জিজ্ঞাসু — ‘মৃত্যু হলেই আবার জন্মাতে হবে –এরূপ শোনা যায় কিন্তু কিভাবে বুঝব যে এটা ঠিক ?

গুরুমহারাজ—ঈশ্বরের বিধান বা মহাজাগতিক নিয়ম স্বতঃই ক্রিয়াশীল—তুই বুঝলি কি না বুঝলি অথবা মানলি কি না মানলি তাতে এই বিরাট বিশ্বসংসারের কিই বা আসে যায় খোকা ? তুই ভারতবর্ষের তথা এই বাংলার মানুষ হয়ে ভারতবর্ষের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে মানবি না তো যেখানকার কৃষ্টি মানতে চাইছিস সে দেশে চলে যা। আর যদি এদেশের কৃষ্টি মানিস তাহলে এখানকার শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক গ্রন্থ ‘গীতা’, যা স্বয়ং ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী সেখানে লেখা আছে “জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুধ্রুবং জন্ম মৃতস্য চ”—এটা তোকে মানতে হবে। মৃত্যুর সময় মানুষের নবদ্বারের যে কোন একটা দ্বার দিয়ে প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে যায়, ফলে হৃৎপিণ্ড ক্রিয়াশীলতা হারায়, রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, কোষকলাগুলির কার্য বন্ধ হয়ে যায়—বলা হয় ব্যক্তিটির মৃত্যু হয়েছে। শাস্ত্র বলছে এটি স্থূল দেহের মৃত্যু। স্থূলদেহ ছাড়াও আরও দুটি দেহ রয়েছে সূক্ষ্মদেহ এবং কারণদেহ। পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ তন্মাত্রা, পঞ্চ প্রাণ এবং মন ও বুদ্ধি এই সতেরো তত্ত্ব দ্বারা সূক্ষ্ম শরীর গঠিত। এরও পরে রয়েছে কারণদেহ আরও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অবস্থায়। সাধারণত স্থূলদেহ বিনষ্ট হলেও ‘বাসনা’ রয়ে যায়, তাই “নির্বাসনা’ হওয়াই মহামৃত্যু, বাকি শুধু স্থূলদেহটা নষ্ট হওয়া। এবার জীবের বাসনারাশি স্থূলদেহকে কেন্দ্র করেই যেহেতু ক্রিয়াশীল থাকে —দেহ বিনষ্ট হলে সে আর ক্রিয়া করার field পায় না, ফলে কি হয় না বাসনা মনে, মন বুদ্ধিতে, বুদ্ধি অহং-এ এবং অহং চিত্তে প্রসুপ্ত হয়ে যায়। এইভাবেই যেন স্থূলদেহের আধার সূক্ষ্মদেহ, আবার সূক্ষ্মদেহের আধার কারণদেহ, আর জগৎ ও জীবের কারণের কারণ হচ্ছে মহাকারণ বা আদিকারণ অবস্থা ! এবার মানুষের জন্মগ্রহণ বা শরীরধারণ কিজন্য ? বাসনা চরিতার্থের জন্য। কিন্তু মানুষের বাসনার কি অন্ত হয় ? যে কোন কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বা কামনা অর্থাৎ ধন, মান, যশ, গৌরব, যৌবন, ভোগ, ঐশ্বর্য ইত্যাদির যে চাহিদা এসবই বাসনা। মানুষ শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব, বার্ধক্য ইত্যাদি ক্রম পেরিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে কিন্তু মন থেকে যায়, কামনা-বাসনা আসক্তি সবকিছু চিত্তে