জিজ্ঞাসু —মন্ত্ৰ যদি বিজ্ঞান হয় তাহলে এটি গোপন রাখার প্রয়োজন হয় কেন ?

গুরুমহারাজ–গোপন রাখার প্রয়োজনীয়তাটিও বিজ্ঞান।একটু আগে আলোচনা করছিলাম তুমি হয়তো খেয়াল করোনি যে,প্রত্যেকটি মানুষের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন, প্রত্যেকের পৃথক individuality রয়েছে তাই প্রত্যেকের মন্ত্র ভিন্ন হয়। প্রতিটি ব্যক্তির মন্ত্রের যেvibration এটি তার স্থূল শরীর সৃষ্টির যে মূল কারণ তার সাথেtuning হলে তবেই মন্ত্রশক্তির ক্রিয়া অনুভূত হয়। এই tuningহবার জন্যই practice বা অভ্যাস যোগ। শ্বাসে-প্রশ্বাসে মন্ত্রজপকরতে পারলে ধীরে ধীরে মূলসুরের সাথে উদ্দীপক রূপ মন্ত্রের মিলঘটে, এটাই মন্ত্রবিজ্ঞান। এবার সে যদি তার মন্ত্র পাঁচজনকে বলে বেড়ায় এটা গুরুর প্রতি অশ্রদ্ধা, তাছাড়া যারা শুনল তারাও হয়তো ওর মন্ত্রটা জপ করতে শুরু করবে, এতে কি হবে—মন্ত্রের কুফল ফলবে, মন্ত্রবৈরী হবে। তাই সদগুরু দীক্ষাদানকালে শিষ্যকে মন্ত্র গুপ্তি বা মন্ত্র গোপন রাখার পরামর্শ দেন। শাস্ত্র বলেছে ইষ্টমন্ত্ৰ যেন স্ত্রীলোকের স্তনের ন্যায় যা স্বামী এবং সন্তানের কাছেই উন্মুক্ত, অন্যত্র নয়। এখানে স্বামী অর্থে গুরু এবং সন্তান অর্থে তাঁর শিষ্য। সুতরাং অশ্রদ্ধাবশত কেউ যদি তার ইষ্টমন্ত্র পাঁচজনকে বলে বেড়ায় এতে মন্ত্রের ক্রিয়াশীলতা নষ্ট হয়ে যায়—ঐ মন্ত্রে তার আর কোন কাজ হবে না, তাকে পুনরায় দীক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

মন্ত্রবৈরী যে কতটা ভয়ঙ্কর তার প্রমাণ ঘটেছিল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সময়ে। হরিশ একজন ভক্ত ছেলে, ঠাকুরের কাছে দীক্ষাগ্রহণ করে কিছুদিন ভালোই ছিল, তারপর কি গণ্ডগোল করেছিল বা অন্য মন্ত্র আশ্রয় করেছিল হয়তো। কিছুদিনের মধ্যেই সে পাগলের মতো হয়ে গেল। ওর স্বভাব, প্রকৃতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। সারদা মা তখন কামারপুকুরে, একদিন তিনি পাশের বাড়ি থেকে বাড়িতে ঢুকছেন আর পাগলা হরিশ তাঁর পিছু পিছু ছুটে মাকে জড়িয়ে ধরতে যায়। মা ধানের গোলার চারিদিকে সাতবার ঘুরেও ও যখন নিরস্ত হয় না তখন মা বগলামূর্তি ধারণ করে হরিশের বুকে হাঁটু দিয়ে ওর জিভ টেনে ধরে গালে চড় মারতে থাকেন। অন্যহাতে ওর জিভে সাধক-মন্ত্র লিখে দেন। এই ঘটনার কিছুদিন পরে হরিশ প্রকৃতিস্থ হয় এবং দ্রুত তার আধ্যাত্মিক উন্নতিও ঘটতে শুরু করে। পরবর্তীকালের ইতিহাসে রামকৃষ্ণ মিশনে হরিশের ভূমিকা তো মানুষের জানা।

তাই বলছিলাম ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছ—এই দেশের প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ পরম্পরাকে অশ্রদ্ধা করো না, ঋষিবাক্য অবহেলা করো না, এটা করতে গিয়েই ভারতবর্ষের আজ এই দশা। তোমরা অপরের দেওয়া চিন্তা মাথায় ঢোকাচ্ছ আর নিজের পিতৃপুরুষদের অবজ্ঞা-অবহেলা করছ। আর বিদেশীরা তোমাদের প্রাচীন সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে উন্নতি করছে। এই মূর্খতা ; আহাম্মকি আর কতদিন চলবে এদেশে ? তোমরা নব যুবক, রুখে দাঁড়াও ! তোমরা আগামী প্রজন্মের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপন করো—তবে তো ভারতবর্ষ আবার তার পুরানো ঐতিহ্যের প্রকাশের আলোয় ঝলমল করে উঠবে, যার সুফল পাবে গোটা বিশ্ব ।

জিজ্ঞাসু—ব্রাহ্মণ ছাড়া কি গুরু হয় না ?

