[আজ থেকে শুরু হচ্ছে “কথা প্রসঙ্গে” -৩য় খন্ডের সংশোধিত রূপ।।]

জিজ্ঞাসু:—আপনার আগেও তো ভারতে তথা পৃথিবীতে অনেক মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করেছেন—তাঁরাও জ্ঞানের বাণী, প্রেমের বাণী ছড়িয়ে গেছেন, অধ্যাত্মশিক্ষা, সংযম ইত্যাদি নানান শিক্ষাও দিয়ে গেছেন। তাঁদের জীবন ও জীবনী হয়তো অনেকে আদর্শ করেছে, আবার অনেকে করেনি। কিন্তু জগৎ যে রকম, সেইরকমই তো রয়ে যাচ্ছে _তাহলে আপনি ধর্মজগতের লোক হয়ে, একজন গেরুয়াপরা সন্ন্যাসী হয়ে জগৎ বা জীবনের পরিবর্তনের জন্য আলাদা করে আর কি করবেন ?

গুরুমহারাজ:—দ্যাখো, আমার গুরুদেব স্বামী রামানন্দ অবধূতজীও আমাকে পরীক্ষাছলে এ ধরণেরই কথা বলেছিলেন—জগৎ ‘জ্যায়সা কি ত্যায়সা’, ‘কুত্তা কা পুছ’ ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কি তাই ! তিনি(রামানন্দ জী)ব্রহ্মজ্ঞানী ছিলেন, তিনি সবই জানতেন! তবু হয়তো আমাকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন বলেই ঐ ধরণের কথা বলেছিলেন।

যাই হোক, দ্যাখো _এই জগৎ-সংসারের সৃষ্টি কবে হয়েছে, কিভাবে হয়েছে তার সঠিক সিদ্ধান্ত আজ পর্যন্ত তো সাধারণভাবে করা যায়নি। বিভিন্ন জড়বিজ্ঞানীরা অনুমান করে কিছু তত্ত্ব বা তথ্য দিয়েছেন মাত্র। কিন্তু জগৎ সৃষ্টি হবার পর এখন যে বিবর্তনের পালা চলছে _ এটা তো আমরা সকলেই দেখতে পাচ্ছি। বিবর্তন মানেই তো এগিয়ে চলা—তাহলে এটা বলাই যায় যে, 'জগৎ জ্যায়সা কি ত্যায়সা' নয় ! তোমার মনে হোতে পারে যে, বিভিন্ন মহাপুরুষগণ জন্মগ্রহণ করেছেন তাতে কি আর এমন হোলো ? – কিন্তু কিছু হোচ্ছে বইকি ! তোমার Antenna-য় হয়তো তা ধরা পড়ছে না !

 দ্যাখো _পরমানন্দ জানে যে, কি করলে সৃষ্টির কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। তাই যদি রাজনীতির দ্বারা মানুষের কল্যাণ হোতো তাহলে আমি নিশ্চয়ই রাজনীতির নেতা হোতাম। যদি বিশেষ কোনো মঠ, মিশনে বা মজহব্‌-এ যোগ দিলে মানুষের কল্যাণ হোতো তাহলে আমি সেখানেই যোগ দিতাম, পৃথকভাবে পরমানন্দ মিশনের প্রয়োজন হোতো না। জানো_মানুষের ভালো করার জন্য প্রচুর সংগঠন, সংঘ, প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলিতেও কিছু কাজ হোচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে "ধর্ম" তো প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বিষয় নয়, "ধর্ম"-কে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে কাজের সুবিধার জন্য। প্রকৃতপক্ষে বলতে গেলে বলতে হয় _'প্রাণই ধর্ম'। প্রাণের দ্বারাই জীবের সৃষ্টি। পিতার শুক্র ও মাতার রজঃ নিয়ে প্রাণের ধারাতেই জীবের সৃষ্টি। আবার প্রাণবায়ুর ক্রিয়াশীলতাতেই জীবনকাল এবং প্রাণবায়ুর ক্রিয়াশীলতা বন্ধ হোলেই জীবদেহের মৃত্যু। এইভাবে প্রাণই জীবজগৎকে ধরে আছে। তাই জীবনের নিরিখে _'প্রাণই ধর্ম'। আর শক্তিকে প্রাণরূপে ধরে ব্যাখ্যা করা যায় যে, জড়জগৎ-ত্ত বিধৃত হয়ে রয়েছে প্রাণে। স্বামী বিবেকানন্দ এগুলি চমৎকার ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছেন। তন্ত্রের মা, বৈষ্ণবের রাধা, যোগীর ঈশ্বর, প্রতীক উপাসকের প্রণব---এই গুলি সবই 'প্রাণ' ছাড়া আর কিছু নয়। প্রাণাশ্রয়ী না হোলে যে কোনো ধর্মমত হিংসাশ্রয়ী ও বিষয়াশ্রয়ী হয়। একহাতে ধর্মপুস্তক অন্যহাতে তরবারি নিয়ে বা 'ছলে বলে কৌশলে' অপরকে স্ব-ধর্মমতে আনা প্রাণাশ্রয়ী নয়। প্রকৃত অর্থে ধর্মের কোনো প্রবর্তক বা প্রবক্তা হয় না, ধর্মমতের হয়। এইজন্য দেখতে পাওয়া যায় _পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মমতের প্রবর্তক বা প্রবক্তা রয়েছে কিন্তু সনাতন ধর্মের কোনো প্রবর্তক নাই। ধর্ম হোলো সনাতন, যা নিত্য-শাশ্বত-চিরন্তন।

অধ্যাত্মজগতের মহাপুরুষেরা বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জন্মগ্রহণ করেছেন ঠিকই কিন্তু তাদের সংখ্যা অত্যন্ত কম। তাদের মধ্যে আবার ভারতবর্ষেই এই সংখ্যাটি সবচাইতে বেশী আর বহু সুপ্রাচীনকাল থেকে এই পরম্পরাই চলে আসছে।

  ভারতবর্ষের মধ্যে আবার কেরল, বাংলা, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে মহাপুরুষদের জন্মগ্রহণের হার অন্যান্য প্রদেশ অপেক্ষা বেশী। উত্তরভারত, বিহার, উড়িষ্যায় তুলনামূলকভাবে কম। পবিত্র আধার(মাতৃ শরীর)ছাড়া মহাপুরুষগণ শরীর নিতে পারেন না। ফলে যে অঞ্চলে মেয়েরা বা মায়েরা শরীর ও মনে যত শুচি বা পবিত্র ও আধ্যাত্মিক, সেই অঞ্চলে ততোই ভালো মানুষ বা মহাপুরুষ জন্মানোর সম্ভাবনা বেশী থাকে। উত্তরভারতে ভালো মানুষ হয়তো রয়েছে কিন্তু বৈরাগ্যবান মানুষের সংখ্যা খুবই কম। আমি ১৯৯৪ খ্রীষ্টাব্দে last উত্তরভারত গিয়েছিলাম তারপর থেকে আর যাওয়া হয়নি, সত্যি বলতে কি ওখানে যেতে আমার আর ভালোই লাগে না।। [ক্রমশঃ]