প্রষুপ্ত থাকে। বৃদ্ধাবস্থায় মৃত্যুর আগে যখন স্থূলশরীর জীর্ণ হয়ে যায়—বাসনা মেটানোর আর উপযুক্ত থাকে না, তখন ধীরে ধীরে ক্রম অনুযায়ী এগুলি সুপ্ত হয়ে থাকে। অর্থাৎ বাসনাসমূহ মনে লীন হয়, মন বুদ্ধিতে লীন হয়, বুদ্ধি অহঙ্কারে লীন হয় এবং অহঙ্কার চিত্তে লীন হয়। এইভাবে অন্তঃকরণ- চতুষ্টয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মরূপে চিত্তভূমিতে বীজাকারে বাসনারাশিকে সঞ্চিত করে রাখে। এইটি কারণশরীর যা আবার পরবর্তীকালে কার্য করার জন্য প্রথমে সূক্ষ্মশরীর ও আরও পরে স্থূলশরীর গ্রহণের জন্য দায়ী।

তাহলে ১৭তত্ত্ব সম্বলিত সূক্ষ্মদেহ যখন প্রাণবায়ুকে অবলম্বন করে শরীরের নবদ্বারের কোন না কোন দ্বারকে অবলম্বন করে নিষ্ক্রান্ত হয় তখনই সাধারণভাবে আমরা বলি ব্যক্তিটির মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু গীতায় ভগবান এটিকে বলেছেন, “যেন জীর্ণ পুরোনো বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করা”, মানুষটির সত্তা যেন সেই একই রয়েছে, অর্থাৎ ব্যক্তিসত্তা সেই একই থেকে যাচ্ছে। এই যে আমাদের আশ্রমের সন্ন্যাসী পূর্ণানন্দ, ওর বাবা মিত্রমশাই মারা গেছে কিন্তু সূক্ষ্মশরীরে আমার এখানে কিছুদিন ছিল—সেই একই মানুষ, একই সংস্কার। পরবর্তী শরীর নিয়ে আবার যখন আসবে ব্যক্তিসত্তায় একই থাকবে শুধু খোলটা পৃথক হবে তাই তখনও আমার চিনতে কোন অসুবিধা হবে না। যাইহোক ব্যক্তির স্থূলদেহের মৃত্যুর পর যে সূক্ষ্ম অবস্থা থাকে তা নিষ্ক্রান্ত হবার কিছুকাল পরই ধীরে ধীরে প্রসুপ্ত থেকে আরও গভীর প্রসুপ্ত অবস্থায় চলে যায়। মহাজাগতিক নির্দিষ্ট নিয়মে, নির্দিষ্ট সময়ে এই প্রসুপ্তি কাটে। যে যে সময়গুলিতে প্রসুপ্তি কাটে— বিভিন্ন ধর্মশাস্ত্র সেই সময়গুলিতেই শ্রাদ্ধাদি বা পারলৌকিক ক্রিয়ার দিন নির্ধারণ করেছে। দশম দিন, দ্বাদশ দিন, পঞ্চদশ দিন, একমাস বা চল্লিশ দিন এইরকমই নির্দিষ্ট সময়কাল। ঐ সময়গুলিতে সুষুপ্তি অবস্থার ঘুম ভেঙে যায় এবং পূর্বশরীরের আত্মীয়-স্বজনের প্রতি মায়া-মমতা জনিত টান বা পূর্বশরীরের অন্য কোন প্রবল আকর্ষণ তাকে পীড়া দেয়। এটাও খুবই কষ্ট বা যন্ত্রণার। বাসনা রয়েছে কিন্তু বাসনা মেটানোর জন্য প্রয়োজন যা, তা তো নেই অর্থাৎ শরীর নেই, তাই যন্ত্রণা। এই প্রচণ্ড যন্ত্রণা তাকে আবার প্রসুপ্ত করে তোলে। মহাজাগতিক নিয়মে এই ঘুমও ভাঙে—ইতিমধ্যে তার পূর্ব পূর্ব জীবনের যে বাসনাগুলি সবচাইতে strong সেগুলি প্রকট হয়ে চিত্ত থেকে অহংএ, অহং বুদ্ধিতে, বুদ্ধি মনে পুনরায় অধঃক্রমে রূপ গ্রহণ করতে থাকে। এইভাবে নতুন সূক্ষ্মশরীর আকাশকে আশ্রয় করে কিছুকাল নিরালম্ব অবস্থায় থাকে। এরপর এই সূক্ষ্মশরীর