জিজ্ঞাসু:—মহাপ্রভুর বেশীরভাগ সময়ই তো উড়িষ্যায় কেটেছে, তাহলে নবদ্বীপে বা গৌড়বঙ্গে তাঁর কি ভূমিকা ছিল ?

গুরুমহারাজ:— শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভু তাঁর জীবনের প্রথম চব্বিশ বছর নবদ্বীপেই কাটিয়েছেন, পরের ছয় বছর পরিব্রাজক জীবন এবং আরো ছয় বছর ভগবৎভাবে পুরীতে ভক্তবৃন্দের সাথে লীলার জীবন।আর জীবনের শেষ বারো বছর গম্ভীরা লীলা ! সুতরাং পুরীতে তাঁর জীবনের বেশ কিছুটা সময় কাটলেও _তিনি পুরীতে সক্রিয়ভাবে স্থুলে লীলা করেছিলেন কমবেশি মাত্র ছয় বছর!

দ্যাখো, শ্রীমন্মহাপ্রভু ছিলেন নরশরীরে ভগবান—সাক্ষাৎ প্রেমস্বরূপ ঈশ্বরের অবতার। পৃথিবীর সৌভাগ্য যে, তিনি নরশরীর ধারণ করে এই ধরণীর ধুলায় কয়েক বছর কাটিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তাঁর কথা এই ভাবে জিজ্ঞাসা করা উচিত নয়—কারণ এর উত্তর দিতে গেলে যতো কথাই বলা হোক না কেন _তা দিয়ে মহাপ্রভুর মহত্ত্বের কিয়দংশ‌ও বর্ণনা করা যাবে না ! প্রথমেই এইটা মাথায় রাখতে হবে, তারপরে যা বলছি সেটা শুনলে তবু কিছুটা ধারণা হবে।

আড়াই হাজার বছর আগে ভগবান বুদ্ধ তৎকালীন সমাজে আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জাগরণ এনেছিলেন। এর ফলে বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে ভারতবর্ষ তার সুফল লাভ করেছিল। কিন্তু যা সবক্ষেত্রেই হয় এখানেও সেইরূপ ঘটতে থাকলো। বৌদ্ধ পরম্পরায় কয়েক জেনারেশন পরেই ধর্মাচার্যরা নিজেরাই নিজেদের চারিত্রিক পবিত্রতা হারিয়ে সংঘের বৈশিষ্ট্যগত আদর্শকে ধরে রাখতে পারলো না। ফলে সংঘারামগুলিও তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হারাতে শুরু করলো। প্রথমদিকে সমাজে অর্থাৎ সাধারণের কাছে এর খুব একটা প্রভাব পড়েনি—কিন্তু ধীরে ধীরে তা সমাজের মানুষকেও প্রভাবিত করতে লাগলো। মানুষ সংঘারাম বা সংঘাচার্যদের প্রতি শ্রদ্ধা-বিশ্বাস হারাতে শুরু করলো। বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে খারাপ রূপ প্রকাশ পেতে লাগলো যখন থেকে বিভিন্ন সংঘে যথেচ্ছভাবে নারী নিয়ে সাধন বা তন্ত্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। ভগবান বুদ্ধের শিক্ষা ছিল—ন্যায় সবার জন্য, ধর্ম সবার জন্য, সংঘ সবার জন্য। সর্বসাধারণের এই অধিকারের দিকটাই মানুষকে সংঘমুখী করেছিল, এখন তার ব্যত্যয় হোতে লাগলো।

