জিজ্ঞাসু—আমি একটা কবিতা লিখেছি ‘গামছা’ নিয়ে, আপনাকে পড়ে শোনাব। (ছেলেটি পড়ে শোনাল) ।
গুরুমহারাজ–বাঃ ভালোই তো লিখেছিস। প্রথম লাইনটা যেন কি—“তোকে দিয়ে সবে গা মোছে, তাই গামোছা তোর নাম দ্যাখ সবাই হাসছে, কিন্তু আমি হাসিনি। আমার ভালোই লেগেছে। যাইহোক কিছু তো লিখেছিস, ওরা যারা হাসছে তারা তোর মতও হয়তো লিখতে পারবে না। তুই দুঃখ করবি না, আরও লেখ আবার যখন আসবি কবিতা লিখে নিয়ে আনবি। আমাকে পড়ে শোনাবি কেমন !
এই যে তোমরা ওর কবিতা শুনে হাসলে, এটিও সাহিত্যে একটি রস। পঞ্চরসের ব্যবহার রয়েছে সাহিত্যে—বীর, করুণ, শান্ত, হাসা আর বীভৎস। এরমধ্যে হাস্যরসও তো একপ্রকাররস। প্রাচীনকাল থেকে যে সমস্ত সাহিত্য চলে আসছে সেখানেও স্থানে স্থানে হাস্যরস রয়েছে। যদি ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ মনোযোগ দিয়ে পড় তাহলে মাঝে-মাঝেই আত্মস্থ হবে আবার মাঝে মাঝে আপন মনেই হেসে উঠবে ঠাকুরের কথার পরিবেশন শুনে। শ্রীচৈতন্য- বিষয়ক গ্রন্থ মনোযোগ সহকারে পড়লে কখন আপনা আপনিই কেঁদে দু’চোখ ভাসিয়ে ফেলবে—ওখানে রয়েছে করুণরস। বাংলাভাষায় প্রথম দিকের লেখা গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘হুতোম প্যাঁচার নক্সা’ গ্রন্থটিতে প্রচুর হাস্যরস রয়েছে। একটা ঘটনা বলছি—জামাই বিয়ের অনেক বছর পর এসেছে শ্বশুরবাড়িতে। ইতিমধ্যে শ্বশুরমশাই গত হয়েছে। জামাই উঠোনে দাঁড়াতেই শাশুড়িমাতা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে সেখানে এল। পাড়া-পড়শিরা ছুটে এল শাশুড়িকে সান্ত্বনা দিতে, জামাই হতবাক। আড় চোখে দেখে নিল তার বউও কাঁদছে। জামাই শ্বশুরবাড়ি এলে কোথায় তাকে সকলে আদর যত্ন করবে, তা না করে ওকে উঠোনে দাঁড় করিয়ে সবাই মরাকান্না কাঁদতে লাগল— ব্যাপারটা কি ? পরে শাশুড়ি কাগজের পুরিয়া থেকে কিছু একটা গুঁড়ো বের করে জামাইবাবাজীকে হাঁ করে জল দিয়ে খেয়ে নিতে বললে। বেচারা জামাইবাবাজী জানত না সেটা ছিল শ্বশুরের চিতাভস্ম। জামাইটি গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলের লোক আর শ্বশুরবাড়ি গঙ্গা থেকে বহুদূরে অবস্থিত, তাই ঐ অঞ্চলের লোকেদের গঙ্গাপ্রাপ্তি হোতো না। এবার কেউ হয়তো বিধান দিয়েছে যে, জামাইটি গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলের লোক, তার পেটে প্রচুর গঙ্গাজল রয়েছে—শ্বশুরের চিতাভস্ম তাকে খাওয়াতে পারলে পেটের গঙ্গাজলে মৃতের গঙ্গাপ্রাপ্তি ঘটবে। তাতেই এই কাণ্ড। জামাই দেখল যে, ওর শাশুড়ি কাঁদছে আর পাড়া-পড়শিরা বোঝাচ্ছে, “কেঁদে কি আর করবে মা আনন্দ কর, এমন ভাগ্য ক’জনার হয়। এমন জামাই বা ক’জনার হয় ! এমন জামাই ছিল বলেই তো কর্তা গঙ্গা পেল।”
