জিজ্ঞাসু — চীনে তো বৌদ্ধধর্মের প্রভাব – তাহলে চীনের সাথে কি ভারতের চিন্তার মিল রয়েছে ?
গুরুমহারাজ—কোথায় মিল পেয়েছ ? চীনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ওরা চিরকালই আস্তিক্যের প্রতিবাদী। বৌদ্ধধর্ম যেহেতু বেদের প্রতিবাদী তাই বৌদ্ধধর্ম ভারতবর্ষ থেকে গিয়ে ওদেশে স্থান করে নিতে পেরেছিল। ভারতের সঙ্গে চীনের যোগাযোগ তো বহুকালের—ভারতের কোন দিকটার সাথে ওদের মিল রয়েছে বল—ভারতের কি ওরা গ্রহণ করেছে ? বরং নেহেরুর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ১৯৬৭ খ্রীষ্টাব্দে ভারত-চীন যুদ্ধের সময় “ইন্দি- চীন বাই-বাই (ভাই ভাই)” বলতে বলতে চীনা সৈন্যবাহিনী এগিয়ে এসে ভারতের বেশ খানিকটা অঞ্চল আজও দখল করে বসে আছে। আর ওদের আস্তিক্যবিরোধী চিন্তা থেকেই কিন্তু ওরা আজও com – munist. পৃথিবীতে বিভিন্ন যে সব জায়গায় communist-এর জন্ম হোল-তারা ঐ system থেকে সরে গেছে, কিন্তু চীন পারল না। নানান ভাবে system পাল্টিয়ে পাল্টিয়েও communism-কে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখার চেষ্টা করবে।
এছাড়া চীনারা মানবতার পূজারি নয়—রক্তপাত, হানাহানি, সংঘর্ষের মধ্যেই থাকতে ভালোবাসে। আজও পৃথিবীতে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী সংগঠন বা সংঘর্ষে লিপ্ত রাষ্ট্রকে ওরা পয়সার বিনিময়ে অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে। এ ব্যাপারে capitalist আমেরিকার সাথে communist চীনের প্রচণ্ড মিল পাবে। সুতরাং এসব দেখে শুনে একটা ব্যাপারেই আমি বেশী জোর দিতে চাই—কে কোন ধর্মের, কে কোন system-এর লোক এসব দিয়ে বিচার কোর না, বিচার করবে তার বা তাদের চেতনার উন্নতি দিয়ে। পৃথিবীর কথা কে ভাবছে, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের কথা কে ভাবছে—তাই দিয়েই চেতনার উন্নতি বোঝা যায়। ভারতীয় ঋষিদের চিন্তা চীনে কোথায় পাবে ? একমাত্র কনফুসিয়স, কিন্তু চীনারা তো তাঁর দর্শনকে গ্রহণ করেনি, বরং মা-ও-সে-তুং-মার্কসবাদ গ্রহণ করায় যে লঙ মার্চ (Long march) বা সাংস্কৃতিক বিপ্লব হয়েছিল তাতে প্রায় ১৭ লক্ষ দেশবাসী (বেশীর ভাগই বুদ্ধিজীবী)-কে মেরে ফেলল। তারপর চীনে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘদিন লালফৌজের শাসন চালাল, আর মৃত্যুর পূর্বে ডায়েরীতে লিখে গেল “সাংস্কৃতিক বিপ্লব করতে যাওয়া ঠিক হয়নি।” আহা ! Experiment-এর কি পদ্ধতি ! কয়েক দশক ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষের রক্তে হোলি খেলে—কোটি কোটি মানুষের জীবনকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলে অকপট স্বীকারোক্তি করলেই হয়ে গেল ? এটা ঐতিহাসিক ভুল ছিল ! একি experiment ? মানুষ কি গিনিপিগ্ নাকি ? Cummunist নেতারা হয়ত তাই ভাবে মানুষকে । কিন্তু চীনে ভারতবর্ষ থেকে গিয়ে রয়ে গিয়েছিলেন কিছু সাধুসন্ত—তাঁদের পরম্পরা রয়েছে “তাও”। এরা বাউল, মানুষের জয়গান গায়। এখানে তো বাউলেরা মানুষকে বলে “মানুষ রতন”, “মনের মানুষ”, “সোনার মানুষ”, মানুষের প্রতি কি মর্যাদা ! মানুষ হয়ে মানুষকে মর্যাদা দেয় না যে, সে আবার কি নেতা ? তা সে ধর্মনেতাই হোক আর রাজনেতাই হোক! ‘বাউল’ আমার এই জন্য ভালো লাগে। বাউল বলে— ‘সহজ মানুষ’, ‘সহজ’ হবার জন্যই সাধনা আর বাকীরা যেন ‘জটিল’ হবার সাধনায় মেতেছে। যাইহোক কথা হচ্ছিল চীনা পরম্পরার সাথে ভারতীয় পরম্পরার পার্থক্যের ব্যাপারে।
চীনারা তো মানুষকে নিয়ে ঐভাবে গবেষণা করে আর ভারতীয় পদ্ধতি দেখো—তাঁরা নিজেরা নিজের জীবনকে সমাজের কল্যাণে বা সমগ্ৰ মানবজাতির কল্যাণে উৎসর্গ করে দিয়ে গিরি, গুহা, অরণ্যে বা কোন নির্জন প্রান্তরে যোগের গভীরে, ধ্যানের গভীরে ডুবে জগৎরহস্য, জীবনরহস্যের উপলব্ধি বা বোধের ফসল তুলে নিয়ে এসে ঐ মানবকল্যাণমূলক, জগৎকল্যাণমূলক চিন্তারাশি জগৎকে উপহারস্বরূপ দিয়ে যাচ্ছেন। এঁরাই যথার্থ মানবপ্রেমিক—মানবদরদী বাউল, যথার্থ সন্ন্যাসী বা প্রকৃত সাধু। কথায় রয়েছে “পুড়বে সাধু উড়বে ছাই— তবে সাধুর গুণ গাই।” প্রকৃত সাধু নিজেকে পুড়িয়ে জীবনপাত করে ধূপের গন্ধ ছড়ানোর মতোই সমাজের কল্যাণ করে যান। এক্ষেত্রে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করো যে, ঐ যে ভারতীয় সাধকরা যাঁরা নিজের জীবনে কোন একটা মতকে গ্রহণ করে তার গভীরে ঢুকে প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান করে তুলে আনছেন, তাঁদের যদি কোন ভুল হয় তাহলে সেই সাধকেরই একটা জীবন গেল – সমাজের কোন ক্ষতি হোল না। এইভাবেই প্রকৃত সাধু বা মানবের প্রকৃত কল্যাণকারীকে সাধারণ মানুষ কখনও চিহ্নিত করতে পারে না। কারণ চেতনায় মানুষ এখনও তত উন্নত নয়। নাহলে ভাবো না বারবার যীশু, বুদ্ধকে মেরে ফেলে মানুষ ! এরপরও মানুষ সভ্যতা ও উন্নতির গর্ব করে ! উন্নত চেতনার মানুষেরা জানেন—মানুষের প্রকৃত level-টা কোথায় ! কিন্তু করবেনটাই বা কি? তাদের কল্যাণের জন্যই মহাপুরুষদের আসা। তাই পিতামাতা যেমন সন্তানের সমস্ত অত্যাচার সহ্য করেও তাকে না ভালোবেসে পারে না–তেমনি মহাপ্রেমিক মহাপুরুষগণ জীবজগৎকে ভালোবেসে নিজেকে নিংড়ে নিঃশেষ করে, সমাজের কল্যাণ করেন। তাই কাল সবকিছুকেই গ্রাস করলেও এঁদের মহিমাকে চট্ করে গ্রাস করতে পারে না। বহুকাল ধরে এঁরা মানুষের সমাজে মানুষের ইষ্ট বা আদর্শ হিসাবে থেকে যান বা পূজিত হন। সমকালীন মানুষ তাঁদেরকে ধরতে না পারলেও পরবর্তীকালের মানুষ তাঁদেরকেই পূজা করে, বন্দনা করে—এই ভাবেই চলছে।
জিজ্ঞাসু — সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যা ভারতীয় শাস্ত্রে যেভাবে করা আছে বর্তমান বিজ্ঞানীরা কি সেই একই তত্ত্ব পাচ্ছে ?
