জিজ্ঞাসু—ভারতবর্ষে বৌদ্ধ প্লাবন এবং এর অহিংস নীতির ফলই কি ভারতবর্ষের পরাধীনতা, কারণ বিদেশী শক্তির মোকাবিলা করার শক্তি বা ক্ষাত্রশক্তি সব নষ্ট হয়ে তরবারি সেদিন কাষ্ঠের তরবারি হয়ে গিয়েছিল ?
গুরুমহারাজ—একটা মাত্র কারণেই কি এত বিশাল একটা দেশ—এত বৈচিত্র্য ও প্রাচীনতা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে বিদেশীদের দাসত্ব করে ? বহুকাল আগে থেকেই তো বিদেশীরা ভারতবর্ষকে আক্রমণ করেছে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দিক থেকে। তৎকালে জাতিভেদ আর ধর্মীয় সংকীর্ণতা ঐ সমস্ত অঞ্চলকে ভিতর থেকে এমনিতেই দুর্বল করে তুলেছিল। ধনী-সম্প্রদায়, রাজন্যবর্গরা অপেক্ষাকৃত অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। তাই কোন বিদেশী আক্রমণ কখনই সামগ্রিকভাবে সর্বস্তরের জনগণের দ্বারা প্রতিহত করার চেষ্টা হয়নি। পশ্চিমের সোমনাথ মন্দির বারবার লুঠ হয়েছে, জনগণ সমবেতভাবে বাধা দিলে তা কি কখনও সম্ভব হতো ? দ্যাখো না শিবায়েৎদের উদার ধর্মনীতির ফলে দক্ষিণভারতে ধর্মস্থান বা মন্দির কখনও আক্রান্ত হয়নি (যদিও বৈষ্ণব সম্প্রদায় অতটা উদার ছিল না)। সাধারণের ধর্মে অধিকার ওখানে স্বীকৃত ছিল। অত শক্তিশালী মুঘলরাও দাক্ষিণাত্য বিজয় করতে হিমসিম খেয়ে গিয়েছিল, এমনকি বারবার পর্যুদস্ত ও লাঞ্ছিত হয়ে ফিরেও আসতে হয়েছিল তাদের। হিমাচল প্রদেশ, জম্মু, নেপাল এই সমস্ত অঞ্চলগুলির সমগ্র জনসাধারণ ও রাজন্যবর্গের সাথে যুক্ত হয়ে বিরোধ করায় ওরা নিজেদেরকে ধর্মান্তরিত হওয়া থেকে মুক্ত রাখতে পেরেছিল।
বৌদ্ধপ্লাবন যেটা বলছ সেটা উত্তর ভারতেই বেশী হয়েছিল, পরে তা পূর্ব ভারতে বিস্তার লাভ করে। ঐতিহাসিকরা বৌদ্ধদের অহিংসা নীতিকেই অনেকাংশে ভারতবর্ষের সমরবিদ্যার দুর্বলতার অন্যতম কারণ হিসাবে মনে করেন। কিন্তু ভগবান বুদ্ধ, আর ১০০০ বা ১৫০০ বছর পরের Buddhist দের যেন একই মানদণ্ডে বিচার করো না। ভগবান বুদ্ধের শিক্ষা পরবর্তীকালের Buddhist-রা ঠিকমতো মেনে চলতে পারল না বলেই ওরা নানান দলে বিভক্ত হ’ল। হীনযান, মহাযান, বজ্রযান, কালচক্রযান ইত্যাদি বহু ভাগ রয়েছে। ভগবান বুদ্ধ অর্থাৎ অমিতাভ বুদ্ধের মৃত্যুর পরও বেশ কয়েকজন বোধিসত্ত্ব ঐ পরম্পরায় শরীর গ্রহণ করেছিলেন। ‘বোধিসত্ত্ব’ তাঁরাই, যাঁরা নিজেদের মুক্তি বা নির্বাণ না চেয়ে জগৎকল্যাণে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের একজন ছিলেন অবলোকহিতেশ্বর বুদ্ধ। যিনি নিজের মুক্তি না চেয়ে জগতের দুঃখ দূর করার জন্য প্রার্থনা করলেন। যাইহোক গৌতমবুদ্ধ বা অমিতাভ বুদ্ধের কাল চলছে এখন। বৌদ্ধশাস্ত্র মতে এক একজন বিশেষ বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত মহাপুরুষ-এর শরীর গ্রহণের সময় থেকে এক একটা “কালের” সূচনা হয়। গৌতম বুদ্ধের আগে ছিল ‘কাল