পাঞ্জাবি এক লেখক বিভিন্ন joke লিখে খ্যাতি অর্জন করেছে। তার একটা joke বলছি শোন। বাঙালি আর পাঞ্জাবিদের মধ্যে কার বুদ্ধি বেশী। এক বাঙালি আর একজন পাঞ্জাবির মধ্যে জোর তর্ক চলছে কোন প্রদেশের বিপ্লবীর সংখ্যা বেশী এই নিয়ে। ঘটনাচক্রে দুজনেরই দাড়ি ছিল। তর্ক করতে করতে উভয়ে ঠিক করল এক- একজন একটা বিপ্লবীর নাম বলবে আর অপরের একটা করে দাড়ি ছিঁড়বে। দু’জনেই রাজি হ’ল। টসে বাঙালি জিতল, প্রথম নাম করল “নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু”—বলেই পাঞ্জাবির একটা দাড়ি ছিঁড়ে নিল। পাঞ্জাবি রেগে মেগে “ভগৎ সিং” বলেই বাঙালির একটা দাড়ি উপড়ে নিল। বাঙালি একটু রোগাধরণের ছিল, দাড়ি ছিঁড়তেই খুব রেগে গেল, বলল “বিনয়-বাদল-দীনেশ”। বলেই পটাপট্ পাঞ্জাবিটির তিনটে দাড়ি ছিঁড়ে নিল। পাঞ্জাবিটি এতে এত রেগে গেল যে সে “জালিয়ানওয়ালাবাগ” – বলেই বাঙালিটির সব দাড়ি ধরে বুকে পা লাগিয়ে মারে টান্। ভাবো একবার বাঙালিবাবুটির অবস্থাটা !
যাইহোক, এই হচ্ছে সাহিত্যে হাস্যরসের দু-একটা নমুনা। মাইকেলের ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ বীররসের উদাহরণ। সেখানে ইন্দ্ৰজিৎ ইন্দ্রজিতের স্ত্রী-প্রমীলা, দশানন রাবণ ইত্যাদি চরিত্রগুলিতে বীরত্বব্যঞ্জক ভাব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিভিন্ন রোমান্টিক উপন্যাস বা হাল্কা গল্পগুলি শান্তরস, এখানে কিছু ঘটনার ব্যাখ্যা, জ্ঞানমূলক কথাবার্তা, কিছু উপদেশাদি থাকে। করুণরস তো বুঝতেই পারছো সেখানে বিরহ-বেদনা ইত্যাদির আধিক্য। শরৎচন্দ্র তাঁর সাহিত্যে খুবই সার্থকভাবে করুণরসের প্রয়োগ করেছেন। বিশেষত দেবদাস উপন্যাসের শেষভাগ পড়ে হৃদয় বেদনার্ত হয়নি, এমন পাঠক খুবই কম আছে। বীভৎস রস বলতে যেখানে ভয়ঙ্করের রূপ বর্ণনা— খুন-জখম, অত্যাচারের কাহিনী রয়েছে সেগুলিকেই বোঝানো হয়। এখনকার উপন্যাসে বা বিশেষত সিনেমার ঘটনায় যেমন নায়ক থাকে তেমনি অন্যতম মুখ্য চরিত্রে থাকে ‘ভিলেন’। এই ভিলেনের কাজ- কর্মগুলি বীভৎস রসের মধ্যে পড়ে।
