“জিজ্ঞাসু:—আচ্ছা গুরুজী! যারা একটু আধটু সাধন-ভজন করে, তাদের অনেকেই বলে__ আজ ধ্যান করার সময় আমার ‘এটা দর্শন হোলো’, ‘ওটা দর্শন হোলো’ ! কিন্তু ‘দর্শন’ মানে তো দেখা ! ‘দর্শন’-এর আর একটা মানে জানি দর্শনশাস্ত্র! তাহলে সাধন-ভজনের ক্ষেত্রে ‘দর্শন’-এর কি অন্য কোনো অর্থ আছে ?”___একজন ভক্তের এই জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন গুরু মহারাজ।। আজ সেই আলোচনার শেষাংশ]
……….দ্যাখো, স্থূলবস্তু বা ‘স্থুল বিষয়’-কে স্থূল-মাধ্যম দিয়েই দেখতে হয়- বুঝতে হয়- অনুভব করতে হয়। তেমনি কোনো ‘সূক্ষ্মবস্তু’-কে ধরতে গেলে অর্থাৎ অনুভব বা উপলব্ধি করতে গেলে__ তোমাকে সূক্ষ্ণ মাধ্যমের সাহায্যে অনুভব বা উপলব্ধি করতে হবে । অনুরূপভাবে ‘কারণ জগতে’-র কোনো কিছুকে ধরতে গেলে_ ‘কারণ’ দিয়েই ধরতে হবে !
তোমাদের মধ্যে যারা একটু আধটু ধ্যান করো__ তারা নিশ্চয়ই জানো, ধ্যানের গভীরতায় যে জ্যোতিঃ দর্শন হয়_ তা কি খালি চোখে দেখা যায় ? কখনোই যায় না ! আর যাবেই বা কি করে_ওটাতো চোখে দেখা আলোর আভা বা আলোকিত কোনো বস্তু নয় ! প্রকৃতপক্ষে জ্যোতিঃ কখনোই ‘আলো’ নয় !
দুই ভ্রূর মধ্যস্থিত স্থানে অর্থাৎ নাসিকাগ্র থেকে এক বুড়ো আঙ্গুল পরিমাণ উঁচুতে অবস্থিত যে স্থান, আরো clear কোরে বলতে গেলে বলা যায়_ মায়েরা বা মেয়েরা ঠিক যেখানটায় কপালে টিপ পড়ে__ তার সোজাসুজি ভিতর দিকে মূর্ধার উপরের অংশে hypothalamus-এর কেন্দ্রে মন এবং প্রাণ এক করতে পারলে যে কোনো সাধকেরই জ্যোতিঃ দর্শন হোতে পারে ! এটা খুব একটা দুঃসাধ্য কোনো ব্যাপার নয়!
ক্রিয়াযোগী পরম্পরার অর্থাৎ যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয় প্রতিষ্ঠিত পরম্পরার দু-একজন কর্মকর্তা(যারা কোলকাতায় থাকে)-র সাথে আমার যোগাযোগ ছিল । যোগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ওদের সাথে কথাবার্তাও হোতো। তখন দেখেছিলাম_ ওরা এই ভ্রূমধ্যস্থিত জ্যোতিঃ দর্শনকে ‘আত্মা নারায়ণ’ বলে বর্ণনা করলো এবং দেখলাম ওদের পরম্পরায় বর্তমানে যারা রয়েছে, তারা এই জ্যোতিঃ দর্শনকে খুবই পাত্তা দিয়ে থাকে। কিন্তু এই পরম্পরার প্রতিষ্ঠাতা মহাযোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ী বা তাঁর পরবর্তী কয়েক generation -এর গুরুরা প্রকৃতই উন্নত ছিলেন। লাহিড়ী মহাশয় তো প্লাশ ওয়ার্ল্ডের লোক ছিলেন, যুগ প্রয়োজনে বিশেষ কাজের জন্য ওনাকে পাঠানো হয়েছিল! তাঁরা জ্যোতিঃর রহস্য জানতেন। সময়ের সাথে সাথে এখন ঐ পরম্পরায় ততোটা উন্নত সাধক আর নাই। অবশ্য এটাই এই পৃথিবী গ্রহের নিয়ম। যে কোনো সদ্গুরু পরম্পরায় তিন generation পর্যন্ত আধ্যাত্মিক শক্তি পরিবাহিত হয় _তারপর থেকে কমতে থাকে এবং কিছুদিন পরই সেটা কমতে কমতে একেবারে শুন্য হয়ে যায়।। বলতে পারো_সব পরম্পরাতেই _এটা একটা বিরাট সমস্যা‌‌।
যাই হোক যা বলছিলাম_ প্রাণ স্থির করে আজ্ঞা চক্রে মন একাগ্র করতে পারলেই যে কারো জ্যোতিঃ দর্শন হোতে পারে ! এই দর্শন যখন কারো প্রথম প্রথম হয়, তখন সে আসন ছেড়ে উঠে পড়ে এবং ঘাবড়ে গিয়ে চোখ খুলে ফেলে! এক উজ্জ্বল ঘন ও শুভ্র রূপ__ এই জ্যোতিঃর ! মনোসংযোগ ঠিকমতো হোলেই হঠাৎ হঠাৎ flashing হয় ! সবকিছু যেন সেই জ্যোতিঃতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে ! কিছুদিন পর অবশ্য এই জ্যোতিঃর একটা শান্ত রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়_ যেন চন্দ্রালোকিত রাত্রির মতো মনে হয় । আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সাধকের এই জ্যোতিঃদর্শন সহ্য হয়ে যায় । আরো পরে ওটি একটি ডিম্বাকৃতি জ্যোতিঃপুঞ্জের আকার ধারণ করে এবং মনে হয় ভিতরটা প্রচন্ড dynamic ! এর পরের অবস্থাগুলো আর এখানে বলা যাচ্ছে না।।
যাই হোক, আমাদের এখানে অর্থাৎ আশ্রমে দীক্ষা নেবার পর অনেক ভক্তেরই প্রথম প্রথম এইরূপ জ্যোতিঃদর্শনের অভিজ্ঞতা হয়েছে ! এই যে আমাদের সামনে বন গ্রামের ‘নগেন’ বসে আছে_ এখানে দীক্ষা নেবার কিছুদিনের মধ্যে থেকে ধ্যানে বসলেই জ্যোতঃদর্শন হোতো ! কি রে নগেন ! আমি ঠিক বলছি তো ! [এতোদুর বলার পর গুরুজী যেমনি নগেনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছেন, অমনি নগেন জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাতে লাগলো এবং সবিস্তারে ওর সেই সময়কার জ্যোতিঃদর্শনের বর্ণনা দিতে লাগলো। উপস্থিত সকলে নগেনের অঙ্গভঙ্গি করে বলা দেখে হেসে উঠলো!!]