গুরুমহারাজ—ভারতীয় ঋষিগণ সৃষ্টিতত্ত্বকে যত সূক্ষ্মাতি- সূক্ষ্মভাবে ব্যাখ্যা করেছে বর্তমানের বিজ্ঞান এখনও ততখানি অগ্রসর হয়নি। যেটুকু হয়েছে তাতেই অবাক হচ্ছে, এরপর জানলে না জানি আরও কত কি হবে ! ঋগ্বেদে বলা হয়েছে ক্ষীরোদসাগর বা পয়োধিজল থেকে প্রণব স্ফুট হয়েছে। ক্ষীরোদসাগর অর্থাৎ cosmic soup | এটা সর্বদা প্লাজমা (plasma) অবস্থায় রয়েছে, এটা matter এর চতুর্থ অবস্থা বা plasmic state (Solid, Liquid, Gaseous, Plasma Space)। তার আগে space বা আকাশ যে অবস্থায় ছিল তা ব্যোমতত্ত্ব । plasmic অবস্থায় ion field-এ বিস্ফোরণের ফলে ‘bang’ অর্থাৎ ‘নাদ’ স্ফুট হল যা প্রণব। বর্তমানের Big bang theory-র সাথে এর সুন্দর সাদৃশ্যও রয়েছে। শাস্ত্রে রয়েছে প্রণব অনাহত নাদ যা কোন শব্দ নয়। শব্দ সৃষ্টি হয় তরঙ্গের সংঘাতজনিত ক্রিয়ায়, তাই শব্দ আহত যার ইংরাজী প্রতিশব্দ হবে noise / sound । কিন্তু প্রণব অনাহত, এর ইংরাজী প্রতিশব্দ tune, “Eternal tune” এর রূপ বর্ণনায় একে জ্যোতির্ময় বলা হয়েছে। জ্যোতি কিন্তু আলো নয়। Photon কণার তরঙ্গ অভিঘাতজনিত ক্রিয়ায় আলো সৃষ্টি হয় আর জ্যোতি cosmic soup থেকে সৃষ্ট।
বর্তমান বিজ্ঞানীরা cosmology-র অনেকটাই গভীরে প্রবেশ করেছে কিন্তু সেটাই বা কতটা ? বিজ্ঞানীরাই বা কি করবে – সামর্থ্য তো সীমিত। এই সৌরমণ্ডলের সব গ্রহগুলোর রহস্যই জানা হয়ে উঠল না তো পরবর্তী সৌরমণ্ডলের খবর কি করে পাবে ? তারপর অন্য galaxy বা অন্য নীহারিকাপুঞ্জ সে সবের খবর দূর-অস্ত। এইখানেই বর্তমান বিজ্ঞানীদের limitation. বিজ্ঞানীরা তাই এখন একটা মূলসূত্রের অনুসন্ধান করতে চাইছে—যেটাকে ধরলে সবকিছু ব্যাখ্যা করা সম্ভব ? পদার্থ বা শক্তি বা যে কোন তত্ত্বের reality কি ? Modern Science-এ এটাই crisis- what is reality ? আইনষ্টাইন বলেছিলেন বস্তুর অস্তিত্ব নেই, বস্তু শক্তিতে বা শক্তি বস্তুতে রূপান্তরিত হতে পারে। তারপর তো বহুদিন কেটে গেল— কত বিজ্ঞানী ক্ষত কি গবেষণা করে কত পুরস্কার পেল কিন্তু কেউ কি reality-র সন্ধান দিতে পারল ? এখানেই চরম ব্যর্থতা। কি বলতে চাইছি বুঝতে পারছ কি—ধরো ওই যে আমগাছটা দেখছ, এটাতো visualization, realisation নয়। কারণ যা কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সে সবই তো relative, রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শ ও গন্ধ। সাধারণভাবে দেখা গেছে যে, মানুষ কোন পদার্থের যা বর্ণ দেখে গরু-আদি অন্যান্য প্রাণীরা সেই সেই বর্ণ সেভাবে দেখে না। আবার বিজ্ঞানীরা বলছে- –যে বর্ণ দেখছ তা তার বর্ণ নয়, সেটা আলোর সাতটা