জিজ্ঞাসু—বাবা, আগেকার দিনে পূর্ববঙ্গের সমাজে কোন্ মানুষের কতটা মর্যাদা, তা বোঝানোর জন্য “গোত্র, প্রবর, গাই- ঘটি” এসব জানতে চাওয়া হোত—এগুলি আসলে কি ?

গুরুমহারাজ—গোত্র ব্যাপারটা তো তোমরা প্রায় সকলেই জানো। ভারতীয়রা বিশ্বাস করে যে, তারা প্রত্যেকে কোন না কোন ঋষির বংশধর। সেই হিসাবে সকলেরই গোত্রপিতার অর্থাৎ সেই ঋষির নামে নিজের গোত্রের পরিচয় দেয়। যেমন সাণ্ডিল্য গোত্র, কাশ্যপ গোত্র, ভরদ্দাজ গোত্র ইত্যাদি। এই সাণ্ডিল্য, কাশ্যপ, ভরদ্দাজ এরা পূর্বে ঋষি ছিলেন। তখনকার দিনে তো এখনকার মতো সন্ন্যাসী সমাজ ছিল না। বৈদিক পরম্পরায় ছিল — ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস। ফলে বানপ্রস্থী বা সন্ন্যাসীদেরও পূর্বজীবনে গার্হস্থধর্ম পালন করতে হত। এতে অনেকের ছেলে-মেয়েও জন্মাতো। তাছাড়া আরও পূর্বে মানুষ যখন বনে-জঙ্গলে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াতো, তখন গোষ্ঠীপিতা বা দলপতি-ই ছিল ঐ দলের সকল নারীর স্বামী। ফলে ঐ দলটির সকল সভ্যের পিতা দলপতি। প্রথম দলপতির নামেই ওদের পরিচয় হোত পরবর্তীকালে এটাই গোত্রপরিচয় হিসাবে সমাজে স্থান নিয়েছে। এবার ‘প্রবর’ কথাটির দ্বারা ঐ গোত্রে বংশ পরম্পরায় উল্লেখযোগ্য কোন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। এখনও মন্ত্রে রয়েছে দেখবে “অমুক গোত্রস্য, অমুক প্রবরস্য।” আর ‘গাই’- ‘ঘটি’ যেটা বললে ওটা তৎকালে গ্রামাঞ্চলে ব্যবহৃত চলতি কথা। ‘গাই’-মানে গরু নয়,—‘গাঁ’ বা গ্রাম। অর্থাৎ কতগুলি গ্রামে তার যজমান বা আত্মীয় রয়েছে, অথবা কতগুলি গ্রামে ঐ ব্যক্তির পরিচিত বা যাতায়াত রয়েছে এসব দিয়ে কোন ব্যক্তির status নির্ণয় হোত। পঞ্চগ্রামী বা দশখানা গ্রাম—এটাই হচ্ছে ‘গাই’। ‘ঘটি’ কথাটা বহুল বিতর্কিত শব্দ। কারণ বাঙাল আর ঘটি-র বিরোধ তো সর্বজনবিদিত। এই ঘটির ব্যাপারটা হচ্ছে তখনকার দিনে মানুষজনকে পায়ে হেঁটেই একস্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে হোত। অশ্ব, গজ এবং যানের ব্যবস্থা ছিল রাজন্যবর্গ বা রাজকর্মচারীদের জন্য, অথবা ধনী ব্যক্তিদের জন্য। সাধারণ আমজনতা পায়ে হেঁটে হেঁটে ১০ ক্রোশ, ২০ ক্রোশ, ৫০ ক্রোশ বা আরও বেশী দূরত্ব অতিক্রম করতো। মাত্র ৫০০- ৫৫০ বছর আগে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব বা তার অনুগামীরা অথবা তীর্থযাত্রীরা পায়ে হেঁটে পুরীর জগন্নাথ দর্শনে যেতো। যাইহোক যাত্রাপথে পিপাসা নিবারণ, শৌচকার্য ইত্যাদির জন্য মানুষ জলবহন করে নিয়ে যেতো। যেমন আজও তোমরা water-bottle ব্যবহার করো—সেরকমই ধরে নাও ব্যাপারটা। এবার যে একটু গণ্যিমানি তার দলে লোকের সংখ্যা বেশী, ফলে তাকে বা তার দলকে বড় পাত্রে জল বহন করতে হোত, আর যে একা একা ঘুরছে তার পাত্র ছোট হোত। এইটাই কালক্রমে কার ঘটি কত বড় এই হিসাবে তার status নির্ণয়ের পদ্ধতি হয়ে গিয়েছিল। সমাজের বিবর্তনে কত কি যে এসেছে আবার তারা হারিয়ে গেছে। নতুন সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠার সাথে সাথে নতুন কিছু নিয়ম, নতুন কিছু সামাজিক শব্দের আমদানি হয়েছে। ঐতিহাসিক বা সমাজতত্ত্ববিদরা সেই সূত্র ধরে পুরাতনকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এইরকমই চলছে সমাজে। তবে জানবে কোনকিছুই চিরন্তন নয়। আজকে হয়তো কিছু দেখছ- শুনছ, ভাবছ সত্য। আগামীতে তা যখন আর থাকবে না বা পরিবর্তিত হয়ে যাবে তখনকার মানুষজন তাকে বলবে ইতিহাস। তাদের কাছে তাদের বর্তমানটা আবার সত্য বলে