জিজ্ঞাসু :~ আপনি একবার বজ্রযোগিনী তান্ত্রিকদের কথা বলেছিলেন । আপনার সাথে ওনাদের কিভাবে যোগাযোগ হয়েছিল গুরুজী ?
গুরুমহারাজ : ~ তখন আমার খুবই অল্প বয়স – বড় জোর ১১/১২ বছর হবে ৷ সেই সময় আমার সাথে দুজন নাগা সন্ন্যাসী সঙ্গ দিচ্ছিলেন। এনাদের উপর আমাকে সমগ্র হিমালয় ঘোরানোর দায়িত্ব ছিল(হিমালয়ের গুরু পরম্পরা থেকে নির্ধারিত)- ওনারাই আমাকে বজ্রযোগিনীদের কথা বলেছিলেন এবং হিমালয়ের এক দুর্গম অঞ্চলে যে ওনাদের ঠাঁই-ঠিকানা — তাও বলে দিয়েছিলেন।
সেই মতো নির্দিষ্ট অঞ্চলে পৌঁছে আমি দেখলাম দুজন প্রাচীন সন্ন্যাসী একটা ছোট্ট গুহার সামনে বসে রয়েছে। বাইরে থেকে যে কেউ দেখে এটাকে একটা ছোট্ট গুহা-ই ভাববে কিন্তু আমার জানা ছিল যে –এইটা হোলো entrance মাত্র, এর ভিতরে অনেক কিছু রয়েছে। তাই আমি ওনাদেরকে অনুরোধ করলাম ভিতরে allow করার জন্য ৷ ওই দুজন আমাকে পাত্তাই দিচ্ছিলেন না ! হঠাৎ করে ওই গুহাতেই অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা একজন অতি প্রাচীন ঋষিকল্প সন্ন্যাসী আমার কথাবার্তা শুনে আমাকে ভেতরে ডেকে পাঠালেন। সেখানে উনি আমার বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের লক্ষণ মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতে লাগলেন এবং আমাকে ভিতরে যাবার জন্য select করলেন ৷
selection-এর পর ওনারা ওই গুহার দেওয়ালের একটা পাথর সরিয়ে আমাকে ভিতরে ঢুকিয়ে দিল ৷ সেখানে গিয়ে দেখলাম একটা বেশ বড়সড় একটা গুহার মতো জায়গা ৷ দেখলাম ওখানে নানা বয়সের সাধু-সন্ত-ব্রহ্মচারী ইত্যাদি অনেকেই রয়েছে – বেশ কয়েকজন প্রাচীন আচার্যরাও রয়েছেন ! আচার্যরা আমাকে ‘শ্রুতি’-তে(অর্থাৎ একবার মাত্র উচ্চারণ করলেন)কিছু শিক্ষা দিলেন ৷ দেখলাম, ওখানে এখনও ‘শ্রুতি’ পরম্পরা বজায় রয়েছে ৷ যাইহোক, আচার্যরা যে শিক্ষা দিলেন তা মুখে মুখে এবং আমাদেরকে(উপস্থিত শিক্ষার্থী সকলকেই)একবার শুনেই তা মুখস্থ করে নিতে বলা হোলো।
একটু ধাতস্থ হবার পর দেখলাম জায়গাটা ভালোই প্রশস্ত, নিচের দিকটা ঢালু হয়ে অনেকটা নিচ পর্যন্ত নেমে গেছে। সেখানে একটা ঝর্ণা রয়েছে — সকলে সেখানে স্নানের জল, পানীয় জল সংগ্রহ এবং শৌচকার্যও করে থাকে ৷ ওই একটিমাত্র শিক্ষাদানের পর সাতদিন কেটে গেল কিন্তু আচার্যরা এর মধ্যে আমার কাছ থেকে কোনো উত্তর চাইলেন না, নিদিধ্যাসনের কথাও বললেন না, আবার নতুন কোনো পাঠও দিলেন না। এরমধ্যে ওখানকার যাবতীয় যা কিছু কাজ – তা সকলের সাথে মিলেমিশে করতে বলা হয়েছিল, সুতরাং আমি তাই করছিলাম_ আর পরবর্তী পাঠের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
ঠিক সাতদিন কেটে যাবার পর সেই আচার্যরা আমাকে ডেকে পাঠালেন। তারপর বললেন – “আমাদের সেদিনের কথনের ‘পুনরাবৃত্তি কথন’ করো। আমি অনায়াসেই ওনাদের নির্দেশ পালন করলাম। এরপর ওনারা বললেন _”সেদিনের কথনের ‘উপলব্ধিজাত কথন’ তোমার কাছ থেকে শুনতে চাই ৷” ওখানে আরও কয়েকজন ছিল – যারা আমার বহুপূর্বেই পাঠ গ্রহণ করেছিল – তাদেরকেও আচার্যরা ওই একই কথা বললেন ৷
