(অনেক মহাপুরুষ তো আগে এসেছিলেন তাতে বিশেষ কিছু হয়নি । তাহলে গুরু মহারাজ বেশি কি করবেন এই আলোচনার পরবর্তী অংশ)

…… তবে আধুনিক ভারতবর্ষে স্বামী বিবেকানন্দই প্রথম যিনি ‘ভারত- ভাবনা’ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম বক্তৃতায় এবং লেখায় ‘হে ভারত!’ —এই সম্বোধন করলেন। সমস্যার বীজ কোথায় তা বুঝতে পেরে তিনি চেয়েছিলেন তার মূল উৎপাটন করতে। তবে তিনি কতটা successful হয়েছিলেন তার পরিমাপ আমি করতে যাবো না। এসব তোমার মতো সমালোচকদের কাজ- তোমরা ওইসব করো। আমি শুধু তোমাদের কাছে ২৫০০ বছর আগে থেকে আজ পর্যন্ত ভারতবর্ষের অধ্যাত্ম জগতের বিবর্তনটা তুলে ধরার চেষ্টা করছিলাম। বিভিন্ন মহাপুরুষ শরীর নিয়েছেন, যে কাজের জন্য তিনি এসেছেন সেই কাজ করেছেন, কাজ সমাপনান্তে তাঁরা চলে গেছেন। এবার একজন মহাপুরুষ কি করে গেলেন, সমাজকে কি দিয়ে গেলেন সেটা তোমরা কি করে বুঝবে ? স্বামী বিবেকানন্দ শরীর ছাড়ার আগে গুরু-ভাইদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন— “বিবেকানন্দ কি করে গেল, তা আর একটা বিবেকানন্দ হোলে বুঝতে পারতো!” ব্যাপারটা বুঝতে পারলে কি!

  দ্যাখো, যে কোনো দর্শন বা যে কোনো ধর্মমতের উদ্দেশ্য তো খারাপ নয়, কিন্তু আদর্শেই যত গোলমাল। ইসলাম বর্তমানে নানা ভাগে বিভক্ত_ খ্রীষ্টানসমাজ আরও বেশীভাগে, বৌদ্ধসমাজ শতধা বিভক্ত, হিন্দুসমাজের তো অবস্থা দেখছোই। তাহলে সাধারণ মানুষ ধর্মজগত থেকে কি ভরসা পাবে !     বাপ-ঠাকুর্দা ধর্মাচরণ করে এসেছে _তাই অনেকে সেই পরম্পরা বজায় রেখে চলেছে। কিন্তু আধুনিক ছেলে-মেয়েরা ঐ ধরণের ধর্মাচরণ মানছে না। ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া সব মহাদেশের কথাই বলছি, আর সব ধর্মমতের কথাই বলছি ! ইসলামিক রাষ্ট্র communist দেশে পরিণত হয়ে যাচ্ছে, খ্রীষ্টান দেশগুলির যুবকেরা হিপি কিংবা punk হয়ে যাচ্ছে, আর ভারতে যে কি হোচ্ছে _তার আর কোনো নাম দেওয়া যাবে না!! তাহলে এখন উপায় ? এখানে শ্রেষ্ঠ দর্শন রয়েছে, মানব জীবনে পূর্ণতা লাভ করা যায় _এমন ধর্মাচরণ রয়েছে, সহস্র সহস্র সংঘ-মজহব-মঠ-মিশন-চার্চ-মন্দির রয়েছে—তবু কেন young generation-এর অধ্যাত্মজগতের প্রতি এই অনীহা ? উত্তর একটাই—উপযুক্ত আদর্শের অভাব। ছেলে-মেয়েরা কোনো filmstar অথবা player অথবা কোনো rockstar-কে আদর্শ করছে। সমগ্র পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে দেখো—ধর্মজগতের আদর্শ কোথায় ! তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে, সমাজকে ধর্মমুখী বা অধ্যাত্মমুখী করতে গেলে ধর্মজগতের কোনো আদর্শ মানবের প্রয়োজন, যিনি নিজ জীবনে ধর্ম অনুশীলন করে জগতের সামনে নিজেকে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ জগৎ তাঁর শিক্ষাই মেনে নেবে—যিনি নিজ জীবনে সেই শিক্ষাকে অনুশীলন ও যোজনা করেছেন এবং তার ফললাভ করেছেন। ধার-করা বিদ্যা, মুখস্থ বিদ্যার কচকচানি আর ব্যাখ্যা আধুনিক মানুষ শুনতে চায় না। এখনও দেখবে যেখানে কথকতা হোচ্ছে, পুরাণ-রামায়ণ পাঠ হোচ্ছে, কীর্তন হোচ্ছে—সেখানে কয়েকজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা অলসভাবে পা ছড়িয়ে বসে বসে সে সব শুনছে আর ‘আহা’ ‘আহা’ করছে, হয়তো চোখের জল‌ও ফেলছে। যুবকেরা সেখানে থাকবে কেন! দেখবে তারা রয়েছে সেখানেই __যেখানে খেলাধুলা হোচ্ছে, শরীর চর্চা হোচ্ছে, নাহয় কোনো কসরৎ প্রদর্শন, শরীর প্রদর্শন অথবা নাচ-গান হুল্লোড় চলছে !

স্বামী বিবেকানন্দ এই জন্যই সাধু মহাত্মাদের প্রচলিত বক্তব্য থেকে সরে গিয়ে বলেছিলেন_ঘরে বসে বসে গীতাপাঠ করে একজন ক্ষীণজীবী যুবক হবার চেয়ে ফুটবল বা অন্য কিছু outdoor games খেলে শরীরটাকে মজবুত করতে । তারপর তিনি এটাও বলেছিলেন যে, শরীর মজবুত হোলে তবেই গীতার মর্মার্থ ভালোভাবে বোঝা যাবে।

 যাইহোক, আমার গুরুদেব রামানন্দ অবধূত আমাকে বলেছিলেন_ 'পরম্পরার গোলাম হয়ো না কিন্তু পরম্পরাকে মেনে চলো।” তাই তাঁরই নির্দেশানুসারে আমাকে এইসব (গেরুয়া কাপড়) পরতে হয়েছে। যেহেতু স্বামী বিবেকানন্দ বর্তমান সন্ন্যাসীদের আদর্শ—তিনিও গেরুয়া পরেছিলেন । আমি গেরুয়া পরলাম সন্ন্যাসীদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করার জন্য। এটা ভারতের কৃষ্টিতে রয়েছে যে, বারবার সম্রাটের রাজমুকুট সন্ন্যাসীর পদতলে লুণ্ঠিত হয়েছে ! তাহলে সেইরকম আদর্শবান সন্ন্যাসী হয়ে উঠলে আজও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে।

আর পরমানন্দ কি করবে ? সে জানে মানুষকে পরিবর্তন করতে হোলে তার বিচারের ধারাকে পরিবর্তন করতে হবে—তবেই মানুষ পরিবর্তন হবে। সে সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছে। (ক্রমশঃ)