এইভাবেই পঞ্চরসের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে সাহিত্য। সাহিত্যে সব রসের সামঞ্জস্য থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রতিটি ভাষায় নিত্য নতুন কত সাহিত্যই তো সৃষ্টি হয়ে চলেছে কিন্তু কালজয়ী সাহিত্য ক’টা সৃষ্টি হয় ? ঐ যে বললাম সর্ব প্রকার রসের সামঞ্জস্য থাকে না। তবে দ্যাখো, সাহিত্য সৃষ্টিতে প্রকৃত ভূমিকা সাহিত্যিকের। তার জীবনধারা বা নিজস্ব সাধনজগৎ এগুলিই তার সাহিত্যে ছাপ ফেলে। আত্মস্থ সাধক সাহিত্যিক ছাড়া অন্য কারও কোন সৃষ্টিই কালের বুকে স্থান পায় না। যাঁর বোধ হয়েছে তিনিই তো পারেন অপরের বোধোদয় ঘটাতে। সেই অর্থে পূর্ণজ্ঞানীই প্রকৃত কবি। প্রকৃত শিল্পী। দ্যাখো না ঈশ্বর পূর্ণ, তাইতো এই মহাপ্রকৃতিকে সর্বাঙ্গসুন্দর রূপে সাজাতে পেরেছেন। এর রূপ দেখে, এর সৌন্দর্য দেখে, এর গঠনশৈলী বা সৃষ্টিশৈলী দেখেই কত সাধক তন্ময় হয়ে গভীরতায় ডুব দিয়ে মহান হয়েছেন এমনকি সমাধিলাভ পর্যন্ত করেছেন। সুতরাং উদ্দেশ্য যখন পূর্ণতালাভ তখন তোমরা আজে-বাজে কাজ না করে সেই চেষ্টাতেই ব্রতী হও। পূর্ণতা অর্জন করে—নিজেরাও সর্বাঙ্গসুন্দর হয়ে ওঠো।
জিজ্ঞাসু —– খাদ্য-খাবার নিয়ে আপনি প্রায়শই নানা আলোচনা করেন, কিন্তু মানুষ কি আর অত গবেষণা করে খাবার রান্না করে, না খায় ?
গুরুমহারাজ—এই দ্যাখো—তুমি কর না বলে কি জগতের সবাই তোমার মত নাকি ? পৃথিবীতে কি খাদ্য-খাবার নিয়ে গবেষণা হয়নি না হয় না ? Food Science বা খাদ্যবিজ্ঞান তো জীববিদ্যার একটা অংশ। বর্তমানে রন্ধনশিল্প Home Science, Hotel man- agement ইত্যাদি নানা scetion-এ পড়ানো হয় বা শেখানো হয়, রান্না নিয়ে নানান বই বাজারে চালু আছে। বিদেশে দেখেছি রান্নার উপর Radio Programme বা T. V. Programme হয় (এখন এদেশেও শুরু হয়েছে)। আর প্রাচীনকালে যখন মানুষ আদিম ও অসভ্য ছিল তখন থেকেই খাদ্য নিয়ে research যদি না হত তাহলে আজ পর্যন্ত কোনটা সুখাদ্য বা কোনটা কুখাদ্য তা যাচাই হল কি করে ? একই জিনিসকে বিভিন্নভাবে prepare করে তা পরিবেশনের ব্যবস্থাই বা কি করে হল ? ভাবলে অবাক হতে হয় যে ধানকে সিদ্ধ করে ভাতের চাল তৈরি বা ২ বার সিদ্ধ করে মুড়ির চাল তৈরি, আবার ভাত রান্নার একরকম পদ্ধতি, মুড়ি ভাজার পৃথক পদ্ধতি এগুলি তো এক বা একাধিক ব্যক্তির দীর্ঘ গবেষণার ফল, কিন্তু কেউ সেই গবেষকদের নামের খবর রাখে না বা তাদের সম্বন্ধে কোন খোঁজখবরও রাখে না।
