[বজ্রযোগিনী তান্ত্রিকদের সম্বন্ধে গতদিনের জিজ্ঞাসা–উত্তরের পরবর্তী অংশ]

…………. সেখানে(তৃতীয় ধাপে)যিনি আচার্য ছিলেন – তিনি আমাকে স্বাগতম জানালেন, তারপর উনি আমাকে তৃতীয় ধাপের শিক্ষা দিতে লাগলেন ৷ সেখানে আমাকে একটি ছোটো কাঠের দন্ড দেওয়া হোলো, আর একটি ছোটো কাঠের পাটাতন (পিঁড়ির মতো, যার উপর একজন বসতে পারে) দেওয়া হোলো ! এবার আমাকে বলা হোলো মাটির উপর ঐ দন্ডটি রেখে তার উপরে পাটাতনটি balance করে রাখতে হবে এবং তারপর সেইটার উপর বসে ধ্যান করতে হবে ৷ আমি ওই কক্ষের মতো বড় গুহাটির চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম – সেখানে বহু মানুষ (যোগী) ওই শিক্ষা গ্রহণ করেছে এবং আচার্যের নির্দেশ পালনের জন্য সদাই সচেষ্ট রয়েছে ৷ দন্ডের উপর পাঠাতনটিকেই দাঁড় করানোই যাচ্ছিলো না – তার ওপর আবার বসা তো দুর-অস্ত ! আর একবার যদিও বা বসা যায় _সেখানে দীর্ঘক্ষণ বসে বসে ধ্যান করা প্রাথমিকভাবে অসম্ভব‌ই মনে হচ্ছিলো । তবু ওখানকার সকলেই ভীষণভাবে চেষ্টায় রত ছিল ! অনেকে দন্ডের উপর পাটাতনটাই স্থির করতে পারছিল না, অনেকে সেইটা পেরেছে কিন্তু তার উপর বসতে যাচ্ছিলো আর পড়ে যাচ্ছিলো ! এইভাবে সকলেই practice করেই চলেছিল ৷

আমিও প্রথমটায় ওদেরই মতো চেষ্টা করতে লেগে গিয়েছিলাম, তারপর অল্প সময়ের মধ্যেই ওই বিষয়ের বিজ্ঞানটা বুঝে গেলাম ! আসল ব্যাপারটা হোলো কি জানো– দন্ড, পাটাতন এবং আমার শরীরের মেরুদন্ড _ এই তিনটির centre of gravity যখন এক সরলরেখায় আনতে পারা যাবে, তখনই দন্ডের উপর পাটাতনকে রেখে – তার উপরে বসে ধ্যান করা সম্ভব হবে! তাছাড়া দ্বিতীয় স্তরে নৈঃশব্দের শিক্ষা করতে গিয়ে ওখানকার সকলকে প্রাণায়াম ক্রিয়ার সিদ্ধি অর্জন করতেই হয়েছিল ! তবেই কোনো মানুষের মধ্যে হাঁটা-চলা-কাজকর্ম করা, বিশ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার মধ্যেও নৈঃশব্দের কৌশল রপ্ত করা সম্ভব – নাহলে যতোই সাবধানে থাকুক না কেন _মানুষ তো শব্দ করে ফেলবেই ! ওখানে (দ্বিতীয় স্তরে) দেখেছিলাম যে মানুষজন হাঁটছে – নিঃশব্দে, নিচ থেকে জল তুলে এনে পাত্রটা রাখছে নিঃশব্দে, কোনো কিছু তুলছে নিঃশব্দে_এইরকম আর কি! অনেক মানুষ এক জায়গায় রয়েছে – তাও যেন মনে হোতো যেন ওই জায়গাটাতে কেউই নাই !