সূর্যকিরণ, চন্দ্রকিরণ, বৃষ্টি, শিশিরকণা, শস্য, খাদ্যের মধ্যে দিয়ে উপযুক্ত পিতৃদেহে প্রবেশ করে। সেই খাদ্য আবার রস, রক্ত, মাংস, বসা (চর্বি), অস্থি, মজ্জা, বীর্য এই সপ্ততত্ত্বের বিবর্তনে রূপান্তরিত হয়ে পিতার মস্তিষ্ককোষে সঞ্চিত থাকে। এখনও পর্যন্ত জীব-বিজ্ঞানীরা শুক্রাণুর গঠন বিন্যাস, জননকোষের বিভাজন, জননকোষ সৃষ্টির কারণ ইত্যাদি জেনেছে কিন্তু শুক্রাণুতে প্রাণের সঞ্চার কিভাবে হচ্ছে তা কিন্তু বলতে পারেনি, যা বেদাদি শাস্ত্র বহুকাল পূর্বেই বলে গেছে।

যাইহোক এইভাবে যাত্রা শুরু হল আবার একটা স্থূলশরীরের, যা কারণশরীরের strong বাসনাগুলি মেটানোর বা কারণের কার্যে রূপ নেবার নতুন field। সূক্ষ্মদেহের আকাশে যে নিরালম্ব অবস্থান এটার polarity কি হবে বা এর centre of gravity কিভাবে কার্যকরী হয় জানো— স্থূলদেহে যেমন perineum থেকে pineal এই বরাবর centre of gravity কাজ করে, সূক্ষ্মদেহেও সূক্ষ্মাকারে ঐ একই ভাবে একই তত্ত্ব কাজ করে থাকে। আর আকাশে অবস্থান বলতে বেদে যে সপ্ত-আকাশের কথা বলা হয়েছে সেগুলোকে যেন বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তর ভেবো না, এগুলি এক একটা চেতনার stage বা দশা। এক এক চেতনার স্তরের ব্যক্তি এক এক stage-এ অবস্থান করে। এটি আবার পিরামিডের মতো যত উঁচু stage-এর দিকে তাকাবে সেটা তত কম space-সম্পন্ন, কিন্তু high potentiality যুক্ত। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্রনাথের চেতনার অবস্থান সম্বন্ধে একবার বলেছিলেন যে, “একটা স্তরে ৭জন ঋষি ধ্যানস্থ অবস্থায় রয়েছে ইত্যাদি”। তাহলেই দেখা যাচ্ছে নিম্ন-মানস-চেতনার লোকসংখ্যা অনেক বেশী, তুলনায় ঊর্ধ্বচেতনার ঋষির সংখ্যা মুষ্টিমেয়।

জিজ্ঞাসু—মৃত্যুর পর প্রেতযোনি প্রাপ্ত হলে জন্ম নিতে দেরি হয় বা কষ্ট ভোগ করতে হয় কেন ?

গুরুমহারাজ—ঐ যে বলছিলাম স্থূলদেহের মৃত্যুকালে শরীরের নবদ্বারের (দুটি চক্ষু, দুটি কর্ণ, নাসিকা, মুখছিদ্র, নাভি, গুহ্য ও লিঙ্গ )যে কোন একটি পথ দিয়ে প্রাণবায়ু নিষ্ক্রান্ত হয়। যোগীব্যক্তির প্রাণবায়ু বের হয় দশমদ্বার অর্থাৎ সহস্রারের পথে। এবার কার কোন ছিদ্রপথে প্রাণবায়ু বের হচ্ছে তার উপর ব্যক্তিটি কোন “যান” প্রাপ্ত হচ্ছে তার নির্ণয় হয়। প্রাণবায়ু গুহ্য এবং লিঙ্গ পথে নিষ্ক্রান্ত হলে সাধারণত “ধূম্রযান” গতি প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ এইসব ক্ষেত্রেই ইতরযোনি বা প্রেতযোনি হবার সম্ভাবনা থাকে। এরা প্রায়শই জানে না যে তাদের মৃত্যু হচ্ছে বা হয়েছে। ফলে এরা পূর্বের মানসিকতায় বা সেই চেতনায় দীর্ঘকাল থেকে যায়। যদি মৃত্যুকালীন সময়ে যন্ত্রণাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকে, তাহলে