কোল’- বুদ্ধের কাল, এরপরে আসবে “মৈত্রেয়ী” বুদ্ধের কাল। পৃথিবীর ইতিহাসের বিবর্তন লক্ষ্য করলে দেখবে যে, অমিতাভ বুদ্ধের পর থেকেই জগৎ-হিতের কাজে সন্ন্যাসীরা এগিয়ে এসেছে। “আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ” –সন্ন্যাসীদের সমাজ বা সংসার পাত্তা দিতে চায় না। কারণ সরাসরি তাঁদের যোগপ্রভাব বা তপঃপ্রভাব সমাজের ১ মানুষের মধ্যে পড়ে না। সাধারণ জনমানসে এইরূপ চিন্তার প্রভাব রয়েছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দরা যদি সমাজের জন্য কাজ না করতেন, তাহলে কে তাঁদের কথা মনে রাখতো ! আত্মমোক্ষার্থে যে সব সাধু-সন্ত গিরি-গুহা-অরণ্যে গভীর সাধনায় রত হয়ে বোধিপ্রাপ্ত হয়েছেন—এঁদেরকে “বোধি চিৎ” বলা হয়। নির্বিকার চিত্ত, মহাজ্ঞানী, ‘বুদ্ধ’ স্থিতিতে এরূপ অনেক সাধক পূর্বেও ছিলেন হয়তো এখনও অনেক রয়েছেন! কিন্তু তাঁরাই আজও মহান যাঁরা “বোধিসত্ত্ব” কারণ এঁরা মানুষের মাঝে এসে মানুষের জন্য কাজ করেন। মহাস্থবির অবস্থায় থেকে যাওয়া ‘বুদ্ধ’-রা যেন দূরের নক্ষত্রের আলোক যা সামগ্রিকভাবে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোন না কোন কাজ করে চলেছে। আর বোধিসত্ত্বরা যেন জ্ঞান, প্রেম, ভক্তি, কর্মের জ্যোতির প্লাবন। তাঁরা সূর্যস্বরূপ হয়ে আলো দিয়ে উত্তাপ দিয়ে এই মাটির পৃথিবীকে ধন্য করেন, আর যে পথে যান আলোকধারায় সবকিছুকে স্নান করাতে করাতে যান। “কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালায়ে তুমি ধরায় আসো।” –তাঁর আলোয় সকলে শুধু আলোকিত হয়না—সংস্পর্শপ্রাপ্ত ব্যক্তিদেরও প্রাণের প্রদীপ জ্বলে ওঠে, ফলে তারা আবার অন্যকে আলো দান করতে পারে।
পৃথিবীর মানুষের অবস্থা ঠিক কেমন জানো—যেন অনেকগুলি মানুষ কাদায় পড়ে পরস্পরে কাদা-মাখামাখি করছে আবার সেই নিয়েই হাসাহাসি, সেই নিয়েই কান্নাকাটি, মারামারি সবকিছু করে চলেছে। সবাই জানে যে, সে কর্দমাক্ত, কিন্তু নিজের দুরবস্থা নিয়ে কেউ দুঃখ করছে না, হাসিমুখে সে যে বেশ ভালো রয়েছে, সেটা বোঝানোর ভান করছে। আবার সেইসাথে অপরকে কর্দমাক্ত করার চেষ্টা করে–হয় মজা পাচ্ছে অথবা কষ্ট পাচ্ছে। পৃথিবীগ্রহে যেমন সূর্য দূর থেকে কিরণ দিয়ে পৃথিবীর মঙ্গল করে থাকে, তেমনি বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা দূর থেকে অর্থাৎ কোন না কোন গিরি-গুহা-কন্দর থেকে সংসার-আবর্তে জর্জরিত মানুষের কল্যাণে সতত সচেষ্ট থাকেন। কর্দমাক্ত ব্যক্তিদের উদাহরণের ক্ষেত্রে এটি হবে যে, ইনি যেন দূর হতে তাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন কিভাবে কাদা থেকে উঠে আসতে হবে, পরিষ্কার থাকাটা কত ভালো ইত্যাদি, ইত্যাদি। কিন্তু বোধিসত্ত্ব বা বোধি চিৎ যেন করুণার অবতার। এঁরা বিন্দুমাত্র কালক্ষেপ না করে নিজেরাই কাদায় লাফিয়ে পড়েন, আর