রঙের খেলা। যার যা বর্ণ দেখছ তার মধ্যে আলোর বাকি রঙকে প্রতিফলিত করার ক্ষমতা রয়েছে শুধু ঐটি ছাড়া। তাই তুমি ভাবছ পদার্থটি ঐ রঙের। কি ভাঁওতা ! বলতে পারো সবটাই ভাঁওতা। আবার দেখা গেছে · কীট-পতঙ্গ, পাখী বা পশুদের ঘ্রাণশক্তি, দৃষ্টিশক্তির যা প্রখরতা বিবর্তনে শ্রেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে তা নেই। তাহলে এ সবই relative।
এবার কোন বস্তুর রূপকে কিভাবে ধরা হয় তার বিশ্লেষণ করা যাক। প্রথমেই দ্যাখো, “চোখে দেখা” কথাটাও ঠিক নয় কারণ চোখ বা চক্ষু অনেকগুলি প্রত্যঙ্গ নিয়ে গঠিত। এদের মধ্যে retina যেন lense, বস্তুর উপর পড়া আলো lense দিয়ে ভিতরে ঢুকে একটা sensation সৃষ্টি করে। যা মস্তিষ্কের visual system সংক্রান্ত কোষগুলিকে vibrate করে এবং দর্শনের অনুভূতি হয়। সুতরাং কোন রূপ দর্শনও একটা system যা অনেকগুলি stage-এর মধ্যে দিয়ে এবং অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কোষকলার সাহায্যে ঘটে থাকে। এইগুলির কোন স্থানে ব্যাঘাত ঘটলেই দর্শনের ব্যাঘাত ঘটে। একজন সাধারণ চক্ষুষ্মান ব্যক্তি কোন বস্তুকে যে অবস্থানে যেমন দ্যাখে, একজন ‘ট্যারা’ ব্যক্তি তেমনটি দেখেনা। তাছাড়া বর্ণান্ধ ব্যক্তি রয়েছে যারা বর্ণ ঠিকমত চিনতে পারে না বা বুঝতে পারে না। রাতকানা ব্যক্তি দিনেঠিকঠাক দেখে কিন্তু রাত্রে ভালো দেখতে পায় না। তাই রূপদর্শন যেন একটা project আর এর মূল হচ্ছে স্পন্দন বা vibration | কারণ আলোও নিজেই একটা vibration। এটি চোখের অভ্যন্তরে স্নায়ুগুলিকে vibrate করছে—যে vibration মস্তিষ্ক কোষে পৌঁছে যাচ্ছে এবং সেখান থেকেই রূপটি নির্ধারিত হয়ে তোমার সামনে প্রতীয়মান হচ্ছে। আবার দ্যাখো যে বস্তুটির রূপ তুমি দেখতে চাইছো – সেটিও তো অসংখ্য অণু-পরমাণু নিয়ে গঠিত। পরমাণুগুলি আবার ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ইলেকট্রনগুলি প্রচণ্ড বেগে ঘূর্ণায়মান। এইগুলিকে ভাঙলে আবার ‘কোয়ার্ক’ পাচ্ছ ? এদের মধ্যে megatone, cytroproton যাদের life period সেকেণ্ডেরও দশমিক ভগ্নাংশ। তাহলে তোমার দৃশ্য বস্তুটি যদি আমগাছ হয়— ওটি আর আমগাছ রইল কোথায় ? শুধু অসংখ্য সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জিনিসের স্পন্দিতরূপ। তাহলে সবকিছুর জন্য দায়ী স্পন্দন বা vibration | বেদে একে স্পন্দতত্ত্ব বলা হয়েছে। এটি Cosmic dance—মহাকালের নৃত্য বা মহাকালীর নৃত্য। বিজ্ঞানীরাও চাইছে এমন কোন তত্ত্ব, যা দিয়ে সবকিছুর বিশ্লেষণ বা মীমাংসা করা সম্ভব— যা সামান্য বস্তুকণার ক্ষেত্রেও যেমনভাবে প্রযোজ্য হয়ে সত্য উদ্ঘাটনে