যাইহোক, দ্বিতীয় স্তরের প্রাণায়াম সিদ্ধিও তৃতীয় স্তরে কাজে লেগেছিল – কারণ এর ফলে শরীরকে অনেক হালকা করা সম্ভব হয়েছিল ! এইসবের ফলে তৃতীয় স্তরের পরীক্ষায় qualified হোতে আমার মোটেই সময় লাগেনি ! দু-চারবার practice করার পরই আমি কৃতকার্য হয়েছিলাম ৷ দন্ডের উপর পাটাতন রেখে তার উপরে বসে আমি ধ্যানস্থ হয়ে গেছিলাম । এরপর আমার শরীরের আর হুঁশ ছিল না ৷ যখন শরীরে হুঁশ এলো, তখন দেখলাম ওখানকার আচার্যরা আনন্দে আমার শরীরটা নিয়ে (তখন ওনার ১১/১২ বছর বয়স) লোফালুফি করতে লাগলেন ! আমার success-এ ওনারা এতো আনন্দ করছিলেন যে সেই আনন্দ আমাকেও গভীরভাবে স্পর্শ করছিল এবং আমার ভিতরেও আনন্দের প্লাবন বয়ে যাচ্ছিলো ! ওনারা ঐরকম করতে করতেই আমাকে চতুর্থ স্তরের গুহায় পৌঁছে দিলেন ৷

চতুর্থ স্তরে পৌঁছানোর সময় ওনারা একটা পাথরের দেয়ালের পাথর সরিয়ে আমাকে অন্য একটি অন্ধকার গুহায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন ! অন্ধকার বলতে সে যে কি অন্ধকার – তা তোমাদেরকে কথায় বোঝাতে পারবো না ! একেবারে “জমাট অন্ধকার” ! ‘জমাট অন্ধকার’ বোঝো তো ? এমন‌ই এক অন্ধকার_ যা যেন হাজার হাজার বছর ধরে জমে রয়েছে, যাকে দুহাত দিয়ে ঠেলে ঠেলে সরিয়ে তবেই সামনের দিকে আগাতে পারা যায় ! কয়লাখনির গভীর খাদে যারা কাজ করেছে – তাদের এইরূপ অভিজ্ঞতা কিছুটা রয়েছে ৷ তবে যারা ধ্যানী, তাদের অনেকেরই এই জমাটবাঁধা অন্ধকারের সঠিক ধারণা রয়েছে ৷ ধ্যানের গভীরতায় সাধকের অন্তঃচক্ষুতে এইরকম অন্ধকারের অনুভূতি হয় – যে অন্ধকারকে ঠেলে ঠেলে সরিয়ে আগাতে হয় !
একটুকু আলোর সন্ধানে সেই অগ্রসর ! ওই গুহায় বাস্তবেই সেইরকম অন্ধকার ছিল ! আমি প্রথমটা বুঝতেই পারছিলাম না যে, এইরকম অন্ধকার natural ভাবে সৃষ্টি হোলো কি করে? ওরা কি গুহার দেওয়ালগুলো মিশমিশে কালো রং করেছে নাকি ? গুহাটা ছোটো না বড়, ভিতরে কতজন লোক রয়েছে এবং তারা কে কোথায় রয়েছে – এইসব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না !

অনেকক্ষণ পর চোখের এবং মনের একটা স্থিতিশীল ভাব আসতেই – অনুভবের সাহায্যে অনেককিছু বুঝতে পারছিলাম। বুঝলাম যে ওই ঘরে আমার মতো অনেকেই রয়েছে, ওখানে যিনি আচার্য ছিলেন, উনি আমাকে কানে কানে অত্যন্ত মৃদুস্বরে বললেন – ” নৈঃশব্দের মধ্যেও শব্দ আছে ৷ তুমি সেই শব্দকে খুঁজে বের করো !” এই কথা কানে কানে বলেই আচার্য অদৃশ্য হয়ে গেলেন ৷ আসলে হয়তো পাশেই কোথাও উনি ছিলেন – কিন্তু দেখা তো যাচ্ছিলো না ! আমি আমার নিজের হাত-পা বা শরীরটাকেই দেখতে পাচ্ছিলাম না, দূরের জিনিস কি করে দেখবো ? শুধু অনুভব করছিলাম – ওই ঘরে আরো অনেকে রয়েছে !