সে অহরহ যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকে, এটাই অতিরিক্ত ভোগান্তি। তবে বেশীর ভাগ মানুষই “পিতৃযান” গতি প্রাপ্ত হয়, ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই তারা আবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ফিরে ফিরে আসে। এগুলি সবই horizontal গতির ক্রিয়া। কিন্তু যে সমস্ত সাধকের দশমদ্বার দিয়ে প্রাণবায়ু বের হয়ে তাদের গতি হয় vertical, সাধারণ জীবের মতো গতি হয় না, শরীরধারণ হলেও জগৎকল্যাণের নিমিত্তই হয়ে থাকে। তবে তুমি জানতে চাইছো ধূম্রযানে যাদের গতি হয় তাদের পরবর্তী জন্মগ্রহণের যে ক্রিয়া সেটি দীর্ঘায়িত হয় কেন ? এর কারণ তাদের মৃত্যুর কোন পূর্ব প্রস্তুতি ছিল না। তাই সূক্ষ্মদেহে তার confused অবস্থা কাটতে কাটতেই অনেক সময় লেগে যায়। আর যেহেতু আকস্মিক বা অকালমৃত্যু অথবা অপঘাতে মৃত্যু ঘটেছে তাই যতদিন তার আয়ু থাকার কথা ততদিন তো সে কষ্ট পাবেই, এছাড়াও জীবনচক্রে পুনরায় ফেরার জন্য যে সময় সেটিও যোগ হবে। এভাবে তার ঐ অবস্থায় থাকাটা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, তবে মারাত্মক কোন অপরাধের ফলভোগ বা কোন আধ্যাত্মিক ব্যক্তি অভিশাপগ্রস্ত হলে তার ভোগকাল আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। আমি অনেক প্রেতযোনিকে দেখেছি যারা বহুকাল ধরে একই অবস্থায় থেকে গিয়ে ফলভোগ করছে, সেই অবস্থায় থেকে রসও পাচ্ছে, সেই অবস্থাটাকে ভালোবেসে ফেলেছে। ফলে তারা ঐ অবস্থা থেকে মুক্ত হতে চাইছেও না আর মুক্তি পাচ্ছেও না। তবে ঈশ্বর করুণাময়, কোন প্রেমিক মহাত্মার সান্নিধ্যে এলে তাঁরা তাকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দেন।

প্রেতযোনি অবস্থাটা একটা আত্মবিস্মৃতের অবস্থা। এমনিতেই সকল জীবই আত্মবিস্মৃত, সেটা ব্যাপক অর্থে। এখানে এই অর্থে বললাম যে—ব্যক্তিটি নিজে জানে না যে সে কোন্ অবস্থায় আছে। এছাড়া ঐ যে বলছিলাম confused অবস্থা—যেমন ধরো সিঙ্গুরে একটা লোককে অজ্ঞান করে জাপানে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হ’ল। সেখানে জ্ঞান ফিরে পাবার পরও সে বাংলাভাষায় “সিঙ্গুর”, “সিঙ্গুর” করছে। কারণ তার সমস্ত অভিজ্ঞতা, স্মৃতি সবকিছুই তো সিঙ্গুরকে কেন্দ্র করে, জাপান সম্বন্ধে তো তার কোন ধারণাই নেই। আর জাপানে যে সে এসেছে, কিভাবে এসেছে এ সব সম্বন্ধেও সে কিছু জানে না। কোনো মানুষ জাপানে যেতে পারে, কিন্তু তার জন্য তো তার অনেক পূর্ব প্রস্তুতি থাকে–এর সেসব কিছুই ছিল না, তার confused অবস্থা। এই অবস্থায় ঐ ব্যক্তিকে স্বস্তি এনে দিতে পারে একমাত্র guide, উপযুক্ত guide ওর ভাষা