জিজ্ঞাসু :~ বলা হয়, “নেতা হওয়া যায় না – নেতা জন্মায়” – এই ব্যাপারটা যদি একটু বুঝিয়ে বলেন ?

গুরুমহারাজ : ~ স্বামী বিবেকানন্দ একবার বলেছিলেন – “নেতা হবে শিশুর মতো” ! ব্যাপারটা কিরকম বলো তো – “শিশুর মতো” বলতে এখানে বয়সে ছোটো, অসহায় একজনকে বোঝানো হয়নি। একটা বাড়িতে যদি একটা শিশু থাকে – তাহলে বাড়ির সবার অর্থাৎ পরিবারের সমস্ত member-দের ষোলআনা মনোযোগ সবসময়ের জন্য ওই শিশুটির উপরেই থাকে ৷ হয়তো সকলেই নিজ নিজ কাজ করে চলেছে কিন্তু সবাই সর্বদা খবর রাখছে ‘শিশুটি কি ঘুমোচ্ছে?’, ‘খোকাকে কি খাওয়ানো হয়েছে?’ _ইত্যাদি। সেই শিশুটি কারুকে শাসন করে না কিন্তু সে তার সহজতা ও সারল্য দিয়ে সবাইকে এমনভাবে বশে রেখে দেয় যে, সকল কাজের ফাঁকেও সবার attention ঐ শিশুটাই draw করে রাখে ৷

‘নেতা’-ও এমনটাই হওয়া উচিত, তা সে ধর্মনৈতিক নেতাই হোক – আর রাজনৈতিক নেতাই হোক ! তার এমন গুণ থাকা দরকার যে, সে তার সেই বিশেষ গুণের সাহায্যে বাকিদের সকলের সবসময় ‘নয়নের মনি ‘ হয়ে থাকবে ৷ কেউ কোনো বেচাল করলে তাকে শাসন করতে হবে না – একটু আবদার-অনুযোগ করলেই কাজ হয়ে যাবে ! শিশু নিজে কাউকে দেখে না – কিন্তু সবার নজর সবসময় থাকে তার দিকে ! বাড়ির অন্যান্য member-রা যে যেখানেই থাকুক না কেন – তাদের মনে, তাদের কথায়, তাদের কাজে ওই শিশুটির উপস্থিতি সদা জাগরুক থাকে ৷ কোনো দেশের নেতা যদি মানুষের মনোজগতে এইরূপ স্থান দখল করতে পারে – তাহলে সেই দেশের উন্নতি হবেই হবে এবং দেশের জনগণও সুস্থ হয়ে জীবন কাটাতে পারবে ৷

তবে তুমি যেটা বলছিলে ‘নেতা হয় না, নেতা জন্মায়’_ ইত্যাদি, এই কথাটা সত্যি এবং এটা ঐলঢসব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য !

জন্ম-জন্মান্তর ধরে অভিজ্ঞতাপুষ্ট যেসব মানুষ অর্থাৎ যারা দীর্ঘদিন ধরে বারবার মানুষ শরীরেই আসছে __তারাই মানব সমাজের senior ! এরাই সমাজের উঁচু উঁচু স্থানগুলি দখল করে থাকে – আর এটাই সাধারণ নিয়ম ৷ অপরদিকে যারা সবে সবে মানুষ শরীর পেয়েছে অর্থাৎ জন্মজন্মান্তরের বিচারে একেবারে নবীন — তারা সাধারণতঃ আমজনতা হয়েই জীবন কাটায় ! এইভাবেই চলছে পৃথিবী ৷

তবে মুশকিল হোচ্ছে কি জানো — জন্মজন্মান্তরের অভিজ্ঞতাপুষ্ট হয়ে মানুষ বুদ্ধিমান হোচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বিবেকপরায়ণ হয়ে উঠছে না ! তাই সাধারণভাবে তোমরা যাদেরকে ‘নেতা’ বলো_তারা প্রকৃত অর্থে ‘নেতা’ নয়। সুতরাং এরা নেতা হয়েই জন্মাক বা জন্মাবার পরেই নেতা হোক – তাতে পৃথিবীর মানুষের খুব একটা বেশি কিছু উপকার হয় না !

পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দ্যাখো – যত বড় বড় রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা সেখানে লেখা রয়েছে__ তারা প্রচুর যুদ্ধ করেছে, মানুষ মেরেছে, সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে ! গোটা কয়েক অবতার পুরুষ বা মহাপুরুষ ছাড়া পৃথিবীর যাবতীয় ধর্মীয় নেতারাও বিবেক আশ্রিত হোতে পারেনি – তারাও বুদ্ধি প্রয়োগ করেছে এবং সাধারণ মানুষের যথেষ্ট ক্ষতি করেছে ৷

এই সমস্ত কারণেই পৃথিবীতে বারবার ঈশ্বরের অবতরণ হয় ৷ অবতরণ হোতেই হয় – পৃথিবীর মানুষকে বিবেকবান করে গড়ে তোলার জন্য ! ‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি’ মানবসমাজে প্রচুর রয়েছে কিন্তু বিবেকবানের-ই অভাব ! পড়াশোনা বা education-এর দ্বারা, তর্ক-বিতর্ক অর্থাৎ বুদ্ধি বিচারের দ্বারা অথবা অন্য কোনোকিছুই মানুষের বিবেকের উন্মেষ ঘটাতে পারে না ৷ একটা জ্বলন্ত প্রদীপের দ্বারাই যেমন অন্য আর একটা বা একাধিক প্রদীপ জ্বালানো যায়, ঠিক তেমনি একজন জাগ্রত বিবেকপরায়ণ ব্যক্তি-ই পারেন অন্যদের বিবেক জাগ্রত করতে ! একশোভাগ জাগ্রত বিবেকীরাই বিবেকানন্দ ! এই জাগ্রত বিবেকীরা বা বিবেকানন্দরা মানবসমাজের প্রকৃত মঙ্গল করে থাকেন । তাঁরা একেবারে grass root level-পৌঁছে যান এবং সাধারণ মানুষের Touch-এ আসেন, তাদের সাথে অন্তরঙ্গভাবে মেশেন, তাদের সুখ-দুঃখের সাথী হ’ন এবং প্রকৃত শিক্ষাদানের মাধ্যমে তাঁরা ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের সুপ্ত বিবেককে জাগ্রত করে তোলেন।

বিবেক সব মানুষের মধ্যেই থাকে কিন্তু সুপ্ত থাকে ৷ যেমন তলোয়ার খাপে থাকে – ঠিক তেমনি ! শুধু খাপ ঘোরালে কি শত্রুর সঙ্গে লড়াই করা যাবে – যাবে না ! অস্ত্রের সঠিক ব্যবহার করতে হোলে আগে তাকে খাপ থেকে বের করতে হবে, তারপর সেই তলোয়ার দিয়ে ঘচ্-ঘচ্ করে কাটা যাবে_তাই না ! এখানে ‘খাপ’ হোলো বুদ্ধি আর ‘তলোয়ার’ যেন বিবেক ! এইজন্যেই বলা হচ্ছিলো যে, সমাজে বুদ্ধিমান প্রচুর রয়েছে কিন্তু তাদেরকে দিয়ে সমাজের বিশেষ ভালো কিছু হয় না _সমাজের প্রকৃত মঙ্গল করে থাকেন বিবেকবানরাই !!!