধ্যেই তুমি এটা দেখতে পাবে ! তাহলে কোনো মানবী মায়ের ক্ষেত্রে এমনটি হবে_তাতে আর বিচিত্র কি ? এগুলি তো প্রাকৃতিক ঘটনা !
কিন্তু প্রকৃত অর্থে ‘স্নেহ’ আলাদা জিনিস ! মানবী মায়ের ক্ষেত্রে স্নেহ থাকাটা স্বাভাবিক_ কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্নেহ না থেকে সন্তানের প্রতি মায়ের মোহ জন্মে যায় ! বেশিরভাগ মায়েদের সন্তানের প্রতি যে ভালোবাসা প্রদর্শন _ সেটা কিন্তু স্নেহ নয় , ওটা মোহ ! মানুষ ছাড়া অন্যান্য মেরুদন্ডী প্রাণীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ওই সব প্রজাতির মায়েরা সন্তান যতদিন ছোট থাকে_ ততদিনই মা তাকে আগলে রাখে, খাবার জোগান দেয়ইত্যাদি সবরকমভাবে take care করে ! কিন্তু সন্তানেরা একটু বড় হয়ে গেলে মা তাদেরকে আর কাছে রাখে না, দূরে সরিয়ে দেয় ! শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই মায়েরা এটা করতে চায় না ! এর কারণ ওই ‘মোহ’, যা প্রত্যাশাসঞ্জাত ! আর তাইতো সন্তানের বিয়ে-থা হয়ে গেলে তারা কষ্ট পায় ! কিন্তু ঠিক ঠিক মাতৃত্বের যেখানে জাগরণ ঘটে গেছে, সেখানে আর মোহ থাকে না _সেখানে থাকে ‘প্রত্যাশাবিহীন ভালোবাসা’ ! এইটিই হোল প্রকৃত অর্থে স্নেহ বা মায়ের বাৎসল্য !