বুঝে, ওর সমস্যা বুঝে, ভারতীয় em- bassy-র সঙ্গে যোগাযোগ করে, নানান ঝামেলা পুইয়ে ওকে ফের ভারতবর্ষে ফেরাতে পারে। এই guide -ই কোন উন্নত মহাত্মা বা সদগুরু। ভিসা, পাসপোর্ট ছাড়া তো কেউ অন্য কোন দেশে যেতে বা আসতে পারে না। কিন্তু এঁদের ছাড় আছে। যেমন সেসব ব্যক্তি পৃথিবীতে সবচাইতে সম্মানীয় অর্থাৎ “নোবেল জয়ী” ইত্যাদি এদের আন্তর্জাতিক ছাড় থাকে। এরা পৃথিবীর যে কোন দেশে যেতে পারে এরা বিশেষ ছাড়পত্রের অধিকারী। তেমনি আধ্যাত্মিক জগতেও যাঁরা জগৎকল্যাণব্রতী, তাঁদের বিশেষ অধিকার দেওয়া থাকে। এঁরা যেখানে খুশি গিয়ে সেখানকার চেতনার জীবদের উন্নতি করতে পারেন। তাই যা কিছু ভালো তা ঈশ্বরের বিধানেই হয়ে থাকে। গুরুকুলই প্রকৃত জীবের কল্যাণ করে থাকেন। সেইজন্যই গুরুর জয়গানে মুখর হতে হয়—ঘোর তমসাবৃত সংসারচক্র থেকে পার করার কাণ্ডারী গুরু। তাই “মর্তের ভগবান” বলা হয়েছে গুরুকে। “গুরোঃ কৃপাহি কেবলম্, গুরোঃ কৃপাহি কেবলম, গুরোঃ কৃপাহি কেবলম্ ॥”

জিজ্ঞাসু—মন্ত্রদীক্ষা সকলকে নিতেই হবে—এটা কেন ? দীক্ষা না নিয়ে কি কাউকে গুরু ভাবা যায় না ?

গুরুমহারাজ-দ্যাখ, মন্ত্র হচ্ছে বিজ্ঞান। আধুনিক বিজ্ঞান পরিদৃশ্যমান জগতের অস্তিত্ব অস্বীকার করছে। কি বলছে তারা— বলছে যা কিছু দেখছি—এসবকিছুরই কোন অস্তিত্ব নেই। এই গাছপালা, মানুষজন, বাড়ীঘর এমনকি সূর্য, চন্দ্র, মহাবিশ্ব সবকিছুই আপাত। প্রকৃত কি জানা যাচ্ছে না, তবে বস্তু, অণু, পরমাণু, ইলেকট্রন-প্রোটন- নিউট্রন, কোয়ার্ক এইরকমভাবে ভাঙতে ভাঙতে বিজ্ঞানীরা এই সিদ্ধান্ত করেছে যে, সবকিছুরই মূলে রয়েছে স্পন্দন বা vibration, জগতের যা কিছু তা ঐ স্পন্দন বা vibration থেকে যেমন সৃষ্ট তেমনি তা ওতেই স্থিত, আবার যখন লয় হচ্ছে তারও কারণ vibration। বেদে এই তত্ত্বকে স্পন্দনতত্ত্ব বলে বর্ণনা করেছে। তাহলে প্রতিটি Indi vidual যেন এক একটা particular স্পন্দনের রূপমাত্র। সমস্ত স্পন্দনের উৎস হল অনাহত নাদ বা প্রণব। নাম-রূপাত্মক যে জগৎ তা সেখান থেকেই সৃষ্ট। যা স্থূলে দেখছি তা পূর্বে সূক্ষ্ম ছিল, তারও আগে কারণ অবস্থায় ছিল, যা ভাবজগতের অবস্থা। কিন্তু যখন যে অবস্থাতেই থাক না কেন, তারও একটা নির্দিষ্ট vibration রয়েছে। vibration change হচ্ছে বলেই কারণ থেকে সূক্ষ্মে এবং আরও পরে name and form ধরে স্থূলে রূপ পরিগ্রহ করছে। মানুষের শরীর, মানুষের মনোজগৎ এইরকমই একটি বা একাধিক vibration-এর দ্বারাই সৃষ্ট। এবার মানুষ শৈশবাবস্থা থেকে যত বড় হয় ততই তার চিত্তে বিষয়-বাসনারূপ ভিন্ন ভিন্ন vibration-র অভিঘাত হতে শুরু করে। এর ফলে মূল সুরটিকে হারিয়ে ফেলে মানুষ। যে অনাহত নাদ বা tune থেকে individual-এর tuning