প্রতীয়মান হবে। এইটা বুঝেই আচার্য শঙ্কর বলেছিলেন, “ব্রহ্ম সত্যং জগন্মিথ্যা, জীবো ব্রহ্মৈব নাপরঃ।” এখানে জগৎ ‘মিথ্যা’ অর্থে সত্য-র opposite word নয়। ‘মিথ্যা’ অর্থে অনিত্য, পরিবর্তনশীল, নশ্বর যার কোন স্থায়ী রূপ নেই। কিন্তু ব্রহ্ম সত্য কারণ সেখান থেকেই সবকিছুর উৎপত্তি এবং তার কারণরূপ প্রাগ্-উৎপত্তি। এবং সেটাই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ও ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং পরে লয়প্রাপ্ত হচ্ছে। কিন্তু ব্রহ্মের হ্রাস-বৃদ্ধি হচ্ছে না, যেমন ছিল তেমনি থাকছে। শাস্ত্র বলেছে, সমুদ্র আর তার ঢেউ, ফেনা, বুদ্বুদ। ঢেউ, ফেনা, বুদ্বুদ সমুদ্র থেকেই উৎপন্ন হচ্ছে ওখানেই নানারূপ পরিগ্রহ করছে আবার সমুদ্রেই লয় হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সমুদ্র সেই সমুদ্রই রয়ে যাচ্ছে। তাই বলা যায় সমুদ্রই সত্য আর ফেনা, বুদ্বুদ ঢেউ অনিত্য বা মিথ্যা। ওগুলি ক্ষণিকের জন্য সত্য হলেও চিরন্তন নয়, সেই অর্থে মিথ্যা। বুঝতে পারলে ব্যাপারটা, অনেকেরই এই সত্য-মিথ্যা নিয়ে confusion রয়েছে। আমাকে বহু জায়গায় এই জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হয়েছে—যে এইতো জগৎ দেখতে পাচ্ছি, তাহলে একে ‘মিথ্যা’ বলা হচ্ছে কেন ? দ্যাখো, ভগবান বুদ্ধ বুঝিয়েছিলেন জ্বলন্ত প্রদীপের উদাহরণ টেনে। উনি বলেছিলেন প্রদীপের যে শিখাটা তুমি দেখছ, সেটা প্রতি মুহূর্তেই বদলে বদলে যাচ্ছে, নতুন নতুন তেলের জোগান আসছে, আর সেইটা পুড়ে নতুন নতুন শিখার সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে তুমি যেটা দেখছ, সেটার স্থায়িত্ব এত কম যে, তোমার দর্শনের অনুভূতি জাগতে না জাগতেই নতুন শিখা সেই স্থান দখল করছে। এইভাবে তুমি অসংখ্য জ্বলন্ত শিখার একটি continualtion দেখছ, আর ভাবছ একটিই জ্বলন্ত শিখা দেখছি। এটাই ভ্রম।

আবার বিজ্ঞানীরা বলছে, তুমি কি দেখছ ? তোমার চোখের রেটিনায় কিছু বস্তুর প্রতিফলন হচ্ছে, ঐ অঞ্চলের কিছু nerve (optice nerve) সেই সংবেদন মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট স্থানে (visual corte) বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেই স্থান নির্ধারণ করছে – বস্তুটি কি বা তার নাম কি ! আর সেটা করতে পারছে কারণ সেখানে পূর্ব হতেই ঐ বস্তুর image-এর প্রতিরূপ এবং তার নামের পরিচিতি রয়েছে। যদি তা না থাকত তাহলে confusion আসত। যাইহোক তাহলে দেখা মানেই একটা শুধুমাত্র শব্দ নয় বিশাল একটা Net work System । এই System-এর কোন এক স্থানে break হয়ে গেলে তুমি আর দেখতে পাবে না। ধর তোমার চোখ ঠিক আছে কিন্তু মস্তিষ্কের ঐ particular piont-টা নষ্ট হয়ে গেল চোখ থাকতেও তুমি অন্ধ হয়ে যাবে। ভাবতে পারছ দেহটাও কতটা গোলমেলে। বিভিন্ন পশুরা ভিন্ন ভিন্ন রঙের তফাৎ দেখে না, কোন কোন প্রাণী দিনে ভালো দেখে না, রাত্রে পরিষ্কার দেখে। মানুষের মধ্যেও বর্ণান্ধ, রাতকানা রয়েছে। সুতরাং ‘দেখা’ বললেই তো হ’ল না, সেটাও আপেক্ষিক ব্যাপার। এবার যা দেখছ সেটার analisys-এ যাচ্ছি। যে কোন বস্তুকে একটা নির্দিষ্ট আকার বা আয়তনের বা বর্ণের দেখছ তো! ধর ঐ আমগাছটা, ওটার একটা নির্দিষ্ট বর্ণ, আকার, আয়তন রয়েছে। এবার ওটাকে ভাঙো কি পাবে—সজীব অবস্থায় কিছু কোষ-কলার সমষ্টি। আর ভৌতবিজ্ঞানীদের মতে অণু-পরমাণুর সমষ্টি। পরমাণুগুলিকে আবার ভাঙো কি পাবে, না—ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন ইত্যাদি কণিকা । ইলেকট্রনগুলি