ইউরোপের একজন বিখ্যাত খাদ্য-গবেষক খাদ্য নিয়ে সারাজীবন গবেষণা করে, শেষে নতুন নতুন খাদ্য উদ্ভাবন করতে গিয়ে আর তার taste আস্বাদন করতে গিয়ে নিজেই মারা গেল। ভদ্রলোক পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতো আর বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণী থেকে নানাভাবে খাদ্য উৎপাদন করে নিজে খেয়ে সেই খাদ্য তৈরির পদ্ধতি এবং taste কি তা লিখে রাখতো। এমনকি খাদ্যটি খাবার পর তার নিজের শরীরের বা মনের উপর খাদ্যটির reaction কি তাও লিখে রাখতো। এইভাবে খাদ্য সম্পর্কিত তার লেখা বই বিভিন্ন খণ্ডে প্রকাশ করত। জঙ্গলের বিভিন্ন উপজাতিরা হাতির মাংস খায় কিন্তু হাতির শুঁড়টা কেটে ফেলে দেয়, এটা দেখে ভদ্রলোক ঠিক করলো যে, সে হাতির শুঁড় রান্না করে খাবে। ১৪ ঘণ্টা ধরে হাতির শুঁড়ের piece সিদ্ধ করে নুন দিয়ে খেতে গিয়ে দেখলো তাও ভালো সিদ্ধ হয়নি এবং স্পঞ্জের মতো চিবিয়ে চিবিয়ে মুখের পেশী ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। যাইহোক তাও কষ্ট করে খাবার পরদিন তার ডায়েরিয়া মতো হলো। ভদ্রলোক আদিবাসীরা কেন হাতির শুঁড় কেটে ফেলে হাতির মাংস খায় তার কারণ খুঁজে পেল এবং তার বই- এ তা লিখে ফেলল। এইভাবে ভদ্রলোক বিভিন্ন খাদ্য নিয়ে গবেষণা করেছে এবং কোনটি কেন খাদ্য বা কেন অখাদ্য তা নিজে জোগাড় করে রান্না করে এবং নিজেই নিজের উপর পরীক্ষা করে তা নির্ণয় করেছে। শেষকালে কি হ’ল জানো, ভদ্রলোক আফ্রিকায় বিভিন্ন প্রাণীর মাংসের গুণাগুণ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে একদিন কালো মাকড়সা রান্না করে খেতে গিয়ে বিষক্রিয়ায় মারা গেল।
তাই বলছিলাম খাদ্য নিয়ে গবেষণা হয় বইকি—প্রচুর গবেষণা হয়েছে, এখনও হচ্ছে, আবার এই নিয়ে বাজারে অনেক বই-ও রয়েছে।
জিজ্ঞাসু—মানুষ আত্মহত্যা করে কেন ?
গুরুমহারাজ—ইংল্যাণ্ডে এই নিয়ে খুব গবেষণা হয়েছে, এটা para-psychology-র ব্যাপার। মনোবিজ্ঞানীরা দেখেছে যে cloudy, foggy আবহাওয়ায় মানুষের অপরাধ প্রবণতা, আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ে, এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। ভারতীয় ঋষিরা কিন্তু বহুপূর্ব থেকেই অন্তঃপ্রকৃতির সাথে বহিঃপ্রকৃতির যোগাযোগের কথা বলে গিয়েছেন। ইংল্যাণ্ড, জাপান ইত্যাদি দেশের climate খারাপ বলে ঐসব দেশে আত্মহত্যা বেশী হয়—এটা মনোবিজ্ঞানীদের ধারণা। জাপানে ‘হারিকিরি’ অর্থাৎ পায়ের main শিরা কেটে বরফ-গলা জলে ডুবিয়ে মৃত্যুবরণ করার খুব প্রচলন রয়েছে। তবে