সক্ষম ঠিক তেমনি Inter Planatory matter অথবা Galaxy কি Milky way-র ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হবে বা সত্য উদ্ঘাটন করবে, সকলকিছুর রহস্য অবগত করাবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তেমন কোন তত্ত্বের সন্ধান বর্তমান বিজ্ঞানীরা পায়নি। আর্য্যঋষিরা বললেন স্পন্দতত্ত্ব vibra- tion theory। রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ ও স্পর্শ সবই তন্মাত্রা, আর এগুলি সবই vibration-এর পার্থক্যজনিত অবস্থা। কোন কিছুই নিত্য নয়, vibration change করলেই এক অবস্থা অন্য অবস্থায় বা এক তন্মাত্রা অন্য তন্মাত্রায় রূপ নেবে।
ঋষিরা বললেন ‘ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা। মিথ্যা অর্থে অসত্য নয়—চিরন্তন নয়—unreal বা relative। দ্যাখো বর্তমান বিজ্ঞানীদের গবেষণা ঋষিদের ঐ সিদ্ধান্তেরই সমর্থনের পথে এগোচ্ছে। বৈদিক শাস্ত্রে ব্রহ্মকে অখণ্ড, চৈতন্যময় অদ্বৈত হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আর বলা হয়েছে ব্রহ্ম অণুতে অনুস্যূত ও বিভুতে ওতপ্রোত অর্থাৎ বিশ্ব চরাচর ব্রহ্মেরই প্রকাশ। এবার আধুনিক বিজ্ঞানের বিবর্তনে এস—জগদীশ চন্দ্র বোসের আগে গাছপালার প্রাণের অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেনি, এখন করছে। কিছুদিনের মধ্যেই দেখবে বলবে, “জড়েরও চৈতন্য রয়েছে সবকিছুই চৈতন্যময়।” সবকিছুর মধ্যেই যা কিছু হবার সম্ভাবনা রয়েছে তা শুধু field এবং vibra- tion-এর তারতম্যে প্রকাশের তারতম্য। মৌলিক পদার্থের প্রথম স্থানে থাকা হাইড্রোজেন পরমাণুর vibration পাল্টে তাকে উন্নত অবস্থা দেওয়া যায়। Vibration পাল্টে তামাকে সোনায় পরিণত করাও সম্ভব। জীবদেহের ক্ষেত্রে field হচ্ছে দেহ। সত্তার প্রকাশের তারতম্যে দেহের ভিন্নতা। এই তারতম্য আবার স্বভাবের ভিন্নতাহেতু।
তাহলে যেটা বলছিলাম what is Reality? Reality-র সন্ধান পেলেই বিজ্ঞানীরা অদ্বৈততত্ত্ব বা অখণ্ডতত্ত্বের সন্ধান পেয়ে যাবে। তখন বিজ্ঞানীদের ঋষি বলবে না, বলবে যে ঋষিরাই প্রকৃত বিজ্ঞানী ছিলেন। এখনকার বিজ্ঞানের যেগুলি theory বলা হচ্ছে সেগুলো তো প্রায় সবই hypothesis। কারণ material science যতই অগ্রসর হচ্ছে আগের সূত্রগুলি ততই অসত্য প্রমাণিত হচ্ছে। দু-এক শতক আগে বিজ্ঞানীরা বলত পৃথিবী স্থির সূর্য ঘুরছে, পরে বলল না না সূর্য স্থির পৃথিবী ঘুরছে, এখন বলছে এটাও সত্য নয় —সূর্যও ঘুরছে অন্য কোন বৃহৎ জগৎকে পরিমণ্ডল করে। এইভাবে আগেকার বিজ্ঞানী যেমন কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও ইত্যাদিদের