প্রচণ্ড গতিশীল, পরমাণুর কেন্দ্রে প্রোটন ও নিউট্রন আর বাকী বেশীর ভাগটাই ফাঁকা । কণিকাগুলি ভাঙলে আবার ‘কোয়ার্ক’ নামক শক্তি কণা। তাহলে যে বস্তুটিকে দেখা হচ্ছে, তার প্রকৃত রূপ কি ? যেটা দেখছ এটাতো বাহ্যরূপ, এর অন্তর্নিহিত রূপ কোনটি সেই রূপকে কে ধরবে ? তাহলে যা দেখছি – এর সত্যতা কোথায় ? কোনটি সত্য—ইন্দ্রিয় সত্য নয়, দর্শন সত্য নয়, দৃশ্য সত্য নয়—তাহলে সত্য কে, নিত্য কে ? এটাই আর্যঋষিদের জিজ্ঞাসা ছিল। ওঁরা ধ্যানের গভীরে ঢুকে এর উত্তর বের করে নিয়ে এলেন, বললেন – –তুমিই সত্য, দৃশ্য-দর্শন সত্য নয়—দ্রষ্টা সত্য। দ্রষ্টা কোন ইন্দ্রিয় নয়, ব্যক্তিসত্তাও নয়, দ্রষ্টা নিত্য, শাশ্বত, চিরন্তন, তাই সত্য। যাঁরা এই তত্ত্ব অবগত হলেন তাঁরাই ঋষি বা পূর্ণজ্ঞানী। তাঁদের কাছে যখন জিজ্ঞাসা আসল – আমি কে ? উত্তর এল— “তৎ-ত্বমসি”–তুমিই সেই। তাহলে আপনি কে ? ‘অহম্ ব্রহ্মাস্মি’, আমিই ব্রহ্ম (এখানে আমি, “ব্যক্তি আমি” নয়)। তাহলে সকল ব্যক্তিসত্তার মধ্যে যে আত্মা বিরাজমান, ওটি কি বা কে ? “অয়মাত্মা ব্রহ্ম” এই আত্মাও ব্রহ্ম। ঋষি আরও বললেন ‘প্রজ্ঞানম, ব্ৰহ্ম’- প্রজ্ঞানই ব্রহ্ম, অর্থাৎ তুমি দেহ নও, মন নও, প্রাণ নও, পঞ্চভূত নও, পঞ্চতন্মাত্রা নও তুমিই সেই চৈতন্যস্বরূপ। তুমি দ্রষ্টা বা সাক্ষীস্বরূপ নিত্য, সত্য, শাশ্বত – তুমিই সেই পরমেশ্বর—এই প্রজ্ঞানই ব্ৰহ্ম।

জিজ্ঞাসু—বারেন্দা আশ্রমে প্রথমবার এলেন কেমন লাগছে ?

গুরুমহারাজ—আমার খুব ভালো লাগছে ! এখানে এসে আমি যেন প্রাণভরে নিশ্বাস নিতে পারছি, এই যে সামনেটা অনেকটা ফাঁকা বা পূর্ব দিকটায় নদীর চড়া, এদিকে তো কখনই বাড়ী-ঘর হবে না—ফলে ফাঁকায় থাকবে। আসার সময় দেখলাম ব্রীজ রয়েছে অজয়ের উপর, এর ফলে এই বাঁকটা আর ভাঙবে না, বরং এদিকটা গড়বে। জমিগুলো নদীর চড়ার দিকে বাড়বে। আমার বহুদিনের একটা ইচ্ছা ছিল অজয়ের ধারে ফাঁকা স্থানে একটা আশ্রম হবে। এখানকার ছেলেরা এটা করল—ভগবান তোদের সকলের উপর প্রসন্ন, তাই তোদেরকে দিয়ে এ কাজটা করিয়ে নিল। এই ঘরটা এখনও ভিজে রয়েছে –সবে করেছিস নাকি ? দ্যাখ আমার সাথে মা জগদম্বা এমনিই করে থাকে—যে আশ্রমেই প্রথম যখন যাই, তখন আমাকে ভিজে অথবা সদ্য প্রস্তুত ঘরে রাত কাটাতে হয় এতে তোদের কোন দোষ নেই। কত খরচ হল তোদের – ও বেশী খরচ হয়নি, শুনে খুব ভালো লাগছে। এইযে এই আশ্রমে বসে আছি, এই সমস্ত অঞ্চলে আমি আগেও এসেছি। অনেক মহাজন বা মহাপুরুষের পদস্পর্শ এখানে রয়েছে। এই আশ্রমের পরিবেশ ধ্যান-জপের অনুকূল। এখানেসেবামূলক কাজ হবে। দাতব্য হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাকেন্দ্র, শিক্ষাদান কেন্দ্র ইত্যাদি হবে। শিক্ষিত বেকার ছেলেদের নিয়ে এবং retired মাষ্টারমশায় বা Govt Employee দের নিয়ে একটা teacher-এর team বানাবি। তারপর এই অঞ্চলের দুঃস্থ ছেলে-মেয়েদের বিনা পয়সায় বা অল্প পয়সায় tution পড়াতে শুরু করবি। এখান থেকে তো Katwa একটু দূরে, স্থানীয় ছাত্র-ছাত্রীরা এখানেই ভালো মাষ্টার পেলে পড়াশুনায় উন্নতি করতে পারবে। ভালো ভালো লেখকের পাঠ্যবই বা সহায়িকা বই জোগাড় করে রাখবি, ছেলে-মেয়েরা সেগুলি থেকে সাহায্য পাবে। পরবর্তীকালে একটা Library করবি। যেখানে কয়েকটা খবরের কাগজ, বিভিন্ন Magazine, তারমধ্যে দু-একটা Science Magazine-ও থাকবে। তাছাড়া গল্পের বই, সমস্ত ক্লাসের পাঠ্যবই ইত্যাদিও থাকবে, যাতে স্কুল, হায়ার সেকেণ্ডারী এমনকি কলেজের ছেলে-মেয়েরাও এসে এখানে পড়াশুনা করতে পারে। আর আশ্রমে