জিজ্ঞাসু—উপাসনা বা সাধনার জন্য সত্যিই কি কোন মূর্তির প্রয়োজন আছে ?

গুরুমহারাজ— ‘উপাসনা’ বলতে নিশ্চয়ই ঈশ্বর উপাসনার কথা বলতে চাইছ। ‘সাধনা’ কথাটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা যায়। কোন কিছু ‘সাধা’ বা পুনঃ পুনঃ অভ্যাসই সাধনা আর যে সাধে সেই সাধক। যেমন—সঙ্গীত সাধনা, নৃত্য সাধনা ইত্যাদি বহুবিধ সাধনা রয়েছে। যে কোন অনিত্যবস্তু লাভের জন্যও সাধনা করা যায় আর সাধ্যবস্তু লাভও হয়। তবে যা নিত্য তা লাভের জন্য সাধনাকেই ঈশ্বর সাধনা বা অধ্যাত্ম সাধনা বলা হয়। অনিত্যবস্তু বললাম কিন্তু নিত্যবস্তু বলা ঠিক নয় কারণ যা নিত্য তা বস্তু নয়, বিষয় নয়, ব্যক্তিও নয়। তাই ঈশ্বরকে ‘নিত্য’ হিসাবে ধরলে কিন্তু তাঁর ওপর ব্যক্তি বা বস্তু, বিষয় এসব কিছু আরোপ করা যাবে না। উপনিষদ্ ‘ব্রহ্ম’ শব্দটি প্রয়োগ করেছে নিত্য, শাশ্বত, সনাতন বোঝাতে—যা অনাদি, স্ব-মহিমায় উদ্ভাসিত, স্ব-প্রকাশে প্রকাশমান, অব্যক্ত কিন্তু তাতে ব্যক্ত হবার সূত্র বিদ্যমান রয়েছে। অনেকে ঈশ্বরকে ব্রহ্মের সাথে গুলিয়ে ফেলে। অব্যক্ত ব্রহ্ম যখন ব্যক্ত হ’ল বা অস্ফুট ব্রহ্ম যখন স্ফুট হল তখন যে আকার বা রূপ এল, এটাকে বোঝাতে ‘ঈশ্বর’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। অরূপ যখন রূপ পরিগ্রহ করল সেটাই ঈশ্বর। এই অর্থে ঈশ্বরের রূপ বর্ণনা করা যায়। ব্রহ্মের প্রথম স্ফোট্ তো ‘নাদ’। তাই নাদব্রহ্ম বা ‘প্রণব’-কে ঈশ্বরের রূপ হিসাবে ধরা হয়। এইভাবেই অস্ফুট ব্রহ্ম থেকে স্ফুট ব্রহ্ম, ব্রহ্ম থেকে ব্রহ্মনাদ, বিন্দু থেকে বিসর্গ বিস্তারলাভ করেছে আবার বিপরীতক্রমে স্ফুট অস্ফুটে, নাদ ব্রহ্মে, বিসর্গ বিন্দুতে লয় হচ্ছে। এটাই বিন্দু-বিসর্গের খেলা। আর এর মধ্যেই অনন্তকোটি ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় হয়ে চলেছে। পৃথিবীগ্রহের আবির্ভাব হচ্ছে, পৃথিবীতে প্রাণধারণের উপযোগী আবহাওয়া তৈরী হচ্ছে, পৃথিবীতে প্রাণের বিবর্তন চলছে, মানুষ শক্তিমান হয়ে অপরকে dominate করতে চাইছে কিন্তু পরিণতিতে আবার মহাকাল সকলকে গ্রাস করে নিচ্ছে নতুন কোন সৃষ্টির আনন্দে।

নিত্য আর অনিত্যের সংজ্ঞা শুনলে—এটা আগম বললাম। এবার ‘নিগম’ বলছি শোন। আমরা অর্থাৎ পৃথিবীর মানুষজনেরা পৃথিবীকে দেখছি ৫০০-৬০০ কোটি বছরের একটা গ্রহ, যা সৌরমণ্ডলের অন্তর্গত। সৌরমণ্ডল আবার আরও বড় কোন মণ্ডলের অন্তর্গত, এইভাবে বাড়তে বাড়তে কোথায় শেষ তা এখনও মহাকাশ বিজ্ঞানীরা জানে না। তাহলেই ভাবো যে, material science এখনও কত নিচু স্তরে রয়েছে বা কতটা limited জ্ঞান নিয়ে কাজ করছে। কাজেই বিজ্ঞানের উন্নতি নিয়ে বেশী গর্ব করে আহাম্মকেরা, প্রকৃত বিজ্ঞানীরা কিন্তু ব্যাপারটা জানেন, তাঁরা বলেন, ‘বিশাল জ্ঞানসমুদ্রের তীরে আমরা এখন নুড়ি-পাথর