উপস্থিতজনেরা কেউই যথাযথ উত্তর দিতে পারলো না কিন্তু আমার পূর্ব-পূর্ব সংস্কার থাকায় – ওইসব পাঠ আমার জানা ছিল, ফলে আমি ওনাদের সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়ে দিলাম ৷
আচার্যগণের মধ্যে যিনি প্রধান, তিনি আমার সমস্ত জিজ্ঞাসার চটপট উত্তর দেওয়া দেখে খুবই খুশি হলেন এবং আমাকে ওনার বামদিকে বসিয়ে বাকিদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন – ” আজ থেকে ইনিও তোমাদের আচার্য্য ! কম বয়স বলে যেন এনার অমর্যাদা কোরো না ! তোমরা একে একে উঠে এসে ওনাকে তোমাদের অন্তরের শ্রদ্ধা-ভক্তি নিবেদন করে যাও ! আচার্যের কথামতো বাকিরা তাই করেছিল ৷
এরপর ওই প্রধান আচার্য আমাকে যত্ন করে ধরে নিয়ে আবার একটা বড় পাথর সড়িয়ে পরের গুহায় নিয়ে গেলেন দ্বিতীয় স্তরের পাঠদান এবং পরীক্ষা গ্রহণের জন্য ! সেখানকার যিনি আচার্য তিনি সানন্দে আমাকে গ্রহণ করে নিলেন এবং সেখানকার কোর্সের শিক্ষা দিতে লাগলেন ৷ ওখানকার শিক্ষা ছিল “নৈঃশব্দ” ! শুধু নির্বাক হয়ে থাকাই নয়, সব ব্যাপারেই নিস্তব্ধতা বজায় রাখতে হবে ! দেখলাম ওখানেও অনেক শিক্ষার্থী রয়েছে, যারা প্রথম স্তরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এখানে এসেছিল। তারা সবাই নির্বাক, দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে কিন্তু কেউই কারো সাথে কোনো কথা বলে না – সবকিছু কাজ করছে সবই নিঃশব্দে ! হাঁটছে, চলছে, শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে সবই এত সাবধানে যে, যাতে কোনোরকম শব্দ না হয় !
এইভাবে দিনের পর দিন থাকাটা সহজ কথা নয় ! সাধারণ মানুষকে যদি দু-চার ঘন্টা নির্বাক হয়ে থাকতে হয় – তাহলেই bore হয়ে যাবে ৷ কিন্তু ওখানে দেখলাম _সবাই খুবই আনন্দের সঙ্গে রয়েছে ! সবাই সব কাজ আনন্দেই করছে ! ওখানকার খাদ্য ছিল ‘শিলাজিৎ’ মিশ্রিত জল, ব্যস্ – আর কিছুই নয়। এতেই শরীরের যাবতীয় পুষ্টি হয়ে যেতো – শৌচাদিরও প্রয়োজন কম হোতো বা হোতোই না ! ওখানকার কথাবার্তা বা আচার্যের কাছে পরীক্ষা দেওয়া __এ সবই হোতো চোখের ভাষায় ! আচার্যদের চোখের ভাষা পড়েই পরীক্ষায় অকৃতকার্যতার বা কৃতকার্যতার কথাও বুঝে নিতে হয়।
এই স্তরে পরীক্ষায় qualified হোতে যে কোনো পরীক্ষার্থীর কমপক্ষে দুই-তিন মাস সময় লাগে, কারও আবার আরো অনেক বেশি সময় লাগে ৷ কিন্তু ওখানকার আচার্যরা ১২ দিনের মধ্যে আমাকে “qualified” ঘোষণা করে দিল ! আমার চোখের ভাষা দেখেই ওরা বুঝতে পেরেছিল এবং ওদের চোখের ভাষা দেখে আমিও বুঝেছিলাম যে, ওরা আমার আচার-আচরণে, আমার পরীক্ষাদানে সন্তুষ্ট হয়েছেন !
এরপর ওখানকার একজন আচার্য আমাকে তৃতীয় স্তরের পরীক্ষার জন্য – ঐ একই কায়দায় পাথর সড়িয়ে অন্য একটি গুহায় নিয়ে গেলেন। ……………(ক্রমশঃ)