সূত্রকে অতিক্রম করে নিউটন তার সূত্রাদি প্রতিষ্ঠা করল, আইনষ্টাইন আবার নিউটনের মতকে খণ্ডন করে নিজস্ব সূত্র বলবৎ করল। এখনকার বিজ্ঞানীরা আইনষ্টাইনের তত্ত্বেরও নানান অসঙ্গতি বা ত্রুটি ধরে ফেলেছে। এই জন্যই বলছিলাম এখনকার যেটাকে তোমরা Modern Science বলছো সেটা তো একটা চলমান Process ; এখনও তো কোন সিদ্ধান্তে আসা যায়নি যে এটাই সঠিক। কিন্তু বেদ-বেদান্ত আদি শাস্ত্র সিদ্ধান্ত করেছে। তাই Modern Science-এর সঙ্গে বেদাদি শাস্ত্রের এখনও তুলনা করাই মূর্খতা হবে। অখণ্ড তত্ত্বের জ্ঞানই জ্ঞান—সেই অর্থে ব্রহ্মজ্ঞানীই যথার্থ বিজ্ঞানী।
ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন উন্নত দেশগুলি এখন Mate- rial Science-এ চরম উন্নতি সাধন করেছে। ওদের গবেষণাগারও উন্নত আর technology, machinery, পরিবেশ সবকিছুই উন্নত হওয়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মেধাবী student-রা ঐসব দেশে পাড়ি জমাচ্ছে। ফলে ওদের উন্নতিও হচ্ছে দ্রুত। কিন্তু আশ্চর্য, ঐসব মানুষেরা কিন্তু বেদান্তের তত্ত্বসমূহকে গ্রহণ করছে, মর্যাদা দিচ্ছে আর তোমার দেশের অর্ধশিক্ষিত, অল্পশিক্ষিতরা এত পণ্ডিত যে, এর অমর্যাদা করতে চাইছে। তাহলে এদেশের দুর্দশা হবে না তো কার হবে বল ! যাইহোক কথা হচ্ছিল ওদের গবেষণাগারকেন্দ্রিক আবিষ্কার বা বহির্মুখী চিন্তাভাবনার উত্তরণের ব্যাপার নিয়ে। দ্যাখো এইভাবে এগোতে এগোতেও কিন্তু ওরা একদিন পৌঁছে যাবে চরম বা পরম সত্যে। ভারতীয়রা গুরুপরম্পরাগত শিক্ষা থেকে অন্তর্মুখী হয়ে আত্মতত্ত্বের বোধে উন্নীত হয়ে সেই একই তত্ত্বের সন্ধান পায়। তাহলে কি বোঝা যাচ্ছে না যে, প্রথম পদ্ধতি-র চাইতে দ্বিতীয় পদ্ধতি অপেক্ষাকৃত সহজ ও শ্রেষ্ঠ। কিন্তু স্বভাব অনুযায়ী মানুষ নিজেই নির্ধারণ করে পথ। আমিই এখানে বহু মানুষকে অন্য মতে দীক্ষা নেওয়া করিয়েছি। অন্য field-এ কাজ করতে নির্দেশ দিয়েছি। এমনকি অনেককে সংসারী হতে প্রেরণা জুগিয়েছি, কারণ ওগুলি তাদের স্বভাবের অনুকূল, এতে তাদের ultimate মঙ্গল হবে, natural-ভাবে উৎক্রমণ হবে। কিলিয়ে কাঠাল পাকিয়ে কি লাভ–এতে দরকচা মেরে যায়, সুমিষ্ট হয় না আবার ঠিকমতো পুষ্টিগুণও পাওয়া যায় না। স্বভাবানুযায়ী কেউ আত্মতত্ত্ব লাভের জন্য সন্ন্যাস আশ্রমে এসে ব্রহ্মচর্য দীক্ষা নেবে— গভীর নিষ্ঠার সাথে যোগাভ্যাসে নিমগ্ন হবে বা গৃহে থেকেও গুরু- নির্দেশানুসারে সাধনাভ্যাস করে যাবে। কিন্তু যাই করো গভীরে ডুবতে হবে, ধ্যানের গভীরে, জ্ঞানের গভীরে, যোগের গভীরে—এককথায় সাধনার গভীরে ডুব দিলেই অরূপ রতনের সাক্ষাৎ পাবে। অধরাকে ধরাও তো সহজ কথা নয় !