কুড়োচ্ছি মাত্র। যাইহোক এই যে বিশাল ব্রহ্মাণ্ড বা Universe-এর কল্পনা করা হচ্ছে যার মধ্যে কত সৌরমণ্ডলের কত গ্রহ রয়েছে। তবে সেখানে উন্নত বা অনুন্নত প্রজাতির জীব রয়েছে কিনা এসব এখনও অজানা। সেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটা অংশ পৃথিবী, তার জীবসমূহের মধ্যে আমরা অর্থাৎ মানুষেরা উন্নত প্রজাতি। আমরা এই জগৎ সংসারকে দু’ভাবে দেখছি – (১) এই জগৎ সংসারের মধ্যে থেকে তার বাহ্যিকরূপ এবং সেই রূপের বিশ্লেষণের মাধ্যমে অর্থাৎ biology, physics, chemistry ইত্যাদি বিজ্ঞানের শাখাসমূহের আবিষ্কারের দ্বারা জড়জগৎ ও জীবজগতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রহস্যের কিনারা করতে চাইছি, আবার economics, political science, history, geography ইত্যাদি পঠন-পাঠনের দ্বারা সমাজের কল্যাণ করতে ও পৃথিবীর আদিকাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশ-কাল-পাত্রের সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করছি। জ্ঞানলাভের বা জ্ঞান অন্বেষণের এই পথটাই গোটা পৃথিবীতে অধিকতর গ্রহণযোগ্য হয়েছে, ফলে গড়ে উঠছে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, গবেষণাগার, লাইব্রেরী ইত্যাদি। জ্ঞানতাপস ও বিজ্ঞান সাধকরা নিয়ত জগৎ সংসারের আরও গূঢ় রহস্য জানার জন্য গভীর সাধনায় মগ্ন রয়েছেন। সাধারণ মানুষ তাঁদের আবিষ্কারের সুফল আর কুফল দু’টোই ভোগ করছে। একটায় কিছুটা সুখভোগ হচ্ছে অপরটায় ভোগান্তি।

(২) আর একদল জ্ঞানতাপস তাঁরা জগৎসংসারের বাহ্যিক রূপের দিকে না চেয়ে নিজ অন্তর্জগতে প্রবেশ করলেন। অর্থাৎ বাহ্যত যে জগৎ দেখা যাচ্ছে তা অন্তশ্চেতনাতেও রয়েছে এই বোধে ধ্যানের গভীরে চিত্তবৃত্তি নিরোধ করে অন্তরের অন্তস্তলে ডুব দিলেন তাঁরা। আর কি আশ্চর্য ! ডুবুরিরা যেমন সাগরের তলা থেকে মণিমুক্তা কুড়িয়ে কুড়িয়ে আনতে পারে, তেমনি এঁরা ধ্যানের গভীরতায় অন্তর্লীন হয়ে জগৎ, জীবন এবং জীবের রহস্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হলেন। কেউ একটু, কেউ আর একটু—এই ভাবে “এক এক করে হল অনেক”। সৃষ্টি হ’ল এক একটি দর্শন শাস্ত্রের, উদ্‌গীত হ’ল বেদ, যার সারভাগ উপনিষদ্। আর সেই জ্ঞানতাপসদের জীবনগুলি পরিবর্তিত হ’ল মহাজীবনে। “অধ্যাত্মবিদ্যা অর্থাৎ অধীত আত্মবিদ্যা, আত্মসাক্ষাৎকারের দ্বারা জগৎ সংসারের রহস্য উন্মোচিত হল। এই যে সাধনা অর্থাৎ অধ্যাত্ম-সাধনা এটা ভারতবর্ষের নিজস্ব পদ্ধতি। বহুকাল পূর্ব হতেই এখানকার আচার্যরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এই বিদ্যার বিস্তার করার চেষ্টা করে আসছেন। অনেকে সফল হয়েছেন, অনেকে বিফল। এর মধ্যে ভারতীয় যোগসাধনা এবং তন্ত্রের কিছু অভিচারক্রিয়া বহু পূর্ব হতেই বহির্বিশ্ব গ্রহণ করেছিল। স্বামী বিবেকানন্দের ইউরোপ-আমেরিকা গমনের পর থেকে প্রকৃত অধ্যাত্ম বিদ্যার সাথেও পাশ্চাত্যের আধ্যাত্মিক মানুষেরা পরিচিত হয়েছে।