ঢুকতেই এখন যেখানে gate রয়েছে, ওটা পরবর্তীতে রাখবি না। ওর ডানপাশে রাস্তা বরাবর Plot-টায় একটা বাঁক রয়েছে। রাস্তার ধার বরাবর building হবে। যে ঘরটা দক্ষিণদিকের শেষ ঘর হবে এটাই হবে dispensary । যাতে রোগীরা বাইরে থেকে এসে বাইরে বাইরে চলে যেতে পারে, আশ্রমের ভিতরে কোন ঝামেলা থাকবে না। আশ্রম একটা পবিত্র জায়গা। এখানে একটা vibration থাকে, আজে বাজে লোক বেশী সেই স্থানে যাওয়া-আসা করলে বা অনেকক্ষণ কাটালে—সেই আশ্রমিক vibration-এ একটা disturbance হয়। কোন মহাপুরুষ সেখানে থাকলে বা মাঝে মাঝে সেখানে গেলে তিনি আবার ঐটা tune করে দেন। সেইজন্য আর্ত, রোগগ্রস্ত, তামসিক ব্যক্তিদের আশ্রমের মধ্যে ঢোকানোর প্রয়োজন নেই তো। তারা বাইরে থেকে সেবা নিয়ে চলে যাবে, আশ্রমের ভিতরে শুধু জিজ্ঞাসু আমার শিক্ষার্থী আসবে, ভক্তরা আসবে। এইভাবে ঐ building-টা যখন একেবারে দক্ষিণ-প্রান্তে চলে যাবে, তখন ওটা ‘L-type’ হয়ে আবার পূর্বদিকে বিস্তৃত হবে। সব থেকে দক্ষিণ প্রান্তের ঘরটাই হবে এই আশ্রমের permanent দাতব্য চিকিৎসালয়। ঐখানে একটা মাঠে নামার রাস্তা আছে দেখেছি। ফলে ঐদিকেই হবে আমাদের মূল entrance, দক্ষিণ দিক বরাবর ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় আশ্রমে ঢোকার main gate হবে। তখন এখনকার বর্তমান gate-টা বন্ধ করে দিবি। কারণ ঐ gate-টা বেশীদিন থাকলে আশ্রমের বাস্তুবিজ্ঞানের ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে। তখনকার main gate-এর একদম ডানদিকে অর্থাৎ অগ্নিকোণে রান্নাঘর তৈরি করে নিবি। বায়ুকোণে পায়খানা বাথরুম থাকবে কয়েকটা। আর ঈশানকোণে তো ঠাকুরঘর করেছিস –তাহলে বাস্তুবিজ্ঞান মেনে সব construction হয়ে যাবে। আমাদের প্রতিটি আশ্রমই ধীরে ধীরে বাস্তুবিজ্ঞানসম্মত ভাবে গড়ে উঠছে। বনগ্রাম মিশনেই কত গণ্ডগোল ছিল, ঈশানকোণে পায়খানা-বাথরুম ছিল – এখন এগুলো ভেঙে ঠাকুরঘর তৈরি হয়েছে। ফলে ওখানে যা disturb ছিল তা কেটে গেছে। তোদের এখানে জায়গা পাওয়ার খুব একটা সমস্যা নেই। ঐ জমিগুলো তো আশ্রমের ভক্তদের, একটু কথা বলবি—দেখবি ঠিক আশ্রমের হয়ে যাবে। তোদের এখানে বেশীর ভাগ মানুষের liver ভালো নয়, T.B রোগও রয়েছে বংশানুক্রমিকভাবে, এখানকার জলে প্রচুর পরিমাণে iron রয়েছে—তাই মুখে-গায়ে ছোপ রয়েছে বেশীরভাগ মানুষের। ফলে homeo treatment-এ এখানকার মানুষ খুবই সুফল পাবে। এখানে একটা যোগাসন শিক্ষার class শুরু করে দিতে পারিস। আমি তো বেশ কিছু সহজ যোগাসন বনগ্রাম আশ্রমে শিখিয়ে দিয়েছি। মুরারী মহারাজ ওগুলো সকলকে শেখাচ্ছে। যারাই regular করছে, তারা ভালো কাজ পাচ্ছে। কিছু regular আসন আর নয় প্রকার সহজ আসন (জীবনতত্ত্ব) সকলকে শেখাতে শুরু করেছে। যদি স্থানীয় যুবক ছেলেরা আকর্ষিত হয় তখন মূল আশ্রমের যে ছেলেরা যোগাসনে training করেছে বা আশ্রমের যে ছেলেরা যোগাসন ভালো করে, তাদেরকে মাঝে মাঝে নিয়ে এসে special training-এর ব্যবস্থা করে দিবি। আমি অনেক মায়েদের দেখেছি যারা প্রণাম করতে আসছে বা সৎসঙ্গ শুনতে আসছে, এদের বেশীর ভাগেরই গালে মেছেতার দাগ। এগুলো liver বা kidney খারাপের লক্ষণ। এখানকার মানুষ খুব বেশী মুড়ি খায়। এখানকার বেশীর ভাগ family ঘরে বালি-খোলায় মুড়ি ভাজে। ফলে পোড়া সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বালি এমনকি অভ্র এসব পেটে গিয়ে এইসমস্ত রোগগুলো ঘটায়। মুড়ি খাওয়া একদম বন্ধ করে দিলে মুখের মেছেতা নষ্ট হয়ে যাবে।