নিজে কাদা মেখে অন্যান্য কর্দমাক্ত ব্যক্তিদের ঠেলে ঠেলে আবর্তের বাইরে পাঠিয়ে দেন। এঁরা জানেন সংসারপঙ্কে নিমজ্জিতদের তুলতে গেলে নিজের গায়েও কাদা- আবর্জনা লাগবে। কিন্তু এরজন্য তাঁরা তোয়াক্কা করেন না। কারণ তাঁরা নিজের সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। কিভাবে কর্দমাক্তদের তুলে আনতে হবে, আর তারপর বেলা শেষে নিজেকে কিভাবে তুলতে হবে—সব কৌশলই তাঁদের জানা আছে।
এই ধরণের মহাপুরুষদের লীলাকালে এইজন্য সমালোচকেরা ভেবে বসে যে, “ঐ দ্যাখো ওনার গায়েও কত কাদা লেগে আছে”– কিন্তু এই কাদা মাখা বা মনুষ্যোচিত আচরণ শুধু জীবসকলকে প্রত্যাশাবিহীন ভালোবাসার জন্য, তাঁর ব্যক্তিগত কিছু চাওয়া বা পাওয়ার জন্য নয়। ‘বুদ্ধ’-রা অর্থাৎ যাঁরা সমাজে এসে কাজ না করে দূর থেকে কাজ করেন তাঁরাও সংসার আবর্ত থেকে বেরোনোর কৌশল জানেন কিন্তু কাদা বা কলঙ্ক মাখতে চান না। তাই সমাজে সরাসরি নেমে আসেন না। কিন্তু বোধিসত্ত্বরা করুণাবশত জীবোদ্ধারের জন্য লাফিয়ে পড়েন। তাই তাঁরা করুণাবতার। আধ্যাত্মিক জগতের নিয়ম বড় বিচিত্র, সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে কি তার ইয়ত্তা করা যায় ?
জিজ্ঞাসু—মৌন কে ?
গুরুমহারাজ—যিনি মনকে বশীভূত করেছেন তিনিই যথার্থমৌন। সাধারণত কথা না বলা বা বাকসংযমকে আমরা মৌনতা বলি বটে কিন্তু ওটা এর একটা অঙ্গমাত্র। কয়েকবছর কথা না বললে শক্তি সঞ্চয় হয়, ১২ বছর কথা না বলে বা বাকসংযম করলে বাক্সিদ্ধি ঘটে। কিন্তু এগুলি যথার্থ ‘মৌন’ নয়।
হিমালয়ে উত্তরকাশীর ওদিকে মৌনীবাবা নামে একজন উচ্চকোটির সাধক থাকতেন—প্রায়শই উনি কোন কথা বলতেন না বলেই ওঁর এইরূপ নামকরণ। কিন্তু প্রয়োজন বা উপযুক্ত সঙ্গলাভ হলে ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ খুব করতেন। আমি যখন ছোট বয়েসে ওনার সান্নিধ্যে এসেছিলাম, তখন আমার সাথে নানান আলোচনা হতো, আবার লোকজন এলে কথা বন্ধ। আমি ব্যাপারটা জানতাম বলে কোন অসুবিধা হোত না। কিন্তু একদিনকার ঘটনায় আমিও খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। হয়েছে কি একদিন কিছু তীর্থ-পর্যটক, বাঙালিই হবে—খোল-করতাল বাজিয়ে হরিনাম করতে করতে সেখানে হাজির। সাধুর আশ্রম দেখে তাদের স্ফূর্তি বেড়ে গেল—লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে হরিনাম করতে শুরু করেছে। খোলের আওয়াজ, খঞ্জনীর আওয়াজ তারপর আবার ঝম্প বাজাচ্ছে ঝম্ ঝম্ করে। বুঝতেই পারছো—পার্বত্য এলাকায় যে কোন শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে এমনিতেই গম গম করে, তার উপর এই উৎপাত। বেশির ভাগ মানুষ তো “হুঁশো” অর্থাৎ হুঁশহীন বা অবিবেকী। কত সাধু-সন্ত ঐ সব স্থানে ধ্যান-জপ করে, শান্ত বা নির্জনতাকে বেছে নিতেই সাধুদের এত ত্যাগ বা কষ্টস্বীকার, কে বোঝে কার ব্যথা !