এদিকে কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই ভারতবর্ষে ধনসম্পদের লোভে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের খোঁজে দলে দলে বিদেশীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আসতে শুরু করেছিল। এদের সাথে সাথে তাদের নিজস্ব দর্শন, তাদের সংস্কৃতিও ভারতে ঢুকে পড়েছিল। এবার যখন তারা এদেশের শাসনকর্তা হয়ে বসল, তখন স্বভাবতই তাদের cul- ture, তাদের philosophy, তাদের জীবনযাত্রাও এ দেশের মানুষের মধ্যে প্রবেশ করল। কোন কোন ক্ষেত্রে জনজীবনে স্বাভাবিকভাবে এগুলি প্রভাব ফেলল, কোন কোন ক্ষেত্রে জোর করে প্রবেশ করানো হোল। আর তখন থেকেই ভারতবর্ষের ধর্মজগতে সংঘাত শুরু হ’ল। এর আগে ভারতবর্ষে ধর্মমত নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়নি। আজ থেকে প্রায় ২৫০০ বছর আগে যখন ভগবান বুদ্ধ ধর্মভেরি বাজিয়ে ধর্মবিজয় শুরু করলেন, ভারতবর্ষের সনাতন ধর্মীরা তাঁকে accept করেছিলেন। তথাকথিত হিন্দু-পুরাণে বুদ্ধও একজন স্বীকৃত অবতার, যদিও বুদ্ধকে বেদবিরোধী, মূর্তিপূজার বিরোধী এসব বলা হয়। তাহলেই ভাবো একবার — ধর্মজগৎ এমনই, এখানে উদারতা, বিশালতা, গ্রহণযোগ্যতা—এটাই রয়েছে, বিরোধ-হিংসা রক্তক্ষয়ের স্থান নেই। ভারতবর্ষে কি হিন্দুদের সঙ্গে বৌদ্ধদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়নি—হয়েছে কিন্তু তা বুদ্ধের মৃত্যুর বহুবছর পরে, এটা হয়েছে রাজন্যবর্গের মধ্যে অথবা যেখানে উভয় ধর্মমতের মধ্যেই আচার- সর্বস্বতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গুরুকুলের মধ্যে তর্ক হয়েছে, বিচার-সভা হয়েছে, আলোচনা সভা হয়েছে, মত বিনিময় হয়েছে কিন্তু রক্তপাত- সংঘর্ষ হয়নি।

এই যে জগৎ পরিদৃশ্যমান—এটা স্থূল জগৎ। এছাড়া রয়েছে সূক্ষ্মজগৎ এবং কারণজগৎ। সূক্ষ্মজগতের ধারণা তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে রয়েছে কিন্তু কারণজগতের কোন ধারণাই নেই। ফলে ধর্মজগতের সূক্ষ্ম রহস্যের কথা তারা বুঝতে চায় না বা বুঝতে পারে ও না। আর বুঝতে না পেরে তর্ক করে, মারামারি করে। যে যেটা বুঝেছে, সেটাকেই প্রতিষ্ঠা করতে চায়—এটাই তো ঘটে চলেছে। উপনিষদে ব্রহ্মকে বলা হয়েছে “অবামনসগোচরম” –অর্থাৎ যা বাক্য ও মনের অতীত। সাধারণ মানুষ তো মন দিয়েই চিন্তা করে আর বাক্য দিয়ে তা প্রকাশ করে, হাত দিয়ে লেখে, তাহলে মানুষের অবাঙমনসগোচর ব্রহ্মের ধারণা কি করে হবে ? এইখানেই তো বিরাট ধাঁধা, বিরাট ফাঁকি হয়ে যাচ্ছে। আর এখানেই অধ্যাত্মবিজ্ঞানী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সহজ সমাধান—‘তিনি শুদ্ধ মনের গোচর।’ এবার প্রশ্ন—“শুদ্ধ মন” ব্যাপারটা কি ? উত্তরে এসে যাচ্ছে সাধনার প্রয়োজনীয়তার কথা, সংযম, নিয়ম, নিষ্ঠা পালনের কথা। এবার তুমি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। চাকুরি বা ব্যবসায় উন্নতি করে জীবনে ভোগবাদে বিশ্বাসী। তোমার জীবনে discipline নেই, কর্মে নিষ্ঠা নেই, সংযম নেই, সাধারণ মানুষ বা জীবের দুঃখে প্রাণ কাঁদে না, লোকমান্যতার জন্য কিছুটা ‘দান’ করে থাকো, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সবটাই কাটছে অর্থ রোজগার, ভোগবিলাস, সংসার-পরিজন- প্রতিপালন, সঞ্চয় ইত্যাদির মধ্যে। আর তুমি অধ্যাত্মজগতের সুগভীর রূপরেখা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছ, মহাতাপস, মহাজ্ঞানী, মহাযোগী, মহাত্যাগীদের দর্শন-চিন্তাসমূহের বিরোধ করছ—কি লজ্জার কথা ! কি বোকামি ! এটা ন্যাকামি আর পাকামি। আমার কাছে এরকম ব্যক্তি এলে ‘টাইট’ হয়ে যায়, কিছুক্ষণ “ফরফর্” করে তারপর মাথা নিচু করে চুপ করে বসে থাকে অথবা উঠে চলে যায় আর আসে না। তবে দেখেছি এরা কিন্তু আমাকে ভুলে যায় না—খোঁজ খবর রাখে। অনেকে এসে বলে, “সেই যে আমার সাথে এসেছিল, আপনার সাথে খুব তর্ক করেছিল, সে মাঝে মাঝেই বলে— ‘তোদের আশ্রমের গুরুদেব কেমন আছে রে !’ এটাই অধ্যাত্ম। যে এখানে সহযোগী হবে তারও কল্যাণ হবে, যে বিরোধ করবে তারও কল্যাণ হবে। কারণ প্রকৃতপক্ষে তো বিরোধ নেই, কোন দ্বৈতই নেই শুধু ‘সত্তা’ রয়েছে যা নিত্য, শাশ্বত, সনাতন ।

কারণজগৎ, সূক্ষ্মজগৎ ও স্থলজগতের ক্রমোন্নতির জন্য ঋষিরা তিনপ্রকার সাধনার কথা বলেছিলেন—নিরাকার সাধনা, প্রতীক সাধনা ও প্রতিমা সাধনা। তুমি-আমি এই স্থূলজগতে বাস করছি, স্থূল সুখভোগে সর্বদা মত্ত, স্থলশরীরের যত্নে ব্যস্ত। … এবার আমি যদি নিরাকার সাধনা করতে চাই তাহলে সেটা কি আহাম্মকি হবে না ? আরে বোকা সূক্ষ্মজগৎ বা কারণজগৎ সম্বন্ধে আগে ধারণা হোক, তারপর তো উন্নততর সাধনে যাবি। নগ্ন নারীমূর্তি দেখলে মনে প্রতিক্রিয়া জাগে—শরীরে শিহরণ হয় যার, সে আবার মূর্তির বিরোধ করে—এটাই আহাম্মকি ! এই স্ব-বিরোধিতাই মানুষকে পিছনে টেনে রাখছে। একটা কবিতায় লিখেছিলাম—“এ যেন ধর্ষণ শেষে কালীমন্দিরে মাথা ঠোকা। বলা–মা জগদম্বে প্রসন্ন হও!” যাইহোক মূর্তির যে মানুষের মনে একটা ভয়ানক প্রতিক্রিয়া রয়েছে তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই কিন্তু এই মূর্তি যদি তার স্বভাবের অনুকূল হয় তাহলে তা মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে। কোন দেব-দেবী বা মহাপুরুষের মূর্তির সামনে কোন মানুষ দীর্ঘক্ষণ কাটালে তার মনে দেবভাব বিকশিত হয়। আর স্বভাব অনুযায়ী নগ্ন-অশ্লীল মূর্তি নিয়ে নাড়াচাড়া করলে তার মন অধোগামী হয়—এটা তো practical !

