(অনেক মহাপুরুষ তো আগে এসেছিলেন তাতে বিশেষ কিছু হয়নি । তাহলে গুরু মহারাজ বেশি কি করবেন এই আলোচনার শেষ অংশ।)

…. মঠাধীশদের কথা যা বলছিলাম তাঁদের মধ্যে একজনের কথা আমার মনে পড়ে যাচ্ছে, তাঁর কথা বলছি শোনো; বারাণসীর এক মঠাধীশ ছিলেন তিনি ! তাঁর ছিল রুপোর সিংহাসন, সোনার খড়ম, হাতে কানে-গলায় সোনার অলঙ্কার, তাতে আবার হীরে বসানো। এদিকে তিনি আবার বেদান্তী-সন্ন্যাসী — বেদান্ত চর্চা করতেন, অনেক ভক্ত তাঁর চর্চা শুনতেও আসতো। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে যখন তাঁর সঙ্গে কথা বললাম, দেখলাম তিনি সকলকে ‘প্রাণিমাত্র’ বা ‘জীবমাত্র’ বলে সম্বোধন করছেন আর নিজেকে বলছেন ‘প্রভু’ ! ওনার সেবকেরা সকলেই ওনাকে ‘প্রভু’ বলে সম্বোধন করছেন। কেউ তা না করলে তিনি বিরক্ত বোধ করছেন, রেগে যাচ্ছেন। আমি তখন বালকশরীরে একজন পরিব্রাজক। উনি আমাকে উপদেশ দিলেন— “ঘুরে বেড়ালে কিছু হবে না যে কোনো একটা রাস্তা ধরো, দিয়ে চুপ করে এক জায়গায় বসো। ” সেখানে ওঁর ভক্তরাও অনেকে ছিল তাই আমি চুপ করে বসে রইলাম। উনি আমাকে উদ্দেশ্য করে আবার বললেন, “কি হোলো চুপ করে আছো কেন—কিছু কথা বলো ?” আমি সবিনয়ে বললাম, “একটা কথা বলবো ?” উনি বললেন, “হ্যাঁ-হ্যাঁ, বলো।” আমি বললাম— ”আমি তো রাস্তা খুঁজতেই পথে বেরিয়েছি, আমি সেই রাস্তা পেতে চাই যা আমাকে ঈশ্বরের মঞ্জিল পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। আপনার যদি সেই রাস্তার সন্ধান জানা থাকে তাহলে আমাকে বলে দিন। তবে হ্যাঁ, আমি এমন রাস্তার সন্ধান চাই না যা আমাকে আপনার মতো এমন জায়গায় পৌঁছে দেয় যা দিয়ে পীঠাধীশ, মোহান্ত ইত্যাদি পদ অথবা রুপোর সিংহাসন, সোনার খড়ম, অলঙ্কারাদি লাভ হয় কিন্তু কথায় এবং কাজে দুস্তর ব্যবধান থাকে।”

উনি একবার চারিদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বললেন, 'এখন চলে যাও, পরে কথা হবে।' ওখানে যারা ভক্তমণ্ডলী ছিল, উনি তাদের উদ্দেশে যে কথাগুলো বললেন সেটা আমি যেতে যেতে শুনতে পেলাম। উনি বলছিলেন—“সিদ্ধ হ্যায়, বালক শরীরমে ঘুমতা হ্যায়। উনকো বলনে কা হক্‌ হ্যায়—ইসি লিয়ে বোলা।” উপস্থিত ব্যক্তিরা মোহান্তর 'সিদ্ধ' চেনার ক্ষমতা দেখে হয়তো আরও অবাক হোলো, তাঁর প্রতি তাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা হয়তো আরও বেড়ে গেলো। —এইটাই চালাকি ! আর এই যে ভণ্ডামি, আমার এটার বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ ছিল! যিনি প্রতিদিন বেদান্তপাঠ করছেন, বলছেন “সর্বং খলু ইদং ব্রহ্ম” —অথচ ছোটো-বড়ো, উচ্চ-নীচের পার্থক্য দেখছেন --তাদের বিরুদ্ধে আমি সবসময় প্রতিবাদ করেছি, কখনো আপোষ করিনি! বেদান্তে শূদ্র-ভদ্র, ধনী-নির্ধন, পাপী-পুণ্যবানের পার্থক্য কোথায় রয়েছে? যেখানে জীব আর জড়েরও পার্থক্য থাকছে না, সেখানে উচ্চ-নীচ, জাত-পাত, সাধু-গৃহী এইসব sentiment সৃষ্টি করে সমাজের সর্বনাশ করা ছাড়া আর কি হোচ্ছে বলোতো !