সে যাইহোক, তীর্থযাত্রীর দল তো হুল্লোড় বাধিয়ে বসেছে এমন সময় হঠাৎ গুফা থেকে মৌনীবাবা একটা বড় চিমটা হাতে নিয়ে তর্জন-গর্জন করতে করতে তেড়ে এলেন ঐ দলটির দিকে। তারপরই সে কি হুঙ্কার ! “ভাগো হিয়াসে, নিকালো – নেহি তো মার ডালুঙ্গা।’ ওনার এই রুদ্র মূর্তি দেখে লোকগুলো নাম-গান বন্ধ করে পড়ি-কি- মরি দৌড়ে পালাল। আমি খুব হাসছিলাম, চোখাচোখি হতেই জিজ্ঞাসা করলাম—কি হল, এরকম করলেন কেন ? উনি উত্তর দিলেন- “আরে ইয়েলোগ্ খোল পার্টি হ্যায়’, ভূত ভাগানেকা যন্ত্রর-মন্তর লেকে চলা আয়া ! ভক্তিবাদী হ্যায় থোরি–বকওয়াশ কর রহা থা। ‘ উনি হাসতে হাসতে ভিতরে ঢুকে গেলেন।
যাইহোক যা বলতে চাইছিলাম, ইনি সাধুসমাজে মৌনীবাবা নামে পরিচিত। যথার্থই ইনি মৌনী কিন্তু প্রয়োজনে কথা বলছেন। আধ্যাত্মিকতা মানুষকে স্বাধীন করে—কোন বাঁধনে তো বাঁধে না ! আর বন্ধন তো মনের। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন না—মানুষ মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত। মনকে বশীভূত করলে তবে মনের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায়। এবার কথা হচ্ছে যেহেতু মন দশ ইন্দ্রিয়ের পরিচালক, তাই মন বশীভূত থাকলে বাগেন্দ্রিয় কেন যে কোন ইন্দ্রিয়-ই বশীভূত থাকবে। এটাই মৌনতার রহস্য।
জিজ্ঞাসু—রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা বোধগম্য নয়—এরূপ বলা হয় কেন ? অপ্রাকৃত, সাধারণের
গুরুমহারাজ—ক্লাস ওয়ানের ছেলেকে M.A ক্লাসের পাঠ দিলে সে কি বুঝবে বল ? সেই ছাত্রটিই যখন বড় হয়ে ধীরে ধীরে B.A পাশ করে M.A-তে ভর্তি হবে তখন M.A ক্লাসের পাঠ ঠিক ঠিক নিতে পারবে—তাই নয়কি ? এটাই তো নিয়ম। দেহভাণ্ডে ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্ব রয়েছে কিন্তু সবমানুষ কি সেই তত্ত্বের সন্ধান পাচ্ছে ? কিন্তু কোন কোন মানুষ পাচ্ছে। মানুষ-ই নিজ নিজ স্বভাব অনুযায়ী ভাব আশ্রয় করে মহাভাবে উপনীত হতে পারে। আর মহাভাবময়ীরাধাই রাসেশ্বরী। তখন তার অনুমতিতে রাসমঞ্চে প্রবেশাধিকার লাভ হয়—এটাই ক্রম। কিন্তু যতক্ষণ তা না হচ্ছে তত ক্ষণ তো অপ্রাকৃত চিন্ময় লীলার সন্ধান বা আস্বাদন পাওয়া যাবে না ।