 এমন সময় এলেন শঙ্করাচার্য, তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদ সৃষ্টি করলেন। শঙ্করের পরম্পরা থেকে শুরু হল নারী ও শূদ্রের অধিকার হরণের পালা। রাজতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্র বা ব্রাহ্মণদের অশুভ আঁতাত প্ৰতিষ্ঠা হওয়ায় সাধারণ মানুষ ভারতীয় মূল স্রোত থেকে দূরে— বহু দূরে চলে যেতে লাগলো। ব্রাহ্মণের ক্ষেত্রে যে অপরাধ করলে কর্ণচ্ছেদ হোতো, শূদ্রের সেই একই অপরাধে মুণ্ডচ্ছেদ দেওয়া হোতে লাগলো। এই সময় থেকেই বিদেশি লুটেরারা(ইসলামীয়রা) ভারতে সহজেই ঢুকে পড়তে পারলো কারণ ক্ষত্রিয়শ্রেনী লড়াই করলেও সাধারণ মানুষ কোনো প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি! ফলে তারা এই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের রাজা হয়ে বসলো। সাধারণ মানুষ বা আম-জনতার অধিকাংশ সব সময়ই রাজার ধর্মকেই মেনে নেয়। রাজার ধর্মই হয় প্রজার ধর্ম। এখনও জনগণ নিজেদের সুবিধার্থে যে দল দেশশাসন করে, তাদেরকেই সমর্থন করে, পরে তাদের পরিবর্তে অন্য শাসকদল এলে জনগণ আবার সেই দলেরই সমর্থক হয়ে যায়। আর তখনকার দিনে সাধারণ মানুষ তো আরও অসহায় ছিল। ইসলামের ভাল দিক হোচ্ছে ভ্রাতৃত্ব—pan-Islamic-brotherhood ! আর এদিকে কোনো হিন্দু একবার মুসলমান হয়ে গেলে আর ব্রাহ্মণেরা তার বিচার করতো না, বিচার করতো 'মজহব'। তাছাড়া এখনও যেটা হয়—রাজধর্ম গ্রহণ করলেই চাকরি পাওয়া যায়, সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়_তখন‌ও সেটাই ছিল। সুতরাং শত শত বৎসর ধরে অন্যায়-অত্যাচার সহ্য করে কেন মানুষ হিন্দুসমাজে পড়ে থাকবে । দলে দলে হিন্দুরা মুসলমান হোতে শুরু করে দিল। স্থানে স্থানে অবশ্য জোর-জবরদস্তি করেও হিন্দুকে মুসলমান করা হয়েছে, কিন্তু জেনে রাখবে স্বেচ্ছায় তখনকার মানুষ বেশী মুসলমান হয়েছে। তৎকালীন সমাজপতিদের অবিমৃষ্যকারিতার জন্য‌ই অধিক সংখ্যক হিন্দু _মুসলমান হয়ে গিয়েছিল।

  এইসময় নবদ্বীপে শরীর নিয়েছিলেন শ্রীমন্মহাপ্রভু। মহাপ্রভু না এলে তখন গৌড়বঙ্গ থেকে রাঢ়বঙ্গের সকল মানুষই মুসলমান হয়ে যেতো। কিন্তু মহাপ্রকৃতির ইচ্ছা নয় যে তা হোক, তাই তাঁর আবির্ভাব হয়েছিল। তিনি প্রেমের অবতার—অপার্থিব প্রেমের প্রবাহ নিয়ে তিনি যেদিকে যেতেন শুধু মানুষজন কেন—বৃক্ষ-লতা, পশু-পাখীও যেন কেমন হয়ে যেতো। তিনি সকল মানুষকে ধর্মাচরণের অধিকার দিলেন। তিনি বললেন _"একবার ‘হরিবোল' বলো, তাতেই  তোমাদের সমস্ত অপরাধ-ভুল-ত্রুটি মাফ হয়ে গেল, এবার আমার সাথে চলো।" ধর্মান্তরিতরা ভাবতো,তারা ধর্ম পরিবর্তন করেছে _এটা বোধ হয় মহাপাপ। ব্রাহ্মণরা তাদের এটাই মাথায় ঢুকিয়েছিল ! গীতার শ্লোক উদ্ধৃতি করে বুঝিয়েছিল, “স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়” ইত্যাদি। মহাপ্রভু এসে বললেন—"পাপ বলে কিছু নেই!" উনি আরও বললেন _"একবার হরিনামে যত পাপ হরে, জীবের সাধ্য নেই, তত পাপ করে”। এ যেন সাধারণ মানুষের একবুক বেদনার মাঝে একটুকরো শান্তির প্রলেপ ! ধর্মান্তরিত যারা হয়েছিল তারা সুড়সুড় করে পুনরায় মুল ধারায় ফিরে এলো, আর যারা হিন্দুধর্মের প্রতি সংশয়াচ্ছন্ন ছিল তারা পুনরায় ধর্মাচরণের অধিকার পেয়ে মূলস্রোতে থেকে গেল।  এরা এখন সবাই হয়ে গেল বৈষ্ণব—গৌড়ীয় বৈষ্ণব ! তবুও ব্রাহ্মণেরা কিন্তু তাদের সমালোচনা করতে ছাড়েনি, বলল— 'এরা তো জাত্ হারিয়ে বৈষ্ণব !’ তারা মহাপ্রভুকে নাম দিয়েছিল “যজানে গোঁসাই”। .. (ক্রমশঃ)