তাই সাধনার জন্য ব্যক্তির স্বভাবের অনুকূল মূর্তির প্রয়োজন আছে নাহলে অনেকসময় ভয়ঙ্কর ফল লাভ হয়, সাধন-বৈপরীত্যঘটে যায়। পিশাচসিদ্ধি বা ডাকিনীবিদ্যা লাভের জন্য উৎকট মূর্তির উপাসনা করা হয়। আর বিভিন্ন ঘৃণ্য পদার্থ উপাচার হিসাবে ব্যবহার করা হয়। ফলে এইসব সাধনায় সিদ্ধ সাধকদের মারণ, উচাটন, সম্মোহন ইত্যাদি ধংসাত্মক শক্তিলাভ হয়। ভারতবর্ষে এই বিদ্যা তো রয়েছেই, আফ্রিকা মহাদেশে ‘ভুডু’ বা ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে ‘Satanic worshiper’-রা এই ধরণের সাধনা করে থাকে । এরা সকলেই বীভৎস মূর্তির উপাসনা করে। শোনা যায় বিভিন্ন দেশনেতা বা রাজনৈতিক নেতারাও শক্তিলাভের আশায় এই ধরণের উপাসনা করেন বা করতেন। জার্মানীর ‘হিটলার’ও এই ধরণের Satanic worshiper ছিলেন। এঁরা উল্টানো ‘স্বস্তিকা’ চিহ্ন বা উল্টানো ‘cross’ চিহ্ন ব্যবহার করেন। ফলে এঁদের আধ্যাত্মিক বা আত্মিক উন্নতি হয় না—জাগতিক শক্তিলাভ হয়। কথিত আছে যে, হিটলারের সম্মোহনী সিদ্ধাই আয়ত্তে ছিল। কারণ তৎকালীন জার্মানীর অন্য নেতারা হিটলারের সব কাজ বা সব সিদ্ধান্ত সমর্থন করত না। কিন্তু হিটলারের সামনে এলে সবাই চুপ করে যেত। এমনিতেই মানুষ hypnotised হয়েই রয়েছে—দুর্বলতা আর অজ্ঞানতার দ্বারা। তাই শারীরিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে বা রাজনৈতিকভাবে শক্তিমান হলেই তার কাছে সাধারণ মানুষ গেলে কুকুর ছানার মত “কেউ কেঁউ” করে ; মাথা তুলে চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। এটা সততার অভাব, সৎ সাহসের অভাব। আর এটা আসে অজ্ঞানতা ও দুর্বলতার জন্য। দুর্বল, ভীরু, কাপুরুষরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে না, অত্যাচারের প্রতিকার করতে পারে না, অদৃষ্টের দোহাই দেয় আর ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে চুপ করে বসে থাকে।

হিটলারের নাকি গণসম্মোহন করারও ক্ষমতা ছিল, ফলে উনি জনসভায় বক্তৃতা করার সময় হাত দিয়ে বিভিন্ন মুদ্রা বা আঙ্গিক ব্যবহার করতেন। যাইহোক এখনও ইউরোপে ঐ সমস্ত satanic worshiper সংস্থার বিভিন্ন শাখা রয়েছে যেখানে বীভৎস মূর্তির পূজা হয় এবং পাখির রক্ত, নখ, হাড় ইত্যাদি উপাচার হিসাবে নিবেদন করা হয়। আর উপাসনার পোশাক, ভঙ্গিমাদিও উৎকট ধরণের বা বীভৎস ধরণের হয়। আশ্চর্যের ব্যাপার দ্যাখো আমাদের মাকালীর মূর্তি— –যা নগ্ন আর যা বহুকাল আগে থেকেই ভারতবর্ষে