ভারতেও প্রতি বছরে আত্মহত্যার সংখ্যাটা কিছু কম নয়! জনসংখ্যার বিচারে ভারতবর্ষে এটা অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই বেশী, তাই percent- age কম হলেও সংখ্যার বিচারে ভারতে আত্মহত্যার সংখ্যা অনেকটাই বেশী। বিভিন্ন সংবাদপত্রে সরকারি নথিভুক্ত সংখ্যাটা পাওয়া যায় কিন্তু সবটা পাওয়া যায় না। গ্রামে-গঞ্জে কত আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, পোষ্ট-মর্টেম বা কাটাকুটি হবে, ঝামেলা হবে—এই ভয়ে গ্রামের প্রান্তে নদী-নালার ধারে শব পুড়িয়ে দেওয়া হয়, এগুলি সরকারিভাবে নথিভুক্ত হয় না।
তবে তুমি যেটা জিজ্ঞাসা করলে যে, মানুষ আত্মহত্যা করেকেন, এর একটা কারণ হয়তো natural ব্যাপার, কিন্তু Para-Psychologyist-রা দেখেছে যে, আত্মহত্যার প্রবণতা মানুষের একটা মানসিক রোগ। ওরা দেখেছে যে, বেশীর ভাগ মানুষই মানসিকভাবে অসুস্থ। প্রতিটি মানুষের জীবনে ক্ষোভ রয়েছে। হতাশা, না পাওয়া, সামাজিক বঞ্চনা, অন্যায়ভাবে নির্যাতন ইত্যাদি থেকে মানুষের মনে ক্ষোভ জন্মায়। ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভ, বিক্ষোভ থেকে বিদ্রোহ এগুলি ক্রমে ক্রমে রূপ পরিগ্রহ করে। কিন্তু ক্ষোভ যদি Channel না পায় তাহলে এগুলি মনোজগতে ক্ষতের সৃষ্টি করে, আত্মহত্যার প্রবণতা এইরূপ একটি ক্ষত। স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী এই ক্ষত ব্যাপক আকার ধারণ করে, ফলে কখনো কখনো এরকম ঘটনা ঘটে যায়, আবার কোন সময় ঘটে না। বর্তমান যুগটা competition-এর যুগ। পড়াশুনায়, কেরিয়ারে, status-এ competition আসায় অনেকের প্রত্যাশার achievement ঘটছে না, ফলে অনেক যুবক-যুবতী হতাশা থেকে আত্মহত্যা করছে। আগে দরিদ্রতা, ঋণের বোঝা এগুলো থেকে মানুষ আত্মহত্যা করত, এখন এই কারণে আত্মহত্যার সংখ্যা কমেছে। তবে জানবে স্থান-কাল-পাত্রের ঠিক ঠিক সংযোগ স্থাপন না হলে কোন ঘটনাই ঘটে না। তাই মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা থাকলেও সবাই এতে মারা যায় না। ভারতীয় শাস্ত্র বলেছে, “আত্মহত্যা মহাপাপ”। কারণ মৃত্যুর পর তার সূক্ষ্মশরীর খুবই কষ্ট ভোগ করে, আর একবার আত্মহত্যা করলে তিনবার আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে। তাই তোমরা একথাগুলি তো শুনছ, কোন খারাপ অবস্থাতে পড়লেও এই পথটি অবলম্বন করো না।
জিজ্ঞাসু—আপনি যে মানুষকে ভালোবাসেন—এটাওতো একরকমের বন্ধন ?