মানবশরীর সমস্ত লীলা আস্বাদনের উপযুক্ত আধার। এই শরীরকে কেন্দ্র করে যে আদ্যাশক্তি কুলকুণ্ডলিনী মূলাধারে সুপ্ত রয়েছে, তার ঘুম ভাঙানোটা হচ্ছে সাধনার প্রথম সোপান, আধ্যাত্মিক রাজ্যে প্রবেশের এটি চাবিকাঠি। সাধনার প্রথমাবস্থায় তাই প্রয়োজন হয় নিষ্ঠা ও শ্রদ্ধা সহকারে সদগুরুর নির্দেশিত পথ অবলম্বন। সাধন, ভজন ইত্যাদির বিভিন্ন নিয়ম বা পন্থা গোটা পৃথিবীতে যে চালু রয়েছে তার উদ্দেশ্য ওটাই। মানুষের কুলকুণ্ডলিনী যে কোনভাবে একবার জাগ্রত হলে তা মেরুদণ্ড অভ্যন্তরস্থ সুষুম্নানাড়ীকে অবলম্বন করে ঊর্ধ্বপথে বিভিন্ন শক্তির ক্ষেত্রকে অতিক্রম করতে থাকে। এই শক্তিক্ষেত্রগুলিকে এক একটি চক্র বলা হয়। বিভিন্ন ডাক্তাররা দেশে এবং বিদেশে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে যে, অ্যানাটমিক্যালি এই চক্রগুলির অস্তিত্ব আছে কি ? তারা যখন মানবশরীর (মৃত) ব্যবচ্ছেদ করেছে তখন কোন চক্রের সন্ধান পায়নি, অতএব এ ব্যাপারটি সত্য নয় ! কি মুস্কিল। যোগশাস্ত্রে ছবি এঁকে প্রত্যেক চক্রে যে কর্ণিকাসহ পদ্মের উল্লেখ দেখানো হয়েছে—সেগুলি কি স্থুল চোখে দৃশ্যমান নাকি ! সাধকের অন্তর্দৃষ্টিতে তা প্রতীয়মান হয়। পৃথিবীতে কোন যোগী কি ঐ চিত্রসমূহের বিরোধ করেছে ? করবে কেন—ওগুলো বাস্তবিকই যেমন তেমনই চিত্রিত হয়েছে। ঠিক তেমনি রয়েছে— তবে সুক্ষ্মাকারে। সাধনা করতে করতে সাধকের অন্তর্দৃষ্টিতে এদের রূপ পরিস্ফুট হয়। কোনটি চতুর্দল পদ্ম, কোনটি অষ্টদল, কোনটি দ্বিদল আবার সহস্রারে সহস্রদল পদ্ম রয়েছে। চক্রগুলি যথাক্রমে মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ, আজ্ঞাচক্র ও সহস্রার। যোগসাধনার অগ্রগতির সাথে সাথে ষট্চক্রের প্রতিটি পদ্মকে প্রস্ফুটিত করতে করতে ইনি ঊর্ধ্বমুখে এগিয়ে চলেন। আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত ষটচক্র। তারপর সহস্রার। আর এই সহস্রারই রাসমঞ্চ। এখানে সহস্রদল পদ্ম বিরাজিত। এই রাসমঞ্চে প্রবেশ করলে তবে জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন ঘটে—এটাই নিত্যরাস।
দ্যাখো, সাধারণ মানুষের মন সর্বদা নাভির নীচে রয়েছে। ঐ স্থান শাস্ত্রসম্মতভাবে ব্রহ্মগ্রন্থি অর্থাৎ মূলাধার থেকে মণিপুর পর্যন্ত। মণিপুর থেকে অনাহত পর্যন্ত বিষ্ণুগ্রন্থি, অনাহত থেকে আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত রুদ্রগ্রন্থি। সাধারণ মানুষ কি কখনও সাধন-ভজন ব্যতিরেকে কোনদিন গ্রন্থিগুলি ভেদ করতে পারবে ?