পূজিতা হয়ে আসছে। মাকালীর নগ্নমূর্তি বিভিন্নভাবে পূজিতা হয়। ঘরে ঘরে ক্যালেণ্ডারে ঝুলিয়ে রাখা হয়, কিন্তু তা দেখে মানুষের মনে কামোদ্রেক হয় না। আগে আগে পাশ্চাত্যের দেশগুলো এই মূর্তির সমালোচনা করতো, বলতো মানসিক বিকৃতি থেকে এই ধরণের মূর্তি কল্পনা করা হয়েছে, যা আদিমতা বা অসভ্য জাতির পরিচায়ক। অতি সম্প্রতি আর তা বলছে না, আমি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পণ্ডিতমহলে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেছি। দেখেছি প্রকৃতপক্ষে যারা পণ্ডিত তারা নগ্ন কালীমূর্তি পূজার ব্যাপারটাকে বলছে ‘সাহসিকতা’ বা boldness! মা কালীর যে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সেটা বুঝে ওরা বলল জগৎ প্রসবিনী মাতা (বিশ্ব প্রকৃতি), যেখানে সবসময় (প্রসব) সৃষ্টি হয়ে চলেছে সেখানে আবরণের অবকাশ কোথায় ? এই বিরাট রূপের এভাবে এতকাল ধরে পূজা করেছে ভারত–কি হিম্মত, কি সুগভীর দৃষ্টিভঙ্গী, কি boldness !

কথা হচ্ছিল মানবমনে মূর্তি বা প্রতীকের ভূমিকা নিয়ে। লক্ষ্য করবে আমাদের দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের যে প্রতীক চিহ্ন ব্যবহার করা হয়, সেগুলিও তাৎপর্যপূর্ণ–এর দ্বারাও মানুষের মনোজগতে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করা হয়। তামসিক ব্যক্তিদের প্রিয় রঙ লাল, তাই যদি কোন দল ‘লাল’ রঙের উপর বেশী জোর দেয় তো সমাজের বেশীর ভাগ মানুষ তাতে আকৃষ্ট হবে, যেহেতু মানুষের মধ্যে বেশীরভাগ মানুষই তামসিক। ইসলামের চাঁদ-তারাই মার্কস- দর্শনে কাস্তে-তারায় পরিণত হয়েছে—কোন কোন গবেষক এটা বলেছে। হয়তো এটা নিয়ে অনেক বিতর্ক চলতে পারে কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, কার্লমার্কস জার্মানীর মানুষ, পড়াশোনা বা গবেষণা ইংল্যাণ্ডে। সমগ্র ইউরোপে তখন নবজাগরণ বা রেনেসাঁস-এর জোয়ার বইছে। তৎকালীন সমাজ দ্রুত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মনৈতিকভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। শিক্ষিত মানুষেরা চার্চের অনুশাসন থেকে বেরিয়ে প্রোটেষ্ট্যাণ্ট হচ্ছে, লুথারিয়ান —কেলভিল পন্থী হচ্ছে। সে এক সময় গেছে ইউরোপে ! খ্রীষ্টান চার্চগুলোর ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অনুশাসন, পাদরিদের অনাচার ও ভণ্ডামি দেখে শুধু কার্লমার্কস কেন তৎকালীন বেশীরভাগ শিক্ষিত যুবকদের মনে ধর্মের