 এই ধরণের বহু পরম্পরা চলে আসছে সাধুসমাজে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ! এই যে ধর্মের নামে ভণ্ডামি–এর ফলেই এক সময় সাধারণ মানুষ সমাজের উচ্চবর্গের কাছ থেকে দূরে সরে এসেছিল। কারণ উচ্চবর্গেরা সাধুসমাজ বা ব্রাহ্মণদের দলে টেনে রেখে বেশ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছিল আর বঞ্চিত হচ্ছিলো সাধারণ মানুষেরা। এর‌ই ফলস্বরূপ ভারতবর্ষের পরাধীনতা ! বিদেশীদের হাতে চলে গিয়েছিল গোটা দেশটা। উচ্চবর্গের মাইনে করা সৈন্যরা হয়তো লড়াই করেছে কিন্তু সাধারণ মানুষ দেশরক্ষার জন্য কাস্তে-কোদাল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে—এমন তো কোথাও হয়নি !

যাইহোক, বারাণসীতেই আবার দশাশ্বমেধ ঘাটে কামরূপ আশ্রমে দেখেছি—রান্নাবান্না করার অথবা সাধুদের খেতে দেবার কোনো ব্যবস্থাই নেই, আশ্রয় মিলবে কিন্তু আহার নয়। যাঁরা ওখানে permanent থাকেন তাঁরা, আবার যাঁরা ঘুরতে ঘুরতে এসে আশ্রয় নেন, তাঁরাও মাধুকরী করে তাঁদের প্রয়োজনীয় আহার সংগ্রহ করে নেন। আমি দেখেছি একটুখানি আটা হয়তো কোনো সাধু পেয়েছে_ তা সেটাকেই জল ঢেলে ২/৩ টে লেট্টি করে, ধুনির আগুনে সেঁকে একটু চাটনি দিয়ে পরমানন্দে খেয়ে মনের সুখে ‘জয় শিব-শম্ভো' অথবা 'রাম-রাম-সিয়ারাম' ইত্যাদি ঈশ্বরের নাম স্মরণ করতে করতে বিশ্রামের ব্যবস্থা করছেন। অনেকে আবার ধুনির সামনে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সৎসঙ্গে মশগুল হয়ে গেছেন। আবার কেউ সারারাত ধ্যানে মগ্ন হয়ে রয়েছেন। আমি ছোটবেলায় বেশ কয়েকদিন ওখানেও থেকেছিলাম। অনেক উন্নত সাধুদের সাথে সেই সময় আমার যোগাযোগ হয়েছিল।

আবার দেখেছি এমন মঠ, যেখানে সাধুদের থাকা এবং খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। ডাল-রুটি-ভাত-তরকারি, দই, মাঝে মাঝে ‘জিলাপি’ও হয়। সেখানে দেখেছি সাধুরা চর্ব্য-চুষ্য খেয়ে-দেয়ে হয়তো দু’ঘণ্টা খাবার নিয়েই আলোচনা চালিয়ে গেল। একদিন শুনলাম একজন বলছে, ‘রোজ করোলার(তেঁতো) তরকারি কি ভালো লাগে ? খাবার আস্বাদনের ভালো লাগাটাই যদি জীবনের উদ্দেশ্য ছিল _ তাহলে সংসারাশ্রম ছেড়ে সন্ন্যাসাশ্রমে আসা কেন ! ওখানেই তো বেশ ভালো ছিল ! সম্যকরূপে অনাসক্তিই সন্ন্যাস । তাই সম্যকরূপে অনাসক্ত হোতে হবে, শুধু খাওয়া বা শোওয়া ইত্যাদি একটা-দুটো বিষয়ে নয় সর্বক্ষেত্রে সমানভাবে সংযম কার্যকর করতে হবে। এইজন্যই “সম্যকরূপে অনাসক্তি” কথাটা বলা হয়েছে । এইরূপ অনাসক্তি না আসলে শুধু গেরুয়া পরে অহঙ্কার বাড়িয়ে লাভ কি ! গেরুয়া না পরাকালীন যেটুকু শক্তি সঞ্চয় হয়েছিল, সেটাকেও খরচা করা ছাড়া তো আর কিছু হয় না ! তাই মহাজনগণ বারবার সতর্কবার্তা দিয়েছেন__ “সাধু সাবধান”!!