গুরুমহারাজ—প্রকৃত অর্থে যাকে প্রেম বলা হয়, সেই প্রেম মানুষকে স্বাধীনতা দেয়—কোন বন্ধনে আবদ্ধ করে না। দীর্ঘদিনের কোন বন্ধন মুক্ত করলেও একটা দাগ থেকে যায়, তেমনি এখানেও ঐরকম একটা ব্যাপার থাকে। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখো, আধ্যাত্মিক মানুষদের যে ভালোবাসা সেই ভালোবাসায় কতশত মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের ঘাড়ে চেপে বসে থাকা এই সংসার-বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে, তারা মুক্ত হয়েছে। প্রথম দিকটায় এটাকে একটু বন্ধন মনে হলেও পরে আর থাকে না। যেমন একটা কাঁটা দিয়েই আর একটা কাঁটা তুলে ফেলে দিতে হয়—এটাও খানিকটা সেরকম। দ্যাখো, আমার কাছে এই যে তোমরা এসেছ, আমি কি তোমাদেরকে কোন বন্ধনে আবদ্ধ করতে চেয়েছি ? যাঁরা ব্রহ্মচারী-সন্ন্যাসী, তারা নিজেরাই কিছু ব্রত গ্রহণ করেছে। আমি শুধু চেষ্টা করি তারা তাদের গৃহীত ব্রত যেন ঠিক ঠিক পালন করে। নিজের সংকল্প নিজেই যদি রাখতে না পারে তাহলে অপরাধ হয়, আমি তাদের সেটা থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করি। তাছাড়া মানবজীবনের উদ্দেশ্যই হ’ল আত্মসাক্ষাৎকার বা ঈশ্বরলাভ। তাহলে আমি যখন সেটা জেনেছি তখন তো চাইবই মানুষ বোকার মত অন্যান্য উদ্দেশ্যের পিছনে ছুটে না বেড়িয়ে প্রকৃত উদ্দেশ্যের দিকে ছুটুক। কিন্তু তা করতে গিয়েও আমি কখনও কড়া হই না, তোমরাই তো তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। কত ছেলে-মেয়ে এখানে আসে ‘সাধু’ হবে বলে। আমি তাদের বেশীর ভাগকে সংসার করতে বলি, অনেক বাবা-মায়েদের ডেকে পাত্র বা পাত্রীর সন্ধানও দিয়ে দিই। দ্যাখো সংস্কারে যার যা আছে, সেটা না কাটলে তো অন্য সংস্কারে আসা যাবে না। “fish out of water” বলে একটা কথা আছে—খানিকটা সেরকম অবস্থা হবে। বহু সাধু-সন্ন্যাসী নিজের জীবন সঠিকভাবে পালন করতে পারে না, আবার অনেকে বার্ধক্যে এসে হা-হুতাশ করে, “কি হল’ বলে আপসোস করে। তাহলে এই ধরণের আত্ম প্রবঞ্চনায় কোন লাভ হয় না। লোকনাথ বাবা যাকে স্বয়ং শিবের অংশ বলে ধরা হয়, লোকশিক্ষার জন্য তাঁকেও তাঁর গুরুদেব কিছুদিন সংস্কার ক্ষয় করিয়ে নিয়েছিলেন।
তাই আমিও মানুষকে স্বাধীনতার কথাই বলি, পরিপূর্ণ স্বাধীনতা যাতে সে লাভ করতে পারে, তারই চেষ্টা করি। কারণ আধ্যাত্মিকতা মানুষকে স্বাধীনতা দেয়, কিন্তু একটা কথা সবসময় মনে রাখতে হবে মানুষ প্রতিটি মুহূর্ত বিবেকের অধীন। বিবেকের অধীনতা ভুললেই মানুষের স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারে পরিণত হয়। বিভিন্ন নিয়ম, নিষেধ, Punishment ইত্যাদির ব্যবস্থা করেও তো সমাজ থেকে অপরাধ বা অপকর্ম বন্ধ করা যায়নি। কিন্তু কার বন্ধ হয়েছে, যার বিবেক সদা জাগ্রত। সবাই যখন ঘুমিয়ে যায়, দৃষ্টির অন্তরালে থাকে তখনও বিবেক জাগ্রত প্রহরীর কাজটি করে। তাকে এড়িয়ে কোন কাজ করার উপায় নেই। আধ্যাত্মিক মানুষেরা তাই সমাজের কোন খারাপের সঙ্গে কখনই যুক্ত হয় না। তাহলে তোমাদের একটা সূত্রও দিয়ে দিলাম, সমাজকে কলুষমুক্ত করতে হলে বিবেকবান মানুষের সংখ্যা বাড়াতে হবে, আর এটা করতেই মহাপুরুষগণের বারবার সমাজে ফিরে ফিরে আসা।
জিজ্ঞাসু—হিন্দি রাষ্ট্রভাষা হবার কারণ কি ? এটা কি অন্যান্য ভারতীয় ভাষার থেকে সমৃদ্ধ ?