প্রতি একটা বীতশ্রদ্ধ ভাব এসেছিল। কিন্তু ইংল্যাণ্ডে বিভিন্ন Library-তে পড়াশোনা করাকালীন বা গবেষণা করার সময় মার্কস কোরানশরীফ বা হাদিস শরীফ সহ ইসলাম দর্শনের উপরে লেখা বিভিন্ন সংকলন পড়াশোনা করেছিল। ফলে ইসলাম ধর্মের একটা প্রভাব মার্কস এর উপর পড়ে। ইসলামের Pan-Islamic Brotherhood ব্যাপারটা ওর খুবই ভালো লাগে। ওখানে সবাইকে “ভাই” বলে সম্বোধন করা হয়, ও শুধু তা একটু পাল্টে ‘Comrade’ বা সাথী বলে সম্বোধন করল। আর “দুনিয়ার মুসলিম এক হও”-টা করে দিল “দুনিয়ার মজদুর এক হও !” চাঁদ-তারা symbol-টাও ওর খুব ভালো লেগেছিল। এমনই co-incidence যে, পরবর্তীকালে বাঁকা চাঁদে বাঁটযুক্ত হয়ে ওটা কাস্তে-তারায় রূপান্তরিত হয়েছে। এবার যদি কোন কারণে communist-রা রঙ বা চিহ্ন বদল করে তাহলে সমাজের একটা বিশেষ শ্রেণীকে আর পাশে পাবে না।

তেমনি জাতীয় কংগ্রেসের পতাকা ভারতের জাতীয় পতাকার প্রায় সবটাই নিয়ে তৈরী। জাতীয় পতাকার রঙ বা তাৎপর্য যেহেতু তৎকালীন বিদগ্ধ পণ্ডিতেরা বসে সিদ্ধান্ত করেছিল তাই এগুলির গভীর তাৎপর্য ও প্রভাব তো রয়েছেই মানুষের মনোজগতে। বর্ত্তমানে কংগ্রেসের হাত চিহ্ন শুধু শ্রমজীবী মানুষের হাত নয়, ইসলাম ধর্মজগতে “আল্লার হাত” বলে যে কথা আছে সেখান থেকে symbol-টা নেওয়া । কিছুদিন আগে পর্যন্ত বয়স্ক মানুষরা কংগ্রেস পার্টিকেই ভারতের একমাত্র পার্টি বলে মনে করতো। BJP-র symbol পদ্ম। এটা ভারতের জাতীয় ফুল, তাই এর প্রতি দুর্বলতা থাকা মানুষের স্বাভাবিক, আর গেরুয়া রঙ সত্ত্বগুণের প্রতীক। তাই দেখবে সত্ত্বগুণী মানুষ, সাধুসন্ত, বিচারশীল-শিক্ষিত-ভদ্র মানুষের BJP-র প্রতি একটু দুর্বলতা রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করতে হলে BJP নেতাদের উচিত কোন দেবী মূর্তির বা সুন্দরী নারী মূর্তির হাতে পদ্ম ধরানো। এই যে কথাগুলো বলছি এগুলো মনস্তত্ত্ব বা Psychology-র বিষয়।তোমরা হয়তো ভাবছ—এমনটা আবার হয় নাকি ! কিন্তু আমি বলছি এমনটাই হয়,শুধু রঙ এবং symbol বদলে দিয়ে মানুষের মনোজগতে প্রভাব ফেলা যায়।

তবে এসব কথা যা বললাম সবই চেতনায় অনুন্নত মানুষের জন্য। চেতনায় অনুন্নত বলতে অশিক্ষিত গ্রামে বাস করে—এসব ভেবো না। শিক্ষিত, ধনী, সমাজনেতা – সমাজের কর্তাব্যক্তিরাও চেতনায় অনুন্নত হতে পারে, বরং এদের সংখ্যাই বেশী। সাধারণ অশিক্ষিত গ্রামের মানুষ তবু খানিকটা সহজ-সরল। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন—“এদের দেবভাব”। জানবে পৃথিবীগ্রহে ৯০ ভাগ লোক এখনও চেতনায় অনুন্নত। মানুষ কি ঠিক ঠিক মানুষ হতে পেরেছে ? মানুষ যেদিন ‘মানুষ’ হয়ে উঠবে সেদিন পিতারা বলবে আমার ছেলেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার, ব্যারিষ্টার করবো না, তারা বলবে আমার একমাত্র ইচ্ছা আমার ছেলেটা যেন ‘মানুষ’ হয়। ছেলেরা শিক্ষিত হয়ে তার নামের আগে-পরে একরাশ ডিগ্রি লাগাবে না বরং নিজেকে একজন humanist হিসাবে ভাববে আর লোকের কাছে নিজেকে human বলে পরিচয় দেবে। মানুষ তো মানুষেরই জন্য ! মানুষ মানুষকে বঞ্চনা করছে, লাঞ্ছনা করছে, শোষণ করছে –এর থেকেই কি মানুষের চেতনার স্তর বোঝা যায় না! বিবর্তনে এককোষী প্রাণী থেকে মানুষ শরীর পর্যন্ত আসতে কতকোটি বছর লেগে গেছে, এবার মানুষ শরীর পেয়েও চেতনায় ঠিক ঠিক মানুষ হতে গেলে আবার কতকোটি বছর লাগবে কে জানে ! কিন্তু এই উন্নতির উপায় আছে, মানুষ যদি নিজে আন্তরিকভাবে তা চায় তবেই সে তা পাবে। একেই বলা হচ্ছে “মুমুক্ষুত্বম্”। মানুষের মধ্যে ঠিক ঠিক ব্যাকুলতা জাগলে যে কোন ভাবে সদগুরু এসে তার হাতটি ধরেন। আর তিনি নানান প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে মানবের চেতনার উন্মীলন ঘটান এবং চেতনাকে চৈতন্যময়তার দিকে নিয়ে যান। মানুষ অজ্ঞানী, ফলে সে অজ্ঞানান্ধকারে রয়েছে, একথা যতটা সত্য, ‘মানুষ পূর্ণ’ ‘মানুষই ঈশ্বর —এ কথাগুলিও ততটাই সত্য। যতক্ষণ প্রচেষ্টা নেই, প্রযত্ন নেই, গড্‌ডালিকাপ্রবাহে ভাসানো জীবন, জাড্য, আলস্য, প্রমাদ, বিষাদগ্রস্ততা জীবনকে গ্রাস করেছে ততক্ষণ প্রথম দলে। আর যেমনি উৎসাহ, প্রচেষ্টা, প্রযত্ন, ব্যাকুলতা, নিষ্ঠা, সংযম, অধ্যবসায়, ধৈর্য, জীবনে যোজনা হল অমনি তুমি আলোর পথের যাত্রী। গভীর অমানিশার মধ্যেও এক চিলতে আলোর সরু রেখা পথ দেখাতে দেখাতে জ্যোতির্ময় রাজ্যে তোমাকে প্রবেশ করিয়ে দেবে। আর সেখানে পৌঁছে দেখবে –“আরে একি ! আমি নিজেও তো জ্যোতির্ময় !” প্রকৃতপক্ষে এটাই সত্য। এতদিন তুমি নিজেকে অজ্ঞানী, অন্ধকারাচ্ছন্ন ভেবে বসেছিলে ফলে তুমি তাই ছিলে। এখন তুমি নিজেকে জ্যোতির্ময় ভাবছ—তাই তুমি সত্যিই জ্যোতির্লোকের মানুষে পরিণত হয়েছ। সদগুরু তোমার ভাবজগতের পরিবর্তনটিই ঘটিয়ে দেন। আর শিষ্য সেই পরিবর্তিত ভাবনায় ভাবিত হতে হতে অর্থাৎ নিগূঢ় সাধনার দ্বারা নতুন রূপ পরিগ্রহ করে। এই ক্রমই চলেছে গুরুপরম্পরায়, যুগ হতে যুগান্তরে। চরৈবেতি—চরৈবেতি চরৈবেতি ৷৷