হয়েছিল তা অসংখ্য vibration-এর উপরিপাতের ফলে ছন্দোবদ্ধতা হারিয়ে ফেলে। এটাই disharmony, এটাই বিকার, এটাই আত্মবিস্মৃতি, আর এটাই মানবজীবনের ত্রিতাপ ক্লেশের একমাত্র কারণ। এবার ধর্ তোর একটা বাদ্যযন্ত্র বেসুরে বাজছে, তুই কি করবি না ওস্তাদের কাছে নিয়ে যাবি। সে ওটাকে আবার সুরে বেঁধে দেবে, এবার তুই তাতে রাগ-রাগিণী বাজা না। সেইরকম disharmonise জীবনকে আবার harmonise করতে পারেন যিনি তিনিই ‘গুরু’। সদগুরু তাকে একটি মন্ত্র দেন, মন্ত্র মানে যা মনকে “ত্রাণ” করে, মন্ত্র একটি বীজ, এটিও vibration। তোর জীবনের যে মূল সুরটি ছিল সেটি অনেক এলোমেলো সুরে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল, এই vibration আবার তোর জীবনের মূল সুরটিকে vibrate করতে থাকবে, সমকম্পাঙ্ক বিশিষ্ট সুর যেমন অপর সুরকে জোরালো করে তোলে, তেমনি এক্ষেত্রেও আত্মবিস্মৃত মানুষ আবার ধীরে ধীরে আত্মমুখী হতে শুরু করে, বিকারগ্রস্ত মানুষ আবার বিকারমুক্ত স্বাধীনতাপিপাসু হয়ে ওঠে, মোহবন্ধনে আবদ্ধ মানুষের মোহমুক্তি ঘটে। তাই জানবি প্রতিটি মানুষের কারণদেহ, সূক্ষ্মদেহ ও স্থূলদেহ যেমন নির্দিষ্ট vibration-যুক্ত তেমনি প্রতিটি মানুষের মন্ত্রও পৃথক হবে—এটাই মন্ত্রবিজ্ঞান। প্রকৃত সদগুরু জানেন তাঁর প্রতিটি শিষ্যের শরীর ও মনের গঠনের সঠিক vibration-টি কেমন তাই সেই অনুযায়ী তিনি ‘মন্ত্র’ selection করেন। যা তার মূল vibration-কে নাড়া দিতে থাকবে। একবারে পরিবর্তন করা হয় না তাহলে জীবের শরীর টিকবে না—তার বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে ধীরে ধীরে তার পরিবর্তন হয়। তাই আজকে মন্ত্র নিয়েছে বলে কালকেই তার মধ্যে পরিবর্তন আসবে তা নাও হতে পারে। অনেকসময় দেখা যায় তার জীবনে সেইমুহূর্তে যে সমস্যাটা প্রবল ছিল—সেটার সমাধান হয়েছে। আর পরিবর্তন তো sudden হবে না। কারণ পরিবর্তন প্রথমে হবে কারণস্তরে, সেখান থেকে আসবে সূক্ষ্মস্তরে তারপর তা স্থূলভাবে প্রকট হবে। এটা একটা long-term- process । সেইজন্য কোন শিষ্যের পরিবর্তন হতে হতে কয়েকজন্ম লেগে যেতে পারে। তিন জন্ম, পাঁচ জন্ম, সাত জন্মও লাগতে পারে। তবে সদগুরু ভার নিলে তিনজন্মেই মুক্তি ঘটে। তাহলে মন্ত্র দীক্ষা নেবার প্রয়োজনীয়তা আশাকরি নিশ্চয়ই বুঝতে পারলি। তবে গুরু সবাই হয় না আবার হতেও চায় না। হয়তো আত্মসাক্ষাৎকার হয়ে গেছে এমন স্থিতির মানুষরাও গুরু হতে চান না। এইজন্যই গুরু পরম্পরার প্রয়োজন হয়েছে। আধ্যাত্মিক গুরু পরম্পরা বা লোকোত্তর গুরু পরম্পরায় নির্বাচিত গুরুদেরই একমাত্র যে কাউকে শক্তি প্রদানের অধিকার রয়েছে। এঁরা বাছ-বিচার না করেই যে কাউকে কৃপা করতে পারেন বা শক্তি প্রদান