যাইহোক, আচার্যের শিক্ষালাভ করে মনঃসংযোগ করতে গিয়েই দেখি – “ওরে বাবা! এ কি! আমার নিজের (প্রাণায়ামসিদ্ধ হ‌ওয়া সত্বেও) নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের বিকট আওয়াজ প্রকট হোতে লাগলো ! আমার শরীরের হৃৎপিন্ডের ধকধকানি যেন বজ্রপাতের মতো মনে হোতে লাগলো ! শিরা-ধমনীর মধ্যের রক্ত চলাচলের ‘দ্রিম্ দ্রিম্’ ধ্বনি শুনে যেন পাগল হয়ে যাবার যোগাড় হচ্ছিলো! আমি বুঝতে পারছিলাম ওখানে যারা এই practice-এর মধ্যে রয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকেই এই অসহ্য ব্যাপারটা নিতে পারছিল না ! তাই অনেকেই মুর্ছিত হয়ে পড়ে যাচ্ছিলো ! আর সঙ্গে সঙ্গে ওখানকার আচার্যরা তাকে বাইরে বের করে নিয়ে যাচ্ছিলেন !

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি বুঝতে পারছিলাম যে- ওই ঘরের সকলকেই একে একে বাইরে বের করে নিয়ে যাওয়া হলো ৷ কিন্তু আমার শরীরের অভ্যন্তরে সৃষ্ট সমস্ত বিকট (বজ্রপাতের মতো) শব্দ যা আমার মস্তিষ্ককোষগুলো ছিঁড়ে ফেলার জোগাড় করছিল – সেগুলি ধীরে ধীরে শান্ত হোতে শুরু করলো ! এরপর আমার হৃৎপিণ্ডের শব্দ, রক্ত চলাচলের শব্দ, নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ সবই স্থিমিত হয়ে গেল এবং আমি ধ্যানের গভীরে এমনভাবে ডুবে গেলাম যে, এক শান্ত-সমাহিত-চিত্তের নিস্তরঙ্গ অবস্থায় চলে গেলাম ৷

এই অবস্থা কাটতেই – দেখলাম ওই ঘরে অনেক আলো ! ওখানকার আচার্যরা আমাকেই পূজা করতে লাগলো, আমাকে একটা আসনে বসিয়ে নানারকম উপাচারসহ অর্চনা করলো ৷ এরপর আমাকে ওরা ছেড়ে দিল – পরের স্তরে যাওয়ার জন্য ৷

[এত দূর পর্যন্ত কথা বলার পরই – সিটিংয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল ৷ এটা দেখে গুরুমহারাজ চুপ করে গেলেন এবং তারপর বলতে লাগলেন – ]

মা (জগদম্বা) আমাকে আর বলতে দিলেন না ৷ আমার কথা বলার যে flow ছিল সেখানে একটা vaccum সৃষ্টি হয়ে গেল ! এইরকমভাবে অনেকবার চেষ্টা করেছি – কিন্তু উচ্চ আধ্যাত্মিক তত্ত্ব অথবা হিমালয়ের অনেক রহস্য বলতে গিয়েও বলতে পারিনি ! পৃথিবী গ্রহে এইসব কথা বলার মতো বা শোনার মতো উপযুক্ত অবস্থা এখনো পর্যন্ত তৈরি হয়নি ! পূর্ণজ্ঞানী মহাপুরুষরা হয়তো এগুলো বলতে পারেন কিন্তু বললে তো শুধু হবে না – শ্রোতাকেও শোনার জন্য‌ও উপযুক্ত হোতে হবে _ তবে তো আধ্যাত্মিক মিলন হবে ৷ গুরুর জিহ্বা যেন লিঙ্গ এবং ভক্তের (শিষ্যের) কর্ণ যেন যোনী – এইভাবে ব্রহ্মবাক্যের আদান-প্রদানের মাধ্যমে গুরু-শিষ্যের মিলন হয় ৷ কিন্তু পাত্র উপযুক্ত না হোলে গুরুর দান নিষ্ফল হয় ! উপযুক্ত গুরু কখনোই অপাত্রে দান করেন না ! কারণ তা করতে গেলে – তাতে কোনো কাজও হয় না – সুতরাং তাঁরা তা করবেনই বা কেন ?

দ্যাখো, এখানে প্রথম স্তরেই শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল – নির্বাক হবার, নৈশব্দ বজায় রাখার ! কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই অনেকে বক্-বক্ করতে শুরু করলো – ফলে আমার কথার flow-টা কেটে গেল ! তবে আমার চেষ্টা থেকেই যাবে ৷ আমি সুযোগ পেলেই এই ধরনের কথা আবার বলার চেষ্টা করবো ! আমার যে মায়ের (জগদম্বা) কাছে permission নেওয়া আছে !