জিজ্ঞাসু—আমরা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের কথা জানি কিন্তু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’ বলেও একটা কথা সাহিত্যে ব্যবহার হয়, এটি কি ?
গুরুমহারাজ—পঞ্চকর্মেন্দ্রিয় বাক্, পাণি, পাদ, উপস্থ ও পায়ু এবং পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়—চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক, আর এদের অধিপতি মন। এছাড়া অতীন্দ্রিয় অন্তঃকরণ চতুষ্টয় হল— মন, বুদ্ধি, চিত্ত এবং অহংকার। কিন্তু কথা হচ্ছে “ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ক্রিয়াশীল” এই কথাটা এল কোথা থেকে—তাইতো ? দ্যাখো, সাধারণ মানুষের brain-cell-গুলির সমস্ত অংশ ক্রিয়াশীল নয় অর্থাৎ cell- গুলির ঠিকমত বিকাশ হয় না। মানবশরীরে perinium থেকে pe- nial অর্থাৎ এই দুটি মেরুর মধ্যবর্তী কতকগুলি endocrine গ্রন্থি রয়েছে যেমন Pre-coccyx, Adrenal, Gonad, Thymus, Thyroid, Pituitary ইত্যাদি। এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলির অসাম্যই মানবশরীরে রোগ সৃষ্টির কারণ আর মানব মনে প্রতিক্রিয়া বা বিকার সৃষ্টির জন্য দায়ী। সাধনার দ্বারা, সংযমের দ্বারা, যোগাভ্যাসের দ্বারা, গুরুর পদপ্রান্তে বসে শ্রবণ, মনন, নিদিধ্যাসন আদির দ্বারা যদি উক্ত গ্রন্থিগুলিকে সাম্য অবস্থায় রাখা যায় তাহলে ধীরে ধীরে মস্তিষ্ককোষের প্রষুপ্ত অংশগুলি খুলে যায়। তখন ঐ সাধকের কিছু বিশেষ অনুভূতি বা উপলব্ধির ক্ষমতা জন্মে। একেই Sixth Sense বলা হয়। যে কোন ভালো মানুষ বা চিন্তাশীল মানুষের জীবনেও মাঝে মধ্যে এরকম একটা বিশেষ অনুভূতির ব্যাপার ঘটতে পারে। ঐ সময় হয়তো তার কুলকুণ্ডলিনী শক্তি ক্রিয়াশীল ছিল তাই ঘটে গেছে। অনেকের জীবনে দেখবে—লাল রঙের স্বপ্ন দেখেছে— পরের দিন রক্তপাত হয়ে গেল, কেউ “যাবো না যাবো না”, করেও বেরিয়ে গেল—accident হয়ে গেল, কেউ একজন ক’দিন ধরেই মৃতদেহ পোড়ানোর গন্ধ পাচ্ছে হঠাৎ তার প্রিয়জন কেউ মারা গেল —এইরকম অনেক কিছুই ঘটে থাকে। তবে এইসব ঘটনাও সবার জীবনে ঘটে না—কারও কারও ঘটে থাকে। যে কারও জীবনে ঘটুক না কেন—জানবে হয় সদগুরুর কৃপায় বা দৈব কৃপায় ঘটেছে অথবা তার কুলকুণ্ডলিনী শক্তি যে কোন কারণে সেই মুহূর্তে ক্রিয়াশীল ছিল, তবেই ঘটেছে অন্যথায় হয় না। যে কোন যোগী এমনকি যারা Martial art অর্থাৎ ক্যারাটে, কুফু, তাইচি ইত্যাদিতে ওস্তাদ হয় তাদেরও এই ধরণের বিশেষ শক্তিলাভ হয়। তারা পিছন থেকে আচমকা আক্রমণ হলেও জানতে পারে কোন ধরণের অস্ত্র কোথায় আঘাত করবে—সবই না দেখে বুঝতে পারে। ফলে এরা চোখ বেঁধেও অনায়াসে প্রতিপক্ষের সাথে মারপিট করতে পারবে।