করতে পারেন। এতে এঁদের সঞ্চিত বা অর্জিত শক্তির হানি হয় না। কারণ এঁদের শক্তি আবার supply হয়, fill up করা হয়। এটা কোন ‘গুরুবাদ’ নয় এটাই প্রকৃত গুরু পরম্পরা। আর এই গুরু পরম্পরাকে রক্ষা করেন, শক্তি জোগান যে গুরুকুল, তাদের সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। আমি ছোটবয়সে হিমালয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময়ে বহু উচ্চতায় এবং গভীরতম প্রদেশে এক মৌনীবাবার সাথে ওখানে গিয়েছিলাম। ওরা আমার উদ্দেশ্যের কথা শুনে খুব আনন্দ প্রকাশ করল। আমাকে খুব ভালোবাসল আর অভয় দিল। পরবর্তীকালে আমি দেখেছি ওরা সর্বদা নজর রাখে।

তবে ‘গণদীক্ষা’ ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। উপস্থিত সকল মানুষ কখনই একইরকম হয় না, তাই সবার ‘একমন্ত্র’ এটা ঠিক নয়। ঘটবে না। লোকোত্তর গুরুপরম্পরায় এই ধরণের ব্যাপার কখনই যারা এরূপ করছে তারা আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের প্রকৃত রহস্য জানে না। ব্যক্তিভেদ হলেই প্রকৃতিভেদে মন্ত্রও পৃথক হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রী একসাথে দীক্ষা নিচ্ছে কিন্তু মন্ত্র আলাদা । গুরু শিষ্যকে দীক্ষা দিচ্ছে মানে কিছু দিয়ে তার কিছু ক্ষয় করছে, গুরুর অর্জিত সম্পদ যা জন্মান্তরের সাধনলব্ধ –তা দিচ্ছে, বিনিময়ে শিষ্যের পাপ-তাপ, ক্লেশ হরণ করছে—এটা কি সহজ ব্যাপার । শিষ্যের প্রতি কত প্রেম থাকলে এটা সম্ভব হয় ? গুরুর সাথে শিষ্যের তাই নিবিড় ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক—এটা জানতে হবে, এটা জানাই জ্ঞান। শুধু তোর সাথে আমার সংযোগ হল বা দেখা-সাক্ষাৎ হ’ল এটাই গুরু-শিষ্যের ব্যাপার নয়। গুরুর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে তারপর ধীরে ধীরে তার সাথে তোর সম্বন্ধ গড়ে উঠবে। তাই গুরু- শিষ্যের বারবার সংযোগ হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এরফলে শিষ্য তার অসুবিধা নিঃসংকোচে নিবেদন করতে পারবে, আর গুরুও শিষ্যের সমস্ত জিজ্ঞাসার মীমাংসা করে দিয়ে তার সংশয় দূর করতে পারবেন। জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমেই শিষ্যের চিত্তের সংশয় কাটে। আধ্যাত্মিক জগতের বিচিত্র নিয়ম। এই জগৎসংসারে শুধু গুরু কেন যারাই মানবকল্যাণের জন্য কিছু না কিছু কাজ করছে তারা সকলেই হিমালয়ের ঐ গুরুশক্তির আয়ত্তে রয়েছে। জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে সমাজের এই ধরণের মানুষেরা গুরুশক্তির কাছ থেকে শক্তির জোগান পায়। এই ব্যাপারটা কিছুটা কিন্তু জানে মানুষ, ফলে দেখবে সবাই বলে থাকে “ভালো কাজে নামলে ঠিক কোথা থেকে হয়ে যায় !” এই ‘কোথা থেকে’-টা হয়ত জানেনা। মানুষের কল্যাণ, জীবজগতের কল্যাণের জন্য পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে যে কাজই হয়ে চলেছে তাদের শক্তির উৎস ঐ গুরুকুল। ওরাই প্রয়োজনে শক্তি জোগায় আবার যখন দেখে সেই ব্যক্তির মধ্যে বা প্রতিষ্ঠানে ‘অহংকার’ বাসা বেঁধেছে, তখন আবার শক্তি withdraw করে নেয়। যিনি যথার্থ জ্ঞানী, যাঁর আত্মসাক্ষাৎকার হয়েছে, দ্রষ্টাবৎ, তিনিই দেখতে পান বা জানতে পারেন শক্তির এই প্রবাহ কোথা থেকে আসছে বা কোন শক্তি থেকে পৃথিবীতে জনকল্যাণমূলক কাজসমূহ হচ্ছে। সাধারণ মানুষ কোন কাজ করে বাহবা নিতে চায়, সবাইকে দেখায়, বলে “দ্যাখো এই কাজটা আমি করেছি।” কিন্তু জ্ঞান হলে অহং নাশ হয়, আর তখনই বোধ হয় যে, “ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই সব হচ্ছে—তাঁর ইচ্ছা না হলে গাছের পাতাটিও নড়ে না।” ক্ষমতা ও অধিকার রয়েছে তবু উন্নত অবস্থার মহাত্মাদের অনেকেই “দীক্ষা” দিয়ে ‘গুরু’ হতে চান না। কারণ দীক্ষা দিলেই শিষ্যের সম্পূর্ণ ভার গুরুর উপর বর্তায়। শিষ্য যদি কর্মবিপাকে পড়ে নরকে গমন করে তাহলে তাকে উদ্ধারের জন্য গুরুকেও নরকে যেতে হয়। তাই সকলে এই গুরুদায়িত্ব নিতে চান না। আমি দীক্ষা দিই কেন জান, আমি মানুষকে ভালোবাসি। আমার জীব-জগতের প্রতি, মানুষের প্রতি অনন্ত ভালোবাসা। তাই মা জগদম্বা যখন আমাকে permission দিলেন যে “তুই দীক্ষা দে।” তখন আমি বললাম “তাহলে নে।” সেই থেকে দিয়ে চলেছি – পাত্রাপাত্ৰ বাছি না, মা বলেছে আবার কি ? মা যেদিন বন্ধ করে দেবে—সেদিনই এ বিরাম পাবে। তার আগে এই process চলতে থাকবে। দেখবে আগামীতে আধ্যাত্মিকতার জোয়ার আসবে। তবে অসুবিধা হয় বইকি ? সময় সময় এই শরীরটা সহ্য করতে পারে না – সহস্র মানুষের নানারকম প্রারব্ধ, এসব চাপ পাঞ্চভৌতিক শরীরটাকে সময় সময় জীর্ণ করে দেয়, মনে হয় শরীর ছুটে যাবে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই দেখি আবার হু হু করে কোথা থেকে শক্তি এসে জুগিয়ে যাচ্ছে পুনরায় fully charged হয়ে উঠছি। রাত্রি ১২টা থেকে ভোর ৪টের মধ্যে এই ক্রিয়াটি খুব ভালো বুঝতে পারি। ঋষিকুল হিমালয়ে আমাকে যে কথা দিয়েছিলেন, সে কথা তাঁরা যথাযথ পালন করেন। ওনাদের সাথে communication হয়, ওনারাই বলেন কিভাবে বিভিন্ন জন ওখান থেকে শক্তি পাচ্ছে আবার দেখি অনেকের শক্তি withdraw হয়ে যাচ্ছে। কোন সমাজসেবী বা সাধক যতক্ষণ না নিজে অহংকারী হয়ে উঠছে বা লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে ততক্ষণ ওনারা শক্তি সরবরাহ করে যান। সমাজের সেবা করার বা প্রকৃতসেবক হয়ে ওঠার লোকেরই তো অভাব। ফলে এমন লোক পেলে সহজে কি ওঁরা ছাড়তে চান ?