বিভিন্ন সাধকেরা সাধনার দ্বারা ব্রহ্মগ্রন্থি ভেদ করলেও বিষ্ণুগ্রন্থি ভেদ করতে পারেন না। যখন কেউ সাধনার দ্বারা বিষ্ণুগ্রন্থি ভেদ করতে পারেন তখন তাঁর জগৎ রহস্যের জ্ঞানলাভ হয়। আর রুদ্রগ্রন্থি ভেদ করতে পারলে তবেই জীব মহামায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়, এটাকে যোগে কৈবল্যস্থিতি বলে, বৌদ্ধরা এটাকেই নির্বাণ বলেন। কিন্তু রাসের রস-আস্বাদন সহস্রারে, যেখানে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন ঘটে। রুদ্রগ্রন্থি ছিন্ন হবার সময় যে ঘটনা ঘটে সেটা বলছি। যে মায়াকে আশ্রয় করে ব্রহ্ম এতদিন নিজেকে একটি ‘দেহ’ ভেবে জীব সেজেছিল, সেই অবিদ্যা মায়াই এখন ‘মা’-রূপে অগ্রগতিতে বাধা দান করেন। শাস্ত্রে পরশুরামের মাতৃহত্যার যে কাহিনী রয়েছে -এখানে ‘রেণুকা’ গর্ভধারিণী জননী নয়। পিতার আদেশে মাতৃহত্যার অর্থ হল—পিতা অর্থাৎ গুরুর নির্দেশে রুদ্রগ্রন্থির ভেদ। বর্তমানকালে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাঁর নির্বিকল্পলাভের পূর্ব অবস্থা বোঝাতে এটাই বলেছিলেন। তিনি যতবার তাঁর মনকে নির্বিকল্প ভূমিতে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলেন ততবার তাঁর ইষ্টদেবী জগদম্বার রূপ ধরে তাঁকে বাধা দিচ্ছিলেন। এবার বার বার চেষ্টা করেও যখন কোন কাজ হল না তখন তিনি জ্ঞান-কে খড়গরূপে ব্যবহার করে অবিদ্যা-মায়ারূপ মাকে দ্বিখণ্ডিত করতেই তাঁর স্থিতি হুহু করে নির্বিকল্প ভূমিতে প্রবেশ করল।
তাহলে বুঝতে পারছ কি প্রকৃত বাস কি বিষমবস্তু ! সাধকের মহাভাব অবস্থা বা নির্বিকল্প অবস্থাই ‘রাস’, রাধা কোন নারী নয়, চিরন্তন ভক্তের একটি সার্থক প্রতীকী রূপ। আর ষোড়শ গোপী হচ্ছে সহস্রারে ষোড়শদল পদ্ম—যাঁরা রাধা-কৃষ্ণকে ঘিরে নৃত্য করেন। এখানে হ্লাদিনীশক্তির স্ফুরণ ঘটায়—সাধকের শরীরে অনির্বচনীয় আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। যোগশাস্ত্রে বলা আছে যে, প্রতিটি লোমকূপে রমণের আনন্দ হয়। এই যে কথাটা বলছি তোমরা কি কোন ধারণা করতে পারছ—পারছ না, তাহলে শাস্ত্র পড়ে বা কীর্তনীয়ার কাছে শুনে কি করে এইসব গূঢ় রহস্যের সমাধান করতে পারবে। আর্যদের শিক্ষাদানের পদ্ধতি ছিল বিভিন্ন প্রতীক বা মূর্তির অবতারণা করে কঠিন কঠিন তত্ত্বসমূহকে প্রকাশ করা। রাধা, ষোড়শ- গোপিনী, রাসমঞ্চ ইত্যাদি ব্যাপারগুলিও এইরকমই প্রতীকী। সাধনার দ্বারা যতক্ষণ না কেউ সঠিক স্থানে উপনীত হয়েছে, ততক্ষণ সেই স্থানের রহস্য সে কি করে বুঝবে বল ? বিভিন্ন প্রতীক বা প্রতিমার রহস্য, বেদাদি শাস্ত্র বা পুরাণের নানা তত্ত্ব বা ঘটনার রহস্য সঠিকভাবে বুঝতেও সাধন-ভজন দরকার হয়। প্রয়োজন হয় সদগুরুর সান্নিধ্যলাভ। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে গুরুর চরণপ্রান্তে বসে শাস্ত্রশিক্ষা করে সেই শিক্ষা জীবনে যোজনা করলে তবে জ্ঞানলাভ হয়। “শ্রদ্ধাবান্ লভতে জ্ঞানম্” – কথাটার তাৎপর্য এটাই।