এই আশ্রমের দক্ষিণদিক বরাবর সাধুদের থাকার ঘর হবে। আর এই দিকে পূর্বদিকের মাঝামাঝি জায়গা দিয়ে একটা সোজা রাস্তা নদীর ধার পর্যন্ত চলে যাবে, যেদিক দিয়ে আশ্রমের ব্রহ্মচারী-সাধুরা নদীতে স্নান করতে যাবে। এই অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য ততটা ভালো নয়। হোমিওপ্যাথিক সেন্টার, যোগ-সেন্টার তৈরি হলে স্থানীয় মানুষ খুবই উপকৃত হবে। আমাদের করিমপুর আশ্রমে চক্ষু অপারেশন শিবির বসছে, ওখানে প্রায় বিনামূল্যে রোগীদের চোখ operation করা হয়। আশ্রমিকরা এবং স্থানীয় ভক্তরা রাতদিন সেবামূলক মনোভাব নিয়ে ওখানে রোগীর সেবা করে ও তাদের সুস্থ করে তোলে । ঐরকম সেবাকার্যে ঈশ্বর সবচেয়ে বেশি খুশি হন। এক একটা যুগ এক একটা বিশেষ কাজের জন্য নির্ধারিত। ঈশ্বরকল্প মহাপুরুষগণ যখন পৃথিবীতে আসেন, তখন এইজন্যই তাঁদের যুগাবতার বলা হয় । প্রেমের ঠাকুর শ্রীচৈতন্যদেব এসেছিলেন প্রেম বিতরণ করতে, তিনি কলিহত জীবের জন্য বিধান দিলেন, “হরিনাম সংকীর্তন” করার। খোল-করতাল সহযোগে কীর্তন করলে আর “হরে কৃষ্ণ” মহামন্ত্র জপ করলেই জীবের মুক্তি। উনি দেখেছিলেন যে, তৎকালে মুসলমান- শাসিত সমাজ ব্যবস্থা। দুঃখ-দারিদ্র, শাসকের অত্যাচার ও শোষণে সাধারণ মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। বীরভাব নেই, তাই তিনি “হরিনাম” সংকীর্তনের বিধান দিয়েছিলেন। খোল ও করতালের শব্দে আর লম্ফ-ঝম্ফ করলে কুলকুণ্ডলিনীর ক্রিয়া শুরু হয়, শরীরে পুলক জাগে, অশ্রুপাত হয়, অর্থাৎ শরীরে অষ্টসাত্ত্বিক বিকারসমূহ প্রকাশ পায়। মানুষ যতক্ষণ হরিনাম-সংকীর্তন করে অন্তত ততক্ষণ তার শরীর মন এক অপার্থিব আনন্দের স্পর্শ পায়। এইভাবে practice করতে করতে মানুষের অন্তর্জগতেরও পরিবর্তন সাধিত হয় এবং মানুষটি কালক্রমে ধার্মিক হয়।

কিন্তু ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের যুগ সেবাকার্যের যুগ। স্বামী বিবেকানন্দ সেই যে সংকল্প করেছিলেন—“যদি কোন দিন আসে, তো জগৎকে শোনাব – “জীবে দয়া” নয় শিবজ্ঞানে জীব সেবা।” এই সেবাকার্যেই এ যুগে ঈশ্বর অধিক প্রসন্ন। সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও সেবাকার্য চালিয়ে যেতে হবে—তাহলে তোমাদেরও আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে। ধ্যান-জপ ঠিকমতো অভ্যাসের পর যদি সেবাকাজ করতে পারো তাহলে তা সবচেয়ে ভালো। ধ্যান-জপ করার সময় নেই, শুধুই নিঃস্বার্থ সেবাকার্য করে যাচ্ছ—তা ভালো অপেক্ষাও ভালো। ধ্যান-জপ তো বহুদিন হ’ল–এর দ্বারা কার কতটা উন্নতি হয়েছে বল দেখি। মুখে হরিনাম করছে, সর্বাঙ্গে তিলক কাটছে আবার বছর বছর সন্তান হচ্ছে, নয়তো প্রতিবেশীর সঙ্গে মামলায় মিথ্যা সাক্ষি দিচ্ছে। মনের ময়লা দূরীভূত না হলে—ধ্যান-জপে লাভ কি ? ধ্যান-জপের উদ্দেশ্য তো চিত্তশুদ্ধি। চিত্তে মল রয়েছে, সেগুলোকে দূর করতে হবে। কামনা আর বাসনা হচ্ছে চিত্তের মল। জগতে যতকিছু চাওয়া-পাওয়া, না পাওয়ার যন্ত্রণা, প্রতিবাদ, পাওয়ার প্রতিযোগিতা, রক্তপাত, সংগ্রাম সবই চিত্তে প্রসুপ্ত রয়েছে। এগুলিকে প্রবৃত্তি বলা হয়। এই প্রবৃত্তি-সমূহের লয়ই সাধনার উদ্দেশ্য। সাধন- ভজনও চলছে প্রবৃত্তিরও দাসত্ব হচ্ছে—এটা কেমন সাধন-ভজন ? তাই এই যুগে ঐ সাধনার সঙ্গে তোমরা সেবামূলক কাজে নিঃস্বার্থভাবে ঝাঁপিয়ে পড়। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় যে যতটা সেবা কাজ করতে পারো কর, নাহলে কোন না কোন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাও। সেখানে তো সেবামূলক কাজ হচ্ছেই—সিন্ধুতে বিন্দুর মতো তুমিও তার অংশ হয়ে যাও। সহজেই ঈশ্বরের প্রিয় হবার এটা একটা অন্যতম উপায়। স্বামী বিবেকানন্দের পর থেকে এখন “সেবাই সাধনা”-র যুগ। এমনিতেই দেখবে বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন দাতব্য চিকিৎসালয়, চক্ষু অপারেশন শিবির ইত্যাদি করে। তাছাড়াও বিভিন্ন ক্লাব, বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা, বিভিন্ন NGO-এরাও Blood- donation camp, চক্ষু-শিবির, দাতব্য চিকিৎসা, বস্ত্র বিতরণ, পুস্তক বিতরণ ইত্যাদি সেবামূলক কাজে খুবই ব্রতী হয়েছে। এগুলোকেই বলে যুগ-প্রভাব। যদিও এখনও নবদ্বীপের চৈতন্য গোঁসাই-এর প্রভাব যথেষ্টই রয়েছে তবু সেবামূলক কাজকর্মের দিকেও মানুষ খুবই ঝুঁকেছে। বিদেশের বিভিন্ন organization এখন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় প্রচুর সেবামূলক কাজ চালাচ্ছে। বন্যাপীড়িত অঞ্চলে বা যে কোন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মানুষের কাছে হরিনাম সংকীর্তন অপেক্ষা খাদ্য ও ত্রাণ-সামগ্রী পৌঁছে দেওয়াটাই তো মানবিক—তাই নয়কি ? এই কাজগুলি বিভিন্ন ধর্মীয় সংস্থা ও বিভিন্ন N.G.O বা বেসরকারী সংস্থা খুবই সুন্দরভাবে পালন করে থাকে। পরমানন্দ মিশনের সমস্ত শাখাতেই সেবামূলক কাজ করার জন্য নির্দেশ দেওয়া আছে। শাস্ত্রে রয়েছে, অন্নদান, বস্ত্রদান, শিক্ষাদান অপেক্ষাও জ্ঞানদান অর্থাৎ অধ্যাত্মবিষয়ক শিক্ষাদানই সর্বশ্রেষ্ঠ দান। তাই আমি যখনই মিশনের যে কোন শাখায় যাই সেখানে সকাল-সন্ধ্যায় সৎসঙ্গ বা সৎপ্রসঙ্গ আলোচনা করি। পরবর্তীকালে যারা ঐসব শাখায় থাকবে তারাও সকাল-সন্ধ্যায় সৎপ্রসঙ্গ আলোচনা করবে, সদগ্রন্থ পাঠ করবে বা সকলকে পাঠ করে শোনাবে। সাধারণত সংসারী মানুষ সংসারের ত্রিতাপ জ্বালায় সর্বদা জ্বলছে। একটু সুখ বা শান্তির সন্ধানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছুটছে মানুষ। রুজি-রোজগারের জন্য, পরিবার প্রতিপালনের জন্য, রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তির জন্য, নানান ঝামেলা- ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্ত হবার জন্য কি না করতে হচ্ছে মানুষকে। কিন্তু দ্যাখো মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, সুখ বা শান্তি তো বাজারে কিনতে মেলে না। কেউ কেউ বলে সুখ স্বপনে, শান্তি শ্মশানে। কিন্তু তাও ঠিক নয়, কারণ মানুষ সুখের স্বপ্ন অপেক্ষা দুঃখের স্বপ্নই বেশী দেখে। দুঃস্বপ্ন দেখতে দেখতে মানুষ ঘেমে যায়, কেঁদে ফেলে, ভয়ে চিৎকার করে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। ফলে “সুখ স্বপনে” কথাটিও ভুল। আবার “শান্তি শ্মশানে” বলতে কি বোঝানো হচ্ছে, শ্মশানে যারা যায় তাদের মধ্যে সাময়িক একটা বৈরাগ্য আসে। এরফলে তাৎক্ষণিক মনে বিষয়-বৈভব, সংসার, ঝামেলা ইত্যাদির ব্যাপারে একটা উদাসীনভাব আসে, এটাকে অনেকে শ্মশানবৈরাগ্য বলে থাকে। কিন্তু সবসময় তাও হয় না—কারণ শ্মশানে গিয়ে নিজেদের মধ্যে হৈ-চৈ, এমনকি মারপিটও হতে দেখেছি। আর যদি মৃত্যুকে শান্তি বলা হয় তাহলে তো সর্বৈব ভুল। কারণ একটি দেহের মৃত্যু তো মহামৃত্যু নয়। বারবার জন্ম-মৃত্যুর যে চক্র চলছে অনাদিকাল থেকে, তার একটা অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যাওয়াটাই একটি দেহের মৃত্যু। এখানে শান্তি কোথায় ? কামনা-বাসনার পরিতৃপ্তি বা পরিসমাপ্তি যতক্ষণ না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বারবার যাওয়া আর আসা। একটি শরীর নষ্ট হচ্ছে, নতুন একটি শরীরলাভের প্রত্যাশায়। আবার শৈশব, কৈশোর …. ইত্যাদি ক্রম, আবার আদি-ব্যাধি, জীবন সংগ্রাম—এখানে permanent শান্তির অবকাশ কোথায় ? যতদিন না মানুষ পূর্ণত্ব প্রাপ্ত হচ্ছে—তার চাওয়া-পাওয়ার অবসান না ঘটছে, ততদিন জন্ম-মৃত্যু বা যাওয়া-আসার ক্রমও বন্ধ হবে না।