গুরুমহারাজ–মোটেই নয়। কয়েকবছর আগে পর্যন্ত এই ভাষায় কোন ভালো সাহিত্যই ছিল না। উর্দু ঢুকে তবুও বর্তমানে ভাষাটা কিছুটা শ্রুতিমধুর হয়েছে। তবে উর্দুরও কোন প্রাচীনতা নেই, এটি আরবী, ফার্সী বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে এই উপমহাদেশে সৃষ্ট একটি ভাষা। যাইহোক হিন্দি রাষ্ট্রভাষা হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক। স্বাধীনতা উত্তর যুগে দিল্লীর গদিতে বেশীরভাগ কর্তাব্যক্তিই ছিল হিন্দিবলয়ের লোক। ওরাই হিন্দিটাকে প্রায় একরকম জোর করেই চালিয়ে দিয়েছিল ভারতীয়দের উপর । দক্ষিণভারত কোনদিনই এই ব্যাপারটা মেনে নেয়নি প্রথম থেকেই বিরোধ করেছে। আজও ওদের বেশীর ভাগ state-এর ছেলে- মেয়েদের হিন্দি শেখানো হয় না, ওরা ইংরাজী শেখে। পূর্বাঞ্চলও প্রথম থেকেই এব্যাপারে বিরোধ করেছিল কিন্তু টেকেনি। এখন T.V-র দৌলতে আর হিন্দি সিনেমার জনপ্রিয়তা অর্জনের সাথে সাথে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে হিন্দি শেখার একটা আগ্রহ জন্মাচ্ছে। তবে বাঙালিদের পক্ষে হিন্দি ভাষা শেখা অবশ্য সহজ, কারণ হিন্দির সঙ্গে বাংলার খুবই সাদৃশ্য আছে।
তবে একটা কথা জেনে রাখবে তোমরা T.V-তে যে হিন্দি —ঐ হিন্দিতে কিন্তু হিন্দিবলয়ের কোন অঞ্চলের লোকেই কথা শোন— বলে না। বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন dialect ব্যবহৃত হয়, হিন্দির প্রায় ২০ থেকে ২৫ রকমের dialect রয়েছে। এর মধ্যে মৈথিলী হিন্দিতে কথা বলা লোকের সংখ্যা অন্য যে কোন dialect-র চাইতে বেশী। বর্তমানে মৈথিলী ভাষা হিন্দির থেকে আলাদা হতে চাইছে, যদি তা কখনও হয় তাহলে কিন্তু হিন্দি বলয়ের বাকী অংশ আর সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে না। তখন হয়তো তেলেগু ভাষীরা চাইবে তেলেগুকে রাষ্ট্রভাষা করা হোক ! কারণ ভারতবর্ষে এখন তেলেগুভাষীর সংখ্যা প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি হয়ে যাবে। এইরকম হলে তো ভারতবর্ষের রাষ্ট্রভাষা কি হবে তাই নিয়ে নতুন করে আবার সমস্যা সৃষ্টি হয়ে যাবে ?