গুরুমহারাজ—ঠিকই, “ব্রাহ্মণ”, তবে বামনাই নয়। ব্রহ্মবিদকে শাস্ত্রে ব্রাহ্মণ বলেছে—এঁরাই বৈদিক গুরুকুল। বর্তমানের ‘হিদুয়ানি বামনাই” এটা একটা সামাজিক বিবর্তনের ফল—এটাকে মানতে তো আমি বলি না। গীতায় শ্রীভগবান গুণ ও কর্মের বিভাগ অনুযায়ী সমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চার প্রকার মানুষের clas- sification করেছেন, জন্ম অনুযায়ী তো বলেননি। তবু বেশিরভাগ মানুষ ভেবে বসে যে, জন্মসূত্রেই ব্রাহ্মণ হয়। বামুনের ছেলে মানেই বামুন এটা ঠিক কিন্তু ব্রাহ্মণের ছেলে হলেই সে “ব্রাহ্মণ” হয় না। আর তুমি একথা কেন বলছ – মহাপ্রভু আচণ্ডালে কোলদিলেন, তারা আবার পরবর্তীকালে কত পরম্পরা সৃষ্টি করল, এদের সবাই কি বামুন নাকি ? সেই বিচারে স্বামী বিবেকানন্দ প্রবর্তিত রামকৃষ্ণ মিশনের যে পরম্পরা চলে আসছে এবং হয়তো চলবে আরও বহুকাল, এঁদের মধ্যে স্বামীজী নিজেই কায়স্থ ছিলেন। স্বামী ব্রহ্মানন্দের নাম ছিল রাখালচন্দ্র ঘোষ, আর পরবর্তীকালের স্বামীজীরা যাঁরা দীক্ষা দেন তাঁরাও তো সবাই বামুন নয়। তবে স্বামী বিবেকানন্দের শরীর ছাড়া একশো বছর হয়ে গেল—এটাই আশ্চর্য যে, স্বামীজী যেভাবে ভারতবাসীর সুপ্ত চেতনায় মুগুর মেরে মেরে জাগাবার চেষ্টা করে গেলেন—তাতেও আশানুরূপ কাজ হল না ? আজও তোমরা শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা জাতিভেদ, ছুঁই-ছুঁই, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ এসব নিয়ে কথা বলছ ! ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশে এসব থাকলেও Bengal- এর মানুষের কেন থাকবে ? মাত্র ৫০০ বছরের মধ্যে অধ্যাত্মজগতের বিশাল বিশাল তরঙ্গস্বরূপ শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামীজীর ন্যায় মহাপুরুষরা এই মাটিতে জন্মে কাজ করে গেলেন, তাঁদের অর্জিত আধ্যাত্মিক-সম্পদ প্রত্যাশাবিহীনভাবে তাঁরা এখানকার বাতাবরণে ছড়িয়ে দিলেন তবু চেতনার জগতে এত দৈন্যতা ? এইজন্যই এবার আমার তথাকথিত নিম্নবর্ণের ঘরে জন্মগ্রহণ। সমাজের মাথায় মুগুর মেরে আর একবার দেখি ঘুম ভাঙে কিনা ? এবার সমাজের বিভিন্ন class থেকে ছেলে নিয়ে আমি কাজে লাগিয়েছি। পরে ওদেরকে দিয়ে দীক্ষাও দেওয়াবো। যখন so called নিম্নবর্ণে জন্মগ্রহণকারী এখানকার সন্ন্যাসীদের কাছে সমাজের মানুষ দীক্ষা নিয়ে আধ্যাত্মিক উন্নতি করবে, চেতনায় উন্নত হতে থাকবে, তাদের অজ্ঞানতা দূর হয়ে জ্ঞানালোকের উন্মেষ ঘটবে তখনই সমাজ থেকে জাত-পাতের অভিশাপস্বরূপ এই centiment ভেঙে যাবে, তার আগে নয়।

তবে ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় এখানকার যুবক-যুবতীদের মন বা চেতনা অনেকটাই সংস্কারমুক্ত। পূর্ব পূর্ব মহাপুরুষগণের শরীর ধারণ কি বৃথা হয় ! তা হয়নি। এখানকার মানুষের চেতনা এত নিম্ন ছিল যে, সেখান থেকে ওঠাতে সময় লাগছে । আশার কথা এই যে, এখানকার ছেলেমেয়েরা অনেকটাই centiment মুক্ত হয়েই জন্মগ্রহণ করছে। তাই আগামী প্রজন্মের যুবক-যুবতীদের আর এই সব centiment থাকবে না ।

জিজ্ঞাসু—রামকৃষ্ণ মিশন বিশ্বহিন্দু পরিষদে যোগ দিচ্ছে না কেন ?