সেইজন্যই বলছিলাম শাস্ত্রে অন্নদান, বস্ত্রদান, শিক্ষাদান অপেক্ষা জ্ঞানদান বা অধ্যাত্ম শিক্ষার দানকে শ্রেষ্ঠদান বলেছে। কারণ একমাত্র অধ্যাত্ম শিক্ষাই মানুষকে সঠিক মাৰ্গ নির্দেশ করে। যে মার্গ বা পথ অবলম্বন করে মানুষ পূর্ণ হয়। জন্ম-মৃত্যুর আবর্তনে আর তাকে ফিরে ফিরে আসতে হয় না।

যাইহোক, এই বারেন্দা আশ্রমেও কাজ হবে। এটা দেখবে পরবর্তীকালে এই অঞ্চলের আধ্যাত্মিককেন্দ্র হবে। পূর্ব পূর্ব কোন কার্য-কারণে গঙ্গা-তীরবর্তী কোনস্থানে এই কেন্দ্রটি হবার কথা ছিল, কিন্তু মা জগদম্বার ইচ্ছায় ঐ স্থানটি পরিবর্তিত হয়ে কেন্দ্রীভূত হয়েছে এই বারেন্দা আশ্রমে। তাই এর ভবিষ্যৎ রয়েছে—বহু মানুষ আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক এই ত্রিবিধভাবে এখান থেকে উপকার লাভ করবে। আর এই সমস্ত অঞ্চল বৈষ্ণব অধ্যুষিত এলাকা, হরিনাম-সংকীর্তন চালু করে গ্রামে ভিক্ষা করলেই ৫/১০ হাজার লোকের মহোৎসব করাটা এখানে খুবই easy । অজয় নদের দু’ধারে বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয় বটে, কিন্তু বন্যার পলিমাটি ফসলের পক্ষে খুবই উর্বর। তাই ধান, আলু, আখ, পাট ইত্যাদি ফসল এখানে খুবই বেশী পরিমাণে হয়। তাই গ্রামের কৃষক পরিবার হয়তো ২০০/৫০০ টাক। দিতে পারবে না, কিন্তু ৫/১০ কেজি চাল বা আলু দিয়ে দেবে অক্লেশে। এই ভাবে কোন মহোৎসবে যা চাল বা আলু জোগাড় হয়—সেগুলির কিছু অংশ বিক্রি করে নুন-তেল-জ্বালানির খরচ হয়ে যায়। এভাবেই এই সব অঞ্চলে গ্রামে গ্রামে কথায় কথায় মহোৎসব বা মোচ্ছব হয়।

আমি এই সমস্ত অঞ্চল পায়ে হেঁটে হেঁটে খুবই ঘুরেছি, তাই এই অঞ্চলের মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং কর্ম-পদ্ধতির বিষয় জানি। এখান থেকে কিছু দূরে গোপালদাস বাবাজীর স্মরণে বৈরাগ্য-তলার মেলা হয়। ওখানে বিভিন্ন আখড়ায় মোচ্ছব হয় এবং ওখানে মানুষকে ডেকে ডেকে খাওয়ানো হয়। পরিচিত অপরিচিত নির্বিশেষে মানুষকে অন্নপ্রসাদ দেওয়া হয়। ভারতবর্ষে আর কোথাও এভাবে এত বেশী সংখ্যক মানুষকে আহ্বান করে আগ্রহ সহকারে ভোজন করানোর ব্যবস্থা রয়েছে বলে আমি দেখিনি। কুম্ভমেলা, সাগরমেলা বা বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্রে ও সাধারণ মানুষকে খাবার দেবার ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু সেগুলি বেশীর ভাগ মাড়োয়ারী বা ধনী ব্যবসায়ীদের দেওয়া ভাণ্ডারা। ওখানে বিভিন্ন সংকল্প কাজ করে, তাই ভাণ্ডারা খেলে সাধুর সাধন- জীবনে হানি হয়। কিন্তু বৈরাগ্য-তলার মেলা বা এই ধরণের মহোৎসবের অন্ন খেলে কোন অকল্যাণ হয় না। ওখানকার অন্ন শুদ্ধ অন্ন। মানুষকে নিঃস্বার্থভাবে সেবার মানসিকতা নিয়ে পাঁচ বাড়ী থেকে collection করে ঐসব অন্নমহোৎসব করা হয়, কোন গরীবের রক্তচোষা পয়সা বা শিশুখাদ্যে ভেজাল মেশানো অথবা জাল ওষুধ বিক্রি করা পয়সা নয়। এই অঞ্চলে একটা প্রবাদ রয়েছে যে, মোচ্ছব (মহোৎসব) খেলে শরীরের রোগ-ব্যাধি ভালো হয়ে যায়। তাই যারা আসে তারা প্রসাদ খায় এবং যারা আসতে পারে না, প্রচলিত বিশ্বাসে তাদের জন্য প্রসাদ বাড়ীতে বয়ে নিয়ে যায় এবং বাড়ীর সকলকে ঐ প্রসাদ মুখে ঠেকিয়ে দেয়।