তবে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘুরে আমি দেখেছি, হিন্দিবলয়ের সাধারণ লোকেরা (আমজনতা) ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রান্তের আমজনতার থেকে অভব্য। অসভ্য বলব না কিন্তু ভব্যতার ব্যবহার কম। ট্রেনে, বাসে, হেঁটে ঐ সমস্ত অঞ্চল দিয়ে যেভাবেই যাও না কেন তোমার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়ে যাবে। হরিয়ানায় বাসে একবার একটা লোক আমার পা মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে, আমি বিরক্তি প্রকাশ করার সাথে সাথে সে ঘুরে দাড়ালো তারপর আমাকে উচ্চকণ্ঠে আর কর্কশ ভাবে বলল ‘তেরা প্যায়ব দাবায়া থোড়া–লাথ তো নহি মারা না তোনে?’ ভাব একবার ! আর একবার পানিপথের কাছে একজায়গায় ছোটকাকা-(বনগ্রামের ন’কাকার ছোট ভাই “গোলক প্রসাদ মুখার্জী)র বাসায় যাব বলে বাসে উঠেছি, কণ্ডাকটরকে স্টপেজের নামটা বলছি এবং নামিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ করছি কিন্তু বাস থামছে না। আমার অনুরোধের কাতরতা দেখে স্থানীয় এক সহৃদয় ব্যক্তি ব্যাপারটা বুঝে একপা এগিয়ে গিয়ে বাসের দেওয়ালে মারল জোরে এক ঘা। আর আরও জোরে চেঁচিয়ে বলে উঠল “আ বে জেরা রোখ দে !” সঙ্গে সঙ্গে ঘ্যাঁচ্ করে বাস থেমে গেল, আমিও লোকটিকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নেমে পড়লাম। পরে দেখেছিলাম বাসের ভিতরের দেওয়ালে ঐরকম কঠিন হাতের চাপ্পড় মেরে মেরে জায়গায়গুলি বসে গেছে।
বিহার U.P-তে দেখেছি বাসে, ট্রেনে তোমার পাশে বসে থাকা লোকটি আনমনে খৈনি ডলছে আর এমনভাবে মাঝে মাঝে খৈনিতে থাপ্পড় মারছে যে, ওর ঝাঁঝে তোমার কাশি হচ্ছে, হাঁচি হচ্ছে তবু সে নিজেকে সংযত করবে না, বরং তোমার অস্বস্তিটা উপভোগ করছে। তোমার ভোগান্তির এখানেই শেষ হোল না—খৈনি মুখে পুরার পর থেকে শুরু হোল থুথু ফেলা। কতবার যে থুথু ফেলবে তার ঠিক নেই। এবার মনে করো তুমি জানালার ধারে seat পেয়েছ, এবার যতবার তার মুখে থুথু আসবে ততবার সে–তোমার দাবনায় চাপ দিয়ে ‘পুচ’ করে জানালার বাইরে থুথু ফেলবে। তোমার দাবনায় চাপ লাগছে বা থুথু উড়ে এসে তোমার গায়ে লাগছে এসব নিয়ে তার কোন ভ্রুক্ষেপই নেই। তুমি বলতে যাও—প্রতিবাদ করতে যাও, উল্টে তোমাকেই অপমান করবে, অন্য যাত্রীরা বলবে, “ওকেই জানালার ধারের seat-টা ছেড়ে দিন না ! ”
সাধারণ মানুষ এমন হলেও বিহারের বেশ কিছু ছেলে-মেয়ে কিন্তু Indian Administrative service-এ প্রতিবার chance পায়, খবরের কাগজে এটা দেখি। তবে খোঁজ নিলে জানতে পারবে ওদের বেশীর ভাগেরই শিক্ষালাভ হয়তো দিল্লী বা অন্য কোথাও থেকে হয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষায় ইংরাজী ছাড়াও হিন্দি version-এ প্রশ্ন থাকে বা উত্তরপত্র হিন্দিতে লেখা যায়—হিন্দিবলয়ের ছেলে-মেয়েদের এটা একটা বিরাট সুবিধা। যদি কখনও ঐ সমস্ত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বাংলায় হয় এবং উত্তরপত্র বাংলায় লেখার সুযোগ পায় তাহলে দেখবে ভূরি ভূরি বাঙালি ছেলে-মেয়ে IA.S, I.P.S হচ্ছে। তখন আন্তর্দেশীয় যে কোন পরীক্ষায় পাশের হার বাঙালিদের হুহু করে বেড়ে যাবে ।