গুরুমহারাজ—দেবে কেন ? বিশ্বহিন্দু পরিষদ একটা স্বতন্ত্র organisation। যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভারতীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, এটা ক্ষত্রিয়ের ভূমিকা। আর রামকৃষ্ণ মিশনের ন্যায় প্রতিষ্ঠানগুলি সমাজে বিপ্রের ভূমিকা পালন করছে। ওরা আর্ত- অসহায়দের সেবা করছে, শিক্ষাদান করছে—এগুলো বিপ্রের কাজ। বৈচিত্র্য নিয়েই তো মায়ের জগৎ, বাবা ! সবাই এক ক্ষুরে মাথা কামাবে নাকি ? এই রকমটা বা অদ্বৈতভাব যেদিন এসে যাবে সেদিন বুঝবে পৃথিবী গ্রহের আর mature হতে বেশী দেরি নেই। আর রামকৃষ্ণ মিশনের বর্তমান ভাবধারাতে ওরা নিজেদেরকে Ramkrishnite বা রামকৃষ্ণপন্থী বলে মনে করে। বিশ্ব-হিন্দু-পরিষদের যে বক্তব্য “কৃণ্বন্তু বিশ্বম৷র্যম্” এখানে ‘আর্য্য’ বলতে ওরা সাধারণত হিন্দুদেরই ধরে। “তাই সব হিন্দু এক হও” এই ধরণের একটা মনোভাব ওদের রয়েছে বা সেরকম প্রচারও রয়েছে। সেই অর্থে রামকৃষ্ণ অনুরাগীরা তো Ramkrishnite, তথাকথিত হিন্দু তো ওরা নয়। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যেহেতু হিন্দু, মুসলিম, ইশাহি ইত্যাদি বিভিন্ন মতের সাধন করেছিলেন তাই রামকৃষ্ণ মিশন প্রমাণ করেছে যে, তারা চিরাচরিত হিন্দু নয়। সেই হিসাবে Ramkrishnite-রা সংখ্যালঘু এবং ওরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে একটা মোটা অংকের grant পায় এইজন্য। তবে কথা হচ্ছে, এই যে Ramkrishnite centiment এটা তবু ভালো কিন্তু রাজনীতিতে জড়ালে মিশনের যেটুকু আধ্যাত্মিকতা রয়েছে সেটাও নষ্ট হয়ে যাবে।

রামকৃষ্ণ মিশনের বহু সাধু বিশ্বহিন্দু পরিষদে যোগ দিয়েছে কিন্তু তারা রামকৃষ্ণ মিশন ত্যাগ করেছে। ব্যক্তিগতভাবে তুমি দেশের সেবায় রাজনীতিতে যোগ দিতে পার—অন্য কিছুও করতে পার কিন্তু সমষ্টিগতভাবে কোন মঠ বা মিশন সেটা করতে গেলেই মিশনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য দুটোই পণ্ড হয়ে যাবে। তাই রামকৃষ্ণ মিশনে যা যা নিয়ম রয়েছে তা লঙ্ঘন করলে strictly মিশন থেকে সেই সন্ন্যাসীকে বের করে দেওয়া হয়। শুনতে রূঢ় হলেও একটা প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে সকলকে নিয়মের নিগড়ে বাঁধতেই হবে, না হলে স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচারে পরিণত হয়ে যাবে। কোন মঠ বা মিশনে যতক্ষণ কোন আধ্যাত্মিক পুরুষ থাকেন ততক্ষণ কোন নিয়ম বা বন্ধনের প্রয়োজন হয় না কিন্তু যেই তিনি চলে যান অমনি প্রয়োজন হয় নিয়মের, অনুশাসনের ইত্যাদির। কোন মিশন বা প্রতিষ্ঠান কেমন চলছে সেটা দেখেই বোঝা যায় প্রতিষ্ঠানটির মাথায় যারা আছে তাদের আধ্যাত্মিক অবস্থান। মহামায়ার জগতের তো অমোঘ নিয়মসমূহ রয়েছে, তাই যার মহামায়াকে তুষ্ট করে মায়াধীশ হয়ে ওঠা হয়নি— সে কি করে তার চতুপার্শ্বস্থ ব্যক্তিদের মায়িক জগতের আকর্ষণ কাটাতে পারবে ? তখনই নিয়ম বা অনুশাসন দিয়ে কর্মীদের, সেবকদের বেঁধে রাখতে হয়। আর চারাগাছে বেড়া দেওয়াও তো ভালো। ঐজন্য দেখবে এই ধরণের বিভিন্ন মিশনে সমস্ত যৌবনকাল ধরে ব্রহ্মচর্য পালন করে বৃদ্ধাবস্থায় সন্ন্যাস দেওয়া হচ্ছে যাতে কোন অঘটন না ঘটে।