তোমাদের অঞ্চলে তন্ত্রেরও খুব প্রাধান্য ছিল এক সময়। প্রাচীন কালীমন্দির বা শক্তিপূজার স্থান রয়েছে স্থানে স্থানে। তোমাদের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা মা, আর উত্তর-পশ্চিমে দেবী অট্টহাস পীঠ রয়েছে। তাছাড়া এই সমস্ত অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি গ্রামেরই গ্রাম্যদেবতা শিব বা মহেশ্বর। শ্রীখণ্ডে ভূতনাথ, তোমাদের পাশেই যে বিল্লনাথ—এগুলি শিবেরই নাম। আমি বহুপূর্বে এই সমস্ত অঞ্চল ঘোরার সময় যোগদ্যা মন্দির, অট্রহাস, শ্রীখণ্ডের ভূতনাথ মন্দিরে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কয়েক রাত করে কাটিয়েছি। ছোটবেলায় আমি যখন এই সমস্ত মন্দিরে রাত কাটিয়েছি তখন ঐ সবস্থান রাত্রে জনশূন্য হয়ে যেতো। কিন্তু কিছু মাতাল বা গেঁজেল অথবা দুষ্কৃতিরা তখন এসে ঐস্থানগুলি দখল করত। আমি মজা দেখতাম। সারদা মা ঠিকই বলেছেন—আমি সতেরও মা, অসতেরও মা। আর বাবা তো ভোলানাথ, তাঁর কোন কিছুতেই আসক্তিও নেই আবার বিরক্তিও নেই। তাই শিবের মন্দিরে বা মায়ের স্থানে সবরকম ভক্তেরই অবাধ প্রবেশ। তবে তোমাদের কাটোয়ার কাছে গঙ্গার ধারে একদল ভৈরব- ভৈরবী আমাকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মায়ের ইচ্ছায় ওদের ভৈরবী-চক্র ভেঙে যায় এবং ভৈরব ওদেরকেই আক্রমণ করে। ফলে ওরা চক্র ভেঙে পালাতে বাধ্য হয়। আর কাটোয়া-শ্মশানে একজন অঘোরপন্থী সাধু থাকতেন (১৯৭০-৭৫ সাল), যিনি নরমাংস খেতেন। নরমাংস মানে ভেবো না যে জ্যান্ত মানুষ মেরে খেতো, শ্মশানে যখন শবদেহ পুড়তো তখন শবদেহের বিশেষ বিশেষ অঙ্গ,মড়া-পোড়ানো লোকগুলি কৌশলে ওনাকে সরবরাহ করত, উনি যেগুলি খেতেন। শিষ্য হিসাবে যারা থাকত, তারাও প্রসাদ পেতো। আমার সাথে ওনার খুব ভাব হয়েছিল—দেখেছিলাম উনি একজন যথার্থ অঘোরী ছিলেন। খুব ভালো মানুষ ছিলেন, উপরটা একটু কঠোর, কিন্তু ভিতরে স্নেহের প্রবাহ ছিল।

বারেন্দা আশ্রমের সন্নিকট কাটোয়া, যা একটা developing শহর। বর্ধমান জেলার বর্ধমান শহরের মতোই কাটোয়ারও উন্নতি হচ্ছে খুব। বিশেষত শহরটি দ্রুত বাড়ছে। আশেপাশের গ্রাম-গঞ্জ থেকে যারই সামর্থ্য রয়েছে, সেই কাটোয়াকে কেন্দ্র করে থাকতে চাইছে। শহরে থাকলে Education, Health, এবং Security-র একটা সুবিধা পাওয়া যায়। তাছাড়া নাগরিক জীবনের একটা সুবিধা তো রয়েছেই। এখানে Railway Station রয়েছে, হাওড়া এবং North Bangal এর সাথে যোগাযোগ সহজেই করা যায়। আর Bus-যোগাযোগ রয়েছে দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের প্রায় সমস্ত জেলার সঙ্গে। তাই কাটোয়ার উন্নতির সাথে সাথে এই আশ্রমটির উন্নতিও নির্ভরশীল হবে, কারণ কাটোয়ার মানুষ যতবেশী এই আশ্রমে আসতে থাকবে—ততই এই আশ্রমের শ্রীবৃদ্ধি হবে। তাছাড়া আমাদের আশ্রমের শাখা রয়েছে আজিমগঞ্জ, মালদহ, রসবেরুলিয়া ইত্যাদি স্থানে। আমাদের মূল আশ্রম বনগ্রাম থেকে যে ত্রৈমাসিক ‘চরৈবেতি’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়, সেটির circulation -এ এই আশ্রম একটা ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। চরৈবেতি কার্যালয় থেকে ওরা হয়তো ঐ সমস্ত আশ্রমগুলির মোট বই এই আশ্রমে গাড়ি করে পাঠিয়ে দিল। এবার এখান থেকে ঐ আশ্রমগুলিতে বইগুলি পাঠানোর ব্যবস্থা হল বা ঐ আশ্রমগুলি এখান থেকে বইগুলি collection করল। এতে দূরবর্তী আশ্রমগুলির মহারাজদের আর কষ্ট করে বনগ্রাম পর্যন্ত যেতে হ’ল না। এইভাবেই দেখবে পরবর্তীকালে এই আশ্রমটি নানাবিধ কাজ করবে।